কৃষ্ণনগর| বাংলার ইতিহাসে রাজার শহর কৃষ্ণনগর

কৃষ্ণনগর| বাংলার ইতিহাসে রাজার শহর কৃষ্ণনগর

রাজার শহর কৃষ্ণনগর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদিয়া জেলায় অবস্থিত। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে কৃষ্ণনগর দক্ষিণবঙ্গের রাজধানী ছিল। কলকাতা থেকে রেলপথে দুরত্ব ঠিক ১০০ কিলোমিটার । আর সড়কপথে ১০৮ কিলোমিটার । মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কৃষ্ণনগর । গোপালভাঁড়ের কৃষ্ণনগর । মাটির পুতুলের কৃষ্ণনগর । সরপুরিয়া-সরভাজার কৃষ্ণনগর । বাংলার ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা কৃষ্ণনগর । কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণীর মাটির পুতুল ও মূর্তি পশ্চিমবঙ্গের শ্রেষ্ঠ কুটির শিল্পগুলির অন্যতম। এটি বর্তমানে নদিয়া জেলার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র ও প্রাচীন বাংলার অন্যতম শিক্ষা ও সংস্কৃতির শহর বলে পরিচিত। কৃষ্ণনগরের বারদোলের মেলা বাংলার অতি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মেলা। নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র এই মেলার প্রবর্তক হিসাবে জানা যায়।  ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে কৃষ্ণনগর শহরের জনসংখ্যা হল ১৩৯,০৭০ জন।

এর মধ্যে পুরুষ ৫১% এবং নারী ৪৯%। এখানে সাক্ষরতার হার ৭৯%। পুরুষদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৮৩% এবং মহিলাদের মধ্যে এই হার ৭৫%। সারা ভারতের সাক্ষরতার হার ৫৯.৫%, তার চাইতে কৃষ্ণনগর এর সাক্ষরতার হার বেশি। এই শহরের জনসংখ্যার ৯% হল ৬ বছর বা তার কম বয়সী। সংস্কৃতি ও বিদ্যোৎসাহী রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নামানুসারে এই স্থান কৃষ্ণনগর নামে খ্যাত। অতীতে এই জায়গার নাম ছিল রেউই। নদিয়া রাজপরিবারের শ্রেষ্ঠ পুরুষ রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজধানী ছিল কৃষ্ণনগর। তিনি বিদ্বানসংস্কৃত ও ফার্সিভাষায় শিক্ষিত, সংগীতরসিক ছিলেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন শাক্তপদাবলিকার রামপ্রসাদ সেন, অন্নদামঙ্গল কাব্য প্রণেতা ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর, হাস্যরসিক গোপাল ভাঁড় প্রমুখ বাংলার প্রবাদপ্রতিম গুণী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষক। তার চেষ্টায় এই স্থানে গুনী ব্যক্তিদের সমাবেশ হয় এবং কৃষ্ণনগর বাংলার সংস্কৃতিচর্চার পীঠস্থান হয়ে ওঠে। ১৮৫৬ সালে সারস্বত চর্চ্চার কেন্দ্র রূপে গড়ে কৃষ্ণনগর সাধারণ গ্রন্থাগার। কৃষ্ণনগরের জগদ্বিখ্যাত মৃৎশিল্পের সূত্রপাত ও জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন তার সময়ে তারই উদ্যোগে ঘটেছিল। কৃষ্ণনগর পৌরসভা ১৮৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। 

কৃষ্ণনগর সিটি জংশন রেলওয়ে স্টেশন । এই জংশন স্টেশন থেকে তিন তিনটি আলাদা রেলপথের সংগম স্থল। কৃষ্ণনগর - লাল গোলা লাইন, কালীনারায়ণপুর -শান্তিপুর – কৃষ্ণনগর লাইন এবং রানাঘাট – কৃষ্ণনগর লাইন এর রেলপথ যুক্ত আছে। -কৃষ্ণনগর - লাল গোলা লাইন এর পরবর্তী স্টেশন হল - ট্যার্মিনাস এবং পূর্ববর্তী স্টেশন হল বাহাদুরপুর রেলওয়ে স্টেশন। -কালীনারায়ণপুর শান্তিপুর – কৃষ্ণনগর লাইন এর পরবর্তী স্টেশন হল - দিগনানগর রেলওয়ে স্টেশন এবং পূর্ববর্তী স্টেশন হল ট্যার্মিনাস। -রানাঘাট – কৃষ্ণনগর লাইন এর পরবর্তী স্টেশন হল - জালাল খালি হল্ট রেলওয়ে স্টেশন এবং পূর্ববর্তী স্টেশন হল ট্যার্মিনাস। 

কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব   দ্বিজেন্দ্রলাল রায় - কবি ও নাট্যকার | ভারতচন্দ্র রায় - কবি চঞ্চল কুমার মজুমদার - বিখ্যাত বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী, মজুমদার-ঘোষ মডেলের উদ্ভাবক। বাঘা যতীন - স্বাধীনতা সংগ্রামী ও শহীদ বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় - জাতীয়তাবাদী কবি মনমোহন ঘোষ লালমোহন ঘোষ হেমন্তকুমার সরকার - স্বাধীনতা সংগ্রামী রামতনু লাহিড়ী - মনীষী প্রমোদরঞ্জন সেনগুপ্ত - স্বাধীনতা সংগ্রামী ও চিন্তাবিদ নারায়ণ সান্যাল হেমচন্দ্র বাগচী দামোদর মুখোপাধ্যায় চার্লস জিমেলিন দিলীপ বাগচী সুধীর চক্রবর্তী বিশ্বম্ভর দাস - কবি দীপক চৌধুরী - কবি ও সাহিত্যিক

মাটিয়ারি

পূৰ্ব্বে মাটিয়ারি নামক স্থানে এই রাজবংশের রাজধানী ছিল। কিন্তু ভবানন্দের পৌত্র রাঘব বর্তমান কৃষ্ণনগরে রাজধানীর পত্তন করেন। তখন ঐ স্থানে রেউই নামে একটি ক্ষুদ্র গ্রাম ছিল। ঐ গ্রামে বহুসংখ্যক গোপজাতীয় লোকের বাস ছিল। ঐ সকল গোপ মহাসমারোহ পূৰ্ব্বক কৃষ্ণের পূজা করিত বলিয়া রাঘবের পুত্র রুদ্র রাজধানীর নাম কৃষ্ণনগর রাখিলেন। তদবধি কৃষ্ণনগর বঙ্গদেশের ইতিবৃত্তে প্রসিদ্ধ স্থান হইয়া উঠিল। তদবধি কৃষ্ণনগরই এই রাজগণের বাসস্থান হইয়া রহিয়াছে। কেবল মধ্যে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র একবার মহারাষ্ট্রীয়দিগের উপদ্রবে উত্ত্যক্ত হইয়া কৃষ্ণনগর পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক ইহার ছয় ক্রোশ দূরে, নিজ জ্যেষ্ঠ পুত্র শিবচন্দ্রের নামে, শিবনিবাস নামক এক নগর স্থাপন করিয়া তাহাতে কিছু দিন বাস করিয়াছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশ্বরচন্দ্র শিবনিবাস ত্যাগ করিয়া কৃষ্ণনগরে অবস্থিত হন।  বৰ্ত্তমান শতাব্দীর প্রারম্ভে যেমন একদিকে নদীয়ার রাজগণের রাজশক্তি হ্রাস পাইতে লাগিল, তেমনি অপর দিকে, ইংরাজ-রাজ্য স্থাপন ও বিষয় বাণিজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে, কতকগুলি মধ্যবিত্ত ভদ্র পরিবার কৃষ্ণনগরে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়া অগ্রগণ্য হইয়া উঠিলেন।

কৃষ্ণনগর...ঐতিহ্য আর বনেদিয়ানার মেলবন্ধন । বর্ধিষ্ণু এই শহরের গলিঘুঁজিতে ঘুরে বেড়ালে সরভাজার কড়া পাকের গন্ধ, মাটির পুতুলের গভীর চোখের তারায় আশ্চর্য সূক্ষ্মতা আর সুদূর বিস্তৃত ফাঁকা মাঠের শেষপ্রান্তের ওই নাটমন্দির-নহবতখানা- বিষ্ণুমহল জানান দিয়ে যায় অতীতের কিছু অন্ধকার আর কিছু গৌরবময় ইতিহাসের পাঁচালি । সোনাপট্টির সরু গলির শেষে শতাব্দী প্রাচীন গোয়াড়ি বাজারের মুখে রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার ষাঁড়, সদ্য জলঙ্গী (যার ডাক নাম খরে) থেকে ধরে আনা তাজা খয়রা মাছ নিয়ে দর হাঁকাহাঁকি কিছুটা হলেও এই মফঃস্বলের অন্যরকম গল্পটাকে চিনিয়ে দিয়ে যায়। 

