মনসা দেবী Manasa Devi

মনসা দেবী Manasa Devi

হিন্দু দেবদেবীদের মধ্যে সর্পদেবী হিসেবে পরিচিত Manasa Devi দেবী মনসা। সাপের ভয় কাটানো, সর্পদংশন প্রতিরোধ এবং দংশনপ্রাপ্ত ব্যক্তির নিরাময়ের জন্য দেবী মনসাকে পূজা করা হয়ে থাকে। তবে সন্তানলাভ এবং সমৃদ্ধির জন্যেও তাঁর পূজা করেন অনেকে। পুরাণ, মহাভারত এবং পরবর্তীকালের মনসামঙ্গলে দেবীকে ঘিরে বিভিন্ন কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। কোন মতে তিনি শিবের কন্যা, কোথাও আবার তাঁকে ঋষি কশ্যপের কন্যা বলা হয়েছে।

দেবী মনসা শেষনাগ এবং বাসুকি নাগের বোন হিসেবেও পরিচিত। বলা হয় দেবতারা তাঁর পূর্ণ ঈশ্বরত্ব অস্বীকার করেছিলেন, কিন্তু মনসার লক্ষ্য ছিল যেকোনো উপায়ে তা অর্জন করা এবং সেই কারণে তিনি কখনও কখনও কঠোর রূপ ধারণ করেন। মনসা দেবীর উৎপত্তি বিষয়ে নানা পন্ডিতের নানা মত প্রচলিত রয়েছে। আশুতোষ ভট্টাচার্য দেখিয়েছেন যে, বৈদিক কাল থেকে মহাভারতের বা বৌদ্ধ সাহিত্যের সময় পর্যন্ত যত নাগদেবতার উল্লেখ আছে তারমধ্যে কোনো সর্পদেবীর উল্লেখ পাওয়া যায় না৷ তবে তিনি এও বলেন, যে,

প্রাকবৈদিক যুগে অনার্য দ্রাবিড় জাতির মধ্যে সর্পদেবীর প্রচলন থাকলেও আর্যদের আগমনের পরে আর্যজাতির পুরুষ দেবতারাই প্রাধান্য লাভ করেছিলেন। তিনি তান্ত্রিক বৌদ্ধ জাঙ্গুলী দেবীর সঙ্গে মনসা দেবীর মিল খুঁজে পেয়েছেন। এরপর তিনি মনসার উৎপত্তির প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে মহীশূরের প্রাচীন মুদমা দেবীর কথা বলেন, যাঁর নিম্নভাগ সর্পাকৃতি। এরপর তিনি দক্ষিণ ভারতের কানাড়া প্রদেশের মনচাম্মার কথা বলেন। মনচাম্মা নাকি আসলে কোনো দেবতার নাম নয়, এটি এক অজ্ঞাত সাপের নাম, যার উপর পরে দেবত্ব আরোপ করা হয়েছিল।

অধ্যাপক ক্ষিতিমোহন সেনের মতে এই ‘মনচা মাতা’ উচ্চারণের বিবর্তনে মনসা মাতা হয়ে উঠেছেন। অনেকেই অধ্যাপক সেনের এই মতকে সমর্থন করেছেন এবং মনচাম্মা দেবীই যে বাংলার ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাবে মনসা দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছে তা মেনে নিয়েছেন। এর থেকে অবশ্য প্রমাণিত হয় যে, মনসা আসলে একজন অনার্য দেবী। সংস্কৃত পদ্মপুরাণ, দেবীভাগবত এবং ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে মনসা দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। দেবী মনসার জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে নানারকম কিংবদন্তি প্রচলিত আছে।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে ঋষি কশ্যপকে মনসার পিতা বলা হয়ে থাকে। কশ্যপের মানসকন্যা ছিলেন বলেই তাঁর নাম মনসা হয়েছে বলে মনে করা হয়। যখন সাপের দল পৃথিবীতে প্রচন্ড গন্ডগোলের সৃষ্টি করেছিল তখন কশ্যপ তাঁর মন থেকে মনসা দেবীকে তৈরি করেছিলেন এবং তাঁকে সাপের ওপর কর্তৃত্ব করবার অধিকার দিয়েছিলেন। মহাভারতেও মনসাকে কশ্যপ এবং কদ্রুর কন্যা বলা হয়েছে। যদিও মহাভারতে সরাসরি মনসার নাম উল্লেখ করা নেই। সেখানে তাঁকে বাসুকির ভগিনী বলা হয়েছে এবং রাজশেখর বসু তাঁর অনুদিত মহাভারতের পাদটীকায় সেই ভগিনীকেই মনসা বলে চিহ্নিত করেছেন।

