বনগাঁ | উত্তর ২৪ পরগনা জেলা শহর Bangaon

বনগাঁ | উত্তর ২৪ পরগনা জেলা শহর Bangaon

  পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের এর উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার একটি ঐতিহাসিক শহর বনগাঁ Bangaon । বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী। ৩৮ টি গ্রামপঞ্চায়েত ১ টি পৌরসভা ও ৩ টি সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক নিয়ে গঠিত জেলার ঐতিহাসিক শহর বনগাঁ Bangaon।  শহরটি উত্তর ২৪ পরগণা জেলা অবস্থিত। ২০১১ সালের জনগণনার পরে শহরটির জনসংখ্যা বেড়েছে এবং জুলাই ২০০১ সালের মার্চ মাস থেকে ২০১১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত জনসংখ্যা ৬,৭০১ জন বৃদ্ধি পেয়ে ১,০৮,৮৬৪ জন হয়। এটি জনসংখ্যার ভিত্তিতে বনগাঁ মহকুমার বৃহত্তম পৌরসভা ও নগর। 

২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী জনসংখ্যার ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গের শহরপুঞ্জগুলি মধ্যে ২৮তম স্থানে রয়েছে।  ঐতিহাসিক এই শহর বরাবরই শিল্পচর্চায় উত্‌সাহী। নীলদর্পণ নাটকের স্রষ্টা দীনবন্ধু মিত্র থেকে শুরু করে কথা সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্যচর্চায় বনগাঁর নামকে দেশবাসীর কাছে পরিচিত করেছেন। সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন হাল আমলের শিল্পী-সাহিত্যিকেরাও। বনগাঁ ২৩.০৭° উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৮৮.৮২° পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মাঝে অবস্থিত।  সমুদ্র থেকে শহরের গড় উচ্চতা ৭ মিটার (২২ ফুট)। শহরটি ১৪.২৭৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।

বনগাঁ ইছামতি-রায়মঙ্গল সমভূমির অন্তর্গত, যা নিম্ন গঙ্গা বদ্বীপে অবস্থিত জেলার তিনটি ভূ-তাত্ত্বিক (ফিজিওগ্রাফিক) অঞ্চলের মধ্যে একটি। শহরের পরিপক্ব কালো বা বাদামী রঙের দোআঁশ থেকে সাম্প্রতিক পলিযুক্ত মাটি পরিলক্ষিত হয়। বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ২৪° সেন্টিগ্রেড থেকে ২৮° সেন্টিগ্রেডের মধ্যে থাকে। এখানে গ্রীষ্মকাল উষ্ণ ও আর্দ্র। এই সময় গড় তাপমাত্রা ৩৫° সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি থাকলেও মে-জুন মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কখনো কখনো ৪০° সেন্টিগ্রেড ছাড়িয়ে যায়। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ১৮° সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি থাকে।

বঙ্গদেশে নীল বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে ১৮৬২ সালের শেষের দিকে নদিয়া জেলার ম্যাজিষ্ট্রেট হর্সেল ও বারাসত জেলার ম্যাজিষ্ট্রেট অ্যাসলে ইডেন বনগাঁয় (তত্‌কালীন বনগ্রাম) আসেন। তাঁরা দুর্দশাগ্রস্ত নীল চাষিদের কাছে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বনগাঁকে মহকুমা ঘোষণা করেন। ১৮৬৩ সালে নদিয়া জেলার একটি মহকুমা হিসাবে গড়ে ওঠে বনগাঁ। প্রথম মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেট হয়ে আসেন সি কুইনি। পরবর্তী ম্যাজিষ্ট্রেট হয়েছিলেন জেএন হার্ডলস। তৃতীয় মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেট শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের কার্যকালে বিদ্যাসাগর বনগাঁয় এসেছিলেন।

