কৃষ্ণ

কৃষ্ণ

শাস্ত্রীয় বিবরণ ও জ্যোতিষ গণনার ভিত্তিতে লোকবিশ্বাস অনুযায়ী Krishna কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল ৩২২৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ১৮ অথবা ২১ জুলাই বুধবার। বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। তাঁকে স্বয়ং ভগবান এবং বিষ্ণুর পূর্ণাবতারও মনে করা হয়। গীতায় বলা হয়েছে যে, অধর্ম ও দুর্জনের বিনাশ এবং ধর্ম  রক্ষার জন্য তিনি যুগে যুগে পৃথিবীতে আগমন করেন। তাঁর এই আগমন ঘটে কখনও মনুষ্যরূপে, কখনও বা মনুষ্যেত্বর প্রাণিরূপে এবং একেই বলা হয় অবতার।

কৃষ্ণের জন্মদিনটি কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী বা জন্মাষ্টমী নামে পালিত হয়। Krishna কৃষ্ণ যাদব-রাজধানী মথুরার রাজপরিবারের সন্তান। তিনি বসুদেব ও দেবকীর অষ্টম পুত্র। তার পিতামাতা উভয়ের যাদববংশীয়। দেবকীর দাদা কংস  তাদের পিতা উগ্রসেনকে বন্দী করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। একটি দৈববাণীর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের হাতে তার মৃত্যু হবে।

এই কথা শুনে তিনি দেবকী ও বসুদেবকে কারারুদ্ধ করেন এবং তাদের প্রথম ছয় পুত্রকে হত্যা করেন। দেবকী তার সপ্তম গর্ভ রোহিণীকে প্রদান করলে, বলরামের জন্ম হয়। এরপরই কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন। কৃষ্ণের জীবন বিপন্ন জেনে জন্মরাত্রেই দৈবসহায়তায় কারাগার থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে বসুদেব তাকে গোকুলে তার পালক মাতাপিতা যশোদা  ও নন্দের কাছে রেখে আসেন। কৃষ্ণ ছাড়া বসুদেবের আরও দুই সন্তানের প্রাণরক্ষা হয়েছিল। প্রথমজন বলরাম (যিনি বসুদেবের প্রথমা স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন) এবং সুভদ্রা (বসুদেব ও রোহিণীর কন্যা, যিনি বলরাম ও কৃষ্ণের অনেক পরে জন্মগ্রহণ করেন)।  

নন্দ ছিলেন গোপালক সম্প্রদায়ের প্রধান। তার নিবাস ছিল বৃন্দাবনে। কৃষ্ণের ছেলেবেলার গল্পগুলি থেকে জানা যায়, কিভাবে তিনি একজন রাখাল বালক হয়ে উঠলেন।  শৈশবেই কৃষ্ণ এতটাই দুর্ধর্ষ আর অপ্রতিরোধ্য প্রকৃতির ছিলেন যে তিনি তার প্রাণনাশের চেষ্টাগুলিকে চমকপ্রদভাবে বানচাল করে দিতে পারতেন এবং বৃন্দাবনবাসীর জীবনরক্ষা করতেন। কৃষ্ণের প্রাণনাশের জন্য কংস পুতনা সহ অন্যান্য রাক্ষসদের প্রেরণ করলে সকলকে হত্যা করেন কৃষ্ণ।কৃষ্ণ চরিত্রটি খুবই বৈচিত্র্যময়। বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর যে কাহিনী বর্ণিত হয়েছে তাতে তাঁর তিনটি প্রধান রূপ লক্ষ্য করা যায়: পরোপকারী, প্রেমিক এবং রাজনীতিক। পরোপকারীর ভূমিকায় কৃষ্ণকে দেখা যায় তাঁর শিশু বয়স থেকেই। 