এই শহরের আরও এক পুরনো যুগের রেশ টেনে ধরে রেখেছে বারোদোলের মেলা। শহরের মূল রাস্তা, যেটা কৃষ্ণনগর থেকে বগুলার দিকে চলে যাচ্ছে...সেই রাস্তার উপরেই রয়েছে রাজবাড়ির চক। ডাকদিকে এগোলেই বিশাল মাঠ। মাঠ শুরু হচ্ছে চকবাড়ি থেকে। এক সময় এখানে একটা মেয়েদের স্কুল ছিল। মহারানি জ্যোতির্ময়ীর নামে সেই স্কুলের নাম ছিল মহারানি জ্যোতির্ময়ী বালিকা বিদ্যালয়। এখন অবশ্য পোড়ো বাড়ি হয়েই পড়ে রয়েছে । চকবাড়ি থেকে কিছুটা এগোলেই নহবতখানা। শ্যাওলামাখা গা বেয়ে নোনা জলের ধারা, আর ঘুঘুর বসবাস সেখানে। নহবতখানার পাশেই রাজবাড়ির পুকুর। সেই পুকুরও প্রায় মৃত্যুশয্যায় বলাই ভাল। তবু এখনও এই পুকুরের তাৎপর্যটি আছে ষোলো আনা। এখনও রাজবাড়ির ঠাকুর ভাসান হয় নিজস্ব এই পুকুরের ঘাটেই। দুর্গাপুজো আর জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় দলে দলে মানুষ আসেন সেই শোভাযাত্রা দেখতে।

নহবতখানাকে বাঁয়ে রেখে এগোলে ডান হাতে পড়বে নাটমন্দির। রাজবাড়ির মাঠে এখন বসেছে বারোদোলের মেলা। পঙ্খের কাজ করা এই নাটমন্দির দেখলে এখনও চোখ ফরানো যায় না। আর নাটমন্দিরের বাঁহাতে রাজবাড়ির মূল ফটক। নাটমন্দিরের ভিতর দিয়েও সাজানো সরু পথ রয়েছে মূল রাজবাড়ির দিকে। তবে সেই পথ একেবারেই পরিবারের লোকেদের ব্যবহারের জন্য। বছরের কয়েকটি বিশেষ তিথিতে সাধারণের জন্য খোলা থাকে এই নাটমন্দির। যেমন একটা হল বারোদোলের মেলা। এছাড়া দুর্গা পুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো তো আছেই। বারোদোল বসে চৈত্র মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে। চলে টানা এক মাস। মোটামুটি ভাবে রংদোলের পর এক মাসের মাথায় এই মেলা শুরু হয়। কৃষ্ণনগরের রাজনৈতিক ইতিহাস খুবই বৈচিত্র্যময়। আর সেই ইতিহাসে এই রাজবাড়ির ভূমিকা অনস্বীকার্য।

খুব কাকতালীয় আর খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে এই রাজবাড়ি একাধারে বাংলার পরাধীনতা আবার স্বাধীনতা দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে। ইতিহাসের পাতা একটু উল্টে দেখা যাক, নদিয়ার রাজবাড়ির প্রাণপুরুষ ছিলেন ভবানন্দ মজুমদার। বাংলা বিজয়ে মানসিংহকে সাহায্য করার জন্য পুরস্কার হিসাবে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে তিনি সম্মান লাভ করেন। সঙ্গে পান নদিয়া, সুলতানপুর, মারুপদহ,মহৎপুর,লেপা,কাশিমপুরের মতো ১৪টি পরগনা। ভবানন্দ নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জ থানার মাটিয়ারিতে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন | পরবর্তীতে নদিয়ারাজ রুদ্র রায় নবদ্বীপ ও শান্তিপুরের কাছে রেউই গ্রামে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। পরে এই রেউই-এর নাম হয় 'কৃষ্ণনগর'। নদিয়ার রাজবংশের শ্রেষ্ঠ রাজা বলা হয় কৃষ্ণচন্দ্র রায়কে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৭২৮-এ তিনি রাজা হন। তাঁর রাজত্বকালে ফুলে ফেঁপে ওঠে রাজ্য। 

