ডাকাতদের হাতে পূজিতা দেবী এখন মালদহের মানিকোড়া কালী

ডাকাতদের হাতে পূজিতা দেবী এখন মালদহের মানিকোড়া কালী

পুজোর সঙ্গে পুরাণ এবং ইতিহাস যেমন জড়িয়ে রয়েছে। তেমনই নানা লোককাহিনিও রয়েছে পরতে পরতে। মানিকোড়ার পুজোর কাহিনি অনেকটা তেমনই। ডাকাতদের হাতে একসময়ের পূজিতা দেবীকে নিয়ে রয়েছে নানা লোককাহিনি। যা এখনও শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। তবে কথাতেই আছে 'বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর'। তাই সে তর্কে না গিয়ে এই পুজোর ইতিহাস জেনে নেওয়া যেতে পারে।

একসময়ে ডাকাতদের পুজো আজ সর্বজনীন। ডাকাতদের হাতে পূজিতা দেবী এখন মানিকোড়া কালী নামে পরিচিত। এলাকার মানুষের মুখে মুখে এখনো শোনা যায় ডাকাতদের হাতে মায়ের পুজো দিতে আসার হাড়হিম করা বহু কাহিনি। লোকমুখে শোনা যায় প্রায় ৩০০ বছর আগে পুনর্ভবা নদী পেরিয়ে রাতের অন্ধকারে একদল ডাকাত জঙ্গলে ঘেরা মানিকোড়ায় এই জাগ্রত দেবীর পুজো দিতে আসত।

সূর্য ওঠার আগেই পুজো দিয়ে আবার নিজেদের ডেরায় ফিরে যেত ডাকাতরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুজো উদ্যোক্তাদের পরিবর্তন ঘটেছে। ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় এক জমিদার জঙ্গলে ঘেরা এই পরিতক্ত পুজোর বেদি খুঁজে পান। এরপর থেকে বংশপরম্পরায় জমিদারদের উদ্যোগে এই পুজো হত। জমিদারি প্রথা উঠে যাওয়ার পর গ্রামবাসীদের উদ্যোগে মালদার হবিবপুর থানা এলাকায় এই কালী পুজো হয়ে আসছে। ডাকাত দলের প্রথা মেনে এখনো মশাল জ্বালিয়ে পুজো হয়।  

কথিত আছে কোন এক সময় গ্রামে শাখা ফেরি করতে এসেছিলেন শাঁখারী। গ্রামের পথে এক মেয়ে তার কাছে শাখা পড়তে চায়। শাখারী তার হাতে শাখা পরিয়ে দেন। কিন্তু দাম চাইতেই মেয়েটি বলে ওঠেন তার কাছে পয়সা নেই। শাঁখার দাম তার বাবা দেবেন। মেয়েটি কালী মন্দিরের সেবায়েতকে তার বাবা বলে সম্বোধন করেন। শাখারী কালী মন্দিরে গিয়ে সেবায়েত এর কাছে শাঁখার দাম চাইতেই অবাক হয়ে যান ওই সেবায়েত।

তিনি বলেন, তার কোনও মেয়ে নেই! কে শাখা পড়েছে? হঠাৎই সেবায়েতের নজর যায় পাশের পুকুরের দিকে। দেখতে পান জলের ওপরে একটি মেয়ে দুই হাত উঁচু করে রয়েছে। দুটি হাতে রয়েছে একজোড়া নতুন শাখা। মুহূর্তে সেবায়েত বুঝে যান ওই মেয়ে আর কেউ নন স্বয়ং মা কালী। মুহুর্তের মধ্যেই শাখার দাম মিটিয়ে দেন তিনি। লোকমুখে শোনা যায়, পুজোর গভীর রাতে এই দেবীমূর্তি কেঁপে ওঠে।

পাঠা বলির সময় মায়ের মূর্তি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়তে চায়। যাতে মূর্তিটি না নড়ে যায়, সেই জন্য আগে দেবী মূর্তিটিকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার প্রচলন ছিল। এখন চক্ষুদান ও পাঠা বলির সময় দেবীর মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। গ্রামের যেকোনো শুভ অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে এখনো দেবীর পুজো দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার ছাড়াও আসার কার্তিক অগ্রহায়ণ মাসে মায়ের পুজো হয়। পুজো কমিটির সদস্য সজল রায় বলেন, এই পুজো নিয়ে অনেক গল্প কথা রয়েছে।

পুনর্ভবা নদীর ওপারে বর্তমান বাংলাদেশ থেকে রাতের অন্ধকারে ডাকাতদল এই দেবীর পুজো দিতে আসত। ডাকাত দলের আনাগোনা বন্ধ হলে জমিদার ভৈরবেন্দ্র নারায়ন রায় জঙ্গল আবৃত এই পুজোর স্থান খুঁজে পেয়ে মায়ের পুজো শুরু করেন। বর্তমানে গ্রামবাসীরা এই পুজোর উদ্যোগ নেয়। পুরনো প্রথা মেনে এখনও সাড়ে সাত হাতের মূর্তি তৈরি হয়। দেবীর মাহাত্ম্যর নানা কাহিনী এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এই দেবী ভীষণ জাগ্রত। ভক্তি আর বিশ্বাসই এই পুজোর শেষ কথা।