কৃষ্ণের খোঁজ পাওয়া গেলে কংস পুতনা নামক এক রাক্ষসীকে পাঠান শিশুকৃষ্ণকে হত্যা করতে। মাত্র ৬ মাস বয়সেই পুতনা রাক্ষসীকে হত্যা করেন তিনি যাঁর উচ্চতা ছিল ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। পর্যায়ক্রমে তিনি বৎসাসুর, অঘাসুর, বকাসুর প্রভৃতি অপশক্তিকে বিনাশ করেন।  কালীয় নামে একটি বিরাট সাপ যমুনার জল বিষাক্ত করে রেখেছিল। এই জল পান করে রাখাল ও গরুর মৃত্যু হত প্রায়শই। তিনি কালীয়দহে কালীয় নাগ দমন, বৃন্দাবনকে রক্ষার জন্য দাবাগ্নি পান, ইন্দ্রের কোপ হতে গোপগণকে রক্ষার জন্য গোবর্ধনগিরি ধারণের মাধ্যমে বাল্যকালেই নানাভাবে জনসাধারণের উপকার করেন।

 কৈশোরে কৃষ্ণ যে কাজগুলি করেন তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কংসবধ। অত্যাচারী কংস ছিল মথুরার রাজা। সে নিজের পিতা উগ্রসেনকে কারাগারে আটক রেখে সিংহাসন অধিকার করে। এমনকি ভবিষ্যদ্বাণীতে জ্ঞাত তার মৃত্যুর কারণ কৃষ্ণের আবির্ভাব ঠেকাতে সে নিজের বোন-ভগ্নীপতি অর্থাৎ কৃষ্ণের মাতা-পিতা দেবকী-বসুদেবকেও কারাগারে আটক রাখে এবং নিজের হাতে বোনের সন্তানদের হত্যা করে। 

তাই কৃষ্ণ মথুরায় প্রত্যাবর্তন করে কৃষ্ণ তার মামা কংসের অনুগামীদের দ্বারা সংঘটিত বহু হত্যার ষড়যন্ত্র থেকে আত্মরক্ষা করে কংসকে বধ করেন। তিনি কংসের পিতা উগ্রসেনকে পুনরায় যাদবকুলের রাজা হিসেবে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন এবং নিজে সেখানে অন্যতম যুবরাজ হিসেবে অবস্থান করেন।এই সময়ে তার সাথে অর্জুন সহ কুরু রাজ্যের অন্যান্য পাণ্ডব রাজপুত্রদের শখ্যতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে তিনি যাদবদের নিয়ে দ্বারকা নগরীতে (অধুনা গুজরাত) চলে আসেন এবং সেখানেই তার রাজত্ব স্থাপন করেন।

যখন যুধিষ্ঠির সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন তিনি সমস্ত মহান রাজাদের সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান। যখন তিনি তাদের প্রত্যেককে একে একে সম্মান জ্ঞাপন করতে আরম্ভ করলেন তখন তিনি সর্বপ্রথম কৃষ্ণকে সম্মান জ্ঞাপন করলেন কারণ তিনি কৃষ্ণকেই সমস্ত রাজাদের মধ্যে মহান হিসেবে গণ্য করেছিলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল রাজারাই তাতে সম্মত হলেও কৃষ্ণের আত্মীয় শিশুপাল তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কৃষ্ণের নিন্দা শুরু করেন। কৃষ্ণ শিশুপালের মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি শিশুপালের একশত অপরাধ ক্ষমা করবেন।

