মুন্সিগঞ্জ জেলা | Munshiganj District

মুন্সিগঞ্জ জেলা | Munshiganj District

বাংলাদেশর  প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল মুন্সিগঞ্জ (Munshigunj) জেলা। ভাগ্যকুলের রাজবাড়ি এবং ভাগ্যকুল বাজারের মিষ্টি ও ঘোলের সুখ্যাতি ছড়িয়ে রয়েছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে।

কিংবা মুন্সিগঞ্জের সুপ্রাচীন ইদ্রাকপুর কেল্লা, পোলঘাটা সেতু, বাবা আদম মসজিদ ইত্যাদির কারণেই বিক্রমপুরের অন্তর্গত মুন্সিগঞ্জ জেলা অত্যন্ত বিখ্যাত আর রয়েছে মাওয়া ঘাটের ইলিশের ঝাঁক। পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী নদী বিধৌত এই অঞ্চলের অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করে থাকে। বাংলাদেশের একটি অন্যতম জেলা হল মুন্সিগঞ্জ। উত্তরে ঢাকা, দক্ষিণে ফরিদপুর, পূর্বে মেঘনা নদী ও কুমিল্লা জেলা এবং পশ্চিমে পদ্মা নদী, শরীয়তপুর ও মাদারিপুর জেলা ঘিরে রয়েছে সমগ্র মুন্সিগঞ্জকে।

এই জেলার উত্তর-পূর্ব দিকে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, এছাড়াও নিখুঁতভাবে বললে পূর্বদিকে রয়েছে কুমিল্লা জেলার অন্তর্গত দাউদকান্দি ও হোমনা উপজেলা। মুন্সিগঞ্জের ভৌগোলিক আকৃতি সমতল নয় একেবারেই। কোনো কোনো এলাকায় পাহাড় না থাকলেও তার উচ্চতা অনেকটাই বেশি। তবে এই জেলার অধিকাংশ অঞ্চল নিম্নভূমি হওয়ায় বর্ষাকালে এই এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়ে। নদীর বর্ণনা দিতে গেলে বলতে হয়, পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী এবং ইছামতী এই নদীগুলি ঘিরে রেখেছেন Munshiganj District  মুন্সিগঞ্জ জেলাকে।

এখানকার বনাঞ্চলের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় মান্দার, পলাশ, শিমূল, শিলকড়ই, পিটরাজ, জারুল, ভাদি, বট, আকাশমণি, কৃষ্ণচূড়া, অশ্বত্থ ইত্যাদি গাছ। আয়তনের বিচারে মুন্সিগঞ্জ সমগ্র বাংলাদেশের বৃহত্তম জেলাগুলির মধ্য ৫৭তম জেলা। এই জেলার সামগ্রিক আয়তন ৯৫৪.৯৬ বর্গকিমি। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে, জনসংখ্যার বিচারে মুন্সিগঞ্জ সমগ্র বাংলাদেশে ৪২তম জনবহুল জেলা। মুন্সিগঞ্জের জনসংখ্যা ১৪ লক্ষ ৪৫ হাজার ৬৬০ জন। এর মধ্যে পুরুষ আছেন ৭ লক্ষ ২১ হাজার ৭৫২ জন এবং মহিলা আছেন ৭ লক্ষ ২৪ হাজার ১০৮ জন।

এই জেলার সাক্ষরতার হার ৫৬.১ শতাংশ। মুঘল শাসনকালে এই জেলার নাম ইদ্রাকপুর ছিল বলে জানা যায়। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ ইদ্রাক নামে ইদ্রাকপুর কেল্লার এক ফৌজদার ছিল। অনেকেই মনে করেন সেই ফৌজদারের নামানুসারেই এই জেলার নাম হয়েছিল ইদ্রাকপুর। ব্রিটিশ সরকার যে সময় সমগ্র বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করেন, ঐ সময়েই রামপালের কাজী কসবা গ্রামের মুন্সি এনায়েত আলির জমিদারভুক্ত হয় এই ইদ্রাকপুর। তারপর থেকেই সেই মুন্সির নামে এই অঞ্চল মুন্সিগঞ্জ নামে পরিচিত হয়।

