মানস সরোবর শক্তিপীঠ | একান্ন সতীপীঠের এক সতীপীঠ মানস সরোবর শক্তিপীঠ

মানস সরোবর শক্তিপীঠ |  একান্ন সতীপীঠের এক সতীপীঠ মানস সরোবর শক্তিপীঠ

দেবী সতী দক্ষ রাজার অমতে মহাদেবকে বিবাহ করেছিলেন। প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশে একটি যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন দক্ষ রাজা। যজ্ঞের আগুনে আত্মঘাতী হন সতী। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন মহাদেব। পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার ভয়ে ভগবান বিষ্ণু প্রলয় থামাতে, সুদর্শন চক্র পাঠিয়ে দেন। দেবীর দেহ ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় পড়ে। এই সব কটি জায়গাকে সতীপীঠ বলা হয়। সতীর ৫১ পীঠ হিন্দু ধর্মে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গাগুলি প্রত্যেক হিন্দুর কাছে পরম পবিত্রের জায়গা। বিভিন্ন জায়গা জুড়ে রয়েছে এই ৫১ পীঠ।  পুরানে আছে মা সতীর ডান হাত মানস সরোবরে পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম দাক্ষায়ণী আর ভৈরবের নাম হর ।

মানস সরোবর কিভাবে সৃষ্টি হল- এই নিয়ে পুরানে একটি ঘটনার বিবরণ দেওয়া আছে । স্কন্দপুরানে এই ঘটনা পাওয়া যায় । এক সময় পদ্মযোনি ব্রহ্মা নিজের মনে মনে ভাবলেন তিনি এমন একটি সরোবর নির্মাণ করবেন- যাতে অবগাহন মাত্রই তম, রজ গুন পার করে সত্ত্ব গুনে অধিষ্ঠিত হওয়া আছে । প্রজাপতি এমনই ভাবছিলেন । পবিত্র হিমালয় খুব দুর্গম। সাধু, সন্ত দের তপস্যা ভূমি। প্রাচীন কাল থেকেই ঈশ্বর প্রাপ্তির জন্য এখানে কত সাধু সন্ত তপস্যা করেছেন, এখনও করছেন । কুম্ভমেলায় যেসব সাধু সন্ত আসেন – তাঁদের মধ্যে কিছু সাধু সন্ত এই হিমালয়েই তপস্যা তে নিমগ্ন থাকেন। এই সাধু সন্ত দের দর্শন লাভ অত্যন্ত সৌভাগ্যের ব্যাপার।

তাই কুম্ভ মেলায় গিয়ে সাধু সন্ত দের দর্শন ও আশীর্বাদ লাভ করতে হয় । প্রজাপতি ভাবা মাত্রই হিমালয় শিখরে ত্রিশ যোজন পরিধির এক হ্রদ নির্মাণ করলেন। তিনি তাতে জল পূর্ণ করলেন । মন থেকে যা উৎপন্ন হয় তাকে ‘মানস’ বলে। যেহেতু পরমপিতা মনে মনে এই হ্রদ তৈরীর কল্পনা করেছিলেন তাই এই হ্রদের নামে ‘মানস সরোবর’ । প্রাচীন কালে এই স্থান দুর্গম হলেও বর্তমানে যানবাহনের যাতায়াতের ফলে এই স্থানে এখন অনেকেই যান । এই দেবীর ভৈরবের নাম অনেকের মতে অমর। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্য অনুসারে ভৈরবের নাম হর । পীঠনির্ণয়তন্ত্র বলে- মানসে দক্ষহস্তো যে দেবী দাক্ষায়ণী হর ।

অমরো ভৈরবস্ত্রত্র সর্বসিদ্ধি প্রদায়কঃ ।। ভ্রমণবিদ ভূপতি রঞ্জন দাসের মতে মানসে দেবীর বাম হস্ত পতিত হয়েছিল। ‘নামষ্টোত্তরশতম’ মতে “মানসে কুমুদা নামা বিশ্বকায়া তথাম্বরে” । এর মতে দেবীর নাম এখানে কুমুদা । চিন্তাহরণ চক্রবর্তী তাঁর ‘তন্ত্র কথা’ তে লিখেছেন- মানস সরোবরের দেবী হলেন ভীষনাকৃতি দেবী দশভুজা । আবার কিছু পণ্ডিত ব্যক্ত করেছেন এই পীঠ মানসে নয়, মালবে অবস্থিত । পীঠনির্ণয়তন্ত্র তন্ত্র তে একস্থানে মালবের নাম উল্লেখ আছে । এই সরোবরে আসলে মনোরম কৈলাশ শিখর দেখা যায় । বিশাল এক পর্বত চূড়া। যেনো শ্বেত চন্দন চর্চিত বিশাল একশিবলিঙ্গ । অপূর্ব মনোরম সেইদৃশ্য দেখে চোখ ফেরানো যায় না।