তাই যখন শিশুপাল একশত অপরাধ অতিক্রম করলেন তখন তিনি তার বিরাট রূপ ধারণ করে সুদর্শন চক্রের দ্বারা শিশুপালকে বধ করলেন। সেইসময় অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রও দিব্যদৃষ্টি লাভ করে কৃষ্ণের সেই রূপ দর্শন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পুরাণ অনুসারে শিশুপাল এবং দন্তবক্র নামে অপর এক ব্যক্তি পূর্বজন্মে ছিলেন স্বর্গে দেবতা বিষ্ণুর দ্বাররক্ষক জয় ও বিজয়। তারা অভিশপ্ত হয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং আবার বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের দ্বারাই স্বর্গে প্রত্যাগমন করেন।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তিনি নিজে অস্ত্র চালনা করেননি বটে, কিন্তু যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন মূলত তিনিই। দুর্বৃত্ত জরাসন্ধ বধ ও শিশুপাল বধও এ পর্বেরই ঘটনা। মহাভারতের ভীষ্মপর্বে কৃষ্ণ অর্জুনকে ক্ষাত্রধর্ম এবং আত্মা সম্পর্কে যে উপদেশ দিয়েছেন তা ভগবদ্গীতা বা সংক্ষেপে গীতা নামে খ্যাত। এভাবে কৃষ্ণ অধর্মের বিনাশ ও দুষ্টের দমন করে ধর্ম স্থাপন ও শিষ্টের পালন করেছেন। এর কিছুকাল পরে তাঁর নিজের যদুবংশে অনাচার দেখা দিলে তাও তিনি কঠোর হাতে দমন করেন।

  যখন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে তখন কৃষ্ণ পাণ্ডব এবং কৌরব উভয়পক্ষকেই সুযোগ দেন তার কাছ থেকে সাহায্য হিসেবে দু'টি জিনিসের মধ্যে যেকোন একটি নির্বাচন করতে। তিনি বলেন যে হয় তিনি স্বয়ং থাকবেন অথবা তার নারায়ণী সেনাকে যুদ্ধের জন্য প্রদান করবেন, কিন্তু তিনি নিজে যখন থাকবেন তখন তিনি হাতে অস্ত্র তুলে নেবেন না। পাণ্ডবদের পক্ষে অর্জুন স্বয়ং কৃষ্ণকে গ্রহণ করেন এবং কৌরবদের পক্ষে দুর্যোধন কৃষ্ণের নারায়ণী সেনা গ্রহণ করেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় কৃষ্ণ অর্জুনের রথের সারথির ভূমিকা পালন করেন কারণ তার অস্ত্র ধরার কোন প্রয়োজন ছিল না।

যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়ে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন যখন উপলব্ধি করলেন যে যাঁরা তার প্রতিপক্ষ তারা তার আত্মীয়বর্গ এবং অত্যন্ত প্রিয়জন তখন তিনি যুদ্ধের বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি সমস্ত আশা ত্যাগ করে তার ধনুক গাণ্ডীব নামিয়ে রাখলেন। তখন অর্জুনের মোহ দূর করার জন্য কৃষ্ণ অর্জুনকে সেই ধর্মযুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে উপদেশ দেন যা ভগবদ্গীতা নামে খ্যাত। কৃষ্ণ ছিলেন প্রখর কূটবুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষ এবং মহাভারতের যুদ্ধ ও তার পরিণতিতে তার প্রগাঢ় প্রভাব ছিল। তিনি পাণ্ডব এবং কৌরবদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করতে যথাসম্ভব উদ্যোগী হয়েছিলেন। কিন্তু দূর্যোধনের কূপ্রচেষ্টায় তার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে তখন তিনি ক্রূর কূটনীতিকের ভূমিকা গ্রহণ করেন।

যুদ্ধকালে পিতৃ-পিতামহের বিরুদ্ধে সঠিক মনোবল নিয়ে যুদ্ধ না করার জন্য তিনি অর্জুনের উপর ক্রুদ্ধ হন। একবার তাকে আঘাত করার অপরাধে কৃষ্ণ একটি রথের চাকাকে চক্রে পরিণত করে ভীষ্মকে আক্রমণ করতে উদ্যত হন। তখন ভীষ্ম সমস্ত অস্ত্র পরিত্যাগ করে কৃষ্ণকে বলেন তাকে হত্যা করতে। কিন্তু এরপর অর্জুন কৃষ্ণের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন এবং পূর্ণ উদ্যম নিয়ে যুদ্ধ করার প্রতিজ্ঞা করেন। কৃষ্ণ যুধিষ্ঠির এবং অর্জুনকে নির্দেশ দেন যাতে তারা ভীষ্মের দেওয়া যুদ্ধজয়ের বর ফিরিয়ে দেয়, কারণ ভীষ্ম স্বয়ং সেই যুদ্ধে পাণ্ডবদের প্রতিপক্ষ হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ভীষ্মকে এ কথা জানানো হলে তিনি এ কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে কীভাবে তিনি অস্ত্র পরিত্যাগ করবেন সে উপায় পাণ্ডবদের বলে দেন।

