সব ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়

সব ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়

আজবাংলা    বীরভূমের মিরিটি গ্রামে সাধারণ পরিবারে ১৯৩৫-এর ১১ ডিসেম্বর জন্ম প্রণববাবুর। তাঁর বাবা কামদাকিঙ্কর ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গে দু'বার বিধান পরিষদে কংগ্রেস সদস্যও ছিলেন। গ্রামের স্কুলে লেখাপড়া শুরু প্রণবের। নিজেই বলেছেন, ভরা বর্ষায় পরনের কাপড় খুলে গামছা পরে মাথায় বই-খাতা নিয়ে জল পেরিয়ে স্কুলে যেতে হত।সিউড়ির কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে কলেজেও পড়িয়েছিলেন। প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যখন তাঁর পদার্পণ, তখন রাজ্যে অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বাংলা কংগ্রসের উত্থানপর্ব।

অল্প দিন ওই দলের সঙ্গে ছিলেন প্রণববাবু। ১৯৬৯-এ মেদিনীপুরে লোকসভার উপনির্বাচনে নির্দল প্রার্থী ভি কে কৃষ্ণ মেননের জন্যও কাজ করেছিলেন। তাতেই ইন্দিরা গাঁধীর নজরে পড়েন এবং ইন্দিরার হাত ধরে যোগ দেন কংগ্রেসে। প্রণবের রাজনৈতিক জয়যাত্রার সেই সূচনা। ইন্দিরা সর্ব অর্থেই ছিলেন প্রণবের উন্নতির কান্ডারি। তাঁর পথপ্রদর্শক।গত ৯ অগস্ট রাতে নিজের দিল্লির বাড়িতে শৌচাগারে পড়ে গিয়েছিলেন প্রণববাবু। পর দিন সকাল থেকে তাঁর স্নায়ুঘটিত কিছু সমস্যা দেখা দেয়।

বাঁ হাত নাড়াচাড়া করতে সমস্যা হচ্ছিল। চিকিৎসকদের পরামর্শে দ্রুত ভর্তি করা হয় হাসপাতালে।  এমআরআই স্ক্যানে দেখা যায়, তাঁর মাথার ভিতর রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর অবস্থার উন্নতি হয়নি। ১৩ অগস্ট থেকে তিনি গভীর কোমায় চলে যান।প্রণব মুখোপাধ্যায় দীর্ঘ দিন ধরে ডায়াবিটিসের রোগী। ১০ তারিখ হাসপাতালে ভর্তির পর ধরা পড়ে, তিনি কোভিড-১৯ আক্রান্তও হয়েছেন। সেই অবস্থাতেই ওই দিন রাতে দীর্ঘ অস্ত্রোপচার হয়।

তার পর থেকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল প্রণববাবুকে।  অস্ত্রোপচারের আগে, নিজের করোনা সংক্রমিত হওয়ার খবর টুইট করে জানিয়েছিলেন তিনিই। সেটাই ছিল প্রণব মুখোপাধ্যায়ের শেষ টুইট।বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। সোমবার সন্ধেবেলা দিল্লির সেনা হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর। ছেলে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় টুইট করে খবর দেওয়া মাত্রই শোকাহত গোটা দেশ। নিস্তব্ধ তাঁর গ্রাম বীরভূমের কীর্ণাহার।জাতীয় রাজনীতিতে ফের এক নক্ষত্রপতন। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সাংবিধানিক নানা দায়িত্ব পালন শেষে বিদায় নিয়েছিলেন সেসব পদ থেকে। তবু অভিভাবকের মতো আশ্রয় হয়ে ছিলেন দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের কাছে। কিন্তু এবার সব ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। 

