Kochbihar|   রাজবাড়িই হল কোচবিহার জেলার মূল আকর্ষণ  

Kochbihar|   রাজবাড়িই হল কোচবিহার জেলার মূল আকর্ষণ   

ব্যাপক ছাড়ে  Amazon-এ শপিং করতে এই খানে ক্লিক করুন

উত্তরবঙ্গের অন্যতম একটি জেলা হল কোচবিহার। আয়তনের হিসেবে এটি রাজ্যের ত্রয়োদশ  এবং জনসংখ্যার হিসেবে ষোড়শ বৃহত্তম জেলা হল এই কোচবিহার (Kochbihar)। এই জেলার উত্তরে  জলপাইগুড়ি জেলা দক্ষিণে বাংলাদেশের রংপুর বিভাগ; পূর্বে অসমের ধুবড়ী জেলা এবং পশ্চিমে জলপাইগুড়ি জেলা ও বাংলাদেশের রংপুর বিভাগ অবস্থিত।বর্তমান কোচবিহার জেলাটি অতীতে বৃহত্তর কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। কামরূপের রাজধানী দ্বিধাবিভক্ত হলে কোচবিহার ‘কামতা’-র অন্তর্গত। সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রচিত শাহজাহাননামা গ্রন্থে কোচবিহার নামটির উল্লেখ পাওয়া যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মেজর রেনেলের মানচিত্রে কোচবিহার ‘বিহার’ নামে উল্লিখিত হয়। 1772-1773 সালে, ভুটানের রাজা আক্রমণ করে কোচবিহার দখল করে। ভুটানীদের বিতাড়িত করার জন্য, কোচবিহার-রাজ ধৈর্যেন্দ্র নারায়ণ  ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে 17 এপ্রিল 5 এ একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে।

এই চুক্তির ফলে কোচবিহার ব্রিটিশদের একটি করদ রাজ্যে পরিণত হয়। ১৭৭৩ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে রাজ্যটি "কোচ বিহার" নামে পরিচিত হয় এবং এর রাজধানীর নাম হয় "বিহার ফোর্ট"। উল্লেখ্য, "কোচবিহার" শব্দটির অর্থ "কোচ জাতির বাসস্থান"। কোচবিহার গেজেট অনুযায়ী, মহারাজার আদেশ অনুযায়ী রাজ্যের সর্বশেষ নামকরণ হয় "কোচবিহার"।১৯৪৯ সালের ২৮ অগস্ট রাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ কোচবিহার রাজ্যকে ভারতীয় অধিরাজ্যের হাতে তুলে দেন। সেই বছর ১২ সেপ্টেম্বর থেকে কোচবিহার ভারতের কমিশনার শাসিত প্রদেশে পরিণত হয়। ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের ২৯০ক ধারা বলে কোচবিহার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি জেলায় পরিণত হয়। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে কোচবিহার জেলার জনসংখ্যা ২৮,১৯,০৮৬ এটি জনসংখ্যার হিসাবে ভারতে ১৩৬তম স্থান অর্জন করেছে।

 সমগ্র কোচবিহার জেলা কোচবিহার সদর, মেখলিগঞ্জ,  মাথাভাঙ্গা ,  তুফানগঞ্জ , দিনহাটা এই পাঁচটি মহকুমা ও ১২টি সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক , ৬টি পুরসভা নিয়ে গঠিত হয়েছে

কোচবিহার সদর মহকুমার

কোচবিহার পুরসভা এবং কোচবিহার ১ ও কোচবিহার ২ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক দুটি নিয়ে গঠিত। এই দুই ব্লকের অধীনে ২৮টি গ্রাম পঞ্চায়েত ও তিনটি নগর পঞ্চায়েত রয়েছে।নগর পঞ্চায়েতগুলি হল খড়িমালা খাগড়াবাড়ি, গুড়িয়াহাটি ।কোচবিহার ১ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকের সদর ঘুঘুমারি, এই  ব্লক ১৫টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত। এগুলি হল  চাঁদামারি, ফালিমারি, হাঁড়িভাঙা, পাটছড়া, চিলকিরহাট, ঘুঘুমারি, জিরানপুর, পুটিমারি-ফুলেশ্বরী, দাউয়াগুড়ি, গুরিয়াহাটি-১, ময়ামারি, দেওয়ানহাট, গুরিয়াহাটি-২, পানিশালা ও শুটকাবাড়ি।

 কোচবিহার ২ ব্লকের সদর পুন্ডিবাড়ি। কোচবিহার ২ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক ১৩টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত। এগুলি হল: টাকাগাছ-রাজারহাট, বাণেশ্বর, আমবাড়ি, ধাংধিংগুড়ি, মধুপুর, গোপালপুর, মরিচবাড়ি-খোলতা, বড়রংরাস, খাগড়াবাড়ি, পাতলাখাওয়া, চাকচাকা, কাপাইডাঙা ও পুন্ডিবাড়ি।  এই ব্লকের একমাত্র নগর পঞ্চায়েতটি হল  খাগড়াবাড়ি।

