মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র | Mahamrityunjay Mantra

মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র  | Mahamrityunjay Mantra

হিন্দু ধর্মে দেবী-দেবতাদের পুজো, আরাধনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মন্ত্রের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মনে করা হয় মন্ত্র জপের ফলে দেবতা প্রসন্ন হন এবং তাঁর আশীর্বাদে ব্যক্তির জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি লাভ করা যায়। সমস্ত দেবী-দেবতার উপাসনার জন্য পৃথক পৃথক মন্ত্র জপ করা হয়। এই মন্ত্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও শক্তিশালী মন্ত্র হল মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র।

শিবপুরাণ ও একাধিক ধর্মীয় গ্রন্থে  Mahamrityunjaya Mantra মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র সম্পর্কে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়।মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র একটি সর্বরোগ হরণকারী মন্ত্র। এই মন্ত্রটি ভগবান মহাদেবকে স্মরণ করে রচিত। এই মন্ত্রটি ঋগ্বেদেও দৃষ্ট হয় - আবার এই মন্ত্রটি মার্কণ্ডেয় পুরাণেও দৃষ্ট হয়। এই মন্ত্রটি জপ করলে মানুষ সব অশান্তি , রোগপীড়া , ব‍্যাধি থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত হয়।

নিরাকার মহাদেবই মৃত‍্যুমুখী প্রাণকে বলপূর্বক জীবদেহে পুণঃ প্রতিষ্ঠিত করেন এবং অপার শান্তিদান করেন। এই মন্ত্রটির সাথে একটি কাহিণী প্রচলিত আছে। সেটি হল - মহর্ষি মৃকন্ডু এবং তাঁর পত্নী মরুদবতী পুত্রহীণ ছিলেন। তারা তপস‍্যা করেন মহাদেবকে সন্তুষ্ট করেন এবং এক পুত্র লাভ করেন , যার নাম হল মার্কন্ডেয়। কিন্তু মার্কন্ডেয়র বাল‍্যকালেই মৃত‍্যুযোগ ছিল।

অভিজ্ঞ ঋষিদের কথায় বালক মার্কন্ডেয় শিব লিঙ্গের সামনে Mahamrityunjaya Mantra মহামৃত‍্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করতে লাগলেন। যথা সময়ে যম রাজ এলেন। কিন্তু মহাদেবের শরণে আসা প্রাণকে কেইবা হরণ করতে পারে ! যমরাজ পরাজিত হয়ে ফিরে গেলেন এবং মার্কন্ডেয় মহাদেবের বরে দীর্ঘায়ু লাভ করলেন। পরে তিনি মার্কন্ডেয় পুরাণ রচনা করলেন। মার্কন্ডেয় ঋষি মহাদেবের স্তুতি করলেন মহামৃত‍্যুঞ্জয় স্তোত্রের মাধ‍্যমে যেটি মার্কন্ডেয় পুরাণে পাওয়া যায়। 

মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব    আধ্যাত্মিক গুরুত্বের পাশাপাশি মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের বৈজ্ঞানিক গুরুত্বও রয়েছে। স্বর সিদ্ধান্তে এই মন্ত্র জপের উপকারিতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ওম-এর উচ্চারণে ব্যক্তি গভীর শ্বাস নেয়, এর ফলে তাঁর শরীরের বিশেষ অংশ এবং নাড়িতে বিশেষ ধরনের কম্পন হয়। এই কম্পনের ফলে শরীরে উচ্চস্তরের বিদ্যুৎ প্রবাহ উৎপন্ন হয়। শরীরের এই কম্পন ধমনীতে রক্তের প্রবাহ বৃদ্ধি করে। এর ফলে ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করলে শরীরে উপস্থিত সপ্তচক্রে শক্তির সঞ্চার হয়। যে স্বয়ং এই মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করে শুধু সে-ই নয়, বরং এই মন্ত্র শুনলেও শরীরে রক্তের সঞ্চার বৃদ্ধি পায়। মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের প্রতটি অক্ষরের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। এই মন্ত্রের প্রতিটি অক্ষরের উচ্চারণের ফলে নানান প্রকারের ধ্বনি উৎপন্ন হয়, যা শরীরের বিশেষ অঙ্গে বিশেষ ধরনের কম্পন উৎপন্ন করে। এ কারণে শরীর রোগভোগের সম্ভাবনা কমে।

 মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র উৎপত্তির পৌরাণিক কাহিনি     ঋষি মৃকণ্ডুর পুত্র মার্কণ্ডেয়র মাত্র ১৬ বছরের জীবনকাল নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরে নিজের মায়ের কাছ থেকে মার্কণ্ডেয় এ বিষয়ে জানতে পারেন। মার্কণ্ডেয় তখন শিবের আরাধনার জন্য মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র রচনা করেন এবং শিব মন্দিরে বসে তার অখণ্ড জপ শুরু করে দেন। তাঁর ১৬ বছরের আয়ু পূর্ণ হওয়ায় যমরাজ যখন তাঁকে নিতে আসেন, মার্কণ্ডেয় যমরাজকে দেখে জোরে জোরে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করতে করতে শিবলিঙ্গকে জড়িয়ে ধরেন।

