অলৌকিক জীবন ঘেরা যোগীপুরুষ লোকনাথ বাবা

অলৌকিক  জীবন ঘেরা যোগীপুরুষ লোকনাথ বাবা

 আদালত চত্বরে সে দিন তিল ধারণের জায়গা নেই। কোর্টের বাইরেও ঔৎসুক জনতার ভিড়, সবাই এসেছে কঙ্কালসার এক সাধককে দেখতে, যিনি এই কেসের অন্যতম সাক্ষী। আইনি এই লড়াই চলছে বারদীর জমিদারের সঙ্গে এক ব্রহ্মচারীর, যাকে জমিদারের উচ্ছৃঙ্খল পুত্র শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত করেছে। ব্রহ্মচারীর সাক্ষী হয়ে সাধক কাঠগড়ায় দাঁড়ালেন। জমিদারপক্ষের উকিল তাঁকে বয়স জিজ্ঞাসা করল। সাধক উত্তর দিলেন, দেড়শো বছর। চারদিকে একটা গুঞ্জন, সবাই অবাক — কী বলছে সাধক! দেড়শো বছর কি কারও বয়স হতে পারে নাকি? জমিদারের উকিল বিচারককে বললেন, ‘ধর্মাবতার, আপনি নিশ্চই বুঝতে পারছেন এই সাধক মানসিক ভাবে সুস্থই নয়। বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মে কোনও মানুষ দেড়শো বছর বাঁচতেই পারে না, আর কোনওক্রমে যদিও বা বাঁচে, তাহলে সেই মানুষটির দাঁড়িয়ে কথা বলার ক্ষমতা থাকে না।

এই সাক্ষী নিজের বয়স নিয়েই ডাহা মিথ্যে বলছেন’। উকিল সাধকের কাছে আবার এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘আপনি বলছেন, আপনি স্বচক্ষে ঘটনাটি দেখেছেন, দেড়শো বছর বয়সে আপনার দৃষ্টিশক্তি এত পরিষ্কার যে আপনি প্রায় পঞ্চাশ ফুট দূর থেকে সবকিছু দেখতে পেলেন, সবাইকে চিনতেও পারলেন’! সাধক মৃদু হেসে বললেন, ‘আচ্ছা, আদালতের বাইরে,দূরে ঐ যে কদম গাছটি দেখা যাচ্ছে, ওর পশ্চিম দিকের মোটা ডালটায় কোনও প্রাণীকে দেখতে পাচ্ছো’? সবাই গাছটার দিকে তাকিয়ে কিচ্ছু দেখতে পেল না। সাধক হেসে ফেলে বললো, ‘তোমাদের বয়স কম, দৃষ্টিশক্তিও ভালো, তবুও কিছু দেখতে পাচ্ছো না? আমি কিন্তু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি ওই ডাল বেয়ে সারি সারি পিঁপড়ের দল উপরের দিকে উঠছে, বিশ্বাস না হলে তোমরা কাছে গিয়ে দেখে আসতে পারো’। সাধকের কথা শুনে সবাই অবাক।

এ কী করে সম্ভব? এত দূর থেকে গাছের ডালে পিঁপড়ের দলকে লক্ষ করা যায়! বিচারপতির নির্দেশে সবাই মিলে গাছের তলায় গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দেখল, সত্যিই সেই কদম গাছের ডাল বেয়ে পিঁপড়ের দল উপরে উঠছে। আদালত চত্বর তখন উত্তাল, সাধারণ মানুষের জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে আইনের পাঠশালা... জয় লোকনাথ বাবার জয়... জয় লোকনাথ বাবার জয়। সময়টা একাদশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক। কলকাতার কাছেই বারাসত অঞ্চলে কচুয়া গ্রামে ঘোষাল পরিবারের বড় ইচ্ছা ছিল তাদের সন্তান লোকনাথ সন্ন্যাসী হোক। আর পাঁচটা সাধকের সঙ্গে বাবা লোকনাথের জীবন একটু হলেও আলাদা, কারণ বাড়ির লোকজনই লোকনাথের সন্ন্যাস জীবন চেয়েছিল।

লোকনাথও ছোট থেকে সংসারের মায়া ত্যাগ করে ক্রমে ক্রমে সাধন জীবনে প্রবেশ করতে থাকে। সেই উলঙ্গ পাগল ছেলেকে দেখে প্রতিবেশীরা টিটকিরি করে, খারাপ কথা বলে কিন্তু তাতে লোকনাথের কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। কিন্তু মানুষের মধ্যে জন্মগতভাবে ঐশ্বরিক ক্ষমতা থাকলে, সেটা একদিন না একদিন প্রকাশিত হবেই, যেমনটা ঘটল সেইদিন, যেদিন গ্রামের পাঁচজন প্রধান পুরোহিত যজ্ঞ করার জন্য যজ্ঞপৈতে তৈরি করছিল। দু’ঘণ্টা ধরে কিছুতেই জট খোলা যাচ্ছে না। এ রকম তো হয় না, পাঁচজন ব্রাহ্মণ একমনে জড়িয়ে যাওয়া পৈতের সুতোর জট খোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু সুতো খোলা তো দূরের কথা, যত সময় যাচ্ছে সুতো যেন আরও জড়িয়ে যাচ্ছে অথচ এই সুতো খুলতে না পারলে যজ্ঞ হবে না। শুধুমাত্র যজ্ঞের জন্যই এই পৈতের সুতো আলাদা করে তৈরি করা হয়েছে, এ সুতো মন্ত্রপূত।

পাঁচ ব্রাহ্মণ কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না, তারা একপ্রকার বিধ্বস্ত। এ সময় একটি টিংটিঙে রোগা উলঙ্গ সাধক তাদের কাছে এসে তাদেরকে অবাক হয়ে দেখতে লাগল। হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমরা কী করছ গো?’। ব্রাহ্মণরা বিরক্তি সহকারে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখন এখান থেকে যাও, তোমার সঙ্গে কথা বলার মতো সময় বা ইচ্ছে কোনোটাই আমাদের নেই’। একগাল হাসি নিয়ে লোকনাথ বলল, ‘তোমরা শুধু শুধু সময় নষ্ট করছো, ওই জট পাকানো পৈতের সুতো কখনোই খুলবে না’।

ব্রাহ্মণরা তো রেগেই আগুন, তারা চিৎকার করে লোকনাথকে চলে যেতে বলল। লোকনাথ অবিচল, সে ব্রাহ্মণদের কাছে গিয়ে হঠাৎ করেই জড়িয়ে যাওয়া পৈতের সুতো নিজের হাতে তুলে নিল, তারপর সেটাকে দলা পাকিয়ে হাতের মুঠোর মধ্যে রেখে গায়ত্রী জপ করতে লাগলো। ব্রাহ্মণরা কী করবে বুঝে ওঠার আগেই লোকনাথ সুতোর দু’দিকের দুটো খুঁট ধরে একটা টান মারতেই ব্রাহ্মণরা অবাক, তারা দেখল জট পাকানো যজ্ঞের পৈতের সব জট ছেড়ে গেছে। এটা কি ম্যাজিক নাকি ঐশ্বরিক কোন ক্ষমতা! লোকনাথের মুখে সেই সহজ সরল হাসি। পৈতের সুতো ব্রাহ্মণদের হাতে দিয়ে সাধক লোকনাথ বলে উঠলো ... ‘রণে বনে জঙ্গলে যেখানেই বিপদে পড়িবে স্মরণ করিও, রক্ষা করিব।’