পাতি লেবু | খাওয়া ভালো, তবে বেশি খেলে বিপদ

পাতি লেবু |  খাওয়া ভালো, তবে বেশি খেলে  বিপদ

আজ বাংলা: লেবু বাঙালির খাবার টেবিলে একটি অন্যতম সহায়ক সবজি।খাবার টেবিলে এবং সালাদে লেবু ছাড়া তো ভাবাই যায় না।এর স্বাদ বৃদ্ধির ভূমিকা যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে বিশেষ খাদ্যগুণ।বিশেষ করে পাতি লেবুকে ‘সি’ ভিটামিনের ডিপো বলা হয়ে থাকে।গরমে ঠান্ডা এক গ্লাস লেবুর সরবত মূহুর্তে ক্লানি- দূর করে।ছোট বড় সবার জন্য লেবু এক আশ্চর্য গুণসম্পন্ন সবজি এবং ভেষজ।পাতি লেবু, খুব ছোট্ট একটা ফল কিন্তু গুণ অনেক।

লেবুর অনেক জাত আছে।তন্মধ্যে পাতিলেবু, কাগজিলেবু, এলাচিলেবু, সিডলেসলেবু, সরবতিলেবু, বাতাবিলেবু,কমলালেবু ও মাল্টালেবু উল্লেখযোগ্য।তবে কমলালেবু পাহাড়ি এলাকায় জন্মে।বাকিগুলো সমভূমিতেই জন্মে। লেবুর প্রচলিত ব্যবহারঃ লেবুর কদর সাধারণত তার রসের জন্য। এর শাঁস এবং খোসাও ব্যবহার হয় বিভিন্ন কাজে।কিন্তু প্রধানত সর্বত্র লেবুর রসই ব্যবহৃত হয়।লেবু পছন্দ করেনা এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

লেবুর রস শরীরকে হাইড্রেড রাখে

  • খাদ্য ও পুষ্টি বোর্ডের মতে, প্রতিদিন মহিলাদের শরীরে কমপক্ষে ৯১ আউন্স এবং পুরুষদের কমপক্ষে ১২৫ আউন্স জলের প্রয়োজন। এই জল, খাবার এবং পানীয় থেকে সাধারণত শরীরে প্রবেশ করে থাকে।
  • জল হাইড্রেশনের জন্য সেরা পানীয়, তবে অনেকেই বেশি জল খেতে পছন্দ করেন না এর স্বাদের জন্য। তাই লেবু মিশিয়ে জল খেলে তা স্বাদ বাড়ায় ও জল খাওয়ার ইচ্ছেও বাড়িয়ে তোলে। এটি শরীরকে হাইড্রেড করতেও সাহায্য করে।

লেবুর রস ভিটামিন সি’র যোগান ঘটায়

  • সাইট্রাস জাতীয় ফলে ভিটামিন সি বিপুল পরিমানে থাকে। লেবু সাইট্রাস জাতীয় ফলের মধ্যে একটি, যা ভিটামিন সি সমৃদ্ধ।
  • ভিটামিন সি’তে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা কোষকে ফ্রি র‌্যাডিক্যালগুলি ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। লেবু তাই এই কাজটি করতে সক্ষম।
  • লেবুতে থাকা ভিটামিন সি কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা কমায়। উচ্চ রক্তচাপকে হ্রাস করতে পারে।
  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিক্ষেত্র নির্ভর সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, একটি লেবুর রস প্রায় ১৮.৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি সরবরাহ করে। একজন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে শরীরে ৬৫ থেকে ৯০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি’র প্রয়োজন। যা লেবু থেকে আপনারা অনায়াসে পেতে পারেন।

লেবুর রস ওজন হ্রাস করে সহজেই

  • গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে লেবুর রস বা লেবু জল নিয়মিত পান করলে ওজন কমতে বাধ্য। কারন লেবুতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে ক্ষতিকর মেদ জমতে দেয় না।
  • অতিরিক্ত মেদকে গলাতে সক্ষম লেবুর জল। তবে তা সঠিক নিয়মে পান করলে তবেই সম্ভব।
  • প্রতিদিন মধু ও লেবু মেশানো জল খালি পেটে সকাল সকাল পান করলে ওজন কমে তাড়াতাড়ি।

