মহিষাদল | Mahishadal

মহিষাদল | Mahishadal

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অত্যন্ত উজ্জ্বল ভূমিকা রাখে মহিষাদল Mahishadal  ।  স্বাধীনতা আন্দোলনে যে এলাকা এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, তা-ই আজ পড়ে অনাদরে। উপকূলবর্তী ভূ-প্রকৃতি, মৌসুমি, গ্রামীণ এবং ঐতিহ্য বৈচিত্র্যের সাথে এটি তার সাধারণ উপকূলভূমি এবং গ্রামাঞ্চলে পর্যটনের সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করে। এই জেলার বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রগুলি মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মহিষাদল। 

  খ্রিষ্ট্রিয় সপ্তম শতক অবধিও মহিষাদলে কোনও জনপদ গড়ে ওঠেনি। ধীরে ধীরে পলি পড়ে চর, জঙ্গল তৈরি হয়। তারপরই এখানে বসতি গড়ে উঠতে শুরু করে। আর জনপদের খ্যাতি বাড়ে মহিষাদল রাজ পরিবারের হাত ধরে। এক সময় জঙ্গল ঘেরা জনপদ আজ মহিষাদল ব্লকের সদর এলাকা। পূর্ব মেদিনীপুরের এই এলাকা পুরসভার দাবিদারও বটে। মহিষাদলের নামকরণ নিয়ে ঐতিহাসিক সত্যতা না থাকলেও বহু জনশ্রুতি রয়েছে।

কেউ বলেন, জনপদের আকার মহিষের আদলের মত ছিল। তাই নাম মহিষাদল হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন, এখানে বসতি গড়ে ওঠার প্রথম দিকে মাহিষ্য জাতির আধিক্য ছিল। তাই এই এলাকার নাম মহিষাদল। কারও মতে এখানে বহু মহিষ বিচরণ করত, তাই এমন নাম। তবে যে ভাবেই মহিষাদল নামটি আসুক না কেন, ওই নামে এই ব্লক এলাকায় কোনও মৌজা বা জায়গা নেই। মহিষাদল তমলুক শহরে থেকে মাত্র ১৬ কিমি দূরে অবস্থিত। এখানে মহিষাদল রাজবাড়ি এবং যাদুঘর । গেঁওখালি মহিষাদল থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, এটি তিনটি নদীর সংযোগ (মোওনানা)।

এলাকার কয়েক’টি মৌজাকে নিয়ে ষষ্ঠ শতকের গোড়ায় মহিষাদলের পত্তন হয়। মহিষাদলে দুটি ডিগ্রি কলেজ রয়েছে। জেলার একমাত্র মহিলা কলেজও এখানেই রয়েছে। চারটি উচ্চমাধ্যমিক ও দুটি মাধ্যমিক স্কুল রয়েছে। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মহিষাদলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।পরাধীন ভারতে স্বাধীন তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের সর্বাধিনায়ক সতীশ সামন্তের বাড়ি এই মহিষাদলেরই একটি গ্রামে। তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের অপর কর্মকর্তা সুশীল ধাড়ার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে রয়েছে মহিষাদলে।

স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু ঘটনার সাক্ষী এই মহিষাদল। এলাকার বাসিন্দা হরপ্রসাদ সাহু মহিষাদলের ইতিহাস নিয়ে চর্চা করেন। তাঁর কথায়, গোটা এলাকা এক সময় বঙ্গোপসাগরের গর্ভে ছিল। পরে পলি জমে চর ও জঙ্গল তৈরি হয়। জঙ্গল কেটে বসতি গড়ে ওঠে। সপ্তম শতকের শুরুতে চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ তাম্পলিপ্ত বন্দরে এসেছিলেন।তাঁর বিবরণ থেকে অনুমান করা যায়, এখনকার মহিষাদল সমুদ্রগর্ভে ছিল।

ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময় তথা আনুমানিক ১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দে 'জনার্দন উপাধ্যায়' নামক এক উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণ উত্তরপ্রদেশ থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে নদীপথে মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত হুগলী নদীর তীরবর্তী গেওখালি নামক জনপদে এসে উপনীত হন।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,জনার্দন উপাধ্যায় নামক ঐ ব্যক্তি পূর্বে মোঘল সম্রাট মহামতি আকবরের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন।অল্পকিছুদিনের মধ্যেই মহিষাদলের তৎকালীন জমিদার কল্যাণ রায়চৌধুরীর জমি নিলামে কেনেন।নিলামে কেনেন।

