কুট্রালানাথার মন্দির

কুট্রালানাথার মন্দির

কুট্রালানাথার মন্দির  Kutralanathar Temple  তামিলনাড়ুর তেনকাশী জেলায় মন্দির-শহর ‘দক্ষিণ কাশী’ তেনকাশী থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে পশ্চিমঘাট পর্বতের অগস্ত্যমালাই রেঞ্জের কোলে সমুদ্রতল থকে ১৬০ মিটার (৫২০ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত কোট্রালাম বা থিরুকুটাচলম নামের তীর্থস্থানে অবস্থিত হল পঞ্চ সভাইয়ের শেষ বা পঞ্চম ‘সভাই’ কুট্রালানাথার শিব মন্দির। জায়গাটি পাহাড় ও জঙ্গলে ঘেরা এবং Kalakkad Mundanthurai Tiger Reserve লাগোয়া, এবং এখানকার জঙ্গলে বাঘ ও চিতাবাঘ আছে।

কোর্টালাম জায়গাটির এবং কোর্টালাম ফলসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্য বহু তামিল কবি-সাহিত্যিক এই জায়গাটি নিয়ে লিখেছেন এবং অনেক দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার শুটিং এখানে হয়েছে।কুট্রালানাথার মন্দির নিয়ে দু’টি দু’ধরণের পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে। প্রথমটি পঞ্চসভাইয়ের কমন গল্প – শিব এই মন্দির সংলগ্ন ‘চিথিরা’ অর্থাত্‍ চিত্র সভায় তাণ্ডব নৃত্য করেছিলেন বা অন্য ভার্সনে শিবলোকে বিভোর হয়ে নৃত্যরত শিবের পায়ের নুপূর থেকে খসে পড়া রত্নের এক টুকরো এসে এখানে পড়েছিল।দ্বিতীয় কাহিনীটি একটু বড়।

সেই কাহিনী অনুসারে শিব-পার্বতীর বিয়ের সময় কৈলাসে দেব-যক্ষ-রক্ষ-মুনিঋষি দর্শকদের এত ভিড় হয়েছিল যে অগস্ত্যমুনি কিছুই দেখতে না পেয়ে শিবের কাছে প্রার্থনা করলেন শিব যেন কৃপা করে তাঁকে শিবদর্শনের ব্যবস্থা করে দেন। শিব সন্তুষ্ট হয়ে অগস্ত্যকে বললেন যে অগস্ত্যর কৈলাস যাওয়ার দরকার নেই, শিব স্বয়ং কোর্টালামের মন্দিরে আসবেন।ঐ মন্দিরটি কিন্তু ছিল বিষ্ণু মন্দির।

অগস্ত্য ঐ মন্দিরে ঢুকতে গেলে মন্দিরের দ্বারপালরা অগস্ত্য ঢুকতে দিলেন না। অগস্ত্য রেগে গিয়ে নিজের তপস্যার শক্তিতে বিষ্ণুকে শিব, শঙ্খকে হরিণ ও তুলসীকে শিবের কপালের অর্ধচন্দ্রে পরিনত করে বিষ্ণুর মাথাটাকে এত জোরে চেপে ধরলেন যে বিষ্ণু একটি শিবলিঙ্গে পরিনত হলেন। সেই শিবলিঙ্গই কুট্রালানাথার লিঙ্গ।এখানেই কিন্তু কাহিনীর অন্ত নয়।

অগস্ত্য ভীষণ জোরে চেপে দেওয়ায় একদিকে শিবলিঙ্গের মাথায় অগস্ত্যের হাতের দাগ বসে গেল (সেই দাগ নাকি এখনও দেখা যায়), অন্যদিকে শিবের প্রচণ্ড মাথাব্যথা আরম্ভ হল। শিবের মাথাব্যথা সারাবার জন্য অগস্ত্য দুধ, ডাবের জল এবং ৪২ ধরণের ওষধি গাছগাছড়া জরিবুটি মিশিয়ে একটা তেল তৈরী করে শিবলিঙ্গে লাগালেন। শিবের আরাম হল। শিব সন্তুষ্ট হয়ে অগস্ত্যকে আশীর্বাদ করে বললেন যে তিনি এখানে কুর্টালানাথার হিসাবে থাকবেন এবং কাছের ঐ জলপ্রপাতগুলির জল অগস্ত্যের তৈরী ওষধি তেলের সব গুণ চিরকালের জন্য বহন করবে।