সে সময় রাজ্যের পরগনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪ টি আর রাজ্যের পরিধি ছিল ৮৫০ ক্রোশ। ভারতের স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যায় ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন পলাশীর মাঠে, ইংরেজদের কাছে সিরাজের হারের সঙ্গে সঙ্গে । আর দেশের সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির নাম। ১৭৫৬ সালে আলিবর্দি খাঁ-র মৃত্যুর পর বাংলার সিংহাসনে বসলেন তাঁরই দৌহিত্র সিরাজ-উদ-দোল্লা। অল্প বয়সে রাজকর্ম হাতে পেয়ে আর বয়সের দোষে রাজকর্মচারীদের চক্ষুশূল হলেন সিরাজ। জগৎ শেঠের নেতৃত্বে সিরাজকে সরানোর চক্রান্ত শুরু হল। সেই দলে সামিল হয়েছিলেন কৃষ্ণচন্দ্রও। শোনা যায়, ব্রিটিশ সরকারকে পত্রযোগে পরামর্শদান করেছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, ব্রিটিশকে সৈন্য দিয়েও সাহায্য করা হয়েছিল কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি থেকেই। যার পরিণাম হল পলাশীর যুদ্ধ।

পলাশীর যুদ্ধ

পলাশীর প্রান্তরে সিরাজবাহিনী পরাস্ত হল আর তারপর মীরজাফর পুত্র মীরণের তত্ত্বাবধানে হল সিরাজহত্যা। ২০০ বছর পর আবার এই কৃষ্ণনগর রাজবাড়িই একদিন স্বাধীন করল জন্মভূমিকে। সেই ইতিহাস লোকবিষ্ম‌ৃত হলেও কম গৌরবময় নয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট স্বাধীন হল দেশ। কিন্তু সে সময় কোনও আনন্দ অনুষ্ঠান পালিত হল না কৃষ্ণনগরের বুকে। বিনিদ্র রজনী তখন উৎকণ্ঠার প্রহর গুণছে। নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও পশ্চিম দিনাজপুর এই চারটি জেলার এবং বনগাঁ থানা এলাকার মানুষ স্বাধীনতার আনন্দ উৎসবে অংশ নিতে পারেননি সেদিন। ভারত না পাকিস্তান – কোন দেশের মধ্যে তাঁরা থাকবেন এই অনিশ্চয়তা নিয়েই তখন দিন কাটছে তখন। সে সময় ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় আঁকা মানচিত্রকে ভিত্তি করে একটি মানচিত্র তৈরি হল। এই মানচিত্র অনুযায়ী দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, যশোহর এবং বনগাঁ থানাকে ‘পূর্ববঙ্গ’এর মধ্যে ধরা হয় । 

রাজবাড়ির অন্দর

৩০ জুন ১৯৪৭ গভর্নর জেনারেলের ঘোষণা(Ref. No.D50/7/47R) অনুযায়ী Sir Cyril Radcliffe কে চেয়ারম্যান করে পাঁচ জনের Bengal Boundary Commission গঠিত হয় । ৩০ জুন থেকে ১৪ অগস্ট ১৯৪৭ মাত্র ৪৫ দিন হলেও প্রকৃত পক্ষে ১৮ জুলাই ১৯৪৭ থেকে ১২ অগস্ট ১৯৪৭ মোট ২৫ দিন কমিশন হাতে পায় । আর সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ১৬ থেকে ১৯ এবং ২১ থেকে ২৪ জুলাই ১৯৪৭ মাত্র ৮ দিন পাওয়া যায়। ১২ অগস্ট ১৯৪৭ Radcliffe রিপোর্ট পেশ করেন। ১৪/১৫ অগস্ট ১৯৪৭ মাঝরাতে যথারীতি দ্বি-খন্ডিত স্বাধীনতা ঘোষিত হল ।১৯০৫ সালের আঁকা মানচিত্রকে রিপোর্টে পেশ করা হয়েছে বলে সুকৌশলে প্রচার করে মুসলিম লিগ ময়দানে নেমে পড়ে ।

