শ্রীরামপুর এর দর্শনীয় স্থান

শ্রীরামপুর এর দর্শনীয় স্থান

শ্রীরামপুর Serampore ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলী নদীর তীরে অবস্থিত একটি নগর।এটি ১৭৫৫-১৮৪৫ পর্যন্ত ফ্রেডরিক্সনগর নামে ডেনিশদের অন্তর্গত ছিল। এই শহরে শ্রীরামপুর মহকুমা-র সদর দপ্তর অবস্থিত। এই অঞ্চলে ছোট, বড়, মাঝারি বিভিন্ন শিল্প গড়ে ওঠায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ও হুগলী জেলার সবচেয়ে উন্নত শহর।

বাংলা তথা ভারতের প্রথম ও দ্বিতীয় পাটকল (ওয়েলিংটন জুটমিল ও ইন্ডিয়া জুটমিল), এশিয়ার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় (শ্রীরামপুর বিশ্ববিদ্যালয়) এবং ভারতের দ্বিতীয় কলেজ (শ্রীরামপুর কলেজ), ভারতের প্রথম গ্রন্থাগার (উইলিয়াম কেরি লাইব্রেরি) এখানেই স্থাপিত হয়। এমনকি শ্রীরামপুর মিশনের প্রতিষ্ঠিত ভারতের প্রথম কাগজকলও এই শহরে প্রতিষ্ঠা হয়। শ্রীরামপুরের মাহেশের রথযাত্রা বাংলার প্রাচীনতম এবং (পুরীর পরেই) ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীন রথযাত্রা।

 মাহেশের রথযাত্রা ও জগন্নাথবাটী- মাহেশের রথযাত্রা ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম এবং বাংলার প্রাচীনতম রথযাত্রা উৎসব। এই উৎসব ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এটি পশ্চিমবঙ্গের এই শহরের মাহেশে অনুষ্ঠিত হয়। রথযাত্রার সময় মাহেশে একমাস ধরে মেলা চলে। মাহেশের জগন্নাথদেবের মূল মন্দির থেকে মাসিরবাড়ি মন্দির অবধি জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার রথটি টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। ৮ দিন পর উল্টোরথের দিন আবার রথটিকে জগন্নাথ মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়।

 রাধাবল্লভ মন্দির- মুর্শিদাবাদের নবাবের এক হিন্দু কর্মচারী আকনা ও মাহেশের মধ্যে থেকে কিয়দংশ ভূমি বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে রাধাবল্লভকে প্রদান করেন এবং ঠাকুরের নাম অনুসারে এই স্থানের নাম বল্লভপুর রাখেন। ঐ সময় ঐ স্থানের বার্ষিক রাজস্ব ১৮ ছিল। এর দেড়শ বছর পরে রাজা নবকৃষ্ণ গ্রামটিকে ভারজাই তালুক করে দেন। ১৫৯৯ সালে কলকাতার নয়নচাঁদ মল্লিক রাধাবল্লভের মন্দির নিৰ্ম্মাণ করে দেন।

 কাশীশ্বর পীঠ - শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু মাহেশের শ্রী শ্রী জগন্নাথদেব ও বল্লভপুরের শ্রী শ্রী রাধাবল্লভ জিউ এর পবিত্র মন্দির পরিদর্শন করতে শ্রীরামপুর-এ এসেছিলেন। বেশ কয়েকবার একবার তিনি নৌকায় করে চাতরার কাছে এসে নদী গঙ্গা এর গৌরাঙ্গ ঘাট এ সাথে চোখাচোখি হল। কোথায় ইতস্তত তিনি চাতরা কাশীশ্বর তরুমজ্জা বা দোলতলা মন্দির পরিদর্শন করেন এবং তিনি মাহেশের জগন্নাথ মন্দির যাওয়ার পথে এই স্থানে কাজকর্ম বন্ধ রাখলেন। কোথায় উপাসকমণ্ডলী ২০০ বছর আগে এই বর্তমান মন্দির তৈরি করেন।

  শ্রী রামপুর রাজবাড়ী- রামগোবিন্দ-এর ছেলে রাধাকান্ত, রঘুরাম গোস্বামী যাঁরা শ্রীরামপুরে বসতি স্থাপন করেন। গোস্বামীপাড়ায় তাঁর আদি সম্পত্তির পর্যন্ত অত্যধিক ফ্র্যাগমেন্টেশন ছিল, রঘুরাম নিজের ও তার সন্তানদের জন্য একটি বাড়ি তৈরী করেন এবং এই জমিদারবাড়ি আজ যেমন শ্রীরামপুর রাজবাড়ী নামে পরিচিত।

