রাধা কৃষ্ণের আসল কাহিনী

রাধা কৃষ্ণের আসল কাহিনী

হিন্দুধর্মে সম্মিলিতভাবে ঈশ্বরের পুরুষ সত্ত্বা ও প্রকৃতি সত্ত্বার যুগলরূপ। এছাড়াও রাধা বলতে কোন নাম বা চরিত্র মহাভারত বা ভাগবত পুরাণের কোথাও উল্লেখ নেই। রাধা নামের "রা" শব্দটা রমন শব্দ থেকে এসেছে রমন শব্দের অর্থ হচ্ছে আনন্দ বর্ধনকারী। "ধা" শব্দটা ধারন থেকে এসেছে যার অর্থ ধারন করা। যিনি আনন্দকে ধারন করে থাকেন তিনিই রাধা, এবং আনন্দ হল শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম সচ্চিদানন্দ (সৎ, চিৎ, আনন্দ)। আনন্দ স্বরূপ কৃষ্ণকে যিনি মনের মধ্যে ধারন করে আছেন তিনিই রাধা।

নিম্বার্ক ও গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মশাস্ত্রে, কৃষ্ণকে প্রায়শই স্বয়ং ভগবান রূপে উল্লেখ করা হয়, এবং রাধা একজন যুবতী নারী (কৃষ্ণের আনন্দ অংশের হ্লাদিনী শক্তি), একজন গোপিনী যিনি পরম সত্ত্বা কৃষ্ণের (পরমাত্মার প্রতীক) সর্বোত্তম প্রেয়সী। রাধা হল কৃষ্ণের সর্বপ্রিয় আরাধিকা। কৃষ্ণের সঙ্গে, রাধাকে সর্বোচ্চ দেবী হিসাবে স্বীকার করা হয়; কেননা তিনি নিজের প্রেমের মাধ্যমে কৃষ্ণকে নিয়ন্ত্রণ করেন।  বিশ্বাস যে, কৃষ্ণ জগৎসংসারকে মোহিত করেন, কিন্তু রাধিকা তাকেও মোহিত করেন।

এজন্য তিনি সকলের সর্বোচ্চ দেবী।  যদিও ভগবানের এই রূপের আরাধনার অনেক প্রাচীন উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু দ্বাদশ শতাব্দীতে যখন জয়দেব গোস্বামী সুবিখ্যাত কাব্য গীতগোবিন্দ রচনা করলেন, তখন থেকেই দিব্য কৃষ্ণ ও তার ভক্ত রাধার মধ্যেকার আধ্যাত্মিক প্রেমের সম্বন্ধিত বিষয়টি সমগ্র ভারতবর্ষে উদযাপিত হতে শুরু করল। বলা হয় যে, কৃষ্ণ রাধিকার অন্বেষণে রাসনৃত্যের চক্র ছেড়ে দিয়েছিলেন। চৈতন্য সম্প্রদায়ের ভাষ্যমতে, রাধারাণীর নাম ও পরিচয়টি ভাগবত পুরাণে এই ঘটনা বর্ণনাকারী ছন্দোবন্ধে গোপনও রাখা হয়েছে এবং উজাগরও করা হয়েছে।  রাধারাণী রাসনৃত্যের অংশীভূত হওয়া সমস্ত গোপিনী তথা দিব্য ব্যক্তিত্বদের মূলসত্ত্বা। 

Radha and Krishna's Relationship :কৃষ্ণ বলতে সবাই পাগল। সবাই জানতে চান কৃষ্ণের আসল কাহিনি। তবে যেই টিভিতে কৃষ্ণকে দেখানো হয়, তাঁকে ফরসা দেখানো হয়। অদ্ভুত ভাবে সেখানে কিন্তু কেউ আপত্তি তোলে না। আহা, কৃষ্ণ শব্দের অর্থ যে কালো! তাঁকে তো ঘনশ্যাম-ও বলা হয়, অর্থাৎ, যে মেঘের মতো কালো। টিভিতে গায়ের রং আলাদা দেখানোয় অবশ্য, কারও কিছু এসে যায় না, কোনও এফআইআর হয় না! আবার ধরা যাক, যদি কেউ বলেন কৃষ্ণভক্তির আধার তান্ত্রিক পরম্পরায়, তখনই মানুষ রে রে করে তেড়ে আসে! ফলে দাঁড়ালো কী, না, কৃষ্ণ নিয়ে উৎসাহ একশো শতাংশ রয়েছে, অথচ সত্যি কথা শুনতে বা জানতে বড় অনীহা।

Krishna Janmashtami in Mathura Vrindavan ভারতে যদি তন্ত্রসাধনার কথা তুলি, তবে দেখব, তা ৭০০ সিই থেকে ১২০০ সিই-তে চরম পর্যায়ে ছিল। হর্ষবর্ধনের শাসনকাল ও ভারতে ইসলামের আগমনের মধ্য ভাগের যে সময়, তাতে এমন বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছিল, যেখানে যৌনগন্ধী শব্দাবলী ব্যবহৃত করে মূলত দর্শনশান্ত্রের কথা বয়ান করা হয়েছিল। এই সব শব্দের মধ্যে দিয়েই জীবনসংক্রান্ত বহু কথা আলোচিত হয়েছিল। রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমগাথাও কিন্তু আমরা এই কালেই পাই। কৃষ্ণকে যেমন আমরা মহাভারতে পাই, যা আজ থেকে প্রায় ২০০০ বছর আগে লেখ্য রূপে সম্মুখে আসে। রাধার কথা আমরা পাই ১০০০ সালেরও কিছু কম বছর আগে প্রাকৃত সাহিত্যে। জয়দেবের গীতগোবিন্দ-তেও তাঁকে পাই আমরা।