মহাভারতে এই বাসুকি ভগিনী মনসার সঙ্গে জরৎকারু মুনির বিবাহের প্রসঙ্গ রয়েছে। জরৎকারু মুনি একদিন পর্যটন করতে করতে একটি স্থানে দেখেন কিছু মানুষ উলটোভাবে গাছ থেকে এক গর্তের ওপর ঝুলে রয়েছে। তাঁদের সাথে কথা বলে জরৎকারু বুঝতে পারেন ওই ঝুলন্ত মানুষেরা তাঁরই পূর্বপুরুষ। তাঁরা জানান যে, বংশলোপের আশঙ্কায় তাঁরা এভাবে ঝুলে আছেন, কারণ জরৎকারু যেহেতু বিবাহ করছেন না তাই তাঁর সন্তান জন্মেরও সম্ভাবনা নেই এবং তার ফলে তাঁদের বংশ লোপ পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই ঝুলন্ত পূর্বপুরুষেরা বংশরক্ষার খাতিরে জরৎকারুকে বিবাহ করতে এবং সন্তানের জন্ম দিতে অনুরোধ করেন। জরৎকারু বলেন যে কন্যার নাম তাঁর নামের সঙ্গে মিলবে তাঁকেই বিবাহ করবেন তিনি।

তারপর একদিন বাসুকি জরৎকারুর কাছে নিজের ভগিনীকে নিয়ে আসেন এবং জানান তাঁর ভগিনীর নামও জরৎকারু। অতএব দেখা যাচ্ছে মহাভারতে মনসা জরৎকারু নামে পরিচিত। যদিও অনেকে এই মহাভারতের জরৎকারুকে মনসা বলে মানেননি। জরৎকারু বাসুকির ভগিনীকে জানান যে তাঁর অপ্রিয় কখনও কিছু করলে তিনি বাসগৃহ এবং স্ত্রী উভয়কেই ত্যাগ করে যাবেন। একদিন জরৎকারু মনসার কোলে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিলেন। সূর্যাস্ত হওয়ার পর সন্ধ্যাকৃত্যের কাল পেরিয়ে যাবে সেই আশঙ্কায় স্বামীকে মৃদুভাবে ডেকে ঘুম ভাঙাতেই মহর্ষি জানালেন তাঁর নিদ্রাভঙ্গ করে মনসা ভুল করেছেন, ফলে তিনি গৃহ ত্যাগ করেন। জরৎকারু চলে যাওয়ার সময় তাঁর পত্নীর গর্ভে যে সন্তান ছিল তাঁর নাম আস্তিক।

পদ্মপুরাণ অনুসারে শিবকে মনসার পিতা বলা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলা সাহিত্যে বর্ণিত মনসা-চাঁদসদাগরের কাহিনি অনুসারেও মনসার জন্ম হয়েছিল শিবের বীর্য থেকে। সেই কাহিনি অনুসারে, একবার শিবের কামোদ্রেক হলে তাঁর বীর্য এক পদ্মের ওপর পতিত হয়। এই বীর্য থেকেই পাতালে নাগরাজ বাসুকির গৃহে মনসার জন্ম হয়। মনসা বিজয় অনুসারে, বাসুকির মায়ের তৈরি একটি সুন্দরী মেয়ের ভাস্কর্যে শিবের বীজ তথা রুদ্রাক্ষের স্পর্শে মনসার জন্ম হয়েছিল। শিব মনসাকে বাড়ি নিয়ে গেলে শিবের পত্নী চন্ডী প্রচন্ড ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। চন্ডীর সঙ্গে মনসার তীব্র কলহ শুরু হয়। এমনকি চন্ডী প্রচন্ড ক্রোধে মনসার একটি চোখ কানা করে দিয়েছিলেন বলেও বিশ্বাস করা হয়।