সালটা ছিল ১৮৬৯। শ্রীশচন্দ্র ছিলেন গোবরডাঙা পুরসভার প্রথম চেয়ারম্যান। তিনিই প্রথম বিদ্যাসাগরের অনুপ্রেরণায় বিধবা বিবাহ করেছিলেন। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ১৮৮২ সালে বনগাঁ মহকুমাকে নদিয়া জেলার বদলে যশোহর জেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ভারতের স্বাধীনতার দিন বনগাঁ শহর কিন্তু ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে। প্রবীণ মানুষেরা জানালেন, বনগাঁ পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাওয়ায় সে সময়ে মুসলিম লিগের পক্ষ থেকে শহরে উত্‌সব করা হয়েছিল। যদিও তার তিন দিন পরে, ১৮ অগস্ট বনগাঁ মহকুমার বনগাঁ ও গাইঘাটাকে এ দেশের তত্‌কালীন অবিভক্ত ২৪ পরগনা জেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। 

দেশভাগের সময়ে ও পার বাংলা থেকে বহু মানুষ বনগাঁ শহরে চলে এসেছিলেন। স্থানীয় ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৪৯ সালে বাংলাদেশের বাগেরহাটে দাঙ্গার সময়েও দলে দলে মানুষ এখানে আসেন। তবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ও পার বাংলা থেকে শরণার্থী হিসাবে সব থেকে বেশি মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। স্থানীয় বার্মা কলোনি, বিচুলিহাটা, মতিগঞ্জে তাঁদের জন্য শিবির করা হয়েছিল। প্রবীণ দের মতে “যুদ্ধের পরে অবশ্য শরণার্থী হিসাবে শহরে আশ্রয় নেওয়া সব মানুষ আর ফিরে যাননি।

যাঁরা টাকা-পয়সা কিছু আনতে পেরেছিলেন, তাঁরা এখানেই সম্পত্তি কিনে পাকাপাকি বসবাস শুরু করেন।”  অতীতে বনগাঁ দিয়ে কলকাতা-খুলনা রেল চলাচল করত। ট্রেনের নাম ছিল বড়িশাল এক্সপ্রেস। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ে তা বন্ধ হয়ে যায়। ’৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালীন বনগাঁ শহরে ভারতীয় সেনারা ক্যাম্প করেছিল। বনগাঁ স্টেডিয়ামে কামান এনে রাখা হয়েছিল। সাঁজোয়া গাড়ি যাতায়াত করত শহরের পথ দিয়ে। আর আকাশ পথে গোঁ গোঁ করে উড়ত যুদ্ধবিমান। তা নিয়ে আতঙ্কে ভুগতেন গাঁয়ের মানুষ।

উড়োজাহাজ গেলেই সকলে নিচু হয়ে বসে পড়তেন। সন্ধ্যার পরে কোনও বাড়িতে আলো জ্বালানোর নিয়ম ছিল না। বনগাঁ শহরের প্রথম হাইস্কুল ছিল বনগাঁ হাইস্কুল। সেটি তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। শহরের একমাত্র কলেজ দীনবন্ধু মহাবিদ্যালয়টিও প্রথমে শুরু হয়েছিল বনগাঁ হাইস্কুলেই। শহরে এখন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা ১৬টি। এলাকার মানুষের চাহিদা, একটি বিএড কলেজ ও একটি আর্ট কলেজের। শহরের ঐতিহ্য পাবলিক লাইব্রেরি তৈরি হয়েছিল ১৯১৭ সালে। আজও তা চলছে। 

ভারতের ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে, বনগাঁ শহরের জনসংখ্যা হল ১,০৮,৮৬৪ জন।এর মধ্যে পুরুষ ৫১% এবং নারী ৪৯%। এই শহরের জনসংখ্যার ১০% হল ৬ বছর বা তার কম বয়সী। বনগাঁ শহরে স্বাক্ষরতার হার ৮৯.৭০% এবং নারী-পুরুষের অনুপাত হল ১০০০ জন পুরুষের বিপরীতে ৯৬৬ জন নারী। শিশুদের মধ্যে নারী-পুরুষের অনুপাত ১০০০/৯৪৩।

