পূর্ব মেদিনীপুর : স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত পূর্ব মেদিনীপুর

পূর্ব মেদিনীপুর : স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত পূর্ব মেদিনীপুর

স্বাধীন ভারতে একাধিকবার সরকার মেদিনীপুর জেলাকে দ্বিখণ্ডিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।  ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ রাজত্বে প্রথম বার মেদিনীপুর জেলাকে দ্বিখণ্ডিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই সময় এই জেলা ছিল ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা ‘কালেকটর’ শাসিত জেলা। বিভাজনের উদ্দেশ্য ছিল এই বিরাট জেলার প্রশাসনকে সহজতর করা। বাংলা সরকার ১৯০৭ সালে জেলাভাগের একটি কথা তুলেছিল, কিন্তু সেই সময় বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করায় এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত করা হয়নি।

মেদিনীপুর সেই সময় ছিল বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র। তাই ব্রিটিশ সরকার মনে করেছিল, জেলাটিকে ভাগ করে দিলে এখানকার প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করে তোলা যাবে। এজন্য মেদিনীপুর ভেঙে নতুন ‘হিজলি জেলা’ গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়। ১৯১৫ সালের ২৬ জানুয়ারি জেলা বিভাজনের ঘোষণা করা হলে, স্থানীয় জমিদারেরা জেলাভাগের বিরোধিতা শুরু করেন। 

২০০২ সালের ১ জানুয়ারি উক্ত জেলাটিকে পূর্ব মেদিনীপুর ও পশ্চিম মেদিনীপুর নামে দু’টি জেলায় বিভক্ত করা হয়। বিভাজনের আগে অবিভক্ত জেলাটির লোকসংখ্যা ছিল ৯৭ লক্ষ। আয়তন বিচারে জেলাটি ছিল ভারতের বৃহত্তম জেলা। সুইডেন সহ একাধিক দেশের লোকসংখ্যা অবিভক্ত মেদিনীপুর অপেক্ষা কম ছিল। বিভাজনের পর অবিভক্ত জেলার মেদিনীপুর সদর, খড়গপুর, ঝাড়গ্রাম ও ঘাটাল মহকুমাগুলিকে নিয়ে গঠিত হয় ‘পশ্চিম মেদিনীপুর’ জেলা। অবিভক্ত মেদিনীপুরের সদর মেদিনীপুর এই জেলার সদরে পরিণত হয়।অন্যদিকে তমলুক, কাঁথি ও হলদিয়া মহকুমাগুলি নিয়ে গঠিত হয় ‘পূর্ব মেদিনীপুর’ জেলা। এই জেলার সদর শহরের মর্যাদা লাভ করে তমলুক।সেই সঙ্গে কাঁথি মহকুমাটিকে ভেঙে এগরা মহকুমা গঠন করা হয়। 

আমাদের পশ্চিমবঙ্গ মূলত ২৩টি জেলাতে বিভক্ত। বেশীরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ আমাদের বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল পূর্ব মেদিনীপুর (Purba Medinipur)। পশ্চিমবঙ্গের সর্বাধিক জনপ্রিয় সমুদ্র সৈকতগুলির প্রায় অধিকাংশই এই জেলার মধ্যে যেমন অবস্থিত তেমনি এই জেলা স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত তাম্রলিপ্ত (তমলুক) এবং ভারতবর্ষের পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর হলদিয়ার জন্য বিখ্যাত।

ভৌগলিক দিক থেকে দেখলে এই জেলার উত্তরে পশ্চিম মেদিনীপুর ও হাওড়া জেলা, পূর্বে হুগলি নদী ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে পশ্চিম মেদিনীপুর ও ওড়িশা রাজ্য অবস্থান করছে। এই জেলার অন্যতম নদীগুলি হল, হলদী, রূপনারায়ন, রসুলপুর, কেলেঘাই, প্রভৃতি। নদীগুলি উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে বহমান৷ ৪৭৩৬ বর্গকিমি বিস্তৃত পূর্ব মেদিনীপুর সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে আয়তনের দিক থেকে সপ্তম স্থান অধিকার করেছে৷ এই জেলার সদর দপ্তর তমলুকে অবস্থিত৷ ২০১১ সালের জনগননা অনুসারে প্রায় ৫০৯৪২৩৮ জন মানুষ এই জেলায় বসবাস করেন৷ জনসংখ্যার বিচারে পূর্ব মেদিনীপুর সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে সপ্তম স্থান অধিকার করেছে৷