ত্বকের যত্ন নেয় লেবুর রস

  • লেবুতে থাকা ভিটামিন সি ত্বকের কুঁচকে যাওয়া, বয়েসের বলিরেখা কমাতে সাহায্য করে।
  • যাদের ড্রাই স্কিন তারা নিয়মিত লেবুর জল পান করলে কয়েকদিনের মধ্যে দেখবেন ড্রাইনেস কমে গিয়েছে।
  • ত্বকের হারানো জেল্লা নিমেষে ফিরে আসে লেবুর চমৎকারী কার্যকারিতার সাহায্যে।
  • ব্ল্যাকহেডসের মত সমস্যার মোকাবিলা করতে লেবুকে আপনার হাতিয়ার বানানে পারেন নির্দ্বিধায়।
  • ঠোঁটের কালচে ভাব দূর করে গোলাপি করতে দারুন কাজ দেয় লেবুর রস।

হজমে সহায়তা করে

  • অনেকেই আছেন যারা প্রতিদিন সকালে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি পেতে লেবুর জল পান করেন। ঘুম থেকে ওঠার পর উষ্ণ বা গরম লেবু জল পান করা পাচনতন্ত্রকে সক্রিয় করতে সহায়তা করে।
  • আয়ুর্বেদিক শাস্ত্র বলছে যে, টক লেবুর স্বাদ অগ্নাশয়কে উদ্দীপিত করতে সাহায্য করে। হজম সিস্টেমকে ঠিক রাখে, ফলে খাবার সহজে হজম হয়। টক্সিনের গঠন প্রতিরোধে সহায়তা করে লেবুর রস।

নিঃশ্বাসকে সতেজ রাখে

  • রসুন, পেঁয়াজের মত গন্ধযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে মুখ থেকে বাজে গন্ধ বের হয়। যা নিঃশ্বাসের সাথেও মিশে যায়। লেবুর রস আপনাদের এই সমস্যা থেকে মুক্ত কোরতে পারে।
  • খাওয়ার পরে এক গ্লাস লেবুর জল পান করে আপনি সকালে দুর্গন্ধ এড়াতে পারেন। লেবুর রস ব্যাকটেরিয়াজনিত দুর্গন্ধ দূর করে নিমেষে মুখের ভিতর ফ্রেসনেশ এনে দেয়।
  • রেস্তোরাঁ বা অনুষ্ঠান বাড়িতে অনেকেই খাবার পর এক টুকরো লেবু চিপে খেয়ে নেন। এতে হজম যেমন ভালো ভাবে হয় পাশাপাশি মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়।

কিডনিতে পাথর প্রতিরোধে সহায়তা করে

  • লেবুতে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড কিডনিতে পাথর প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।
  • লেবুর রস প্রসাবকে কম অ্যাসিডযুক্ত করে তোলে এবং ছোট ছোট পাথরও ভেঙে ফেলতে পারে।

কীভাবে লেবুর জল বানাবেন

  • নিয়মিত লেবুর জল পান করা মানে এই নয় যে জলে এক ফালি লেবু মিশিয়ে খেয়ে নিলেই হবে। সঠিক প্রয়োগই এনে দেবে উপকার।
  • সবসময় টাটকা লেবুর ব্যবহার করবেন। কোন প্রকারের কেমিক্যাল যুক্ত লেমন জুস না।
  • লেবুর জল তৈরি করতে, অর্ধেক লেবু ৪ আউন্স গরম বা ঠান্ডা জলে মিশিয়ে নিন। পানীয়টি যথাসম্ভব স্বাস্থ্যকর করতে, ফিল্টারযুক্ত জল এবং জৈব লেবু ব্যবহার করুন।
  • আইস ট্রেতে লেবুর রস জমিয়ে আইস কিউব বানিয়ে রেখে দিতে পারেন। যখনই জল খাবেন একটুকরো লেবুর আইস কিউব মিশিয়ে তা পান করুন। বারবার কাটার ঝামেলা থাকবে না।
  • উষ্ণ লেবুর জল দিয়ে শুরু করতে পারেন আপনার সকাল। এক গ্লাস উষ্ণ গরমজলে একটি গোটা লেবু মিশিয়ে খান খালি পেটে। আর সারাদিনের জন্য এক বোতল জলে লেবু ফালি ফালি করে কেটে মিশিয়ে ফ্রিজে রেখে দিন।

পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া লেবুর রসের

  • সাধারণত লেবুর জল পান করা নিরাপদ। তবে কয়েকটি সম্ভাব্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে, তাই সচেতন হওয়া জরুরি।
  • লেবুতে সাইট্রিক অ্যাসিড রয়েছে যা দাঁতের এনামেল ক্ষয় করতে পারে। ঝুঁকি এড়াতে স্ট্র এর সাহায্যে লেবুর জল পান করুন। জল খাওয়ার পর মুখ জল দিয়ে কুলকুচি করে নিন।
  • অম্বলের সমস্যা যাদের আছে তাদের জন্য লেবু বেশি পরিমানে খাওয়া ঠিক না। সাইট্রিক অ্যাসিড লেবুতে থাকার ফলে অনেকের লেবু খেয়েও অম্বল হয়। তাই তারা একটু সাবধান থাকুন এটি পানের ক্ষেত্রে।
  • লেবুর জল পান করলে বারবার বার্থরুমে যাওয়ার প্রবনতা বেড়ে যায় অনেকের। তবে এটি লেবুর জন্য হয় না। পরিমানের চেয়ে বেশি জল পানের জন্য হয়।

দাঁতের এনামেল ক্ষয়ে যায়
লেবু আমাদের নানা রকম উপকারে আসে. তবে অতিরিক্ত খেলে লেবুর মধ্যে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড থেকে দাঁত ক্ষয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা যায়. দাঁতের উপর সাদা স্তর পড়ে যায়. সম্প্রতি ব্রাজিলের National Institute of Dental and Craniofacial Research এর একটি গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে সফট ড্রিংক খেলে দাঁতের যে সমস্যা হয় লেবুর থেকেও ঠিক একই সমস্যা হয়. এছাড়াও যারা প্রতিদিন সকালে উঠে লেবু জল খান তাঁরা যদি দিনে অন্তত দুবার ব্রাশ করেন তাহলে দাঁতের সমস্যা অনেক কম হয়.

মুখমন্ডলের কোশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়
দীর্ঘদিন ধরে লেবু খেলে মুখের মধ্যে থাকা নরম কোশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়. সেখান থেকে মুখের মধ্যে ফোঁড়া বা ফুসকুড়ি হওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যায়. সাইট্রিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ যে কোনও ফল খেলেই এই সমস্যা হতে পারে। 

অ্যাসিড এবং বমির সম্ভাবনা থাকে

ভিটামিন সি শরীরের জন্য প্রয়োজন. কিন্তু অতিরিক্তও ভালো নয়. অতিরিক্ত লেবু বা লেবুর রস খেলে সেখান থেকে অ্যাসিড তো হবেই. সেই সঙ্গে বমি বমি ভাব বা বমি হতেই পারে. যেখান থেকে পরবর্তীকালে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়. শুধুমাত্র লেবু জল নয়. যে কোনও ডিটক্স ডায়েট ড্রিংক থেকেই এই সমস্যা হতে পারে.

বারবার বাথরুম পাওয়া, শরীর শুকনো হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা যায়
গরম জলে লেবু যেহেতু ডিটক্সিফিকেশনে সাহায্য করে তাই বারে বারে বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হয়. এছাড়াও পেট ফেঁপে যাওয়া, শরীর শুকনো হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়. বারবার প্রস্রাব হওয়ার ফলে ইলেকট্রোলাইটস ও সোডিয়াম দেহের থেকে বেরিয়ে যায়. আর এই বার বার বাথরুমে যাওয়ার ফলে ব্লাডারে চাপ পড়ে. যা কিন্তু শরীরের জন্য ক্ষতিকর. এছাড়াও পটাসিয়ামের অভাব দেখা যায়. এক সপ্তাহ লেবু বা সাইট্রিক জাতীয় ফল খাওয়া বন্ধ রাখুন. তাহলেই পার্থক্য বুঝতে পারবেন.

মনে রাখার বিষয়

গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে লেবুর জল পানের যথেষ্ট স্বাস্থ্যগত সুবিধা রয়েছে। তাছাড়া জলে লেবু মিশিয়ে খাওয়ায়, সারাদিন সঠিক মাত্রায় শরীরে জলের যোগান ঘটে। লেবু শরীরকে সারাদিন হাইড্রেটেড রাখতে সহায়তা করে। শরীর হাইড্রেটেড থাকা স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই লাভদায়ক। তাই শরীরের জন্য লেবুর রসের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।