জমিদার কল্যাণ রায়চৌধুরী নবাবকে রাজকর দিতে না পারায় জমিদারের সম্পত্তি নিলামে ওঠে।অল্পকিছুদিনের মধ্যেই মোঘল সম্রাট জনার্দন উপাধ্যায়কে 'মহিষাদলরাজ' হিসাবে স্বীকৃতিদান করেন।সেই সাথে সম্রাট আকবর তাকে বৈরাম খাঁয়ের নামাঙ্কিত একটি তরবারি উপহার দেন।রাজা জনার্দন উপাধ্যায়ই হলেন মহিষাদল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা।রাজা জনার্দন উপাধ্যায়ের পরবর্তী পঞ্চম পুরুষ রাজা আনন্দলাল উপাধ্যায় পুত্রহীন হওয়ার কারণে রাজার মৃত্যুর পর রানী জানকী দেবী সুদক্ষতার সহিত রাজ্য পরিচালনা করেন।

তিনি তার দৌহিত্র(কন্যা পক্ষের) গুরুপ্রসাদ গর্গকে ধনসম্পত্তিসহ রাজ্য ও রাজপ্রাসাদ দান করেন।এরপর গুরুপ্রসাদ গর্গ সিংহাসনে বসে দক্ষতার সহিত রাজকার্য পরিচালনা করেন।গুরুপ্রসাদ গর্গের দৌহিত্র(পালিত) লছমন গর্গ ভারতের স্বাধীনতার আগের(১৪ ই আগস্ট,১৯৪৭ খ্রি;)  দিন পর্যন্ত সিংহাসন অলংকৃত করেছিলেন।পরর্বতীসময়ে দেবপ্রসাদ গর্গ সাফল্যের সাথে এই রাজবংশকে নেতৃত্ব দান করেছিলেন।

এরপর তার জামাতা ছক্কনপ্রসাদ গর্গের ছেলে গুরুপ্রসাদ গর্গ রাজা হন। সেই থেকে মহিষাদলে গর্গদের রাজত্ব। বর্তমানে শৌর্যপ্রসাদ গর্গ এই ঐতিহ্যবাহী রাজবংশকে নেতৃত্বদান করছেন। আজও রাজবাড়ির প্রতিটি কণায় লুকিয়ে আছে কতশত ইতিহাসের গল্প,আজও ফুলবাড়ির সামনে স্বমহিমায় দণ্ডায়মান বৃক্ষগুলি শত শত বছরের কতশত ইতিহাসের সাক্ষ্য বহনকরে আসছে,আজও 'ফুলবাড়ি'-র প্রবেশদ্বারে মজে যাওয়া গড় কিমবা রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন আমবাগান ইতিহাস সচেতন মানুষের হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

আজও মহিষাদল রাজবাড়ির বুকে তৈরি হয় হাজারো নিত্যনতুন গল্প।মহিষাদলের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-ইতিহাস সমৃদ্ধ সেইসব গল্প এখন পুরানো নিদর্শন বলতে মহিষাদলে রাজাদের দু’টি রাজবাড়ি রয়েছে। একটি হচ্ছে রঙ্গিবসান রাজবাড়ি। যা আনুমানিক ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি হয়েছিল। অন্যটি ফুলবাগ রাজবাড়ি যা আনুমানিক ১৯৩৪ সালে তৈরি হয়।

তা ছাড়াও রাজবাড়ি চত্বরে গোপাল জিউর মন্দির ও রামবাগে রামজীউর মন্দির রয়েছে। রঙ্গিবসান রাজবাড়িতে এখনও রাজ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত কিছু লোকজন বসবাস করেন। তবে অপেক্ষাকৃত নতুন রাজবাড়িটির দোতলায় এখনও রাজ পরিবারের সদস্যেরা বসবাস করেন। নীচের তলায় রয়েছে সংগ্রহশালা। মহিষাদলের অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষক সংকর্ষণ মাইতি জানান, রাজারা শিক্ষা-সংস্কৃতিতে প্রজাদের উৎসাহ দিতেন। মহিষাদল রাজ কলেজ থেকে শুরু করে রাজ হাইস্কুল-সহ নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়েছেন তাঁরা। শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে উন্নয়ন— সব কিছুতেই মহিষাদল রাজবাড়ি অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে রয়েছে।