ফলহারিণী কালী পূজা

ফলহারিণী কালী পূজা

ফলহারিণী অর্থাৎ ফল হরণকারী, অশুভ ফল হরণকারী। সমস্ত দেব-দেবীর পূজা, আরাধনায় কিছু না কিছু শুভ ফল লাভ হয় এবং কিছু না কিছু অশুভত্ব নাশ হয়।বিশ্বাস, এই তিথিতে দেবীর পূজা-আরাধনায় অশুভ কর্মফল নাশ হয় এবং শুভ ফল প্রাপ্ত হয়।জ্যৈষ্ঠমাসের অমাবস্যা তিথিতে ফলহারিণী মাতারূপে দেবী কালী পূজিতা হন। মোক্ষফল প্রাপ্তির জন্য এই অমাবস্যার বিশেষ মাহাত্ম্য আছে ৷

 এইদিন মাকে বিভিন্ন মরশুমি ফল দিয়ে পুজো করা হয়। এই পুজোর দিনে শ্রীরামকৃষ্ণদেব স্ত্রী সারদা দেবীকে পুজো করেছিলেন জগৎ কল্যাণের জন্য। শ্রীমা সারদাকে ঠাকুর ষোড়শীরূপে পুজো করেছিলেন বলে আজও রামকৃষ্ণমঠ ও আশ্রমে এই পুজো ষোড়শী’ পুজা নামে পরিচিত।

কিন্তু এই অমাবস্যাকে কেন ফলহারিণী অমাবস্যা বলা হয় জানেন?   বলা হয়, এই অমাবস্যার তিথিতে মায়ের পুজো ভালো ভাবে সম্পন্ন করলে, মা সমস্ত অশুভ ফলের নাশ করে শুভ ফলের প্রাপ্তি ঘটান ৷ সমস্ত অশুভ কর্মফল হরণ করেন বলেই এই অমাবস্যার কালীপুজোরে ফলহারিণী কালীপুজো বলা হয়।

বলা হয়, এই দিন মায়ের বিশেষ পুজোয় সকলের বিদ্যা, কর্ম ও অর্থ ভাগ্যের উন্নতি ঘটে। সাংসারিক দাম্পত্য জীবন ও নানা ক্ষেত্রে মানুষ যে বাধার সম্মুখীন হন, সে বাধা কেটে যায় এবং মায়ের কৃপায় অভিষ্ঠ ফল লাভ হয়। সেই সঙ্গে মানসিক ও আধ্যাত্মিক দিকের জাগরণ ঘটে এই বিশেষ তিথিতে ৷  যিনি আমাদের কর্মফল হরণ করেন এবং মুক্তি প্রদান করেন তিনিই ফলহারিণী কালী।

আমাদের সমস্ত বিপদ, দৈন্য, ব্যাধি এবং সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাশ করে তিনি ঐশ্বর্য্য, আরোগ্য, বল, পুষ্টি, ও গৌরব প্রদান করেন। তবে জীবকে যা তিনি দেন তা তাদের কর্মফল অনুসারেই দেন। বিশ্বাস, ফলহারিণী কালীপুজো করলে পূজারীর ও ভক্তের কর্ম ও অর্থভাগ্যে উন্নতি ঘটে। সাংসারিক নানা বাধা দূর হয়। জীবনে সুখশান্তি লাভ হয়।

 সাধকেরা বলেন, কালী স্বয়ং ব্রহ্মশক্তি। মহাকাল শিব মায়ের পদতলে বিরাজ করেন। স্থিতি সৃষ্টি প্রলয়ের কর্ত্রী দেখতে গেলে কালীই। মহাকালী একধারে ভয়ংকরী, অন্য দিকে অপার করুণাময়ী। মায়ের নানা রূপ। কোথাও তিনি নিত্যকালী, কোথাও মহাকালী, কোথাও ভদ্রকালী, কোথাও শ্যামাকালী, কোথাও আবার রক্ষাকালী, সিদ্ধেশ্বরী কালী, শ্মশানকালী বা রটন্তীকালী। তিনিই আবার এই ফলহারিণী কালী। 

পৃথিবীর আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এ এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। জগতের ইতিহাসে শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনা যেমন তুলনাবিহীন তেমনি আপামর পৃথিবীবাসীর কাছে দাম্পত্যের এক যুগান্তকারী দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরলেন তিনি। গৃহে ও সমাজে রমণীদের স্থান কোথায় এবং তাদের প্রকৃত স্বরূপ কী- তা চেনালেন শ্রীরামকৃষ্ণ।

এত বড় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শন এবং সমাজব্যবস্থায় নারীর অবস্থানে গভীর রেখাপাত করে, তা ঘটেছিল নিভৃতে, অনাড়ম্বরভাবে। সেই পুজোয় পূজ্যা ও পূজক ছাড়া আর কারও প্রবেশের অনুমতি ছিল না। পরবর্তী কালে স্বামী সারদানন্দ রচিত ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ’ এবং ব্রহ্মচারী অক্ষয়চৈতন্য রচিত ‘শ্রীশ্রী সারদাদেবী’ গ্রন্থে ষোড়শী পুজোর বিবরণ পাওয়া যায়।

জগৎ যেন জানতে পারল, এক বিপ্লবের জন্মকথা। এযাবৎ অবতারপুরুষগণ – বুদ্ধ, চৈতন্য প্রমুখ স্ত্রীকে ত্যাগ করেই এগিয়েছিলেন সাধনপথে। রামকৃষ্ণ যেন আক্ষরিক অর্থে বোঝালেন সহধর্মিণী শব্দের অর্থ। সেই সামাজিক প্রেক্ষিতে নারীর যে অবস্থান ছিল, আর নারীর যে অবস্থান হওয়া উচিত – তা-ই যেন দেখিয়ে দিলেন ঠাকুর, যা উত্তরকালে নারীমুক্তির নান্দীমুখ হয়ে থাকবে।