রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

গ্রীষ্মের এক বিকেলে কলকাতার নারকেলডাঙা মাঠে আট হাজার মানুষের এক বিশাল জমায়েত। সবার মুখে চাপা উত্তেজনার ছাপ। আর দৃষ্টি মাঠের মাঝখানে রাখা এক বিশাল ফানুসের ওপর! গ্যাস ভরা হচ্ছে ফানুসে। ফানুসের নিচের দিকে একটি ইস্পাতের আংটা। সেই আংটা থেকে ১২ ফুট নিচে ঝুলছে প্রকাণ্ড এক ঝুড়ি। এই ঝুড়িতে চেপেই নাকি এক বাঙালি উড়বে আকাশে! উত্তর কলকাতার Kolkata শিমুলিয়া অঞ্চলের কাঁসারিপাড়ার বাসিন্দা এই সাহসী বাঙ্গালী পুরুষ রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়  Ramchandra Chattopaddhay। 

একজন ভারতীয় বাঙালি জিমন্যাস্ট, ট্র্যাপিজ খেলোয়াড় যিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন প্রথম ভারতীয় হিসেবে বেলুনের মাধ্যমে শূন্যে ভ্রমণ ও প্যারাশুটে অবতরণের জন্য। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি বেলুনে চেপে ভ্রমণকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। সেই সময়ের নিরিখে এধরনের দুঃসাহসিক কাজের জন্য তিনি প্রায় জাতীয় বীরের মর্যাদা পেতেন ভারতে। যে সব বাঙ্গালী যুবার হাত ধরে নিজের শক্তিকে চিনে নিতে শুরু করেছিল শহরবাসী, কবি, নাট্যকার, নবগোপাল মিত্র ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

১৮৬৭ সালে হিন্দুমেলা প্রবর্তন করার পর, একের পর এক ন্যাশনাল পেপার, ন্যাশনাল জিমন্যাশিয়াম, ন্যাশনাল স্কুল, ন্যাশনাল থিয়েটার তৈরি করে প্রায় কপর্দকশূন্য হয়ে, অবশেষে নিজের বসতবাড়ি বন্ধক রেখে সেই অর্থ দিয়েই ১৮৮১ সালে শুরু করেন ন্যাশনাল সার্কাস।  রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জিমন্যাস্ট ও ট্রাপিজ আর্টিস্ট হিসেবে এই ন্যাশনাল সার্কাসের সাথে যুক্ত হন।

এর প্রায় ১০০ বছর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে গেছে এক বিপ্লব। এরোপ্লেন নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা সফল হওয়ার আগেই মনটগলফিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের হাত ধরে হট এয়ার বেলুনের সাথে পরিচিত হয়েছে মানুষ। পাখির মতো আকাশে ওড়ার বহুদিনের স্বপ্ন সফল হয়েছে। তারপর দীর্ঘ কাল, মাস, বছর অতিক্রম করলেও এই বেলুনে ওড়ার কৌশল শুধুমাত্র সীমিত থেকে যাচ্ছিল কিছু ফরাসী ও ইংরেজ অ্যাক্রোব্যাট ও ট্রাপিজ আর্টিস্টদের নিজেদের সাহস ও ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবেই।

বহু বছর ধরে এইসব পেশাদার অ্যাক্রোব্যাটরা তাঁদের বেলুন নিয়ে দেশে বিদেশে প্রদর্শনী করে বেরিয়েছেন। এরকমই একটি বেলুন নিয়ে প্রদর্শনী করতে ১৮৮৬ সালে ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় হাজির হন ডি রবার্টসন নামের এক ইংরেজ। ১৮৮৬ সালের ১৬ই মার্চ প্রথম ভারতবর্ষের আকাশে ওড়ে হট এয়ার বেলুন। কলকাতার উপকণ্ঠে মুচিখোলা থেকে ওড়া সেই বেলুনের উড়ান দেখতে কাশিপুর থেকে গার্ডেনরীচ অবধি মানুষের ঢল নামে। পি মেইগ্রেট বা ফিটজারবারটের মতো আরও কিছু বেলুনবিদের দৌলতে এরপর মাঝেমধ্যেই কলকাতার আকাশে উড়তে দেখা যেত হাইড্রোজেন গ্যাস ভরা হট এয়ার বেলুন।