কিন্তু অনেকে আবার মনে করেন, মুঘল শাসনকালে ফৌজদারি আদালতের প্রধান হিসেবে হায়দার আলি মুন্সির নামানুসারে এই জেলার নামকরণ হয়েছে মুন্সিগঞ্জ। খ্রিস্টীয় দশ শতকের থেকে তেরো শতকের প্রথম পর্ব পর্যন্ত এই অঞ্চলে সেন, বর্মন ও চন্দ্র বংশীয় রাজাদের শাসন চলতো। সেই বংশের রাজাদের রাজধানীও স্থাপিত হয়েছিল এই মুন্সিগঞ্জে। শ্রীচন্দ্রের শাসনকালে তাম্রপত্রে প্রথম বিক্রমপুরের অন্তর্গত এই জেলার উল্লেখ পাওয়া যায়। আরো জানা যায় যে, বখতিয়ার খলজি যখন বাংলা আক্রমণ করেন, সেই সময় পরাজিত লক্ষ্মণসেন নদীয়া ছেড়ে এই জেলায় এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

লক্ষ্মণসেনের দুই পুত্র বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন বেশ কিছুদিন এই মুন্সিগঞ্জে ছিলেন। ১২৮০ সালের শেষ দিক পর্যন্ত ঐতিহাসিকভাবে এই মুন্সিগঞ্জের খ্যাতি ছিল সমগ্র বঙ্গদেশে। বাংলার বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম চাঁদ রায় ও কেদার রায় মুঘল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে লড়াই করেছিলেন তাতে মুন্সিগঞ্জ কিছুকালের জন্য মুঘল আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ে ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ ছাত্ররা সরকারি অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র লুঠ করে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

এর আগে নারায়ণগঞ্জে পাকিস্তানিদের আক্রমনের সময় মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দারা একজোট হয়ে সেই আক্রমণ প্রতিহত করে। এরই মাঝে পাক সেনারা মুন্সিগঞ্জ দখল করে নিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল বিরোধিতায় মুন্সিগঞ্জ স্বাধীনতা লাভ করে। মুন্সিগঞ্জ ভৌগোলিকভাবে ঢাকার নিকটবর্তী হওয়ায় ঢাকার উপভাষার বহুল প্রভাব পড়েছে এই জেলার ভাষার মধ্যে।

আবার এই জেলার গজরিয়া আগে কুমিল্লা জেলার অন্তর্ভুক্ত থাকায় এখানে কুমিল্লার ভাষার প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। তাই সামগ্রিক দিক থেকে বলা যায় যে মুন্সিগঞ্জের ভাষা আসলে মিশ্রভাষা। এই জেলার মধ্যে ৯১.৯২ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং ৭.৯৩ শতাংশ মানুষ রয়েছেন হিন্দু। মোট ৬টি উপজেলা এবং ৬৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গড়ে উঠেছে মুন্সিগঞ্জ জেলা। সেই ৬টি উপজেলা হল যথাক্রমে – মুন্সিগঞ্জ সদর, টঙ্গিবাড়ি, শ্রীনগর, লৌহজং, গজারিয়া, সিরাজদিখান। মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলায় মোট ৯টি, টঙ্গিবাড়িতে ১৩টি, শ্রীনগর উপজেলায় ১৪টি, লৌহজং উপজেলায় ১০টি, গজারিয়ায় ৮টি এবং সিরাজদিখান উপজেলায় ১৪টি ইউনিয়ন রয়েছে।

এই জেলার প্রধান ফসল হিসেবে উৎপাদিত হয় আমন, আউশ এবং বোরো ধান, পাট, ডাল, পিঁয়াজ, রসুন, শাকসবজি, আখ, তামাক, সুপারি, চিনাবাদাম, আলু ইত্যাদি। বাংলাদেশের মধ্যে সবথেকে বেশি আলু উৎপাদন হয় মুন্সিগঞ্জ জেলায়। এছাড়া ফলের মধ্যে উৎপাদিত হয় আম, কলা, খেজুর, তাল, নারকেল, কামরাঙা ইত্যাদি। মুন্সিগঞ্জ জেলার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণ স্থানের তালিকা অপূর্ণই থেকে যাবে যদি তালিকার শুরুতেই ইদ্রাকপুর কেল্লা, পোলঘাটা সেতু, মাওয়া ঘাট, ষোলোআনি সৈকত, রায়বাহাদুর শ্রীনাথ রায়ের বাড়ি, পদ্মহেম ধাম, বাবা আদম মসজিদ, আড়িয়াল বিল, ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ি, জগদীশচন্দ্র বসু স্মৃতি জাদুঘর ইত্যাদি না থাকে।