তিনি বলেন যে, যদি কোন নারী যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করে তবেই তিনি অস্ত্রত্যাগ করবেন। পরের দিন কৃষ্ণের নির্দেশে শিখণ্ডী, অর্থাৎ যিনি পূর্বজন্মে অম্বা ছিলেন তিনি অর্জুনের সাথে যুদ্ধে যোগদান করেন এবং ভীষ্ম তার অস্ত্রসকল নামিয়ে রাখেন। এছাড়াও কৃষ্ণ ধৃতরাষ্ট্রের জামাতা জয়দ্রথকে বধ করতে অর্জুনকে সহায়তা করেন। জয়দ্রথের কারণেই অর্জুনের পুত্র অভিমন্যু দ্রোণাচার্যের চক্রব্যূহে প্রবেশ করেও বেরিয়ে আসার উপায় অজ্ঞাত থাকায় কৌরবদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। কৃষ্ণ কৌরবদের সেনাপতি দ্রোণাচার্যের পতনও সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি ভীমকে নির্দেশ দিয়েছিলেন অশ্বত্থামা নামক একটি হাতিকে বধ করতে এবং তাৎপর্যপূর্ণভাবে দ্রোণাচার্যের পুত্রের নামও অশ্বত্থামা।

এরপর কৃষ্ণের নির্দেশে যুধিষ্ঠির দ্রোণাচার্যকে গিয়ে চতুরতার সাথে বলেন যে অশ্বত্থামা নিহত হয়েছেন এবং তারপর খুব মৃদুস্বরে বলেন যে সেটি একটি হাতি। কিন্তু যেহেতু যুধিষ্ঠির কখনও মিথ্যাচার করতেন না তাই দ্রোণাচার্য তার প্রথম কথাটি শুনেই মানসিক ভাবে অত্যন্ত আহত হন ও অস্ত্র পরিত্যাগ করেন। এরপর কৃষ্ণের নির্দেশে ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণের শিরশ্ছেদ করেন। কর্ণের সাথে অর্জুনের যুদ্ধের সময় কর্ণের রথের চাকা মাটিতে বসে যায়। তখন কর্ণ যুদ্ধে বিরত থেকে সেই চাকা মাটি থেকে ওঠানোর চেষ্টা করলে কৃষ্ণ অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে দেন যে কৌরবেরা অভিমন্যুকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে যুদ্ধের সমস্ত নিয়ম ভঙ্গ করেছে।

তাই তিনি নিরস্ত্র কর্ণকে বধ করে অর্জুনকে সেই হত্যার প্রতিশোধ নিতে আদেশ করেন। এরপর যুদ্ধের অন্তিম পর্বে কৌরবপ্রধান দুর্যোধন মাতা গান্ধারীর আশীর্বাদ গ্রহণ করতে যান যাতে তার শরীরের যে অঙ্গসমূহের উপর গান্ধারীর দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হবে তাই ইস্পাতকঠিন হয়ে উঠবে। তখন কৃষ্ণ ছলপূর্বক তার ঊরুদ্বয় কলাপাতা দিয়ে আচ্ছাদিত করে দেন। এর ফলে গান্ধারীর দৃষ্টি দুর্যোধনের সমস্ত অঙ্গের উপর পড়লেও ঊরুদ্বয় আবৃত থেকে যায়। এরপর যখন দুর্যোধনের সাথে ভীম গদাযুদ্ধে লিপ্ত হন তখন ভীমের আঘাত দুর্যোধনকে কোনভাবে আহত করতে ব্যর্থ হয়।