মেখলিগঞ্জ মহকুমার

সদর মেখলিগঞ্জ , এই মহকুমার সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক ২ টি হল মেখলিগঞ্জ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক ও হলদিবাড়ী সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক । পৌরসভা দুটি হল মেখলিগঞ্জ , হলদিবাড়ি।

ব্যাপক ছাড়ে  Amazon-এ শপিং করতে এই খানে ক্লিক করুন

 মাথাভাঙ্গা মহকুমার 

মাথাভাঙ্গা পৌরসভা  ও  শীতলকুচি সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক , মাথাভাঙ্গা ১ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক, মাথাভাঙ্গা ২ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক নিয়ে গঠিত। এছাড়া ২৮টি গ্রামপঞ্চায়েত নিয়ে মাথাভাঙ্গা মহকুমা গঠিত। মাথাভাঙ্গাতে এর সদর দফতর রয়েছে।

শীতলকুচি সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক ৮টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত। এই ব্লকের সদর দফতর ও থানা হল শীতলকুচি।

মাথাভাঙ্গা-১ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক ১০টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত। এই সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকের সদর দফতর মাথাভাঙ্গা এবং এই এলাকা মাথাভাঙ্গা ও ঘোকসাডাঙ্গা নিয়ে থানা গঠিত।

মাথাভাঙ্গা-২ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক১০টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত। এই সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকের সদর দফতর ভোগমারা এবং এই এলাকা মাথাভাঙ্গা ও ঘোকসাডাঙ্গা নিয়ে থানা গঠিত।

 তুফানগঞ্জ মহকুমার

সদর  তুফানগঞ্জ , এই মহকুমার সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক ২ টি হল  তুফানগঞ্জ ১ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক , তুফানগঞ্জ ২ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক।এই মহকুমার পৌরসভাটি হল  তুফানগঞ্জ।

 দিনহাটা মহকুমার 

দিনহাটা পুরসভা এবং দিনহাটা ১, দিনহাটা ২ ও সিতাই সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক তিনটি নিয়ে গঠিত। এই মহকুমার সদর দিনহাটা শহরে অবস্থিত। এই মহকুমার একমাত্র সেন্সাস টাউন হচ্ছে ভাঙরি প্রথম খণ্ড

দিনহাটা-১ ব্লক ১৬টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত। এই গ্রাম পঞ্চায়েত গুলি হল - দিনহাটা ভিলেজ-১, দিনহাটা ভিলেজ-২, বড়ো আটিয়াবাড়ি-১, বড়ো আটিয়াবাড়ি-২, গোসানিমারি-১, গোসানিমারি-২,  পুটিমারি-১, পুটিমারি-২, গিতালদা-১, গিতালদা-২, ভেটাগুরি-১, ভেটাগুরি-২, বড়ো শৌলমারি, মাতালহাট, ওকরাবাড়ি ও পেটলা। দিনহাটা-১ ব্লক এর সদর দিনহাটা ।

দিনহাটা-২ ব্লক ১২টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত। এই গ্রাম পঞ্চায়েত গুলি হল - বামনহাট-১, বামনহাট-২, কিশামত দশগ্রাম, সুকারুকুঠি,  নাজিরহাট-১, নাজিরহাট-২, গোবরাছড়া নয়ারহাট, চৌধুরিহাট, বড়োশাকদল, বুড়িরহাট-১, বুড়িরহাট-২ ও সাহেবগঞ্জ। দিনহাটা-২ ব্লক এর সদর হল সাহেবগঞ্জ।

সিতাই ব্লক ৫টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত। এই গ্রাম পঞ্চায়েত গুলি হল - সিতাই-১, সিতাই-২, আদাবাড়ি, চামটা,  ও ব্রাহ্মত্তর-চাত্রা। সিতাই ব্লক এর সদর হল সিতাই।

 

কোচবিহার জেলার ছয়টি প্রধান নদী হল তিস্তা, তোর্সা, কালজানি, জলঢাকা,  রায়ডাক ও গদাধর। এই নদীগুলি উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত। হিমালয় থেকে উৎপন্ন এই নদীগুলি জলপাইগুড়ি জেলার পশ্চিম ডুয়ার্স অঞ্চল থেকে কোচবিহার জেলায় প্রবেশ করেছে। কেবল মাত্র গুম্মন নদটি ডুয়ার্স থেকে উৎপন্ন। কোচবিহারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের রংপুর বিভাগে প্রবেশ করে শেষে ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছে এইসব নদী। নদীগুলির পাড় উঁচুনিচু ও নদীতল বালুকাময়।