১২ অগস্ট ১৯৪৭ থেকে ১৪/১৫ অগস্ট ১৯৪৭ স্বাধীনতা ঘোষনা মাঝের মাত্র দুদিনে মানুষ Radcliffe রিপোর্টের সঙ্গে পেশ করা নতুন মানচিত্র সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন না । ১৫ অগস্ট সকালে মুসলিম লিগ মিছিল মিটিং করে পাকিস্থানের পতাকা উত্তোলন করে। এতেই বিভ্রান্ত হন সাধারণ মানুষ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে Radcliffe রিপোর্ট ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকে । শুরু হয় তৎপরতা।বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মহারানি জ্যোতির্ময়ী দেবী রাজ্য ও সর্ব ভারতীয় স্তরে যোগাযোগ করা শুরু হয়। ১৬ অগস্ট তৎপরতা তুঙ্গে উঠে । কিন্তু ১৪ অগস্টের বেতার বার্তা শুনে তো সবার মাথায় হাত।

কৃষ্ণনগর ও রাণাঘাট পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। রেডিওর ঘোষণা শেষ হলে, এলাকায় উড়ল পাকিস্তানের পতাকা। এদিকে কৃষ্ণনগরের রানি জ্যোতির্ময়ী দেবী ইংরেজদের এই কাজ মেনে নিলেন না। পুত্র সৌরীশ ও গণ্যমান্য কয়েকজনকে নিয়ে সোজা গিয়ে দেখা করলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে। কাগজপত্র দেখে মাউন্টব্যাটেন মেনে নিলেন রানির দাবি। ১৭ অগাস্ট রাতে রেডিওতে ঘোষণা হল যে, কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট ভারতেই থাকছে। উল্লাসে ফেটে পড়লেন এলাকার মানুষ। ১৮ অগস্ট ‘দ্বিতীয়বার’ স্বাধীন হল কৃষ্ণনগর।আর এবার সেই স্বাধীনতা এনে দিল নদিয়ার রাজবাড়ি।আজকের রাজবাড়ি সক্রিয় রাজনীতি থেকে বহু দূরে। রাজবাড়ির অন্দরে সদ্য শেষ হওয়া বারোদোলের ভাঙা আসরের গন্ধ। কিন্তু ভোটের তাপ উত্তাপ এখানে খুঁজতে যাওয়া বোকামি হবে। রাজবাড়ির চৌহদ্দিতে ঢুকলে সেখানে নির্ভেজাল নীরবতা বাইরের উত্তেজনাকে ম্লান করে দেয়।  

কলকাতা থেকে রেলপথে ঠিক ১০০ কিলোমিটার দূরে কৃষ্ণনগর একটা বেশ সুন্দর দেখার জায়গা । ট্রেনে যাওয়ার খরচ সবচেয়ে কম, এছাড়া কলকাতা থেকে বাসে বা গাড়ি ভাড়া করেও যাওয়া যেতে পারে ।  জায়গাটা ঠিক ঘোরার জায়গা হিসেবে প্রসিদ্ধ স্থান  তাই আগে থেকে একটু জেনে যাওয়ার দরকার যে এখানে কি কি দেখার জিনিস আছে, সেগুলোর কোনটা কোথায় আর কিভাবে যেতে হয় । ২ জন ঘোরার জন্য টোটো  হচ্ছে সবচেয়ে সুবিধেজনক । তবে লোকসংখ্যা বেশি হলে অটো ভাড়া করে নেওয়া যেতে পারে ।  এখানে দেখার জায়গা বলতে রাজবাড়ি, কলেজ,কদমতলা ঘাট,ঐতিহ্য ময় কৃষ্ণনগর পৌরসভা, রবীন্দ্রভবন , জলঙ্গীর ব্রিজ, ঘূর্ণি আর চার্চ । এর মধ্যে রাজবাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেয় না । . ঘূর্ণি অবশ্যই দেখা উচিৎ । এখানকার মাটির পুতুল পৃথিবীবিখ্যাত আর তার কারণটা এখানে গেলে স্পষ্ট বোঝা যায় ।