সেইজন্যই নাকি মনসাকে ‘চ্যাংমুড়ি কানী’ বলে গাল দিত চাঁদ সদাগর। মনসাকে কেন্দ্র করে প্রায় পনেরোটি মঙ্গলকাব্য লিখিত হয়েছে। একেকটিতে একেকরকম গল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। পুরাণে, সাহিত্যে, নানারকম কিংবদন্তিতে মনসার যেসব নাম প্রচলিত তার মধ্যে রয়েছে জরৎকারু, বিষহরি, পদ্মাবতী ইত্যাদি। জরৎকারু নাম নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা করা হয়েছে। বিষহরি নামের পিছনে একটি কাহিনি রয়েছে। সমুদ্রমন্থনের সময় উত্থিত বিষ শিব ধারণ করে যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তখন নাকি মনসা সেই বিষের প্রভাব কমিয়ে শিবকে বাঁচিয়েছিলেন।

সেই কারণেই মনসাকে বিষহরি বলা হয়ে থাকে। আবার পদ্মাবতী নামটি মনসার পদ্মের উপর অবস্থানের কারণে হয়ে থাকতে পারে, অথবা পদ্মের ওপর শিবের বীর্য পতিত হয়ে তাঁর জন্ম হয়েছে বলেও হতে পারে। মনসাকে কেন্দ্র করে সারা বাংলায় এমনকি ভারতবর্ষেরও বিভিন্ন অঞ্চলে যে কাহিনি সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ, তা হল চাঁদসদাগর ও দেবী মনসার দ্বন্দ্বের কাহিনি। চাঁদসদাগর শিবভক্ত ছিলেন এবং দেবী মনসার পূজা তিনি দেবেন না বলে মনস্থির করে রেখেছিলেন। অথচ মনসাকে পূর্ণ ঈশ্বরত্ব লাভ করতে হলে মর্তের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি চাঁদসদাগরের পূজা পেতেই হবে। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁদের লড়াই৷ নাছোড়বান্দা চাঁদের যতরকম ক্ষতিসাধন করা যায় তা করতে থাকেন মনসা।

চাঁদের ছয় ছেলেকে হত্যা করেন, বাণিজ্যতরী সপ্তডিঙা ডুবিয়ে দিয়ে চাঁদকে সর্বস্বান্ত করবার চেষ্টা করেন এমনকি সুন্দরী রমণীর ছদ্মবেশে গিয়ে শিবের কাছ থেকে প্রাপ্ত চাঁদের অভিজ্ঞানটি হাতিয়েও নিয়েছিলেন। চাঁদের পুত্র লখিন্দরকে বাসর রাতেই কালনাগিনী দিয়ে দংশন করিয়ে হত্যা করেছিলেন মনসা দেবী। শেষপর্যন্ত লখিন্দরের স্ত্রী সতীসাধ্বী বেহুলা স্বামীর দেহ নিয়ে স্বর্গে পদার্পণ করেন এবং দেবতাদের নাচে-গানে সন্তুষ্ট করে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনেন। লখিন্দরের প্রাণ মনসা ফিরিয়ে দেন একটাই শর্তে যে, বেহুলাকে ফিরে গিয়ে চাঁদসদাগরকে দিয়ে মনসার পুজো দেওয়াতে হবে।

শেষপর্যন্ত চাঁদসদাগর বাঁহাতে মনসার পুজো দিয়েছিলেন। মনসার যে মূর্তি সাধারণের মধ্যে প্রচলিত তাতে দেখা যায় দেবীর চার হাত। দেবীর বামহাতে লক্ষ করা যায় একটি সাপ, ডানহাতে বরাভয় মুদ্রা। অবশিষ্ট আরওদুটি হাতের একটিতে রক্তপদ্ম এবং অন্যটিতে শ্বেতপদ্ম থাকে। দেবীর মাথাকে ঘিরে কখনও সাতটি সাপ কখনও আবার তিনটি সাপ দেখা যায়। দেবী পদ্মের সিংহাসনে বসে থাকেন এবং নীচে বাহনের স্থলে রাজহংস লক্ষ করা যায়। মনসার কয়েকটি প্রাচীন মূর্তিতে দেখা যায়, দেবীর মাথার পিছনে সাতটি ফনাওলা সাপ মাথা উঁচিয়ে আছে, একটি পদ্মের মঞ্চে দেবী বসে আছেন, কখনও কখনও তাঁর কোলে একটি শিশুকেও (আস্তিক) দেখা যায়।

