উত্তর চব্বিশ পরগণা | পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম এই জেলা একসময় ছিল ধর্মপালের রাজ্যভুক্ত  

উত্তর চব্বিশ পরগণা | পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম এই  জেলা একসময় ছিল ধর্মপালের রাজ্যভুক্ত  

কলকাতা শহরের উত্তরপূর্ব দিকে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা হল উত্তর চব্বিশ পরগণা North 24 Parganas ।   জেলাটি প্রেসিডেন্সি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত।এর প্রশাসনিক ভবন ও সদর দপ্তর বারাসাত শহরে অবস্থিত৷ ১৭৫৭ সালে বাংলার নবাব মীরজাফর কলকাতার দক্ষিণে কুলপি পর্যন্ত অঞ্চলে ২৪ টি জংলীমহল বা পরগনার জমিদারি সত্ত্ব ভোগ করার অধিকার দেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। এই ২৪টি পরগনা হল  আকবরপুর , দক্ষিণ সাগর , আমীরপুর , আজিমবাদ , বালিয়া ,বাদিরহাটি ,বসনধারী , কলিকাতা , গড় , হাতিয়াগড় , ইখতিয়ারপুর , খাড়িজুড়ি , মেদনমল্ল , মাগুরা , মানপুর , ময়দা , সাতল , শাহনগর , মুড়াগাছা , শাহপুর , পাইকান , পেচাকুলি , উত্তর পরগনা। সেই থেকে অঞ্চলটির নাম হয় ২৪ পরগণা।  

২৪ পরগণা অঞ্চলটির অস্তিত্বের প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে গ্রিক ভুগোলবিদ টলেমির “ট্রিটিজ অন জিওগ্রাফি” গ্রন্থে৷ ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ববিদদের উদ্দ্যোগে উত্তর ২৪ পরগণার দেগঙ্গা থানার অন্তর্গত বেড়াচাঁপা গ্রামে খনন করে পাওয়া বস্তুসমূহ প্রমাণ করে এই অঞ্চল সরাসরি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অংশ না হলে গুপ্ত সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল যথেষ্ট৷ হিউয়েন সাঙের (৬২৯-৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) ভারতভ্রমণকালে তিনি সমগ্র উত্তর ভারতে যে ১০০ টি মুল হিন্দু মন্দির ও ৩০ টি বৌদ্ধবিহারের উল্লেখ করেন তার বেশ কয়েকটির অবস্থান এই অঞ্চলকে নির্দেশ করে৷ পাল বংশের রাজা ধর্মপালের (৭৭০-৮১০ খ্রিষ্টাব্দ) সময়ে এই অঞ্চল তার রাজ্যভুক্ত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। তবে সেন যুগের বহু দেব-দেবীর মূর্তি জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আবিস্কৃত হয়েছে।“মনসামঙ্গল” কাব্যে ২৪টি পরগনা জেলার অনেক জায়গার নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।

 

 কর্ণপুর রচিত “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে ও ২৪টি পরগনা জেলার অনেক জায়গার নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।“মনসামঙ্গল” কাব্যে ও “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে পাওয়া বিভিন্ন জায়গার নাম ও বিবরণ তুলনা করলে দেখে যায় ২৪টি পরগনা জেলার উক্ত জায়গাগুলির অস্তিত্ব ছিল। খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই অঞ্চলের নদীপথে পর্তুগিজ জলদস্যুদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল৷ ১০০ বছর তাদের আদিপত্য বজায় ছিল উত্তর ২৪টি পরগনা ও দক্ষিণ ২৪টি পরগনার বসিরহাট অঞ্চলে।  খ্রিস্টীয় শতাব্দীর শুরুতে মহারাজা প্রতাপাদিত্য সাগরদ্বীপ, সরসুনা ,জগদ্দল প্রভৃতি অঞ্চলে দুর্গ বানিয়ে এদের আটকাবার চেষ্টা করেন ও বিতাড়িত করতে সক্ষম হন৷ মহারাজা প্রতাপাদিত্য ছিলেন বাংলার বারো ভুঁইয়ার একজন, জলদস্যুদের পরাজিত করার পর তিনি যশোর,খুলনা, বরিশালসহ গোটা ২৪টি পরগনা জেলাতে আধিপত্য বিস্তার করেন৷ 