  শহরটির প্রধান ভাষা বাংলা। বাংলা ও ইংরেজি সহ শহরের দাপ্তরিক ভাষা। ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে, মোট ১,০৮,৮৬৪ জন শহরবাসীর মধ্যে ১,০৮,০০৯ জন বাংলাভাষী এবং অবশিষ্টরা অন্যান্য ভাষায় কথা বলেন। ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে, বনগাঁর জনসংখ্যার ৯৬.৬৬ শতাংশ হিন্দু, ২.৮৫ শতাংশ মুসলিম, ০.২৫ শতাংশ খ্রিষ্টান এবং ০.০২ শতাংশ শিখ; অন্যান ধর্মানুসারীরা রয়েছে ০.০১ শতাংশ। 

 বনগাঁ  পৌরসভাটি ১৯৫৪ সালে আধুনিক স্বায়ত্বশাসনমূলক সংস্থা হিসেবে গঠিত হয়। বনগাঁ পৌরসভা একজন পৌরপিতা/পৌরমাতা ও ২২ জন কাউন্সিলর (পৌরপিতা সহ) নিয়ে গঠিত। পৌরসভার ২২ জন কাউন্সিলর শহরের নাগরিকদের ভোটে প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত হন। নির্বাচিত কাউন্সিলরগণ নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে পৌরপিতা/পৌরমাতা নির্বাচিত করেন। 

পৌরসভাটি ১৪.২৭৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ২২ টি ওয়ার্ডের সমন্বয়ে গঠিত। পৌরসভার প্রধান কাজ হল জল সরবরাহ, শহরের রাস্তাঘাট ও প্রকাশ্য স্থানসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ, রাস্তার আলোকদান, বাড়িনির্মাণ নিবন্ধীকরণ ও নিয়ন্ত্রণ, পয়ঃপ্রণালী রক্ষণাবেক্ষণ ও কঠিন বর্জ্য পদার্থের অপসারণ ইত্যাদি। 

পণ্য রপ্তানি সম্পর্কিত শিল্প গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে অবস্থিত শহরটির অর্থনীতির বৃহত্তম খাত। শহরটির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকারের পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানি হয় এবং বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা হয়। পণ্য পরিবহন এবং পণ্য বোঝাই ও খালাসের কাজে প্রচুর সংখ্যক শ্রমিক নিযুক্ত রয়েছে। এই শহরের নিকটে পেট্রাপোল হল ভারতের সব থেকে বড় স্থল বন্দর ও উল্লেখযোগ্য সীমান্তবর্তী এলাকা।   

এই শহরের মানুষ আজও গর্ববোধ করেন দীনবন্ধু, বিভূতিভূষণ কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে।” জানাযায়, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই শহরে জন্মগ্রহণ করেননি বা এখানে বসবাসও করতেন না। কিন্তু শহর-সংলগ্ন ছয়ঘড়িয়া এলাকায় রাখালদাসের ছোট ঠাকুরদাদা গৌরহরি বন্দ্যোপাধায়ের বাড়ি ছিল। দুর্গাপুজোর সময়ে রাখালদাস শহরের উপর দিয়েই আসতেন। তা সত্ত্বেও শহরবাসী রাখালদাসকে নিজেদের লোক বলেই মনে করেন।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম কাঁচরাপাড়ার কাছে মামার বাড়িতে। তাঁর পৈতৃক ভিটে ছিল অধুনা গোপালনগরের বারাকপুর গ্রামে। বিভূতিভূষণ বনগাঁ হাইস্কুলে লেখাপড়া করেছেন। প্রথমে পায়ে হেঁটে স্কুলে এলেও পরে স্থানীয় খেলাঘর মাঠের কাছে ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশোনা করতেন। শহরে মন্মথনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে তিনি সাহিত্যপাঠের আসরে আসতেন। যা খ্যাত ছিল লিচুতলা ক্লাব নামে। ইছামতী নদীর নামে তিনি উপন্যাসও লিখেছেন। পথের পাঁচালি উপন্যাসের কিছুটা অংশ তিনি ইছামতীর পাড়ে বসেই লিখেছিলেন বলে জানা যায়।