পঞ্চসভাই স্থলঙ্গমের পঞ্চম ‘স্থলঙ্গল’ অর্থাত্‍ স্থল হল তামিলনাড়ুর তেনকাশী জেলায় তেনকাশী থেকে ছ’ কিলোমিটার দূরে পাহাড় আর ঝর্ণা ঘেরা সুন্দর ছোট জনপদ থিরুকুর্টালাম বা থিরুকুটাচলমে অবস্থিত কুট্রালানাথার মন্দির। চোল ও পাণ্ড্য রাজাদের প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরটির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা অংশটি শঙ্খের আকৃতির বলে এই মন্দিরটিকে ‘শঙ্খকোভিল’ বলা হয়।

মন্দিরটির ঠিক পিছনে পাহাড় এবং কোট্রালাম ফলসের প্রধান ধারা ‘পেরারুভি’ ফলস পাহাড় থেকে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। প্রতিদিনই অজস্র ট্যুরিস্ট ও তীর্থযাত্রী এই ফলসের ওষধিগুণসম্পন্ন জলের ধারার নীচে দাঁড়িয়ে স্নান করেন এবং এই স্নানটি এককথায় রিফ্রেশিং (ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি)।মন্দিরের পাশ দিয়ে শীর্ণকায়া চিত্তর নদী বয়ে গেছে। একটা ছোট্ট ব্রীজ দিয়ে নদী (আসলে একটা বড় ড্রেনের মতো) পার হয়ে মন্দিরের গেট।

দ্রাবিড়ীয় রীতির মন্দির, ছোট গোপুরম। মূল মন্দিরে শিব, পাশে আলাদা মন্দিরে পার্বতী। শিব এখানে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর সঙ্গে যুগ্ম ভাবে আছেন। তাঁর পরিচিতি ‘কুট্রালানাথ’ (তামিলে কুট্রালানাথার) নামে। আম্বাল অর্থাত্‍ পার্বতী এখানে কুঝালভই মোঝিআম্মাই। পার্বতীর মন্দিরটি ধর্মীয় দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারন এটি ৬৪-শক্তিপীঠের একটি।মন্দিরসংলগ্ন ‘থিরিকূটামণ্ডপম’ বা ত্রিকূট মণ্ডপে উত্‍সবকালীন সমারোহ অনুষ্ঠিত হয়।

এই মন্দিরের স্থলবৃক্ষ বা temple tree হল ” কুরুম পলা” এবং “তীর্থম” অর্থাত্‍ পবিত্র জলাশয় হল “চিত্রনদী”। মন্দির চত্তরে একটি প্রায় জলশূন্য বাঁধানো পুকুরই এই তীর্থম।মূল মন্দির থেকে প্রায় ৭৫০ মিটার দূরে একটি মণ্ডপ হল ‘চিথিরা সভাই’ অর্থাত্‍ চিত্র সভা। এই চিত্রসভায় উত্‍সবের সময় কুরমপালাভীসার মন্দির থেকে নটরাজের মূর্তি নিয়ে আসা হয়। এই মণ্ডপটিতে ঢুকলে বোঝা যায় ‘চিত্রসভা’ নামের সার্থকতা। মণ্ডপটির সমস্ত ভিতরের দেওয়াল জুড়ে আঁকা আছে অজস্র রঙিন ম্যুরাল।

পৌরাণিক কাহিনীর কী নেই সেই ছবির শোভাযাত্রায়! মুগ্ধ বিস্ময়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয় চিত্রসভার সেই চিত্ররাশির দিকে। তবে দুঃখের কথা, ফটো তোলা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। তার উপর মণ্ডপটির গড়ণ এমনই যে বাইরে থেকে কিছুতেই ভিতরের ফটো তোলা যায় না। চিত্রসভার অপরূপ চিত্রের সমাহার দেখতে হলে আপনাকে তাই থিরুকুর্টালাম যেতেই হবে।

