বিশ্বজুড়ে নানারূপে পূজিত হন বিদ্যাদেবী মা সরস্বতী

বিশ্বজুড়ে নানারূপে পূজিত হন বিদ্যাদেবী মা সরস্বতী

 ঋগ্বেদে বাগ্দেবী ত্রয়ীমূর্তি - ভূ: ভুব: স্ব:, জ্ঞানময়ীরূপে সর্বত্রব্যাপিনী। বিশ্বভূবন প্রকাশ তারই জ্যোতিতে। হৃদয়ে সে আলোকবর্তিকা যখন প্রজ্বলিত হয়, তখন জমাট বাধা অজ্ঞানতারূপ অন্ধকার যায় দূর হয়ে। অন্তরে, বাইরে সর্বত্র তখন জ্বলতে থাকে জ্ঞানের পুণ্য জ্যোতি। এই জ্যোতিজ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান, এই জ্যোতিই সরস্বতী। আলোকময়ী, তাই তিনি সর্বশুক্লা। তিন গুণের মধ্যে তিনি সত্ত্বগুণময়ী, অনন্ত জ্ঞানময় ঈশ্বরের বাক্শক্তির প্রতীক বাগ্দেবী। গতিময় জ্ঞানের জন্যই ঋগ্বেদে তাঁকে নদীরূপা কল্পনা করা হয়েছে, যিনি প্রবাহরূপে কর্মের দ্বারা মহার্ণব বা অনন্ত সমুদ্রে মিলিত হয়েছেন। কল্যাণময়ী নদীতটে সাম গায়কেরা বেদমন্ত্র উচ্চারণে ও সাধনে নিমগ্ন হতো।

তাদের কণ্ঠে উদ্গীত সাম সঙ্গীতের প্রতীকী বীণা দেবীর করকমলে। সরস্বতী বিধৌত ব্রহ্মাবর্ত ভূমি বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত আশ্রয় করে সাধনা করতে আশ্রমবাসী ঋষিগণ। সেই ভাবটি নিয়েই দেবী 'পুস্তক হস্তে', গ্রন্থ রচনার সহায়ক লেখনীটিও তাঁর সঙ্গে। মার্কণ্ডেয় পুরাণে শ্রীশ্রীচণ্ডী উত্তরলীলায় শুম্ভ নিশুম্ভ নামক অসুরদ্বয়কে বধ করার সময় দেবীর যে মূর্তির কল্পনা করা হয়েছিল তা ছিল মহাসরস্বতী। এ মূর্তি অষ্টভূজা - বাণ, কার্মূক, শঙ্খ, চক্র, হল, মুষল, শূল ও ঘন্টা ছিল তাঁর অস্ত্র। তাঁর এই সংহারলীলাতেও কিন্তু জ্ঞানের ভাবটি হানি ঘটেনি, কেননা তিনি 'একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়াকা মমাপরা' বলে মোহদুষ্ট শুম্ভকে অদ্বৈত জ্ঞান দান করেছিলেন।

স্কন্দ পুরাণে প্রভাসখণ্ডে দেবী সরস্বতীর নদীরূপে অবতরণের কাহিনী বর্ণিত আছে। বায়ু পুরাণ অনুযায়ী কল্পান্তে সমুদয় জগত্‍ রুদ্র কর্তৃক সংহৃত পুনর্বার প্রজাসৃষ্টির জন্য প্রজাপতি ব্রহ্মা নিজ অন্তর থেকেই দেবী সরস্বতীকে সৃষ্টি করেন। সরস্বতীকে আশ্রয় করেই ব্রহ্মার প্রজাসৃষ্টি সূচনা। গরুড় পুরাণে সরস্বতী শক্তি অষ্টবিধা। শ্রদ্ধা, ঋদ্ধি, কলা, মেধা, তুষ্টি, পুষ্টি, প্রভা ও স্মৃতি। তন্ত্রে এই অষ্টশক্তি যথাক্রমে যোগ, সত্য, বিমল, জ্ঞান, বুদ্ধি, স্মৃতি, মেধা ও প্রজ্ঞা। তন্ত্র শাস্ত্রমতে সরস্বতী বাগীশ্বরী - অং থেকে ক্ষং পঞ্চাশটি বর্ণে তাঁর দেহ।