১২০০ বঙ্গাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিসের সময়ে সমগ্র সুন্দরবন অঞ্চল ২৪ টি পরগণা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিলো৷ ১২০৯ বঙ্গাব্দে নদীয়ার আরো কিছু পরগণাকে ২৪ টি পরগণার অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ১২২১ বঙ্গাব্দে প্রশাসনিক সুবিধার্থে এই নবগঠিত জেলার জন্য আলাদা একজন কালেক্টর নিয়োগ করা হয়৷ পরে ১২২৪ বঙ্গাব্দে পলতা ও বরানগর এবং নদীয়ার বলন্দা ও আনোয়ারপুর যথাক্রমে ১২২৭ ও ১২৩১ বঙ্গাব্দে ২৪ পরগণার অন্তর্ভুক্ত করা হয়৷ আরো পরে খুলনার দক্ষিণাংশের বেশকিছু অঞ্চল ও বাখেরগঞ্জের দক্ষিণ-পশ্চিমে সামান্য অঞ্চলও এই জেলাটির সঙ্গে যুক্ত করা হয়৷

১২৩১ বঙ্গাব্দে জেলাসদর কলকাতা থেকে বারুইপুরে স্থানান্তরিত করা হয় যা আবার ১২৩৫ বঙ্গাব্দে কলকাতারই দক্ষিণে আলিপুরে স্থানান্তরিত করা হয়৷ ১২৪১ বঙ্গাব্দে জেলাটিকে বারাসাত ও আলিপুর এই দুটি নতুনজেলাতে বিভক্ত করি হয়৷ পরে অবিভক্ত ২৪ টি পরগণা জেলা বিভিন্ন ব্রিটিশ বিরোধী কাজে লিপ্ত হয়৷ ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশভাগের সময় পুর্ববর্তী ২৪ পরগণা জেলার সম্পূর্ণ অংশ ভারতে যুক্ত হলেও যশোর জেলার বনগাঁ, বাগদা ও গাইঘাটা অঞ্চল এই জেলার সাথে যুক্ত করে স্বাধীন ভারতের ২৪ পরগণা জেলা গঠিত হয়৷ ১১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ডাঃ অশোক মিত্রের প্রস্তাবনাতে ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে জেলাটির উত্তর অংশ নিয়ে উত্তর ২৪ পরগণা জেলা গঠন করা হয়। বারাসাত, বারাকপুর, বনগাঁ, বসিরহাট, বিধাননগর এই পাঁচটি মহকুমা নিয়ে উত্তর ২৪ পরগণা জেলা গঠিত।

ব্যারাকপুর মহকুমা  প্রশাসনিক সদর দপ্তর বারাকপুর৷ ১৬ টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই ব্যারাকপুর মহকুমা   কাঁচরাপাড়া,  গরুলিয়া, ব্যারাকপুর, হালিশহর, নৈহাটি, ভাটপাড়া,উত্তর ব্যারাকপুর, নিউ ব্যারাকপুর, টিটাগড়, পানিহাটি, কামারহাটি, বরানগর, খড়দহ, দম দম, উত্তর দমদম এবং দক্ষিণ দমদম। ব্যারাকপুর ১  গ্রামীণ এলাকা নিয়ে গঠিত 8 টি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং তিনটি আদমশুমারি শহর: জেটিয়া, গরশ্যামনগর এবং কাউগাছি।ব্যারাকপুর ২ গ্রামীণ এলাকা নিয়ে গঠিত 6 টি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং ছয়টি আদমশুমারি শহর: জাফরপুর, তালবান্ধা, মুরগাছা, পাটুলিয়া, রুইয়া এবং চাঁদপুর।প্রধানত শহরকেন্দ্রিক এই মহকুমা ইন্জিনিয়ারিং, পাটকল, রাসায়নিক শিল্পর জন্য বিখ্যাত৷ ভারতের প্রাচীনতম সেনানিবাস বারাকপুরে অবস্থিত৷ ১৮৫৭র মহাবিদ্রোহর প্রথম শহীদ বারাকপুরের মঙ্গল পান্ডে৷