এছাড়াও মুন্সিগঞ্জের অন্যান্য ভ্রমণস্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বিভিন্ন রিসর্ট যার মধ্যে রয়েছে মেঘনা ভিলেজ হলিডে রিসর্ট, মাওয়া রিসর্ট এবং পদ্মা রিসর্ট আর রয়েছে প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার। মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলায় অবস্থিত ইদ্রাকপুর কেল্লা মুঘল শাসনের এক সুপ্রাচীন নিদর্শন। এই জেলার নাম যে আগে ইদ্রাকপুর ছিল তার প্রমাণ হসেবে এই কেল্লাটি রয়েছে। ইছামতী নদীর ধারে মুঘল সেনাপতি মীরজুমলা এই কেল্লা তৈরি করেছিলেন। অনেকে মনে করেন যে ঢাকার লালবাগ কেল্লা থেকে এই ইদ্রাকপুর কেল্লা পর্যন্ত অতীতের একটি দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ ছিল।

কেল্লার প্রাচীরের গায়ে শত্রুর উদ্দেশ্যে গোলা নিক্ষেপ করার জন্য আজও গর্তগুলি লক্ষ্য করা যায়। পোলঘাটা সেতুটিও মুঘল আমলের স্থাপত্যকীর্তির অন্তর্গত। শ্রীনাথ রাজবাড়িটি মুন্সিগঞ্জের এককালে ধনী ব্যক্তি শ্রীনাথ রায়ের স্মৃতিতে তৈরি হয়েছে বলে জানা যায়। ব্রিটিশ সরকার এই শ্রীনাথ রায়কে রায়বাহাদুর উপাধি দিয়েছিল। টঙ্গীবাড়ি উপজেলার সোনারং জোড়া মঠ এখানকার এক প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন। মুন্সিগঞ্জের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের ধারক ও বাহক হিসেবে এখানকার আড়িয়াল বিল পর্যটকদের মন কাড়ে বারবার।

বর্ষাকালে জলে ভরে ওঠা এই বিলে কচুরিপানার সারি, শাপলা ফুলের পাশাপাশি ভিড় করে নানা জাতের পাখি। আর শীতকালে এখানে ভরে ওঠে সবুজ শস্যক্ষেত। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রসিক মানুষেরা নৌকায় চড়ে নদীভ্রমণ আর ইলিশ খাওয়ার জন্য ছুটে আসেন এখানকার মাওয়া ঘাটে। পদ্মার সৌন্দর্য আর পদ্মার ইলিশের অভাবিত স্বাদ দুয়ে মিলে মন ভুলিয়ে দেয় সকলের। মুন্সিগঞ্জের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারক অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, সরোজিনী নাইডু, কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, কবি বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, মুন্সিগঞ্জে সদ্য আবিষ্কৃত সেই বৌদ্ধ বিহার অতীশ দীপঙ্করের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে। মুন্সিগঞ্জের লোক-সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ হল নৌ-বাইচ। ধলেশ্বরী নদীতে প্রতি বছর এই নৌ বাইচ উৎসব হয়ে থাকে। অন্যান্য সকল জেলা থেকে এই সময় বাইচ দেখতে মানুষ ভিড় করে মুন্সিগঞ্জের ধলেশ্বরী নদী তীরে। একসময় মুন্সিগঞ্জ সহ সমগ্র বিক্রমপুরের কলার খ্যাতি ছিল সুবিদিত। সেই কলা রপ্তানি হতো মধ্য প্রাচ্য, ইউরোপ কিংবা আফ্রিকায়। আজও এখানকার কলার স্বাদ ও গন্ধ অটুট। আর খাবারের মধ্যে রয়েছে ভাগ্যকুলের মিষ্টি। ভাগ্যকুলের জমিদারবাড়ির যেমন ঐতিহাসিক খ্যাতি রয়েছে, তেমনি এখানকার মিষ্টি ও ঘোল সমগ্র বাংলাদেশে জনপ্রিয়।  

[ আরও পড়ুন নড়াইল জেলা ]