দীনবন্ধু মিত্রের জন্ম বনগাঁ মহকুমার চৌবেড়িয়া গ্রামে। তাঁর লেখা ‘নীলদর্পণ’ তো গোটা দেশে শোরগোল ফেলেছিল। তা ছাড়াও বিয়ে পাগলা বুড়ো, লীলাবতী-সহ বহু নাটক লিখেছেন দীনবন্ধু। সাহিত্যিক মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়, শঙ্কর নামেই যিনি বাংলা সাহিত্যে চিরকালীন জায়গা করে নিয়েছেন, তাঁরও জন্মভিটে বনগাঁয়। কবি কেশবলাল দাস, শিবপ্রসাদ ঘটক, নির্মল আচার্য, হরিপদ মুখোপাধ্যায়, মন্মথনাথ চট্টোপাধ্যায়, অনিল সাধু, নির্মল মুখোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ মৈত্রের মতো অনেকেই সাহিত্য চর্চার শহরের ঐতিহ্য এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। 

তারও পরবর্তী সময়ে পাঁচ কবি, যাঁদের এক সময়ে একযোগে ‘পঞ্চস্বর’ ডাকা হত, তাঁরা হলেন রাখাল বিশ্বাস, ক্ষিতীশ বিশ্বাস, দেবপ্রসাদ ঘোষ, বীরেন বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্যামল রায়চৌধুরী। দেবপ্রসাদ ঘোষ বহু কবিতার পাশাপাশি অসংখ্য গণসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। তারও পরবর্তী সময়ে স্বপন চক্রবর্তী, মলয় গোস্বামী, অশোক আচার্য, সমর মুখোপাধ্যায়, কান্তিময় ভট্টাচার্য, জলধি হালদার, ভবানী ঘটক, বিভাস রায়চৌধুরী, বাবলু রায়, মোহন ঘোষ, রণবীর দত্তর মতো লেখকেরা বনগাঁর সাহিত্য চর্চার ঐতিহ্য সমৃদ্ধ করেছেন।

বনগাঁ শহর থেকে নিয়মিত বহু লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হয় কয়েকটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্রও। আর দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে এই শহর থেকে যত পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়, তা সম্ভবত রাজ্যের আরও কোনও প্রান্তে দেখা যায় না। পুজো উদ্যোক্তারাও ভাল মানের স্মরণিকা প্রকাশ করেন, যা সাহিত্য পত্রিকার আকার নেয়। ‘অচেনা যাত্রী’ নামে একটি ওয়েব ম্যাগাজিনও বেরোচ্ছে সম্প্রতি। তবে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছুই। অতীতে নিয়মিত নাটক ও যাত্রা উত্‌সব হত শহরে।

এখন সেই রমরমা নেই। বনগাঁ নাট্যচর্চা কেন্দ্র এখন বছরে একটি করে নাট্য উত্‌সব করে। হারিয়ে গিয়েছে কথক-এর মতো বহু নাট্যদল। রক্তকরবী ও বনগাঁ বিদর্ভ নামে কয়েকটি সংস্থা মাঝে মধ্যে নাটক মঞ্চস্থ করে। অতীতে ট’বাজারের ব্যবসায়ীরা নিয়মিত যাত্রা চর্চা করতেন। এখন তা অনিয়মিত। বনগাঁর জ্ঞান বিকাশিনী সঙ্ঘের মাঠ, এমএস ক্লাবের মাঠ, ২ নম্বর রেলগেঠ এলাকায় দোলের মাঠে বিখ্যাত যাত্রা দলকে নিয়ে পালা হত। অতীতে পূর্বপাড়াতেও নিয়মিত যাত্রা চর্চা হত। ওই এলাকারই বাসিন্দা কানাই নাথ যাত্রা পালাকার হিসাবে গোটা রাজ্যে নাম করেছিলেন। সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন তিনি।