  কৃষ্ণ ও রাধার প্রেমপর্বকে আধুনিক এ কালে এমন রূপে দেখানো হয়, যেন তাঁরা স্কুলে পড়া দুই সহপাঠী ও তাঁদের মধ্যে এক মিষ্টি প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। জয়দেবের গীতগোবিন্দ দেখুন, আদপেই তাঁদের এই রূপ প্রেমের বর্ণনা করেননি তিনি। আরও বলি, বিদ্যাপতি বা চণ্ডীদাস-ও অন্যথা ভাবেননি। তাঁরাও জয়দেবের মতোই এই প্রেম কল্পনা করেছিলেন। প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মধ্যে কিন্তু এক বড় ফারাক রয়েছে। সংস্কৃতি মানব-নির্মিত। বিবাহের ধারণাও মানুষের সৃষ্টি। আবার দেখুন, তন্ত্র কিন্তু সামাজিক নিয়মের ঘেরের বাইরের কথা নিয়ে ভাবিত। অতএব, তা প্রকৃতির ভাবনা নিয়ে অধিক মত্ত। এখানেই ভাবনা জাগে, বিবাহের ক্ষেত্র ও সমাজের রীতিনীতির বন্ধনের বাইরে যে প্রেম, যে আকণ্ঠ আকর্ষণ, একে অপরের প্রতি, তাকে আপনি কী রূপে ব্যক্ত করবেন‌? প্রশ্ন সেটাই।

Janmashtami Recipes in North India কৃষ্ণ ও রাধার প্রেমের বিষয় যখন কথা ওঠে, তখন প্রথমেই এ হেন ভাবনার উত্তর বের করতেই হবে। নয়তো, কৃষ্ণ ও রাধার অমোঘ, অমর এ প্রেমকে আমরা কখনওই ধরাছোঁয়ার মধ্যে আনতে পারব না। মনে রাখতে হবে, সে কারও ভালো লাগুক আর না লাগুক, কৃষ্ণের প্রেম কিন্তু এই সমাজের তৈরি নিয়মের ধার ধারে না। তা এমন নির্মিত নিয়মকে অনায়াসেই লঙ্ঘন করে ও অন্য এক প্রেম, যা ভীষণ ভাবেই সত্যি, তার কথা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়।

শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীমতি রাধারাণী সম্পর্কে কিছু না জানলেও তাদের মধ্যে যে এক গভীর প্রেমপূর্ণ সম্পর্ক ছিল তা জানে না, এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মনবীয় প্রেমের দৃষ্টান্তস্বরূপ যে কয়েকটি চরিত্র উঠে আসে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম রাধাকৃষ্ণের  প্রেমে। এই প্রেম নিয়ে যুগে যুগে বহু সাহিত্যক সাহিত্য রচনা করেছেন। বিশেষত বাংলা, সংস্কৃত ও ব্রজবুলি ভাষায় রাধাকৃষ্ণের প্রেম বেশি প্রচারিত হয়েছে। তবে, যে মনোভাব নিয়ে বৈষ্ণব কবিগণ রাধাকৃষ্ণের প্রেমের মতো পরম পবিত্র বিষয় নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছিলেন, অধুনা সাহিত্যকগণ তাদের রাচনায় তার বিকৃত প্রতিফলন করেছেন।

তারা রাধাকৃষ্ণের প্রেমকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা মানবীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সমালোচনায় পর্যবসিত হয়।  আসলে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীমতি রাধারাণী সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই কেউ কেউ তাদের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়ে প্রশ্ন তোলে। অনেকেই বৃন্দাবন লীলায় রাধারাণী ও শ্রীকৃষ্ণের মধ্যকার সম্পর্ককে সামাজিকভাবে অগ্রাহ্য বলে মনে করে। প্রকৃতপক্ষে শ্রীমতি রাধারাণী ও শ্রীকৃষ্ণের মধ্যকার সম্পর্কটা কেমন? তাঁদের সম্পর্ক কি আমাদের মতো প্রাকৃত, নাকি এই লীলার অন্তরালে রয়েছে অপ্রাকৃত দিব্য প্রেমের গভীর আস্বাদন, যা আমাদের জড় ইন্দ্রিয়জাত উপলদ্ধির অতীত?