তখন কৃষ্ণের ইঙ্গিতে ভীম ন্যায় গদাযুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করে দুর্যোধনের ঊরুতে আঘাত করেন ও তাকে বধ করেন। এইভাবে কৃষ্ণের অতুলনীয় ও অপ্রতিরোধ্য কৌশলের সাহায্যে পাণ্ডবেরা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ জয় করে। এছাড়াও কৃষ্ণ অর্জুনের পৌত্র পরীক্ষিতের প্রাণরক্ষা করেন, যাকে অশ্বত্থামা মাতৃগর্ভেই ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করে আঘাত করেছিলেন। পরবর্তীকালে পরীক্ষিতই পাণ্ডবদের উত্তরাধিকারী হন। 

এমনিভাবে অপশক্তির হাত থেকে শুভশক্তিকে রক্ষার জন্য কৃষ্ণ পরবর্তীকালে আরও অনেক দুর্বৃত্তকে হত্যা করেন বা করান।  কৃষ্ণের প্রেমিক রূপের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর বৃন্দাবন লীলায়। হরিবংশপুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত ইত্যাদি গ্রন্থে তিনি চিত্রিত হয়েছেন একজন প্রেমিক, ভক্তসখা এবং গোপীজনবল্লভরূপে। এখানে তিনি সমাজের একেবারে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, তাদের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবন কাটিয়েছেন। এ সময় তাঁর জীবনে স্বাভাবিক ঘটনার পাশাপাশি অনেক অস্বাভাবিক ঘটনাও ঘটতে দেখা যায়। গোপকন্যা এবং গোপস্ত্রী রাধার সঙ্গে তাঁর প্রণয়-সম্পর্ক পরবর্তীকালের বৈষ্ণব সাহিত্যের মূল প্রেরণা। গোপনারীদের সঙ্গে তাঁর যে সম্পর্ক তার মধ্যে নিহিত রয়েছে ভারতীয় বেদান্তদর্শনের জীবাত্মা-পরমাত্মা সম্পর্কিত মূলতত্ত্ব।

সে তত্ত্ব হলো জীবাত্মা-পরমাত্মা এক; পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলনই জীবের প্রধান কাঙ্ক্ষিত বিষয়, যাকে বলা হয় মোক্ষ। কৃষ্ণ সেই পরমাত্মা, আর সব জীবাত্মা। কৃষ্ণের সখাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন শ্রীদাম, সুদামা, উদ্ধব প্রমুখ। অর্জুন তাঁর সখা এবং আত্মীয়ও। এঁদের সঙ্গে কৃষ্ণের আচরণ একজন সাধারণ মানুষের মতোই। 

এক মতে শ্রীকৃষ্ণের ১৬১০৮ জন স্ত্রী ছিলেন । যাদের মধ্যে বৈবাহিকসূত্রে প্রধান স্ত্রী ছিলেন আটজন এবং বাকি ১৬১০০ জন ছিলেন নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে উদ্ধার হওয়া ধর্মাবতার কৃষ্ণে সমর্পিত ও তার অধিকারপ্রাপ্ত নারী । কিন্তু এদের প্রত্যেককে দেবী লক্ষ্মীর অবতার হিসেবে মনে করা হয়। প্রত্যেকের গর্ভেই শ্রীকৃষ্ণের দশটি পুত্র এবং একটি কন্যার জন্ম হয়েছিল।