মোট ৭২টি যাত্রা পালা লিখেছিলেন কানাইবাবু। ‘আমি মা হতে চাই’ পালার জন্য রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও পেয়েছিলেন। চণ্ডীতলার মন্দির যাত্রার জন্য রাজ্যের শ্রেষ্ঠ পালাকারের সম্মান পেয়েছিলেন। এক সময়ে বহু উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসর বসত বনগাঁয়। বনগাঁয় আগে নিয়মিত বসত সাহিত্য পাঠের আসর। সাধুজন পাঠাগার ও দৈনন্দিন প্রেসে সাহিত্যের আড্ডায় ভিড় করতেন কত না মানুষ। সে সব আজ অতীত। বিশ্বনাথ মৈত্রর নাটক ‘শিবের দেহত্যাগ’ এক সময়ে গোটা রাজ্যে সাড়া ফেলেছিল।

দীপশিখা ঘোষ ভৌমিকের বাড়িতে এখনও অবশ্য সাহিত্যপাঠ বা কবিতা পাঠের আসর বসে। ‘আনকথা’ আয়োজন করে গল্পপাঠের আসরের। নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতি প্রতি বছর যাত্রা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে চলেছে। কবিতা আশ্রম পত্রিকা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিককে স্মরণ করতে অনুষ্ঠান করা হয়।এবং অন্যকথা পত্রিকা গোষ্ঠী বছরে একটি সাহিত্য সম্মান প্রদান অনুষ্ঠান করে। অতীতে শিস পত্রিকার উদ্যোগে বড় বড় সাহিত্যভিত্তিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত।

 বনগাঁ শহরের সাহিত্যিকদের মতে সৃষ্টি সংরক্ষণের জন্য সরকারি বা বেসরকারি কোনও তরফেই কোনও উদ্যোগ করা হয়নি। পুরসভা বা তথ্য সংস্কৃতি দফতরও সে বিষয়ে উদাসীন। অতীতে দেখেছি, বড়রা নিয়মিত কী লেখালেখি করছি, তার খোঁজ নিতেন। উত্‌সাহ দিতেন। এখন সে সব দেখা যায় না। অন্য কে কী লিখছে, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। নিজে কে কী করছে, সেটাই বড় বিষয়। 

বনগাঁ শহরে কোনো বড় বা বৃহৎ শিল্প গড়ে ওঠেনি। তবে, এখানে বহু ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বনগাঁ শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩৫টি চিরুনি কারখানা বিদ্যমান। এই শিল্পের সাথে কয়েকশো মানুষযুক্ত রয়েছেন।এই শহরের তৈরি চিরুনি দেশের বিভিন্ন রাজ্য রপ্তানি করা হয়।কৃষি নির্ভর কিছু শিল্প শহরে ও শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় দৃশ্যমান। শহরের নিকট কালপুর এলাকায় রাধাকৃষ্ণ রাইস মিল নামে পরিচিত একটি রাইচ মিল বা চাল মিল রয়েছে। 

   সীমানা নির্ধারণ কমিশনের সুপারিশ ক্রমে বিধানসভা কেন্দ্র গঠিত হয়েছে। গাঁরাপোতা, সুন্দরপুর এবং টেংরা, পশ্চিমবঙ্গের বাগদা বিধানসভা কেন্দ্র গঠিত । বনগাঁ পৌরসভা এবং বনগাঁ ব্লকের সাত গ্রাম পঞ্চায়েত আকাইপুর, ছয়ঘড়িয়া, ধরম পুকুরিয়া, গঙ্গাধরপুর, ঘাটবাওর, গোপালনগর-১ ও গোপালনগর -২, নিয়ে বনগাঁ উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র গঠিত।

