মণিবন্ধ শক্তিপীঠ

মণিবন্ধ শক্তিপীঠ

মণিবন্ধ মন্দিরটি রাজস্থানের আজমীরের কাছে পুষ্কর নামক স্থানে অবস্থিত। এটি একান্ন সতীপীঠের একটি পীঠ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এখানে Manibandh Shakti Peeth সতীর মণিবন্ধ বা হাতের কবজি পড়েছিল। সতীপীঠ মণিবন্ধ তে অধিষ্ঠিত দেবী সাবিত্রী বা গায়ত্রী এবং ভৈরব হলেন স্থাণু বা সর্বানন্দ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মাতা সতী নিজের বাপের বাড়িতে বাবার কাছে স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে সেখানেই দেহত্যাগ করেছিলেন।

মাতা সতীর দেহত্যাগের খবর মহাদেবের কাছে পৌঁছতেই মহাদেব সেখানে উপস্থিত হন। সতীর মৃতদেহ দেখে ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেব সেই দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য চালু করেন। মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্যে পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কায় শ্রীবিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দ্বারা মাতা সতীর দেহ একান্নটি খণ্ডে খণ্ডিত করেন। সেই দেহখণ্ডগুলোই যে যে স্থানে পড়েছিল সেখানে একটি করে সতীপীঠ প্রতিষ্ঠা হয়।

বলা হয় সতীর মণিবন্ধ বা হাতের কবজি পড়ে মণিবন্ধ সতীপীঠ গড়ে উঠেছে। শোনা যায়, ত্রেতা যুগের অবসানের পর পৃথিবীতে কলিযুগের সূচনা হলে পৃথিবী থেকে ধর্ম-কর্ম ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। জগতের মানুষকে ক্রমশ অনাচারী ও অধার্মিক হয়ে উঠতে দেখে চিন্তিত দেবর্ষি নারদ সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার কাছে গিয়ে প্রতিকারের আর্জি জানান। সকল কথা শুনে ব্রহ্মা স্থির করেন স্বর্গতীর্থ পুষ্করকে তিনি পৃথিবীতে নিয়ে যাবেন, যাতে সেখানে স্নান করে মানুষ পাপমুক্ত হতে পারে।

এই ভেবে তিনি তাঁর হাতের পদ্মকে পৃথিবীতে গিয়ে এমন কোনও স্থান খুঁজে দেখতে বললেন যেখানে এখনও কলির কোনও প্রভাব পড়েনি। ব্রহ্মার পদ্ম সারা পৃথিবী খুঁজে বর্তমানের রাজস্থানের আজমীরের কাছে একটি জায়গায় এসে কলিরহিত স্থান খুঁজে পায়। সেই সংবাদ শুনে ব্রহ্মা সেই স্থানেই নিয়ে আসেন স্বর্গতীর্থ পুষ্করকে, সৃষ্টি করলেন পুষ্কর হ্রদ। হ্রদের মাঝে সৃষ্টি হয় একটি স্থলভাগ। সেই স্থানে সমস্ত জগতের মঙ্গলকামনায় ব্রহ্মা একটি যজ্ঞ করবেন স্থির করেন। কার্তিক মাসের পূর্ণিমায় সেই যজ্ঞ আরম্ভ হল। ভৃগু, চ্যবন প্রভৃতি মহর্ষিরা সেই যজ্ঞের পুরোহিত হলেন।

আমন্ত্রিত হলেন সকল দেবতা, গন্ধর্ব, যক্ষ, অপ্সরা ও কিন্নরেরা। সকলে উপস্থিত হলেও ব্রহ্মার পত্নী সাবিত্রী যজ্ঞস্থলে পৌঁছতে দেরি করছিলেন। স্ত্রীকে ছাড়া প্রজাপতি ব্রহ্মা যজ্ঞে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। যজ্ঞের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে দেখে সকল দেবতার অনুরোধে ব্রহ্মা দেবী গায়ত্রীকে বিবাহ করেন এবং যজ্ঞ শুরু করেন। কিছুক্ষন পরে সাবিত্রী দেবী সেই স্থানে উপস্থিত হয়ে স্বামীর পাশে অন্য রমণীকে দেখে ভীষণ ক্রোধান্বিত হন। তিনি ব্রহ্মাকে অভিশাপ দেন যে একমাত্র পুষ্কর ব্যতীত পৃথিবীর অন্য কোনও স্থানে ব্রহ্মার পূজা হবে না।

শুধু ব্রহ্মা নন, সেই স্থানে উপস্থিত কোনও দেব-দেবীই বাদ গেলেন না দেবী সাবিত্রীর অভিশাপের হাত থেকে। তারপর সাবিত্রী দেবী একটি পর্বতের চূড়ায় গিয়ে তপস্যায় মগ্ন হন। চিন্তিত দেবগণ তখন গায়ত্রী দেবীর শরণাপন্ন হলেন। গায়ত্রী দেবী বললেন, গায়ত্রী মন্ত্র জপ করলে অভিশাপের প্রভাব অনেক কম হয়ে যাবে। সেই থেকে একমাত্র এই স্থানেই সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার পূজা হয়।

মূল মণিবন্ধ মন্দিরে দেবী সাবিত্রীর শ্বেতপাথরের মূর্তি পূজিত হয়। দেবী চতুর্ভুজা ও হংসবাহনা। চারটি হাতে বেদ, জপমালা, কমণ্ডলু ও বরমুদ্রা ধারণ করেন। সাবিত্রী দেবীর বাম পাশে দেবী সরস্বতী ও ডান পাশে শ্রীশ্রীমা সারদা পূজিতা হন। মা সারদার পুষ্কর ভ্রমণকে স্মরণীয় করে রাখতেই রামকৃষ্ণ মিশন থেকে মা সারদার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মন্দির চত্বরে আছে একটি নিমগাছ।

ভক্তরা দেবীর কাছে মানত করে এই নিমগাছে নারকেল বেঁধে দেন। মন্দিরের সংলগ্ন একটি পবিত্র কুণ্ড রয়েছে এখানে যা পদ্মপুরাণ অনুযায়ী ব্রহ্মার পূজার স্থল হিসেবেই পরিচিত। প্রত্যেকটি সতীপীঠ বা শক্তিপীঠে দেবী এবং ভৈরব অধিষ্ঠিত থাকেন। দেবী হলেন সতীর রূপ। ভৈরব হলেন দেবীর স্বামী।

এখানে দেবী হলেন সাবিত্রী ও তাঁর ভৈরব হলেন স্থাণু। আবার কোনও কোনও মত অনুসারে, সতীপীঠ মণিবন্ধের দেবীর নাম গায়ত্রী ও ভৈরব হলেন সর্বানন্দ। প্রতি কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত এখানে বিরাট মেলা বসে। এছাড়া নবরাত্রির সময়ও অগণিত ভক্ত পুষ্করে আসেন। পুষ্কর হ্রদে অনেক ভক্ত পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে থাকেন। |