সংসদীয় জীবনের সিংহভাগ প্রণববাবু কাটিয়েছিলেন রাজ্যসভায়। ফলে সরাসরি জনগণের ভোটে জিততে হয়নি তাঁকে। সেই অপূর্ণতা মেটে ২০০৪ সালে। মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর থেকে জিতে প্রথম লোকসভার সাংসদ হন তিনি। পরের বার ২০০৯-এর ভোটেও জয়ী হন সেখান থেকে।কিন্তু সেই মেয়াদ ফুরানোর আগেই ২০১২ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি। বঙ্গসন্তানের মাথায় দেশের সর্বোচ্চ পদাধিকারীর মুকুটও প্রথম। তার আগে জাতীয় রাজনীতিতে প্রায় পাঁচ দশকের অভিযাত্রায় প্রণববাবু এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হয়ে গিয়েছেন। অপরিহার্য হয়ে উঠেছে তাঁর ভূমিকা।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ইন্দিরার অবদান চির দিন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন প্রণববাবু। ১৯৭৩-এ প্রথম তাঁকে শিল্প মন্ত্রকের উপমন্ত্রী করেছিলেন ইন্দিরা। আনুগত্য, দক্ষতা, বিশ্বস্ততায় প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে নিজের আসন পাকা করে নিতে দেরি হয়নি প্রণবের। ইন্দিরা-অনুগত প্রণববাবুর বিরুদ্ধে জরুরি অবস্থার সময় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে শাহ কমিশনেও।ইন্দিরা দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় ফিরে ১৯৮২ সালে প্রণববাবুকে অর্থমন্ত্রী করেন। তাঁর গগনচুম্বী অগ্রগতির আর একটি পর্ব শুরু এখান থেকে।

প্রণববাবুর রাজনৈতিক জীবনে বড় ছন্দপতন ঘটেছিল ইন্দিরার আকস্মিক হত্যার পরে রাজীব গাঁধী ক্ষমতায় আসার পরে। প্রণববাবু তখন আর মন্ত্রী নন। দলেও কোণঠাসা। হতাশায় কংগ্রেস ছেড়ে রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস গড়েছিলেন। কিন্তু দিল্লিতে বসে উঁচুতলার রাজনীতি করলেও নিজে দল গড়ার সাংগঠনিক দক্ষতা তাঁর কোনও দিন ছিল না। ১৯৮৯-তে প্রত্যাবর্তন কংগ্রেসেই।১৯৯১। নির্বাচন পর্বের মধ্যে রাজীব হত্যা। প্রধানমন্ত্রী হন নরসিংহ রাও। ধীরে ধীরে প্রণববাবু ফের সক্রিয়। যোজনা কমিশনের চেয়ারম্যান থেকে এই পর্বের যাত্রা শুরু। পরে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন।

পদ ছাপিয়ে গুরুত্বের দিক থেকে তিনি হয়ে ওঠেন ইন্দিরা মন্ত্রিসভার কার্যত দু'নম্বর। কংগ্রেসেও তাই। তাঁর প্রতি ইন্দিরার নির্ভরতা এতটাই বেশি ছিল যে, প্রণববাবু কোনও সিদ্ধান্তের কথা জানালে তা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা বলেই গণ্য হত। প্রণবের ঘনিষ্ঠমহলে অনেকের অভিমত, খাতায়কলমে প্রধানমন্ত্রী না হয়েও প্রকৃতপক্ষে প্রায় প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বই প্রণব পেয়েছেন তখন। নিজে অবশ্য বলেছেন, কখনও তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চাননি। যদিও অনেকের ধারণা, ২০০৪ ও ২০০৯-এ পর পর দু'বার মনমোহন সিংহকে সনিয়া গাঁধী প্রধানমন্ত্রী পদে বেছে নেওয়ায় কিছু বেদনা হয়তো প্রণববাবুর মনকে পীড়িত করেছিল। তবে থাকলেও তা ছিল অব্যক্ত। মনমোহনের সঙ্গে সম্পর্কের রসায়নে তার ছাপ বোঝা যায়নি। সবাই ভেবেছিলেন যে বাংলার মানুষ প্রধানমন্ত্রী পাবেন এক বাঙালি। কিন্তু তাঁর জায়গায় করা হয় মনমোহন সিংকে। অনেকে অবাকই হয়েছিলেন এই সিদ্ধান্তে। মনে করা হয়, কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গান্ধী রাজীবের সময় থেকে কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের পরিবর্তে মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য বেছে নেন। যদিও রাষ্ট্রপতি পদে প্রণব মুখোপাধ্যায়কে চাপে পরে মনোনীত করেন সেই সোনিয়া গান্ধীই।