লোকনাথ ব্রহ্মচারী : 'রণে বনে জলে জঙ্গলে বাবা লোকনাথ

লোকনাথ ব্রহ্মচারী  : 'রণে বনে জলে জঙ্গলে বাবা লোকনাথ

জন্মাষ্টমী তিথিতেই জন্ম হয়েছিল লোকনাথ ব্রহ্মচারীর, ভক্তদের কাছে তিনি বাবা লোকনাথ নামেই তিনি পরিচিত। তাঁর বিখ্যাত বাণী 'রণে বনে জলে জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিও, আমিই রক্ষা করিব।' বাবা লোকনাথের কৃপা সর্ব সময় রক্ষা করে ৷

লোকনাথ ব্রহ্মচারী জীবনকে সুন্দর করে বিকশিত করতে সাহায্য করে ৷ বাবা লোকনাথ সব সময়েই সোজা পথে চলার পরামর্শ দিতেন ৷ জটিলতা যেন কোনও ভাবেই জীবনের পথ আঁকড়ে ধরে রাখতে না পরে যেই জন্যই তিনি পরামর্শ দিতেন ৷  বাবার কৃপায় জীবনের প্রতিটি স্বাদ, বাসনা পূরণ হয়ে থাকে ৷

এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে কীভাবে মানুষের কাছে পূজনীয় হয়ে উঠতে হয় তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ বাবা লোকনাথ ৷সৎ পথে জীবন অতিবাহিত করলেই বাবার শরণ পাওয়া সম্ভব ৷ রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে বাবার নামে কাটে সব বিপদ ৷

লোকনাথ ব্রহ্মচারী ১১৩৭ বঙ্গাব্দ বা ইংরেজি ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে তত্কালীন যশোহর জেলা আর বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত মহকুমার চৌরশী চাকলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। লোকনাথে জন্মস্থান নিয়ে শিষ্যদেরও ভেতরে বিতর্ক আছে। নিত্যগোপাল সাহা এ বিষয়ে হাইকোর্টে মামলা করেন ও রায় অনুযায়ী তার জন্মস্থান কচুয়া বলে চিহ্নিত হয়। যদিও অনেকে মনে করেন তার জন্মস্থান বর্তমান উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার চাকলা। যা চাকলাধাম নামে লোকনাথ ভক্তদের নিকট পরিচিত।

তাঁর বাবার নাম রামনারায়ণ ও মায়ের নাম কমলা দেবী। বাবা ছিলেন ধার্মিক ব্রাহ্মণ। পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান ছিলেন তিনি।লোকনাথকে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করানোর জন্য ১১ বছরে উপনয়ন দিয়ে পাশের গ্রামের ভগবান গাঙ্গুলীর হাতে তুলে দেন। এ সময় তাঁর সঙ্গী হন বাল্যবন্ধু বেনীমাধব। উপনয়ন শেষে লোকনাথ, বেনীমাধব ও ভগবান গাঙ্গুলী পদযাত্রা শুরু করেন। বিভিন্ন গ্রাম-শহর, নদ-নদী, জঙ্গল অতিক্রম করে প্রথমে কালীঘাটে এসে যোগ সাধনা শুরু করেন।

এইরূপে গুরুর আদেশে বিভিন্ন স্থানে যোগ সাধনা ও ব্রত করে শেষ পর্যন্ত লোকনাথ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন। তারপর শুরু হয় দেশ ভ্রমণ। প্রথমে হিমালয় থেকে  প্রথমে আফগানিস্তান, পারস্য, আরব, মক্কা-মদীনা, মক্কেশ্বর তীর্থস্থান, তুরস্ক, ইতালি, গ্রিস, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, ইউরোপ-সহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে দেশে ফিরে আসেন এবং পরে দেশের ভিতর হরিদ্বার, হিমালয় তীর্থ, বদ্রীনাথ, সুমেরু পর্বত, কাশিধাম ও কাবুল পরিদর্শন করেন। দিনে দিনে গুরুর বয়স একশ বছর ও শিষ্যদের বয়স পঞ্চাশ বছর হলো।

গুরুদেব ভগবান গাঙ্গুলী শিষ্য দু’জনকে শ্রী তৈলঙ্গস্বামীর (হিতলাল নামে যিনি পরিচিত) হাতে তুলে দিয়ে পরলোক গমন করেন। নারায়ণগঞ্জের বারদীর জমিদার নাগ মহাশয় লোকনাথের কথা শুনে তাঁর জন্য জমি দান করেন এবং সেখানে মহা ধুম-ধামের সঙ্গে আশ্রম স্থাপন করা হয়।

লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রমের কথা শুনে দেশ-দেশান্তর হতে বহু ভক্ত এসে ভিড় জমাতে থাকেন। অল্প সময়ের ব্যবধানেই বাবার আশ্রম তীর্থভূমিতে পরিণত হয়। কোনো এক সময় ভাওয়ালের মহারাজ তাঁর ফটো তুলে রাখেন। যে ফটো বর্তমানে ঘরে ঘরে পূজিত হয়। সেদিন ছিল ১৯শে জৈষ্ঠ, রবিবার। বাবা নিজেই বললেন তার প্রয়াণের কথা। বহু মানুষ আসেন তাঁকে শেষ দর্শন করার জন্য। কথিত আছে একসময় লোকনাথ মহাযোগে বসেন।

সবাই নির্বাক হয়ে অশ্রুসজল চোখে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন কখন বাবার মহাযোগ ভাঙ্গবে। কিন্তু ঐ মহাযোগ আর ভাঙেনি। শেষ পর্যন্ত ১১.৪৫ মিনিটে দেহ স্পর্শ করা হলে দেহ মাটিতে পড়ে যায়। ত্রিকালদর্শী বাবা লোকনাথ বলেছেন, ‘প্রতিদিন রাতে শোবার সময় সারাদিনের কাজের হিসাব-নিকাশ করবি অর্থাত্ ভাল কাজ কী কী করেছিস আর খারাপ কাজ কী কী করেছিস?

যে সকল কাজ খারাপ বলে বিবেচনা করলি সে সকল কাজ আর যাতে না করতে হয় সেদিকে খেয়াল রাখবি।’ আবার তিনি বলেছেন, ‘সূর্য উঠলে যেমন আঁধার পালিয়ে যায়। গৃহস্থের ঘুম ভেঙে গেলে যেমন চোর পালিয়ে যায়, ঠিক তেমনি বার-বার বিচার করলে খারাপ কাজ করবার প্রবৃত্তি পালিয়ে যাবে।’