 সেন্ট ওলাভস চার্চ- ২৫০ বছর বয়সী সেন্ট ওলাভস চার্চ-এর শ্রীরামপুরে রেনেসাঁ। ১৮০০ সালে শ্রীরামপুরের গভর্নর ওলে'বি সেন্ট ওলাভস চার্চের ইমারত প্রবর্তিত করেন। ওলে'বি ডেনমার্ক ও ভারত উভয়ের ভবন কার্যকলাপের জন্য সংগৃহীত তহবিল এবং এবং গির্জা শ্রীরামপুরের নতুন ল্যান্ডমার্ক হতে অভিপ্রেত ছিলেন। কিন্তু তিনি এটি সমাপ্ত অবস্থায় দেখে যেতে পারেননি। ১৮০৫-এ তিনি যখন মারা যান তখন চার্চের টাওয়ার ও সামনের অংশ সম্পূর্ণ হয়। ওলে'বি -এর উত্তরসূরি ক্যাপ্টেন ক্রেফটিং। তারপর ভবনের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সাহায্য করার জন্য ইংরেজদের জন চেম্বারস এবং রবার্ট আর্মস্ট্রং ভাড়া করা হয়। ১৮০৬ সালে গির্জা সমাপ্ত হয়।

 জননগর চার্চ সম্পাদনা- জননগর চার্চ-টি ১৮২২ সালে জন ক্লার্ক মার্শম্যান-এর উদ্দ্যোগেই এই চার্চটি নির্মাণ করা হয়। তাঁর নাম অনুসারেই এই এলাকা ও চার্চের নাম হয়। চার্চটি এখনও সক্রিয়ভাবে সচল।

গভর্নমেন্ট হাউস - শ্রীরামপুরের গভর্নমেন্ট হাউসটি তৎকালীন ডেনিশ আমলে নির্মাণ হলেও পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শাসন এমনকি স্বাধীনতার পর ভারতের নিজস্ব শাসনকালেও এই গভর্নমেন্ট হাউসটি বেশ পরিচিত ছিল । তবে বর্তমানে এটি একটি কালচারাল অফিসে পরিণত হয়েছে। তৎকালীন ডেনিশ রাজত্বের সাক্ষীবহ এই অফিসে প্রায়ই শিল্পকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় ।

শ্রীরামপুর কলেজ - ১৮১৮ সালে উইলিয়াম ক্যারি, জাশুয়া মার্শম্যান এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড এই কলেজটি নির্মাণ করেন। এই কলেজটি এশিয়ার মহাদেশের দ্বিতীয় প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ভারতের প্রথম মিশনারি কলেজ হিসেবে পরিচিত। মূলত খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যেই এই কলেজ নির্মাণ করা হয়। একটি রিপোর্ট অনুযায়ী জানা যায়, এই কলেজে শিক্ষা প্রসারের জন্য ডেনিশ এবং ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আজও এই কলেজটি নিজের গৌরবকে রক্ষা করে চলেছে । বর্তমানে এই কলেজে খ্রীষ্টান ধর্মতত্ত্ব ছাড়াও বিজ্ঞান, বাণিজ্য এবং কলা বিভাগের পঠনপাঠন হয় । শ্রীরামপুর কলেজ দর্শনের পাশাপাশি এই কলেজের লাইব্রেরি, যা ক্যারি লাইব্রেরি নামে পরিচিত, রিসার্চ সেন্টার, এবং ক্যারি মিউজিয়াম পরিদর্শন করতে ভুলবেন না ।

 চাতরার দোল মন্দির -  এই মন্দিরটি ১৫২২ সালে কাশীশ্বর মিশ্র নির্মাণ করেন । এই কাশীশ্বর পন্ডিত শ্রী চৈতন্যদেবের অন্যতম শিষ্য ।ঐতিহ্যবাহী এই মন্দিরে আজও প্রতিদিন রাধা কৃষ্ণের পূজা করা হয় ।

উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য ও মন্দির

  • বল্লভপুর রাধাবল্লভ মন্দির 
  • মাহেশ জগন্নাথ মন্দির 
  • শ্রীপুরের রাম-সীতা মন্দির (শহরের নামকরণের উৎস)
  • চাতরা কাশীশ্বর পীঠ 
  • বল্লভপুর শ্মশানকালী মন্দির
  • হেনরী মার্টিন প্যাগোডা, জলকল মাঠ
  • বুড়োবিবি মাজার
  • শীতলা মাতা মন্দির ও মেলা (চাতরা শীতলাতলা)
  • নিস্তারিণী কালীমন্দির
  • মল্লিকপাড়া বড় মসজিদ
  • মানিকতলা মানিকপীর দরগা
  • সেন্ট ওলাভস চার্চ
  • শ্রীরামপুর জননগর ব্যাপটিস্ট চার্চ, (উইলিয়াম কেরীর গঙ্গাপাড়ে শ্রীরামপুরের প্রথম বাসভবন)
  • শ্রীরামপুর জননগর চার্চ, মাহেশ

কীভাবে যাবেন - ট্রেনে - হাওড়া থেকে মেইন লাইনের লোকাল ট্রেন চেপে মাত্র ৩০মিনিটের দূরত্ব অতিক্রম করে পৌঁছে যেতে পারেন গন্তব্যে। স্টেশন থেকে টোটো ভাড়া করে শ্রীরামপুরের দর্শনীয় স্থানগুলি পরিদর্শন করে নিতে পারেন । সড়কপথে - কলকাতা থেকে গাড়ি চেপে মাত্র ৩১কিমি দূরত্ব অতিক্রম করে পৌঁছে যেতে পারেন শ্রীরামপুর।