কৈলাশ শিখর মাত্র ২২,০২৮ফুট। হিমালয়ে এর চেয়েওআরোও বড় চূড়া আছে।  মানস সরোবর এর সেই পবিত্র কুণ্ডই দেবী পীঠ। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য বড়ই মনোরম । দেবী মহামায়াকেই আদ্যাশক্তি পরমাপ্রকৃতি বলে। নিখিল প্রকৃতি সেই আদিভূতা সনাতনীর নিরাকার রূপ। এই শক্তি নিরাকারা । পুনরায় তিনি দুর্গা, কালী, চণ্ডী মূর্তিতে সাকারা । মানস সরোবরের সেই পর্বত চূড়া মনকে মোহিত করবে আপনার । তিব্বতে প্রচুর সন্ন্যাসী সাধক দেখা যায় । দেবী দাক্ষায়ণী ছিলেন দক্ষ প্রজাপতির কন্যা । প্রজাপতি ব্রহ্মার আদেশে দক্ষ আর তাঁর পত্নী বিরনী মহামায়ার কঠোর তপস্যা করেন।

মহামায়া সন্তুষ্ট হয়ে তাঁদের বর দিলেন- কন্যা রূপে দক্ষ মহলে আসবেন । মহাদেবী জন্ম নিলেন। তাঁর নাম সতী। কালক্রমে সতী দেবীর সাথে ভগবান শিবের বিবাহ হল। এরপর দক্ষের সাথে মহাদেবের বিরোধ হয়। দক্ষ শিব হীন যজ্ঞ করতে চাইলে মহাদেবী সতী এই অশাস্ত্রীয় যজ্ঞ বন্ধ করার সংকল্প করেন । কারন শিব হীন যজ্ঞ অশাস্ত্রীয় । শাস্ত্র বিধান না মেনে পূজা করলে তাঁর ফল স্বরূপ ধ্বংস নেমে আসতে পারে। সে যে কোন পূজাই হোক । তাই মহাদেবী এই যজ্ঞ বন্ধ করার জন্য যজ্ঞে প্রান দিয়েছিলেন। পুরানে বলে শিব নিন্দা, স্বামী নিন্দা সহ্য করতে না পেরে দেবী সতী আত্ম বিসর্জন দিয়েছিলেন ।

দুর্গা পূজার সময় “দক্ষযজ্ঞবিনাশৈ ন্যই” নামে মাকে পূজা করা হয় । মা নিজেই দক্ষের যজ্ঞ ধ্বংসের পথ তৈরী করেছিলেন। শক্তির নাশ হয় না। পরজন্মে তিনি মা গৌরী রূপে এলেন। এক কোটি যোগিনী মাকে সেবা করেন । মানস সরোবরের এখানে কৈলাশ চূড়া বৈচিত্রময়। ঐ সব পাহাড়ের মাথা থেকে নেমে এসেছে সারি সারি বিপুল ঝরনা । কোন কোনটি আবার ৬০০-৭০০ ফুট ওপর থেকে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়েছে। ভক্ত মানুষের বিশ্বাস এখানে স্বর্গের দেবতা দেবী, গন্ধর্ব, অপ্সরা গন এখানে আসেন । রাত্রি সময় আকাশে শশীর আলোকে এই স্থান আরো সুন্দর ও আকর্ষণীয় লাগে। মনে হয় যেনো সত্যই দেবতারা নেমে এসেছেন। তাইতো এত মধুর ভাবে চারপাশ সেজে উঠেছে । মানস সরোবরের পশ্চিম দিকে কিছু গুহা আছে। বর্তমানে এগুলি গুম্ফা হয়েছে। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী গন এখানে থাকেন ।