মেদিনীপুর জেলার নামকরণ সম্পর্কে নানা মতান্তর রয়েছে৷ তার মধ্যে একটি মতানুযায়ী সামন্তরাজা প্রাণকরের পুত্র মেদিনীকর এই শহর প্রতিষ্ঠা করেন৷ তাঁরই নাম অনুসারে এই জেলার নাম মেদিনীপুর। মেদিনীপুর নামকরণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন এখানে । এই জেলায় মূলত বাংলা ভাষাভাষী মানুষেরই বসবাস৷ পূর্ব মেদিনীপুর জেলা কৃষি ও শিল্প দুই ক্ষেত্রেই যথেষ্ট অগ্রসর। এই জেলায় অবস্থিত হলদিয়া বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হিসেবে প্রসিদ্ধ৷ এছাড়া ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন-এর অধীনে প্রায় ৪৫৬ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা হলদিয়ার খনিজ তৈলশোধনাগার এই জেলার উল্লেখযোগ্য শিল্পকেন্দ্র।

এছাড়া আমদানিকৃত ফসফেট ও হলদিয়া তেলশোধনাগার থেকে প্রাপ্ত ন্যাপথার ওপর নির্ভর করে হলদিয়া শিল্পাঞ্চলে রাষ্ট্রায়ত্ত হিন্দুস্তান ফার্টিলাইজার কর্পোরেশন-এর অধীনে একটি রাসায়নিক সার উৎপাদন কারখানা গড়ে উঠেছে। এছাড়া কীটনাশক ওষুধ শিল্প, সাবান শিল্প, ফসফেট শিল্প, কার্বন-ব্ল্যাক শিল্প সহ বিভিন্ন শিল্পকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এই জেলায় অবস্থিত দীঘা, মন্দারমনি, তাজপুর, উদয়পুর, চাঁদপুর, হরিপুর, জুনপুট, বাঁকিপুট, তালসারি, শংকরপুর, বগুরান জলপাই – প্রভৃতি সমুদ্রসৈকতগুলি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।

৫১ সতীপীঠের অন্যতম পাঁচ শতাধিক প্রাচীন দেবী বর্গভীমা মন্দির, তমলুকের প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর, মহিষাদলের মহিষাদল রাজবাড়ি এই জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে পড়ে৷ এই জেলার উল্লেখযোগ্য উৎসবের মধ্যে পৌষ সংক্রান্তির দিন বারুণী স্নানের মেলা, শূলনী গ্রামের সাপের মেলা, মহিষাদলের রথযাত্রা, পঁচেটগড়ের রাসের মেলা বিখ্যাত। এখানকার বিখ্যাত খাবারের মধ্যে তমলুকের মণ্ডা সন্দেশ ও পান, তমলুকের গয়না বড়ি, হাউরের মুগের জিলিপি, পাঁশকুড়ার চপ উল্লেখযোগ্য।এই জেলার উল্লেখযোগ্য হস্তশিল্পের মধ্যে কাপুড়িয়াদের মোড়া, বৈষ্ণবচকের মোষের শিংয়ের চিরুনি, ভগবানপুরের পদ্মতামলি গ্রামের দস্তানা পুতুল, এগরার পাঁচরোল গ্রামের জউ পুতুল ও শঙ্খ শিল্প, নন্দীগ্রামের কুমীরমারি গ্রামের টেপা পুতুল, পটাশপুরের সোলা শিল্প। 

পূর্ব মেদিনীপুর

প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ২০০২ সালে। জেলা সদর – তমলুক। মহকুমা – ★তমলুক, ★হলদিয়া, ★এগরা, ★কাঁথি। আয়তন – ৪,৭৮৫ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা – ৫,০৯৮,২৩৮। 

পূর্ব মেদিনীপুর লোকসভা 

কাঁথি (কোন্টাই), তমলুক, ঘাটাল, মেদিনীপুর

 পূর্ব মেদিনীপুর বিধানসভা

তমলুক, পাঁশকুড়া পূর্ব, পাঁশকুড়া পশ্চিম, ময়না, নন্দকুমার, মহিষাদল, হলদিয়া, নন্দীগ্রাম, চাঁদিপুর, পটাশপুর, কাঁথি উত্তর, ভগবানপুর, খেজুরি, কাঁথি দক্ষিণ, রামনগর, এগরা 

 পূর্ব মেদিনীপুর ব্লক

ভগবানপুর-৷, ভগবানপুর-৷৷, চাঁদিপুর, কাঁথি-৷, কাঁথি-III, দেশোপ্রান, এগরা-৷, এগরা-II, হলদিয়া, খেজুরি-৷, খেজুরি-II, কোলাঘাট, মহিষাদল, ময়না, নন্দ কুমার, নন্দীগ্রাম-৷, নন্দীগ্রাম-II, পাঁশকুড়া, পটাশপুর-৷, পটাশপুর-II, রামনগর-৷, রামনগর-II, শহীদ মাতঙ্গিনী, সুতাহাটা, তমলুক