১৮৮০র দশকের শেষ দিকে প্রখ্যাত বেলুনবিদ পারসিভাল স্পেন্সার গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে তাঁর ‘দ্য ভাইসরয়’ বেলুন নিয়ে উড়ানের প্রদর্শনী করতে শুরু করেন। দ্য ভাইসরয়ের উড়ান প্রথম কলকাতাবাসীর চোখে পড়ে ১৮৮৯ সালের ১৯শে মার্চ কলকাতা রেস কোর্স সংলগ্ন ময়দানে। পারসিভাল স্পেন্সারের এই প্রদর্শনীকে নিয়ে সাড়া পড়ে যায় গোটা শহর জুড়ে। বিখ্যাত জিমন্যাসট অবতার চন্দ্র লাহা স্বয়ং পারসিভাল স্পেন্সারকে গিয়ে অনুরোধ করেন তাঁকে তাঁর সঙ্গী হিসেবে নিতে। তাঁর সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন পারসিভাল স্পেন্সার।

বাঙ্গালীর জীবনে এই বেলুন অভিযানের মাহাত্ম্যের আভাস পাওয়া যায় যখন তৎকালীন এক বহুল প্রচলিত দৈনিক সংবাদপত্রে পারসিভাল স্পেন্সারের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি লেখেন অনিলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নামের এক বাঙ্গালী যুবা। সেই চিঠিতে তিনি পারসিভাল সাহেবকে জানান, কীভাবে তাঁর সঙ্গী হতে পারলে বাঙ্গালী যুবসমাজে তিনি এক মহান কীর্তি স্থাপন করতে পারবেন। দুর্ভাগ্যবশত তাঁর এই চিঠিও পারসিভাল স্পেন্সারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। অবতারচন্দ্র লাহার পৃষ্ঠপোষকেরাও, এই ঝুঁকিপূর্ণ খেলা বাঙ্গালীর উপযুক্ত নয় বলে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসেন।

এই সময় অবতারচন্দ্র লাহার হাত ধরেই পারসিভাল স্পেন্সারের সাথে দেখা করতে যান রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যিনি তখন সুদক্ষ ট্রাপিজ শিল্পী হিসেবে যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেছেন। অবতারচন্দ্রই তাঁকে বোঝান কীভাবে এই বেলুনের উড়ান তাঁকে ট্রাপিজের থেকে অনেক বেশী খ্যাতি এনে দিতে পারে। পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রামচন্দ্র পাশে পেয়ে যান পাথুরিয়াঘাটার জমিদার গোপাল চন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে। নগদ ৫০০ টাকার বিনিময়ে পারসিভাল স্পেন্সার রাজি হন পরবর্তী উড়ানে রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে দ্য ভাইসরয় বেলুনে তাঁর সহযাত্রী হিসেবে নিতে।

 ১৮৮৯ সালের ১০ই এপ্রিল বিকেল ৩টে ৩০ মিনিটে নারকেলডাঙার দ্য ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানির লাগোয়া মাঠ থেকে পারসিভাল স্পেন্সারের সাথে দ্য ভাইসরয় বেলুনে প্রথম ভারতীয় এরোনট হিসেবে উড়ান শুরু করেন রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এক ঘণ্টা পরে তাঁদের বেলুন গিয়ে নামে বারাসাতের কাছে পালপাকিরা-কাজিপারা গ্রামে। তাঁর এই অসাধারণ কীর্তির কথা, তাঁর সাহস ও স্থৈর্যের কথা দ্য ইভিনিং মেল ও হিন্দু প্যাট্রিয়টের পরবর্তী সংস্করণে ফলাও করে বের হয়। তাঁর বেলুনযাত্রার পরবর্তী অধ্যায় হিসেবে মাস দুয়েক পরেই ১৮৮৯ সালের ৪ঠা মে, প্রথমবার একক বেলুন যাত্রার দিন ঠিক করেন রামচন্দ্র।