কোট্রালাম কুট্রালানাথার শিবমন্দিরের জন্য বিখ্যাত হলেও এর অন্য একটি আকর্ষণ আছে। সেটি হল কোট্রালাম ফলস (জল প্রপাত)। পশ্চিমঘাট পর্বতের অংশ কোট্রালাম হিলস থেকে উত্‍পন্ন হওয়া ‘চিত্তর’ (‘ছোট’ বা ‘সুন্দর’) নদী এখানে পাহাড় থেকে অনেকগুলি ধারায় বিভক্ত হয়ে প্রায় ৫০ ফিট উঁচু থেকে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। ৮০ কিলোমিটার লম্বা চিত্তর নদী ‘থামিরাবরণী’ (‘তাম্রপর্ণী’) নদীর একটি বাম-উপনদী।

বলা হয় যে এই জল ওষধি গুণ যুক্ত, সে জন্য এই জলপ্রপাতকে ‘মেডিক্যাল স্পা’-ও বলে। জলে সত্যিই একটা ওষুধ ওষুধ গন্ধ আছে।এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মতে মোট ৯টি ধারা আছে – তার মধ্যে ‘পেরারুভি’ হল প্রধান ফলস। অন্যগুলি হল ‘আইন্থারুভি’ ফলস (ফাইভ ফলস), ‘শেনবাঘাদেবী’ ফলস, ‘থেন আরুভি’ ফলস (হানি ফলস), ‘চিত্রারুভি’ ফলস, ‘পুলি আরুভি'(টাইগার ফলস), ‘পাঝায়া আরুভি’ (ওল্ড ফলস), ‘পুথু আরুভি’ (নিউ ফলস), ‘পাঝাথোট্টা আরুভি’ (ফ্রুট গার্ডেনস ফলস)।

এই ধারাগুলির জল বৃষ্টিপাতের সময় বেড়ে যায়। মনে রাখতে হবে যে কেরল-ঘেঁষা তামিলনাড়ুর এই অঞ্চলে বর্ষা আসে বছরে দু’বার – দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে মে থেকে সেপটেম্বর মাসে এবং উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসে। এই দ্বিতীয় মনসুনেই বৃষ্টি বেশি হয়।কোট্রালাম ফলসের প্রধান ধারা পেরারুভির খুব কাছেই কুট্রালানাথার শিবের মন্দির। 

পঞ্চসভাই স্থলঙ্গলের পাঁচটি মন্দিরই তামিলনাড়ুতে। এই মন্দিরগুলি হল :-১) রত্ন সভাই – থিরুভলানগাডু বডারণ্যেশ্বরার মন্দির – চেন্নাই শহরের কাছে; ভৌগোলিক কো-অর্ডিনেট ১৩.০৭ ডিগ্রী নর্থ, ৭৯.৪৬ ডিগ্রী ইস্ট।২) কনক সভাই – থিল্লাই নটরাজা মন্দির – চিদাম্বরম – ভৌগোলিক কো-অর্ডিনেট ১১.৪ ডিগ্রী নর্থ, ৭৯.৭ ডিগ্রী ইস্ট।৩) ভিলি (রজত) সভাই – মীনাক্ষী আম্মান মন্দির – মাদুরাই – ভৌগোলিক কো-অর্ডিনেট ৯.৫৫ ডিগ্রী নর্থ, ৭৮.০৭ ডিগ্রী ইস্ট।৪) থামিরা (তাম্র) সভাই – নেল্লাইআপ্পার মন্দির – তিরুনেলভেলি – ভৌগোলিক কো-অর্ডিনেট ৮.৭২ ডিগ্রী নর্থ, ৭৭.৬৮ ডিগ্রী ইস্ট।৫) চিথিরা (চিত্র) সভাই – কুট্রালানাথার মন্দির – থিরুকুর্টালাম, তেনকাশী – ভৌগোলিক কো-অর্ডিনেট ৮.৫৫ ডিগ্রী নর্থ, ৭৭.১৬ ডিগ্রী ইস্ট।