দুই বাঙ্গালী সহ ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের হাত ধরে মঙ্গলে পা দিল নাসার ল্যান্ডার

দুই বাঙ্গালী  সহ ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের হাত ধরে  মঙ্গলে পা দিল নাসার ল্যান্ডার

দীর্ঘ সাত মাসের যাত্রা শেষ। আবারও ইতিহাস গড়ল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA (National Aeronautics and Space Administration)। মঙ্গলের মাটিতে সফলভাবে অবতরণ করল নাসার মহাকাশযান 'পারসিভিয়ারেন্স রোভার'। পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী বৃহস্পতিবার অর্থাৎ ১৮ ফেব্রুয়ারী ভারতীয় সময় মধ্যরাতের ঠিক পর থেকেই মঙ্গল গ্রহে মঙ্গলযান নামার প্রস্তুতি শুরু হয়। ঠিক ৭ মিনিটের রোমহর্ষক সময়ের পর রাত্রি ২.২৫ মিনিট নাগাদ মঙ্গলের মাটি ছোঁয় যানটি। এরপরেই বিশ্ব সাক্ষী রইল রহস্যে মোড়া লালগ্রহের প্রথম ছবির।

এ বারে প্রাণের সন্ধানে যা পরে চষে ফেলবে লাল গ্রহের মাটি।  তার পর সেই ল্যান্ডার থেকে মঙ্গলের আকাশে ওড়ানো হবে হেলিকপ্টার। ‘ইনজেনুইটি’। আকাশ থেকে মঙ্গলের আরও বড় এলাকাজুড়ে নজরদারি চালাতে। এই প্রথম অন্য কোনও গ্রহে হেলিকপ্টার ওড়াতে চলেছে সভ্যতা।  এই ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকায় বৃহস্পতিবারই ইতিহাসে ঢুকে যাবে ৪ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূতের নাম। যাদের মধ্যে দু’জন আবার বাঙালি। তাঁদের মধ্যে এক জন মহিলা। বেঙ্গালুরুর স্বাতী মোহন।

‘পারসিভের‌্যান্স’-এর গাইডেন্স, নেভিগেশন ও কন্ট্রোলস অপারেশন্স (জিএনঅ্যান্ডসি)-এর প্রধান। বাকি ৩ জনের মধ্যে অন্যতম বেঙ্গালুরুর জে বব বলরাম। অন্য কোনও গ্রহে এ বার প্রথম যে হেলিকপ্টার ওড়াতে চলেছে বিশ্ব, সেই ইনজেনুইটি-র চিফ ইঞ্জিনিয়র। রয়েছেন অনুভব দত্ত। এখন মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারোডায়নামিক্স ও অ্যারোইলেকট্রিসিটি বিভাগের অধ্যাপক।

তিন দশক আগেই লাল গ্রহে হেলিকপ্টার ওড়ানোর স্বপ্নটা দেখতে শুরু করেছিলেন যে মুষ্টিমেয় কয়েক জন, তাঁদের অন্যতম মহিষাদলের অনুভব। আর রয়েছেন বর্ধমানের সৌম্য দত্ত। ১৫টি মানুষ একে অন্যের উপর দাঁড়ালে যত উচ্চতা হয়, তেমনই একটি দৈত্যাকার প্যারাশুট নির্মাণ প্রকল্পের অন্যতম কারিগর তিনি। ওই প্যারাশুটে চেপেই মঙ্গলের বুকে নামবে নাসার ‘মার্স ২০২০ রোভার’ পারসিভের‌্যান্স আর ল্যান্ডার। বর্ধমানের সৌম্য দত্তের বাবার চাকরির সূত্রে ছোটবেলা থেকেই বার বার ঠাঁই বদল হয়েছে ।

স্কুলজীবনের প্রথম পর্বটা কেটেছে দেহরাদুন ও মুম্বইয়ে। তার পর স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে আমেরিকায়। টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক সৌম্য মাস্টার্স এবং পিএইচডি করেন জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে। নাসার ল্যাংলি রিসার্চ সেন্টারে এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে যোগ দেন ৭ বছর আগে। ২০১৩-য়। এর আগে লাল গ্রহে এত বড় প্যারাসুট আর কখনও পাঠায়নি নাসা। যে প্যারাশুটে চেপে ৯ বছর আগে লাল গ্রহের বুকে পা ছুঁইয়েছিল কিউরিওসিটি রোভার, এ বারের প্যারাশুটের কাছে সেটা শুধুই নস্যি নয়, প্রযুক্তির নিরিখেও বলা যায় ‘সেকেলে’।

এমন প্যারাশুট না থাকলে মঙ্গলের বুকে নিরাপদে নামানো সম্ভব হত না মার্স ২০২০ রোভার ও ল্যান্ডার। সৌম্যের কথায়, ‘‘এ বার এত বড় আকারের প্যারাশুট বানানোর বিশেষ প্রয়োজন ছিল। কারণ, ল্যান্ডার ও রোভারকে মঙ্গলের মাটিতে নামাতে কোনও অরবিটার প্রদক্ষিণ করবে না লাল গ্রহের কক্ষপথে। যে রকেটে চাপিয়ে এ বার পাঠানো হয়েছে মার্স ২০২০ ল্যান্ডার ও রোভার, তা পৃথিবী থেকে সরাসরি মঙ্গলে কক্ষপথে ঢুকে পড়বে। তার পর দ্রুত নামতে শুরু করবে লাল গ্রহে।’’  অনুভবের জন্ম পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মহিষাদলের ঘাঘরা গ্রামে।