বনগাঁ ব্লকের অধীনে ছয়টি গ্রাম পঞ্চায়েত বইরামপুর, চৌবেরিয়া-১, চৌবেরিয়া -২, দিঘারি, কুলুপুর এবং পাল্লা, গাইঘাটা ব্লকের অধীনে ছয়টি গ্রাম পঞ্চায়েত চাঁদপাড়া, ডুমা, ফুলসরা, জলেশ্বর -২, ঝাউডাঙ্গা এবং রামনগর, বনগাঁ দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র গঠিত। গাইঘাটা ব্লকের অন্যান্য সাতটি গ্রাম পঞ্চায়েত শুটিয়া, ধর্মপুর-১, ইচ্ছাপুর-১, ধর্মপুর -২, ইচ্ছাপুর -২, জলেশ্বর-১ ও শিমুলপুর, গাইঘাটক বিধানসভা কেন্দ্র গঠিত।এই চারটি সংসদীয় আসনে তফসিলি জাতি (এসসি) প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত । সমস্ত বনগাঁ (লোকসভা কেন্দ্রের), তফসিলি জাতি প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত । 

বাগদা ব্লক    বাগদা ব্লক গ্রামীণ এলাকা নয়টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত। অ আশারু, হেলেঞ্চা, মালিপোতা, বাগদা, কোনিয়ারা-১, রানাঘাট, বয়রা, কোনিয়ারা -২ ও সিন্ধানি। এই ব্লকে কোনো শহরাঞ্চল নেই। বাগদা থানায় ব্লকটি। ব্লকের সদর বাগদায় অবস্থিত ।

বনগাঁ ব্লক   বনগাঁ ব্লকের গ্রামীণ এলাকা ১৬ টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত। এগুলি হল আকাইপুর, ছয়ঘড়িয়া, গারাপোতা, কালুপুর, বইরামপুর, ধরম পুকুরিয়া, ঘাটবাওর, পাল্লা, চৌবেরিয়া-১, দিঘারি, গোপালনগর-১, সুন্দরপুর, চৌবেরিয়া-২, গঙ্গাধরপুর, গোপালনগর-২ ও টেংরা। এই ব্লকে এক মাত্র শহরাঞ্চল হল বনগাঁ। ব্লকটিতে মোট ৩ টি থানা রয়েছে। থানা ৩ টি হল বনগাঁ থানা,গোপালনগর থানা ও পেট্রাপোল থানা। ব্লকের সদর দপ্তর বনগাঁ শহরে অবস্থিত।

গাইঘাটা ব্লক     গাইঘাটা ব্লক গ্রামীণ এলাকা ১৩ টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত। চাঁদপাড়া বাজার এলাকা,চাঁদপাড়া বনগাঁ মহকুমার মধ্যে বনগাঁ শহরের পর বৃহত্তম শহর অঞ্চল গাইঘাটা ব্লক গ্রামীণ এলাকা ১৩ টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত। চাঁদপাড়া, ফুলসরা, জলেশ্বর -২, শুটিয়া, ধর্মপুর-১, ইচ্ছাপুর-১, ঝাউডাঙ্গা, ধর্মপুর -২, ইচ্ছাপুর-২, রামনগর, ডুমা, জলেশ্বর-ডুমা ও শিমুলপুর ।এই ব্লকের শহরাঞ্চল দুটি সেন্সাস টাউন নিয়ে গঠিত।যথা- চাঁদপাড়া, সোনারটিকারি এবং ঢাকুরিয়া। গাইঘাটাথানার অন্তর্গত এই ব্লকটি। ব্লকের সদর চাঁদপাড়া বাজারে অবস্থিত।