দেবীকে কোনো কোনো মূর্তিতে নানা অলঙ্কারে সজ্জিতা হিসেবে দেখা যায়। বাম হাতে দেবী আট ফনাযুক্ত সাপ ধারন করে আছেন এবং ডানহাতে বরদানের মূদ্রা ও একটি ফল ধরে রাখা। দুপাশে দুই ক্ষিপ্ত মূর্তিকে বসে থাকতে দেখা যায়, পুরাণ অনুযায়ী তাঁরা হলেন আস্তিক ও জরৎকারু। মূলত বাংলা, ঝাড়খন্ড এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে মনসা দেবীর পূজার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। ভাগলপুর (পূর্বনাম চম্পা) অঞ্চলের প্রধান দেবতাই হল মনসা। মনে করা হয় এখান থেকেই সওদাগর ও বেহুলার কাহিনি শুরু হয়েছিল। আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসের প্রত্যেক পক্ষকালের পঞ্চম দিনে অর্থাৎ পঞ্চমী তিথিতে মনসা পূজা করা হয়ে থাকে।

শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে নাগপঞ্চমী পালিত হয় এবং সেইদিন মনসারও পূজা করা হয়ে থাকে। এই দিন ধুমধাম করে ভক্তেরা সাপের মূর্তিকে পূজা করেন৷ নাগপঞ্চমীতে বাঙালি মহিলারা ব্রত-উপবাস করেন এবং সাপের গর্তে দুধ দেন। বেশিরভাগ স্থানে দেখা যায় মনসা পূজায় কোনো মূর্তি নেই। একটি সিজ গাছের ডাল কিংবা মাটি দিয়ে তৈরি সাপের মূর্তি বা সরাতে মনসার পুজো করা হয়। সাধারণত বর্ষাকালে মনসার পূজা করা হয় কারণ এই সময়ে বেশি পরিমাণে সাপ বেরোতে দেখা যায়।

তবে কেবল সর্পভয় দূরীকরণের জন্য নয়, চিকেনপক্স কিংবা গুটিবসন্তের মতো রোগ থেকে নিরাময় লাভ করতে বা সন্তানলাভের আশায়, নাম-খ্যাতির আকাঙ্ক্ষায় ভক্তেরা মনসা পূজা করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, চতুর্দশ শতকে মনসা বিবাহের আচারের দেবী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। আসাম, ত্রিপুরা, অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে মনসা দেবীর মন্দির রয়েছে এবং সেসব জায়গায় ধুমধাম করে মনসার পুজো অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মনসা মন্দিরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হরিদ্বারের মনসা দেবীর মন্দির, চন্ডিগড়ের পঞ্চকুলায় অবস্থিত মন্দির, ভাগলপুরের মনসা বিষহরি মন্দির, হরিপালের মনসা মন্দির ইত্যাদি। অন্ধ্রপ্রদেশে প্রচুর স্থানে মনসা দেবীর মন্দির রয়েছে। যেমন, নেলোরের অন্তর্গত নাইদুপেটার মনসা মন্দির,  শ্রীকাকুলামের অন্তর্ভুক্ত তিলারুতে অবস্থিত মন্দির, কানুমালাপাল্লের মন্দির, কুর্নুলের মনসা দেবীর মন্দির, ভাদলুরুর মনসা মন্দির ইত্যাদি।

আরো পড়ুন      জীবনী  মন্দির দর্শন  ইতিহাস  ধর্ম  জেলা শহর   শেয়ার বাজার  কালীপূজা  যোগ ব্যায়াম  আজকের রাশিফল  পুজা পাঠ  দুর্গাপুজো ব্রত কথা   মিউচুয়াল ফান্ড  বিনিয়োগ  জ্যোতিষশাস্ত্র  টোটকা  লক্ষ্মী পূজা  ভ্রমণ  বার্ষিক রাশিফল  মাসিক রাশিফল  সাপ্তাহিক রাশিফল  আজ বিশেষ  রান্নাঘর  প্রাপ্তবয়স্ক  বাংলা পঞ্জিকা