এছাড়া বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মস্থান বারাকপুর মহকুমা৷ হিন্দুতীর্থ দক্ষিণেশ্বর এই মহকুমায় অবস্থিত৷ অসংখ্য বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় সমৃদ্ধ বারাকপুর মহকুমা শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে৷ এখানে মেডিক্যাল কলেজ সহ একাধিক উন্নতমানের সরকারি ও বেসরকারী হাসপাতাল আছে৷ কলকাতা বিমানবন্দর প্রশাসনিক ভাবে বারাকপুর মহকুমার অন্তর্গত৷ বারাসত  মহকুমার জেলাসদর বারাসত। বারাসাত, হাবড়া, অশোকনগর কল্যাণগড়, মধ্যগ্রাম এবং গোবরডাঙ্গা এই ৬ টি  পৌরসভা নিয়ে গঠিত বারাসত মহকুমা।যশোহর রোড, ৩৪ নং জাতীয় সড়ক দ্বারা এই মহকুমা কলকাতার সঙ্গে যুক্ত৷ এছাড়া রেলপথে এই মহকুমা কলকাতাকে বসিরহাট ও বনগাঁ মহকুমাকে যুক্ত করেছে৷

এই মহকুমাতেও অনেক বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে৷ সরকারি বেসরকারী অনেকগুলি হাসপাতাল মহকুমা তথা রাজ্যের মানুষকে চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করছে৷বনগাঁ মহকুমা বনগাঁ, গাইঘাটা ও বাগদা ব্লক ও বনগাঁ পৌরসভা নিয়ে গঠিত৷ সীমান্ত বাণিজ্য ও কৃষি এই মহকুমার প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি৷ সড়কপথে যশোর রোডের মাধ্যমে মহকুমাটি কলকাতার সঙ্গে যুক্ত৷ রেলপথে বনগাঁ কলকাতা ও নদীয়ার রাণাঘাটের সঙ্গে যুক্ত৷ মতুয়া সম্প্রদায়ের পূণ্যতীর্থ ঠাকুরনগর এই মহকুমায় অবস্থিত৷বসিরহাট এই জেলার বৃহত্তম মহকুমা৷ তিনটিপৌরসভা ১০টি ব্লক নিয়ে এই মহকুমা গঠিত৷ কৃষিভিত্তিক এই মহকুমার দক্ষিণ অংশ সুন্দরবনের অংশ৷ টাকী রোড এবং রেলপথে মহকুমাটি কলকাতার সঙ্গে যুক্ত৷

বিধাননগর মহকুমা বিধাননগর কর্পোরেশন নিয়ে গঠিত৷তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পর ক্ষেত্রে ভারতের অন্যতম কেন্দ্রস্থল বিধাননগর৷ উন্নত আধুনিক নগরজীবনের সকল সুবিধা সম্পন্ন বিধাননগর রাজ্যের অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র৷  এই জেলার  লোকসভা কেন্দ্র গুলি হল বনগাঁ,  ব্যারাকপুর,  দমদম,  বারাসত,  বসিরহাট।  বিধানসভা কেন্দ্র গুলি হল বাগদা,  বনগাঁ উত্তর,  বনগাঁ দক্ষিণ,  গাইঘাটা,  স্বরূপনগর,  বাদুড়িয়া,  হাবড়া,  অশোকনগর,  আমডাঙা,  বীজপুর, কামারহাটি, বরানগর বিধানসভা কেন্দ্র, দমদম,  রাজারহাট নিউটাউন, বরানগর,  রাজারহাট গোপালপুর,  মধ্যমগ্রাম,   নৈহাটি,  ভাটপাড়া,  জগদ্দল,  নোয়াপাড়া,  ব্যারাকপুর,  খড়দহ, পানিহাটি,  বারাসত, দেগঙ্গা,   দমদম উত্তর,  হাড়োয়া, মিনাখাঁ,  সন্দেশখালি, বসিরহাট দক্ষিণ, বসিরহাট উত্তর, হিঙ্গলগঞ্জ। 


পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ১০.৯৭% লোক উত্তর ২৪ পরগণা জেলাতে বাস করেন ৷২০০১ সালে  জেলার জনঘনত্ব  ছিল ২১৮২ এবং ২০১১ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২৪৪৫ জন প্রতি বর্গকিলোমিটার হয়েছে ২০০১-২০১১ সালের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১২.০৪%  ৷ স্বাক্ষরতা : ৭৮.০৭%(২০০১) ৮৪.০৬%(২০১১)। পুরুষদের স্বাক্ষরতা হার ৮৩.৯২%(২০০১) ৮৭.৬১%(২০১১) । নারী  স্বাক্ষরতা হার ৭১.৭২%(২০০১) ৮০.৩৪% (২০১১)।  উত্তর ২৪ পরগণা জেলার গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চল কলকাতা উপনগরীর অন্তর্ভুক্ত৷ স্বভাবতই উত্তর শহরতলি শিল্পাঞ্চলটি শিল্প ও চাকুরীবহুল৷ কলকাতার তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র(দ্য ইনফরমেশন টেকনোলজি হাব) এই জেলাতেই অবস্থিত, যা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে 'সিলিকন ভ্যালি' নামে আখ্যায়িত হতে চলেছে৷ এটি কলকাতার জনপ্রিয় তথ্যপ্রযুক্তি ও বহুরাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির অন্যতম আলোচনা ও আধিকারিক স্থান৷ ২০১৭ সালের আনুমানিক গণনা অনুযায়ী ৫.৮ লক্ষ চাকুরীর জোগান দিয়েছে এই কেন্দ্রগুলি যা সল্টলেকের মুলত সেক্টর ৫ ও সেক্টর ৩ অঞ্চলে কেন্দ্রীভুত৷সল্টলেক-বিধাননগর ছাড়াও রাজারহাট-নিউ টাউন অঞ্চলটি দ্রুত উন্নতিশীল৷

সুযোগ সুবিধা, পরিবহন ও সৌন্দর্যায়ন সহ পর্যটন ও এই অঞ্চলগুলির অর্থনীতিরাকান্ডারী৷অপর একটি পুরাতন শিল্পোন্নত অঞ্চল হলো বারাকপুর মহকুমা ও বারাসাত শহরাঞ্চল৷ এখানে মুলত কারখানা ও বেশ কিছু পুরোনো সংস্থার দপ্তর অবস্থিত,  উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা ট্রেন পথ। শিয়ালদহ থেকে নৈহাটি মেন লাইন,শিয়ালদহথেকে বনগাঁও শাখা, এবং বারাসাত থেকে হাসনাবাদ শাখা। এছাড়াও বাস পরিষেবা খুবই উন্নত। জেলা সদর বারাসত তিতুমীর বাসস্ট্যান্ড থেকে রাজ্যের প্রায় সব জেলাতেই বাস পরিষেবা পাওয়া যায় । বারাসত, বরানগর, হাবরা, বসিরহাট, নৈহাটি, দেগঙ্গা,  বনগাঁ, কাকিনাড়া, মছলন্দপুর, ব্যারাকপুর, স্বরূপনগর, অশোকনগর, চাকলা (লোকনাথ বাবার ধাম), হাসনাবাদ প্রভৃতি বাস টার্মিনাল গুলি থেকে জেলা ও জেলার বাইরে বাস পরিষেবা চালু আছে। অনেক বিখ্যাত স্থান যেমন দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির, বরানগর মঠ এই জেলায় অবস্থিত। এই জেলার অনেক জায়গা উৎসবের জন্য বিখ্যাত  বরানগর, বসিরহাট দুর্গা পূজার জন্য, হাবড়া, বারাসাত, অশোকনগর,  নৈহাটি এবং মধ্যগ্রাম কালী পূজার জন্য, বনগাঁ, বেরচাঁপা বাসন্তী পূজার জন্য। 

নানান ঐতিহাসিক আন্দোলনের সাক্ষী এই জেলা। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই জেলার নাম। সিপাহী বিদ্রোহের সিপাহী মঙ্গল পান্ডে সহ নীলবিদ্রোহের  অনেক নীলচাষী , অনেক জমিদারগোষ্ঠী নাম রয়েছে এই তালিকায়। ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দে জেলাটি ব্রিটিশ বিরোধীতার মুলকেন্দ্র হয়ে ওঠে যখন বারাকপুর সেনানিবাসে বাসরত সিপাহীরা ইঙ্গ-বর্মা' যুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষ নিয়ে লড়াই করতে মানা করে৷১১ই কার্তিক (২রা নভেম্বর) বিদ্রোহীদের ওপর আক্রমণ করা হয়, অনেকে পালিয়ে বাঁচলেও দলনেতাদের ব্রিটিশ বাহিনী ফাঁসি দেয়৷ কিছু ঐতিহাসিকদের মতে এটি ছিল সিপাহী বিদ্রোহের সূত্রপাত৷এই বিদ্রোহ মুলত শুরু হয়েছিলো সেনানিবাসে আসা নতুন কার্তুজকে নিয়ে৷