এই সরোবরেই মা ভবানী তাঁর অপূর্ব স্নেহ সুধা ঢেলে দিয়েছেন। বিশ্ব জননী যেমন সৃষ্টি করেন, পালন করেন, আবার দুরাত্মা অসুর দের নাশের জন্য বারংবার আবির্ভূতা হন । যখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আসুরিক শক্তি নাশ করতে পারেন না- তখন মহাশক্তির আবির্ভাব হয় । তিনি দানব ধ্বংস করে ধর্ম সংস্থাপন করেন । অন্তিমে আমরা মাকে প্রনাম জানাই। দারুকাসুর বধের পর দেবতারা যে স্তবে মাকালীকে বন্দনা করেছিলেন- সেই স্তব টি আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। দারুকাসুর বধের ঘটনা অন্য এক সময় শোনাবো।

প্রবল অত্যাচারী দারুকাসুরের পতনে স্বর্গের দেব দেবীগণ অতিশয় আনন্দিত। তাঁরা করজোড়ে দেবী চণ্ডীকার বন্দনা করছেন- হে শক্তিমাতা। তুমি সর্ব মঙ্গলা। তুমিই শিবা। তোমার করুণাতে বিপদের সাথে সাথে সকল প্রকার পাপের নাশ হয়। হে চণ্ডীকে। তোমার নাম স্মরণ মাত্র সকল দুর্গম ভাব সুগম হয়ে যায়। মা। দারুকাসুরকে বধ করে আপনি ধর্ম সংস্থাপন করেছেন। মা তোমাকে প্রনাম জানাই। হে জগন্মাতা ।

তুমি সমস্ত শুভ কর্মের সূচক। তাই সকল কর্মের আগে তোমার নাম উচ্চারণ করলে সে কর্ম সফল হবে। হে দেবী। কৃপা করো। আমার মুখে যেনো সর্বদা তোমার নাম কীর্তন হয় । হে দেবী। তুমি যুদ্ধে চামুণ্ডা ও শিবদূতী নামক দেবী রূপ ধারন করে পাপী অসুর দের নাশ করেছো । হে উগ্র চণ্ডীকে । তুমি চণ্ডনায়িকা। মহাচণ্ডেশ্বরী । তোমার আশীর্বাদ সকলের ওপর বর্ষণ হোক। হে অভয়দায়িনী। তুমি ত্রিপুরভৈরবী। তুমি অনন্তা। প্রতিটি জীবের মধ্যে যে শক্তি আছে তা তোমারই দান । হে মহামায়া। স্বর্গ, রাজ্যপাট হারিয় আমরা ছন্নছাড়া হয়েছিলাম। তুমি আমাদের সকল দুঃখের নাশ করেছো। তোমার কৃপা হলে পথের ভিক্ষুকও ছত্রপতি রাজা হতে পারে। হে মাতঃ।

তুমি অত্যাচারী দৈত্য গনের নাশ করে ধরণীকে অত্যাচার মুক্ত করেছো। সমগ্র বিশ্ব তোমারই স্তব করছে। আমরা তোমাকে বারবার প্রনাম করি। হে আদিশক্তি। তুমিই সনাতনী। সমস্ত শক্তির উৎস তুমি। সকল বস্তুই তোমার অধীন। তুমি সকলকে সব অভীষ্ট প্রদান করো। তুমি লক্ষ্মী রূপে ধন জন দাও, আবার অলক্ষ্মী রূপে পাপীদের সংসার নাশ করো। হে চামুণ্ডে।হে ত্রিপুরমালিনী। সমস্ত শক্তি সব তোমার অধীনে থাকে। তুমি তুষ্টা না হলে কোন প্রকার সিদ্ধি প্রাপ্তি ঘটে না। তোমার কৃপাতেই সিদ্ধি লাভ ঘটে। তোমাকে প্রনাম। হে আদ্যাশক্তি। তোমার ইচ্ছাতেই সমস্ত কিছু সঞ্চালিত হয়। তোমার ইচ্ছা ভিন্ন গাছের পাতা নড়া তো দূর- পবন তাঁর নিজ স্থান পরিবর্তন করতে পারে না। তোমার আশীর্বাদে যেনো সকলের জীবন ধন্য হয় ।