ততদিনে পারসিভাল স্পেন্সারের থেকে তিনি কিনে নিয়েছেন দ্য ভাইসরয় বেলুনটি এবং তাঁর নাম রেখেছেন সিটি অফ ক্যালকাটা। বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানির লাগোয়া মাঠ থেকে কলকাতার পুলিশ কমিশনার সহ প্রায় ৮০০০ দর্শকের চোখের সামনে প্রথম একক উড়ান শুরু করেন রামচন্দ্র এবং চল্লিশ মিনিট উড়ানের পর সোদপুরের কাছে অবতরণ করে তাঁর বেলুন। তাঁকে সম্বর্ধিত করার সময় নেবুতলা ইয়ংম্যান্স ক্লাব কর্তৃপক্ষ বলেন, কোনও ইউরোপীয়ানের থেকেও কোনও অংশে কম নয় তাঁর এই কৃতিত্ব।

তাঁর এই কীর্তির খবর বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয় তৎকালীন সবকটি দৈনিক সংবাদপত্রে। দ্য বেঙ্গলি টাইমস তাঁদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, রামচন্দ্র তাঁর এই ঐতিহাসিক কীর্তির মধ্যে দিয়ে বাঙ্গালী জাতির সম্বন্ধে ইউরোপীয়দের ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে সাহায্য করবেন। এই সাফল্যের পরেই রামচন্দ্র তৈরি করেন তাঁর সংস্থা ক্যালকাটা বেলুনিস্টস কোম্পানি, যার ছত্রচ্ছায়ায় তিনি ভারতের উত্তরাঞ্চলের এলাহাবাদ, লাহোর, জয়পুর, লখনউ সহ বিভিন্ন শহরে এই প্রদর্শনী করার পরিকল্পনা করেন।

১৮৮৯ সালের ২৭শে জুন এলাহাবাদের খুসরো বাগে ১০০০০ দর্শকের সামনে সিটি অফ ক্যালকাটার উড়ানের সময় দেখা যায় ওড়ার মতো পর্যাপ্ত গ্যাস বেলুনের মধ্যে নেই। বেলুনের সাথে লাগানো যন্ত্রপাতি খুলে ফেলার পরও দেখা যায় সেটি উড়ছেনা। সেই সময় বেলুনে যাত্রীর দাঁড়ানোর জন্য তৈরি বাস্কেটটি খুলে ফেলে রামচন্দ্র বেলুনের সাথে লাগানো একটি লোহার আংটার থেকে ঝুলে গোটা উড়ানটি শেষ করেন। হিন্দু পেট্রিয়ট, ইন্ডিয়ান ডেইলি নিউজ, পায়োনিয়ার, মর্নিং পোস্ট সহ সব সংবাদপত্রই রামচন্দ্রের এই অসীম সাহসী কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন। সেই প্রথম একজন দেশীয় ক্রীড়াবিদের বিস্তারিত সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয় লাহোরের সিভিল এন্ড মিলিটারি গ্যাজেটে।

১৮৯০ সালের ২২শে মার্চ, কলকাতার টিভোলি গার্ডেনসে চীনের রাষ্ট্রদূত, শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ যোগীন্দ্রনাথ সরকার সহ আরও অনেক বিশিষ্ট নাগরিক এবং হাজার হাজার উৎসুক দর্শকের চোখের সামনে বিকেল ৫:৩০ মিনিটে উড়ান শুরু করার ঠিক ৫ মিনিটের মাথায় প্রায় ৩৫০০ ফুট উচ্চতা থেকে প্যারাশুট নিয়ে ঝাঁপ দেন রামচন্দ্র। এই চমকপ্রদ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা নিজের অনবদ্য লেখনীতে লিখে গেছেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যোগীন্দ্রনাথ সরকার তাঁর বর্ণনায় উল্লেখ করে গেছেন এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে হওয়া বিশাল জনসমাবেশের কথা।