কোচবিহার জেলার জলবায়ু অতিরিক্ত আর্দ্রতাযুক্ত ও মধ্যম রকমের উষ্ণ।  একবিংশ শতাব্দীর আগমনের পর থেকে কোচবিহার জেলা জুড়ে শিল্প, রিয়েল এস্টেট, এবং তথ্য প্রযুক্তি সংস্থা এবং শিক্ষার মতো খাতে দ্রুত উন্নয়নের সাথে সাথে আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করছে। কোচবিহারে অনেক ইঞ্জিনিয়ারিং, টেকনোলজি, ম্যানেজমেন্ট এবং প্রফেশনাল স্টাডি কলেজ খোলা হয়েছে। আবাসন সমবায় এবং ফ্ল্যাট, শপিং মল, হোটেল এবং স্টেডিয়ামও উঠে এসেছে। এই জেলার তুফানগঞ্জ  শহর থেকে 4 কিমি দূরে  একটি শিল্প পার্ক তৈরি করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি ছোট কোম্পানি সেখানে শিল্প স্থাপন করেছে।কৃষি নিকটবর্তী গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবিকার একটি প্রধান উৎস। রাজ্য সরকার কোচবিহার জেলাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে উন্নীত করার চেষ্টা করছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার দিকেও উন্নতির দিকে এগোচ্ছে এই জেলা । এই জেলার নামকরা কয়েকটি স্কুলের মধ্যে রয়েছে জেনকিন্স স্কুল, সুনিটি একাডেমি এবং কোচবিহার রামভোলা উচ্চ বিদ্যালয়। কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়, কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয় হল পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার শহরের একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। কোচ রাজবংশী নেতা য় সমাজ সংস্কারক পঞ্চানন বর্মার নামে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি নামাঙ্কিত। কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলার মোট ২৫টি কলেজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ।কোচবিহার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পুন্ডিবারী,এম.জে.এন.মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল মহাবিদ্যালয়, তুফানগঞ্জ মহাবিদ্যালয়, মেখলীগঞ্জ মাহাবিদ্যালয়, দিনহাটা মহাবিদ্যালয়, মাথাভাঙ্গা মহাবিদ্যালয় ইত্যাদী বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় ও বহুসংখ্যক উচ্চ ও নিম্নবিদ্যালয় এই জেলার অন্তর্গত৷

কোচবিহারের জনপ্রিয় লোকসংঙ্গীত হল ভাওয়াইয়া , এটি কোচবিহারে ও আসামের গোয়ালপাড়ায় প্রচলিত এক প্রকার পল্লীগীতি। এসকল গানের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এ গানগুলোতে স্থানীয় সংস্কৃতি, জনপদের জীবনযাত্রা, তাদের কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক ঘটনাবলী ইত্যাদির সার্থক প্রয়োগ ঘটেছে।, এছাড়াও কোচবিহারের জনপ্রিয় পালাগান বিষহরা। কোচবিহারের অন্যতম একটি জনপ্রিয় উৎসব হল রাসমেলা , প্রতি বছর রাস পূর্ণিমার সময় বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম মেলা রাস মেলা আয়োজন করেকোচবিহার পৌরসভা।

এই মেলা প্রায় ২০০ বছরেরও পুরনো। আগে কোচবিহারের মহারাজরা রাস চক্র সরিয়ে মেলার উদ্বোধন করতেন এবং এখন কোচবিহার জেলার ম্যাজিস্ট্রেট এই কাজটি  করেন। কোচবিহার রাজবাড়ি কোচবিহার জেলার মূল আকর্ষণ । ইংল্যান্ডের বাকিংহাম প্যালেসের অনুকরণে তৈরী এই বিশাল রাজবাড়ি  আজও রাজবাড়ির জাঁকজমকের সাক্ষ্য বহন করে। মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণের আমলে এই রাজপ্রাসাদ তৈরী হয়। মহারানি গায়ত্রীদেবী এই রাজ পরিবারের মেয়ে ছিলেন।

রাজপ্রাসাদে আছে শয়নকক্ষ, সাজ ঘর, খাওয়ার ঘর, বিলিয়ার্ড হল, গ্রন্থাগার প্রভৃতি। এই জেলার আর একটি দর্শনীয় স্থান হল  বাণেশ্বর মন্দির। এখানে মূল মন্দির থেকে ১০ ফুট নীচে রয়েছে গর্ভগৃহ এবং শিবলিঙ্গ।  মন্দিরের চারপাশে অনেক জলাশয় আছে আর সেখানে অনেক কচ্ছপ দেখতে পাওয়া যায়। দোল্পূর্ণিমার দিন এই মন্দির থেকে মদনমোহন মন্দির পর্যন্ত শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। দোল ও রাস এই দুই উৎসবেই সরগরম থাকে কোচবিহার। মদনমোহন মন্দির কোচবিহার জেলার একটি প্রসিদ্ধ পীঠস্থান। রাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ এই মন্দির তৈরী করেন।এই জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান সাগর দীঘি  মহারাজা হীরেন্দ্র নারায়ণের আমলে তৈরী এই দীঘি। এই স্থানটিও বেশ মনোরম।