রুক্ষ্মিণী হলেন কৃষ্ণের প্রধান পত্নী। তিনি বিদর্ভরাজ ভীষ্মকের কন্যা এবং ভীষ্মকপুত্র রুক্মীর ভগিনী। ইনি কৃষ্ণের সহিত বিবাহ করার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন। শিশুপালের সঙ্গে বিবাহের পূর্বলগ্নে কৃষ্ণ রুক্ষ্মিনীর সম্মতিতে বিবাহ করেন এবং দ্বারকায় আনয়ন করেন। রুক্ষ্মিনী কৃষ্ণের ঔরসে একটি তেজস্বী পুত্রসন্তান লাভ করেন। তাঁর নাম হলো প্রদ্যুম্ন। কৃষ্ণের আরেক মহিষী সত্যভামার গর্ভে কৃষ্ণ যে দশটি পুত্র লাভ করেছিলেন তারা হলেন ভানু, সুভানু, স্বরভানু, প্রভানু, ভানুমান, চন্দ্রভানু, বৃহদ্ভানু, অতিভানু, শ্রীভানু এবং প্রতিভানু। 

জাম্ববানের কন্যা জাম্ববতীর গর্ভে কৃষ্ণ যে দশটি পুত্র লাভ করেছিলেন তারা হলেন শাম্ব, সুমিত্র, পুরুজিৎ, শতজিৎ, সহস্রজিৎ, বিজয়, চিত্রকেতু, বসুমান, দ্রাবিড় ও ক্রতু। এই পুত্রেরা কৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ ও নগ্নজিতির সন্তানরা হলেন বীর, চন্দ্র, অশ্বসেন, চিত্রাগু, বেগবান, বৃষ, অম, শঙ্কু এবং কুন্তী (কৃষ্ণের পিসি ও পাণ্ডবদের মাতা কুন্তী নন)।শ্রুত, কবি, বৃষ, বীর, সুবাহু, ভদ্র, শান্তি, দর্শ, পূর্ণাংশ এবং সোমক হলেন কৃষ্ণ ও কালিন্দির পুত্র। লক্ষণা নামক মহিষীর গর্ভে শ্রীকৃষ্ণের ঔরসজাত পুত্রেরা হলেন প্রঘোষ, গাত্রবান, সিংহ, বল, প্রবল, উর্ধগ, মহাশক্তি, সাহা, ওজ এবং অপরাজিত। মিত্রবৃন্দা ও শ্রীকৃষ্ণের মিলনে যে দশ পুত্রের জন্ম হয়, তারা হলেন বৃক, হর্ষ, অনিল, গৃধ্র, বর্ধন, উন্নাদ, মহাংশ, পবন, বহ্নি এবং ক্ষুধী। ভদ্রার গর্ভজাত শ্রীকৃষ্ণের পুত্রেরা হলেন সংগ্রামজিৎ, বৃহৎসেন, সুর, প্রহরণ, অরিজিৎ, জয়, সুভদ্র, বাম, আয়ুর ও সাত্যক। 

কৃষ্ণের বুদ্ধিদীপ্ত এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তাঁর রাজনীতিক রূপ, যার পরিচয় পাওয়া যায় মহাভারতে। এখানে তিনি একজন রাজা (দ্বারকার রাজা), রাজনীতিক, কূটনীতিক, যোদ্ধা এবং দার্শনিকরূপে চিত্রিত হয়েছেন। এ পর্বে তাঁর কর্মকান্ডের প্রায় সবই মানবোচিত। পান্ডবদের পক্ষে দৌত্য-ক্রিয়া ও তাঁদের প্রাপ্য রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করা, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে পান্ডবদের পরামর্শ দান ও বিজয়ী করা, দুর্যোধনাদি দুর্জনদের বিনাশ ও যুধিষ্ঠিরকে রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করা, অর্থাৎ অধর্মের বিনাশ করে ধর্মকে প্রতিস্থাপন করার কাজ কৃষ্ণ এ পর্বেই সমাপ্ত করেন।  কৌশলে তিনি যদুবংশ ধ্বংস করে নিজে এক ব্যাধের শরাঘাতে ইহলোক ত্যাগ করেন।