শ্রীমতি রাধারাণীর সঙ্গে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সম্পর্ক পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং পরমব্রহ্ম। তাঁর থেকেই জগতে সমস্ত কিছু প্রকাশিত হয়েছে-অহং সর্বস্য প্রভবঃ মত্তঃ সর্বং পবর্ততে। (ভ.গী. 10.8)। ব্রহ্মসংহিতায় শ্রীকৃষ্ণকে অনাদির আদি বলে সম্বোধন করা হয়েছে। তিনি সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশ সমস্ত কিছুর মূল কারণ-জন্মাদ্যস্যযতঃ (ভা.১.১.১)। তাঁর শক্তিতেই বিষ্ণু পালন করেন, ব্রহ্মা সৃজন করেন ও শিব সংহার করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনন্ত শক্তির আধার। তবুও তাঁর শক্তিকে প্রধানত তিন ভাবে ভাগ করা হয়েছে- অন্তরঙ্গা শক্তি, বহিরঙ্গা শক্তি তটস্থা শক্তি। তটস্থা শক্তি হচ্ছে জীবশক্তি।

 মনুষ্যাদি সকল জীব এই শক্তির অন্তর্গত। বহিরঙ্গা শক্তি হচ্ছে ভগবানের মায়া শক্তি, যাঁর মাধ্যমে এই জড়জগৎ পরিচালিত হচ্ছে। আর অন্তরঙ্গা শক্তিকে আবার সন্ধিনী, সম্বিৎ ও হ্লাদিনী-এই তিন ভাগে ভাগ করা যায়। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সচ্ছিদানন্দময়। সৎ চিৎ ও আনন্দ এই তিনটির মধ্যে সন্ধিনী হচ্ছে ভগবানের সৎ বিভব, যাঁর দ্বারা তিনি তাঁর নিত্য স্বরূপ ধারণ করে আছেন। শ্রীকৃষ্ণের ধাম, শয্যা, আসন ইত্যাদি সন্ধিনী শক্তির অন্তর্গত। সম্বিৎ শক্তি হচ্ছে চিৎ শক্তি বা জ্ঞান শক্তি।

চিৎ শক্তির দ্বারা ভগবান নিজেকে জানেন ও অপরকে তাঁর সম্বন্ধে জানান। হ্লাদিনী শক্তি হচ্ছে ভগবানের আনন্দদায়িনী শক্তি। শ্রীমতি রাধারাণী হচ্ছেন এই হ্লাদিনী শক্তির মূর্ত প্রকাশ। শ্রীকৃষ্ণের লীলার পুষ্টিবিধানের নিমিত্ত রাধারাণী থেকেই বৃন্দাবনের গোপীগণ, দ্বারকার মহিষীগণ এবং বৈকুণ্ঠের লক্ষীগণ প্রকাশিত হয়েছেন। পদ্মপুরাণ, পাতালখন্ড অনুসারে, শ্রীশিব নারদকে বলছেন- দেবী কৃষ্ণময়ী প্রোজ্বা রাধিকা পরদেবতা। সর্বলক্ষ্মীস্বরূপা সা কৃষ্ণাহ্লাদস্বরূপিণী।। ততঃ সা প্রোচ্যতে বিপ্র হ্লাদিনীতি মনীষিভিঃ। তৎকলাকোটিকোট্যংশা দুর্গাদ্যাস্ত্রিগুণাত্মিকাঃ।। সা তু সাক্ষান্মহালক্ষীঃ কৃষ্ণো নারায়ণো প্রভুঃ। নৈতয়োর্বিদ্যতে ভেদঃ স্বল্পোহপি মুনসত্তম।। (৫০/৫৩/৫৫)

 দেবী রাধিকা, কৃষ্ণময়ী,পরদেবতা, সর্বলক্ষ্মীস্বরূপা; তিনি কৃষ্ণাহ্লাদস্বরূপিণী, এজন্য মনীষীগণ তাঁকে হ্লাদিনী বা আনন্দদায়িনী বলেন। ত্রিগুণময়ী দুর্গা প্রভৃতি শক্তিগণ তাঁরই কলার কোটি কোটি অংশের একাংশ। শ্রীরাধাই মহালক্ষ্মী, আর শ্রীকৃষ্ণই সাক্ষাৎ প্রভু নারায়ণ। হে মনিসত্তম, এঁদের মধ্যে কোনো ভেদ নেই। অর্থাৎ, শ্রীমতি রাধারাণী যে শ্রীকৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য হ্লাদিনী শক্তি এ ব্যাপারে কোনো সংশয় নেই। তাঁরা পরস্পর নিত্যসঙ্গী। গোলোক বৃন্দাবন ধামে তাঁরা নিত্য লীলা বিলাস করছেন।

আরো পড়ুন      জীবনী  মন্দির দর্শন  ইতিহাস  ধর্ম  জেলা শহর   শেয়ার বাজার  কালীপূজা  যোগ ব্যায়াম  আজকের রাশিফল  পুজা পাঠ  দুর্গাপুজো ব্রত কথা   মিউচুয়াল ফান্ড  বিনিয়োগ  জ্যোতিষশাস্ত্র  টোটকা  লক্ষ্মী পূজা  ভ্রমণ  বার্ষিক রাশিফল  মাসিক রাশিফল  সাপ্তাহিক রাশিফল  আজ বিশেষ  রান্নাঘর  প্রাপ্তবয়স্ক  বাংলা পঞ্জিকা