কোনও বায়ুমণ্ডলই নেই যে গ্রহে, সেই মঙ্গলে যে এমন হেলিকপ্টার ওড়ানো সম্ভব, সাড়ে ৩ দশক আগে এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে সেই স্বপ্নটা দেখিয়েছিলেন এই অনুভবই। পরে নাসার এমস রিসার্চ সেন্টারে এ বারের মঙ্গল অভিযানের হেলিকপ্টারের অ্যারোমেকানিক্স সম্পর্কিত যাবতীয় পরীক্ষানিরীক্ষার সঙ্গেও ওতপ্রোত ভাবে জড়িত ছিলেন অনুভব। কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুল থেকে ১৯৯৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় একাদশ স্থানটি পান অনুভব। তার পর তিনি বি টেক করেন খড়্গপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) থেকে। পিএইচডি মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অনুভব আমেরিকান হেলিকপ্টার সোসাইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির প্রতিষ্ঠাতা।

পারসিভের‌্যান্স-এর গাইডেন্স, নেভিগেশন ও কন্ট্রোলস অপারেশন্স (জিএনঅ্যান্ডসি)-এর প্রধান স্বাতীর জন্ম বেঙ্গালুরুতে। জন্মের এক বছর পরেই মা, বাবার সঙ্গে আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিলেন স্বাতী। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে। ১৯৮৬-তে। তার পর বেড়ে ওঠা, পড়াশোনার পুরোটাই আমেরিকায়। বড় হয়েছেন উত্তর ভার্জিনিয়া ও ওয়াশিংটন ডিসি-তে। মেকানিক্যাল ও অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর অব সায়েন্স (বিএস) করার পর স্বাতী অ্যারোনটিক্স ও অ্যাস্ট্রোনটিক্সে মাস্টার্স অব সায়েন্স (এমএস) করেন ম্যাসাচুসেট্‌স ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে। সেখান থেকেই পিএইচডি। হেলিকপ্টার ইনজেনুইটি-র চিফ ইঞ্জিনিয়ার জে বব বলরামের জন্মও বেঙ্গালুরুতে।

মাদ্রাজের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি)’ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে রেনস্‌লার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে মাস্টার্স এবং পিএইচডি-র পর বলরাম জেপিএল-এ চাকরি করতে ঢোকেন ১৯৮৫ সালে। ওই সময়ের মধ্যেই মঙ্গলে কয়েকটি ল্যান্ডার ও রোভার পাঠানো হয়ে গিয়েছে নাসার। লাল গ্রহের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে প্রাণের সন্ধানে। ওই সময় বলরামেরই প্রথম মাথায় আসে ল্যান্ডারে চাপিয়ে মঙ্গলে হেলিকপ্টার পাঠালেই তো কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়। সেটা নয়ের দশকের গোড়ার দিক।

বলরামের মনে হয়, রোভার যতটা এলাকা ঘুরে দেখতে পারবে, তার চেয়ে অনেক বেশি এলাকার উপর অনেক কম সময়ে নজরদারির কাজটা সেরে ফেলতে পারবে হেলিকপ্টার।  বলরামের সেই অভিনব ভাবনা গোড়ার দিকে কিন্তু তেমন আমল পায়নি জেপিএল-এ। পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য যে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। ইতিমধ্যেই মঙ্গলের ছবি পাঠাতে শুরু করেছে রোভার। প্রথম ছবিটি বিশ্বের মানুষের জন্য ট্যুইট করে নাসা। লেখা হয়, “Hello, world. My first look at my forever home.”  রোভার অবতরণের সময় প্রতিটা মুহূর্ত গভীর উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন এই বিশাল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা। কারণ যে কোনও পাহাড়ে ধাক্কা লেগে ভেঙে পড়তে পারত নাসার ল্যান্ডার ও রোভার।

এমনকি পাহাড়ের খাঁজে আটকে গিয়ে বিকল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু এক্কেবারে সফলভাবে অবতরণ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে সব উৎকণ্ঠা কাটিয়ে ঠিক যে মুহুর্তে রেডিও সিগন্যাল ল্যান্ডিং সফল হয়, উচ্ছ্বাসের বাঁধ ভাঙে। এ দিন রোভারের অতরণের আগের উহুরত পর্যন্ত নিজের অফিসে টিভির  পর্দায় চোখ রেখেছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সফল অবতরণে পরে বিজ্ঞানীদের ট্যুইট করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। লেখেন, "আরও একবার প্রমাণ হয়ে গেল বিজ্ঞান আর আমেরিকার মানুষের চেষ্টায় কোনও কিছুই অসম্ভব নয়।"

 NASA-র তরফে জানানো হয়েছে, প্রায় ৯ বছর ধরে মঙ্গলের মাটিতে থাকবে  'পারসিভিয়ারেন্স রোভার'। সেখান থেকে ৩০ ধরনের পাথর এবং মাটির নমুনা সংগ্রহ করবে সে। এরপর ২০৩০ সাল নাগাদ ফের পৃথিবীতে ফিরে আসবে। নাসার বিজ্ঞানীদের আশা, রোভার ফিরে এলে খুলে যেতে পারে নতুন দিগন্ত।  'পারসিভিয়ারেন্স রোভার'-র দুটি লম্বা হাত রয়েছে, তাতে লাগান রয়েছে ১৯টি ক্যামেরা। পাশাপাশি, কোনও শব্দ বা হাওয়ার অস্তিত্ব রয়েছে কিনা বুঝতে রয়েছে মাইক্রোফোন। এ ছাড়াও তার সঙ্গে পাঠানো হয়েছে মাটি কাটা, পাথর সংগ্রহ করে সংরক্ষণের একাধিক যন্ত্রাদি।