যম মার্কণ্ডেয়কে শিবলিঙ্গ থেকে আলাদা করার চেষ্টা করেন। এতে শিব ক্ষুব্ধ হয়ে যান এবং যমকে মৃত্যুদণ্ড দান করেন। ভীত যম তখন শিবকে বলেন যে, ‘আমি আপনারই সেবক, প্রাণীর প্রাণ হরণের নিষ্ঠুর কাজ আপনি আমাকে দিয়েছেন।’ ক্ষোভ শান্ত হলে শিব বলেন, ‘আমি নিজের ভক্তের ভক্তিতে প্রসন্ন। আমি এঁকে দীর্ঘায়ুর বরদান দিলাম।

তুমি এঁকে নিয়ে যেতে পার না।’ মার্কণ্ডেয় জীবিত থাকবে এই শর্তে শিব যমকে অভিশাপ মুক্ত করেন। এর পর যমরাজ বলেন, ‘প্রভু আপনার আজ্ঞা সর্বোপরি। আমি আপনার ভক্ত মার্কণ্ডেয় রচিত মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র যে পাঠ করবে, তাঁকে কষ্ট দেব না।’ মহাকালের আশীর্বাদে মার্কণ্ডেয় দীর্ঘায়ু লাভ করেন। এখান থেকেই এই মন্ত্রের উৎপত্তি হয়।

ॐ त्र्य॑म्बकं यजामहे सु॒गन्धिं॑ पुष्टि॒वर्ध॑नम्।
उ॒र्वा॒रु॒कमि॑व॒ बन्ध॑नान् मृ॒त्योर्मु॑क्षीय॒ माऽमृता॑॑त्।।

ওঁ ত্রম্বকম যজামহে সুগন্ধিং 
পুষ্টি বর্ধনাম।। 
ঊর্বারু কমিব বন্ধনাৎ 
মৃত্যুমক্ষীয় মামৃতাৎ’।। 

মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপের সময় যে সাবধানতা অবলম্বন করবেন

১. মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের শব্দের গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই এই মন্ত্র জপ করার সময় এর উচ্চারণের শুদ্ধতা লক্ষ্য রাখবেন।

২. মালার সাহায্যে জপ করবেন। কারণ সংখ্যাহীন জপের ফল পাওয়া যায় না। প্রতিদিন অন্তত পক্ষে একমালা জপ পূর্ণ করুন।

৩. অন্য দিন জপ করে থাকলে প্রথম দিনের তুলনায় কম জপ করবেন না। তার চেয়ে বেশি যত ইচ্ছা জপ করা যায়।

৪. মন্ত্র উচ্চারণের সময় স্বর ঠোঁটের বাইরে আসা উচিত নয়। কম স্বরে ধীরে ধীরে মন্ত্র জপ করুন।

 ৫. রুদ্রাক্ষের মালাতেই মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করবেন।

৬. জপ করার সময় মালাকে গৌমুখীতে ঢেকে রাখুন।

 ৭. জপের আগে শিবের সামনে ধূপকাঠি ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করুন। লক্ষ্য রাখবেন জপের সময় যাতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত থাকে।

৮. এই মন্ত্র জপের সময় শিবের প্রতিমা, ছবি, শিবলিঙ্গ বা মহামৃত্যুঞ্জয় যন্ত্রের মধ্যে যে কোনও একটি নিজের কাছে রাখুন।

৯. কুশের আসনে বসে মন্ত্র জপ করা উচিত।

১০. মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ এবং পূজার্চনার সময় নিজের মুখ পূর্ব দিকে রাখুন।

১১. শিবলিঙ্গের পাশে বসে জপ করে থাকলে জল বা দুধ দিয়ে অভিষেক করুন।

১২. জপ করার জন্য একটি শান্ত স্থান বেছে নিন। যাতে জপের সময় মনে একাগ্রতা থাকে।

 ১৩. জপ করার সময় হাই তুলবেন না এবং আলস্য করবেন না। ঈশ্বরে মনোনিবেশ করুন।

১৪. জপের দিন ব্রহ্মচর্য পালন করুন।

১৫. যতদিন জপ করবেন ততদিন তামসিক ভোজন যেমন- মাছ, মাংস, রসুন, পেঁয়াজ খাবেন না। আবার মদ্যপান করবেন না বা অন্য কোনও নেশার জিনিস খাবেন না।

১৬. প্রথম দিন যেখানে বসে জপ করবেন, তার পর থেকে প্রতিদিন সেই স্থানে বসেই জপ করে যান।

১৭. জপের মাঝখানে কারও সঙ্গে কথা বলবেন না।