আবার পদ্মপুরাণ-এ উল্লিখিত সরস্বতীস্তোত্রম্-এ বর্ণিত হয়েছে - শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতপুষ্পোপশোভিতা শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চিতা শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারভূষিতা ইত্যাদি।  সুপ্রাচীন যুগ থেকেই বাঙালির হৃদয় ও মননে সরস্বতী পুজো সমাদৃত হয়ে আসছে। পলাশপ্রিয়া মা সরস্বতী শুক্ল বর্ণ, শুভ্র হংসবাহনা, বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে অর্থাত্‍ একহাতে বীণা আর অন্য হাতে পুস্তক নিয়ে বিরাজ করেন। শুধু হিন্দু মতেই নয় দেবী সরস্বতীকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রূপে পুজো করা হয়। দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-‌পূর্ব এশিয়ার নানা দেশে বিদ্যার দেবী হিসেবেই পুজো করা হয় মা সরস্বতীকে।

থাইল্যান্ডে যেমন দেবী সরস্বতীকে জ্ঞান এবং বিদ্যার দেবী রূপে পুজো করা হলেও সরস্বতীর বর্ণ এখানে সবুজ আভা যুক্ত। সরস্বতীর বাহন এখানে হাঁস নয় থাকে ময়ূর। তিব্বতে মা সরস্বতীকে সঙ্গীতের দেবী বা ইয়াং চেন বলা হয়। তিব্বতের তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে মিলিয়ে মা সরস্বতীকে এখানে ২১ জন তারার মধ্যে একজন দেবী মঞ্জুশ্রীর সঙ্গে বর্ণনা করা হয়। ইন্দোনেশিয়ায় একটি বিশেষ দিন দেবী সরস্বতীর নামে রাখা হয়েছে।

বিশেষ এই দিনটিকে বলা হয় ডে অফ সরস্বতী। বালি দ্বীপে বসবাসকারী হিন্দুরা মা সরস্বতীর আরাধনা করেন। জ্ঞানের স্বারক হিসেবে দেবী সরস্বতীর মূর্তি দেখা যায় আমেরিকায় অবস্থিত ইন্দোনেশিয়ার দূতাবাসের সামনে। কম্বোডিয়াতে মা সরস্বতীকে বাগেশ্বরী এবং ভারতী বলে ডাকা হয়। এখানে সরস্বতীকে বিবাহিত হিসেবে ধরা হয়। কম্বোডিয়ার পুরাণে কথিত আছে প্রজাপতি ব্রহ্মা হলেন সরস্বতীর স্বামী। জাপানে আবার মা সরস্বতীকে বেনজাইতেন বলা হয়। দেবী সরস্বতী এখানে সুর ও সঙ্গীতের অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে পূজিত হন। এখানে দেবী সরস্বতীর হাতে থাকে ম্যান্ডোলিন।

শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা হয় সাধারণ পূজার আচারাদি মেনে। তবে এই পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়, যেমন অভ্র-আবির, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ, বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুল। লোকাচার অনুসারে ছাত্রছাত্রীরা পূজার আগে কুল ভক্ষণ করে না। পূজার দিন লেখাপড়া নিষেধ থাকে। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার, পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করা হয়।

পূজার শেষে পুষ্পাঞ্জলি। পরদিন সকালে ফের পূজার পর চিড়া ও দই মেশানো দধিকরম্ব বা দধিকর্মা নিবেদন করে পূজা সমাপ্ত হয় ও সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। বসন্ত পঞ্চমীতে অনুষ্ঠিত সরস্বতী পূজার পরের দিনটি বাংলায় শীতলষষ্ঠী। কোনো কোনো পরিবারে এদিন অরন্ধন পালন ও 'গোটা-সেদ্ধ' খাওয়ার প্রথা আছে। অষ্টাদশ শতকে নদীয়ার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের সভাকবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের অন্নদামঙ্গলে ত্রিপদী ছন্দে সরস্বতী বন্দনায় দেবীর প্রতি ভক্তের শ্রদ্ধার নিদর্শন মেলে সেই সময়ের বঙ্গভূমিতে।