সিপাহীরা সন্দেহ করেছিলো যে কার্তুজের কিছু অংশ সম্ভবতঃ এমন কিছু দিয়ে তৈরী যা ছিলো ধর্মবিরূদ্ধ৷ ফলস্বরূপ বারাকপুর সেনানিবাসে সিপাহী মঙ্গল পান্ডের অনুপ্রেরণায় সৈন্যদের তরফ থেকে ৪ঠা চৈত্র ১২৬৩ বঙ্গাব্দে (২০ মার্চ ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে) বিদ্রোহ ঘোষিত হয়৷ নীলচাষীদের বিদ্রোহও জেলাটির ইতিহাসকে গৌরবান্বিত করেছে৷ ১১৮৪ বঙ্গাব্দে লুইস বোনার্ড বাংলার ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগরের দুটি খামারে প্রথম নীলচাষ ও নীলের উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করেন৷ ১২৩৭ বঙ্গাব্দে(১৮৩০-৩১ খ্রিষ্টাব্দে) বারাসাত, বনগাঁ, বসিরহাট অঞ্চলে নীলচাষে বিমুখ চাষীদের বিদ্রোহ দমন করতে কোম্পানি ও স্থানীয় জমিদাররা একীভূত হয়৷ পরিশেষে ১২৬৬ বঙ্গাব্দে(১৮৫৯-৬০) নাগাদ নীলকুঠিতে নীলচাষীদের প্রতি অত্যাচারকে কেন্দ্র করে নীলচাষীরা ও ২৪ পরগণার শ্রীরামপুর গ্রামের তালুকদার শিবনাথ ঘোষ সহ কিছু জমিদারগোষ্ঠীর সমর্থনে নীলবিদ্রোহ ঘোষণা করে।  

শিক্ষাদীক্ষার দিক থেকেও বেশ উন্নত এই জেলা। এই জেলা জুড়ে রয়েছে বহু সরকারি বেসরকারি বাংলা ও ইংরাজি মাধ্যম স্কুল , কলেজ , বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, রয়েছে বহু প্রশিক্ষন কেন্দ্র।এই জেলা জুড়ে রয়েছে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ। রয়েছে  ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট ,মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় , পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় , ভগিনী নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয় , অ্যাডামাস বিশ্ববিদ্যালয় , টেকনো ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি , নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়  , জেআইএস বিশ্ববিদ্যালয় , ব্রেইনওয়্যার ইউনিভার্সিটি ,  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (প্রযুক্তিগত ক্যাম্পাস), যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (দ্বিতীয় ক্যাম্পাস)আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় , অ্যামিটি ইউনিভার্সিটি , সেন্ট জেভিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়।

এই জেলা জুড়ে রয়েছে প্রচুর কলেজ।  তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল নারুলা ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি , বসিরহাট কলেজ , কলেজ অফ মেডিসিন এবং সাগর দত্ত হাসপাতাল , ভৈরব গাঙ্গুলী কলেজ , বিধাননগর কলেজ , হেলঞ্চা শ্রীচৈতন্য কলেজ , প্রকৌশল ও ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট, টাকি সরকারি কলেজ ,  গুরু নানক ইনস্টিটিউট অফ ডেন্টাল সায়েন্সেস অ্যান্ড রিসার্চ , গুরু নানক ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি , দীনবন্ধু মহাবিদ্যালয় , ড. বি আর আম্বেদকর সাতবার্সিকি মহাবিদ্যালয়,  টেকনো ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বানীপুর , আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ , আমডাঙ্গা জুগল কিশোর মহাবিদ্যালয় ,  রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ শতবর্ষী কলেজ , বারাসাত সরকারি কলেজ , গোবরডাঙ্গা হিন্দু কলেজ,  ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজব্যারাকপুর রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ কলেজ , এছারাও আরও অনেক কলেজ রয়েছে এই জেলা জুড়ে।

এই জেলা জুড়ে রয়েছে সরকারি বেসরকারি বহু স্কুল , তার মধ্যে এখানে কিছু উল্লেখ করা হল হাবড়া উচ্চ বিদ্যালয় (H.S) , অশোকনগর বালক মাধ্যমিক বিদ্যালয় , কামিনী কুমার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় , অশোকনগর বানপীঠ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় , সেন্ট স্টিফেন স্কুল , সেন্ট জেভিয়ার্স ইনস্টিটিউশন (পানিহাটি) , আদামাস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল , দুন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, বসিরহাট , কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় ব্যারাকপুর (সেনা) , রাহার রামকৃষ্ণ মিশন বয়েজ হোম হাই স্কুল , পঞ্চ গ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়, আমবাউলা মর্নিং বেলস একাডেমি , স্ট্র্যাটফোর্ড ডে স্কুল , আদিত্য একাডেমী (সিনিয়র মাধ্যমিক) , অক্সিলিয়াম কনভেন্ট স্কুল , কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি, হাটথুবা আদর্শ বিদ্যাপীঠ (এইচএস) , হাবড়া উচ্চ বিদ্যালয় (H.S) , স্ট্র্যাটফোর্ড ডে স্কুল, আদিত্য একাডেমী (সিনিয়র মাধ্যমিক) ,  অক্সিলিয়াম কনভেন্ট স্কুল, কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি, দম দম, বরণগোর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম হাই স্কুল , ব্যারাকপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এছাড়াও আরও অনেক ইংরাজি ও বাংলা মাধ্যম স্কুল রয়েছে এই জেলায়।  


উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার প্রধান পর্যটন কেন্দ্র সুন্দরবন। এছাড়াও রয়েছে বিভূতিভূষন অভয়অরণ্য, পারমোদন, চাকলা (লোকনাথ বাবার ধাম ও সাত গম্বুজ মসজিদ ও পুকুর)। ঠাকুরনগর, জলেস্বর শিব মন্দির,কচুয়া লোকনাথ ধাম , মঙ্গল পাণ্ডে উদ্যান, ব্যারাকপুর , বেড়াচাঁপার কাছে চন্দ্রকেতুগড় ঢিপি, যা প্রায় প্রাক মৌর্য যুগের সময় বলা হয়।  উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার একটি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র হল টাকি। এটি ইছামতি নদীর তীরে অবস্থিত। টাকি ইছামতি নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এবং নদীর পূর্ব তীরে বাংলাদেশ। বনগাঁ এই জেলার একটি সীমান্তবর্তী শহর। এই শহরের কাছেই এশিয়ার বৃহত্তম স্থলবন্দর পেট্রাপোল অবস্থিত। 

এই জেলায় জন্মেছেন অনেক প্রথিতযশা মানষ।এই জেলার বিশিষ্ঠ কয়েকজন ব্যেক্তি হলেন বিখ্যাত বাংলা সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জন্মেছেন এই জেলার নৈহাটি শহরে। বিভূতিভূষণ এই জেলার কাঁচরাপাড়ার নিকটবর্তী ঘোষপাড়া-মুরাতিপুর গ্রামে নিজ মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্যিক বিমল কর  উত্তর ২৪ পরগণার টাকীতে জন্মগ্রহণ করেন।বাঙালি ভূতত্ত্ববিদ, বিজ্ঞানী প্রমথনাথ বসু এই জেলার মানুষ ,তিনি গোবরডাঙার নিকট গৈপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বিপ্লবী প্রমথনাথ মিত্র এই জেলার নৈহাটিতে জন্মগ্রহণ করেন । বিপ্লবী তারকনাথ দাসের জন্ম এই জেলায়।  প্রভাস সরকার, উমাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যিক , জিৎ গাঙ্গুলী ,  শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ,  অভিষেক চ্যাটার্জী , প্ৰসন্নকুমার সেন , উমানাথ গুপ্ত  ধর্মপ্রচারক ও লেখক।