অনুষ্ঠান শেষে রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও পারসিভাল স্পেন্সারকে সম্বর্ধিত করা হয়। পরের বছরে আবার গোটা দেশ পরিক্রমায় বের হন রামচন্দ্র। দিল্লীর তিস হাজারীতে আবার বেলুন থেকে প্যারাশুট নিয়ে ঝাঁপ দেওয়া দেখে চমৎকৃত হন দিল্লিবাসীরা। এরপর লাহোর ও রাওয়ালপিন্ডিতেও এই কীর্তি স্থাপন করেন তিনি। ইন্দোরের মহারাজার আমন্ত্রণে রামচন্দ্র ভাইসরয়ের সামনে তাঁর খেলা দেখাতে যান।

সেখান থেকে আগ্রা ও বেনারসে যান তাঁর দক্ষতার প্রমাণ রাখতে।  সেদিন টিভোলি গার্ডেন্সে রামচন্দ্রকে একটি গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেই অনুষ্ঠানে স্পেন্সার সাহেব নিজে স্বীকার করেন যে, অন্য কারুর পক্ষে রামচন্দ্রের মতো দক্ষতার সাথে অবতরণ করা সম্ভব নয়। তিনি তাকে একটি মেডেলও প্রদান করেন। পরবর্তীতে রামচন্দ্র প্যারাশ্যুটের সুবিধাযুক্ত একটি নতুন বেলুন সংগ্রহ করেন এবং যথাক্রমে দিল্লি, রাওয়ালপিন্ডি, ইন্দোর, আগ্রা ও বেনারসে তার অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।

অবশেষে কোনো একটি নেটিভ স্টেটের পাহাড়ের ওপর প্যারাশ্যুট ল্যান্ডিং করার সময় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। সেখান থেকে তাকে জীবিত অবস্থায় কলকাতা আনা হলেও শেষরক্ষা করা যায়নি। গোপাল মুখার্জির বাগানবাড়িতে এই মহান অভিযাত্রী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তারিখটা ১৮৯২ সালের ৯ আগস্ট। 

রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই সাহসী কার্যকলাপ প্রবোধ চন্দ্র লাহাকে এই রোমাঞ্চকর খেলার দিকে চালিত হতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি ১৮৯০সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি স্পেন্সারকে সাথে নিয়ে 'দ্য সিটি অফ ইয়র্ক' নামক বেলুনে চড়ে কলকাতা থেকে আকাশে আরোহণ করেন। এরপর তিনি ৮ই মার্চ স্পেন্সারের থেকে ক্রীত 'দ্য ভাইসরয় অফ ইন্ডিয়া' নামক বেলুনে চড়ে একক উড্ডিয়ন করেন এবং ১৮৯২ এর মার্চ মাসে কানপুর থেকে সাফল্যের সাথে তার পরবর্তী প্রচেষ্টা সম্পাদন করেন।

তৃতীয় ব্যোমযান আরোহী হলেন বিখ্যাত ব্যারিস্টার এবং মেট্রোপলিটন কলেজের অধ্যাপক যোগেশ চন্দ্র চৌধুরী। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য তিনি সুরেন্দ্রনাথ ব্যানারজীর জামাতা ছিলেন। তবে তিনি শুধুমাত্র রোমাঞ্চের জন্য নয়, বৈজ্ঞানিক কাজের উদ্দেশে শূন্যে আরোহণ করেছিলেন। দীর্ঘদিন কলকাতায় বসবাসকারী মেজর হ্যারি হবস নাম্নী এক ব্যক্তি তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছিলেন যে রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা তারই মত সাহসিনী ছিলেন যিনি বহুবার ব্যোমযানে আরোহণ করে শূন্যে বহু দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন।