রাণীগঞ্জ | দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ কয়লাক্ষেত্র , শিক্ষা , স্বাস্থ্যেও বেশ উন্নত  

রাণীগঞ্জ | দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ কয়লাক্ষেত্র , শিক্ষা , স্বাস্থ্যেও বেশ উন্নত  

পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত একটি শহর হল রাণীগঞ্জ।অজয় নদ ও দামোদর নদ-এর মাঝামাঝি অবস্থিত এই শহরটি  কয়লা খনির জন্য বিখ্যাত। রাণীগঞ্জ প্রধানত কয়লা খনি বেষ্টিত জনবহুল এলাকা।সমুদ্র সমতল হতে এর গড় উচ্চতা হল ৯১ মিটার (২৯৮ ফুট)। ভারতের ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে রানীগঞ্জের জনসংখ্যা হল ১২২,৮৯১ জন।

এর মধ্যে পুরুষ ৫৩% এবং নারী ৪৭%। এই অঞ্চলটির জনসংখ্যার ১১% হল ৬ বছর বা তার কম বয়সী।এখানে সাক্ষরতার হার ৬৪%। পুরুষদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৭২% এবং নারীদের  সাক্ষরতার হার  ৫৬%। রানীগঞ্জ শহরের চারধারে মহাবীর কলিয়ারী, নর্থ সিয়ারসোল কলিয়ারী, অমৃত নগর কলিয়ারী,দামোদা কলিয়ারী নামে বহু খনি এলাকা আছে। রানিগঞ্জ ব্লকের গ্রামীণ এলাকা ছয়টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত।

এগুলি হল আমড়াসোতা, বল্লভপুর,এগারা, রতিবাটী,  জেমারি ও তিরাট। এই ব্লকের শহরাঞ্চল বাঁশড়া, চেলোদ, রতিবাটী, চাপুই, জেমারি (জে. কে. নগর টাউনশিপ),মুরগাথুল, রঘুনাথচক, বল্লভপুর আমকুলা,  ও বেলেবাথান সেন্সাস টাউন দশটি নিয়ে গঠিত। ব্লকটি রানিগঞ্জ থানার অধীনস্থ। ব্লকের সদর সিয়ারশোল রাজবাড়ি। 

কয়লা খনি অধ্যুষিত এলাকা হলেও শিক্ষাগত দিক থেকেও রানীগঞ্জ বেশ উন্নত।এখানে রয়েছে বেশ কিছু সরকারি , বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান , প্রশিক্ষণ কেন্দ্র , কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র । কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রানিগঞ্জ বালিকা কলেজ (1980 সালে ) , রানীগঞ্জে ত্রিবেণী দেবী ভালোটিয়া কলেজ (1957 সালে)।  সিয়ারসোল রাজ উচ্চ বিদ্যালয় , এখানে পঞ্চম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাদানের সুবিধা রয়েছে।

স্কুলটিতে 3,981 টি বই এবং একটি খেলার মাঠ রয়েছে। রানীগঞ্জ জি.এম. গার্লস হাইস্কুল 20 টি কম্পিউটার, 4,000 টি বই সহ একটি লাইব্রেরি এবং একটি খেলার মাঠ রয়েছে। রানীগঞ্জ মারোয়ারী সনাতন বিদ্যালয় হল একটি হিন্দি-মাধ্যম পঞ্চম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাদানের সুবিধা রয়েছে। স্কুলে 1 টি কম্পিউটার, 2,000 টি বই সহ একটি লাইব্রেরি এবং একটি খেলার মাঠ রয়েছে।

রানীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় একটি বাংলা-মাধ্যম , বিদ্যালয়ে 21 টি কম্পিউটার, 3,500 বই সম্বলিত একটি লাইব্রেরি এবং একটি খেলার মাঠ রয়েছে। জ্ঞান ভারতী স্কুল একটি হিন্দি-মাধ্যম সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাদানের সুবিধা রয়েছে। স্কুলের একটি খেলার মাঠ আছে। রাণীগঞ্জ উর্দু উচ্চ বিদ্যালয় একটি উর্দু-মাধ্যম সহ-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে পঞ্চম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাদানের সুবিধা রয়েছে।

স্কুলে 10 টি কম্পিউটার এবং 900 টি বই সহ একটি লাইব্রেরি রয়েছে।রাণীগঞ্জ B.D.G. বিদ্যামন্দির হল একটি হিন্দি-মাধ্যম মেয়েদের একমাত্র প্রতিষ্ঠান। এখানে পঞ্চম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাদানের সুবিধা রয়েছে। বিদ্যালয়ে 12 টি কম্পিউটার এবং একটি লাইব্রেরি রয়েছে যার মধ্যে 3,050 টি বই রয়েছে। নন্দলাল জালান শিক্ষা সদন একটি ইংরেজি মাধ্যম সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও রয়েছে হরশঙ্কর ভট্টাচার্য ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি অ্যান্ড মাইনিং। 

ব্যাবসায়িক ক্ষেত্র হিসাবে বেশ উন্নত রাণীগঞ্জ ।রাণীগঞ্জ মূলত এখানকার কয়লা খনি এবং খনিজ সংক্রান্ত ব্যবসায়িক কাজের জন্য বিখ্যাত। পূর্ব ভারতের অন্যান্য স্থানের সাথে একটি অর্থনৈতিক বাণিজ্য এলাকা হিসাবে কলকাতার মাধ্যমে রাণীগঞ্জ যুক্ত। রাণীগঞ্জের সর্বোদয়া গ্রুপ অফ কোম্পানীজ্ , ছোট শিবাজী বিড়ি , বেঙ্গল অয়েল মিল , মাল্টি কোম্পানি , সাঁই গ্রুপ , চিট ফুড কোম্পানি , রিলায়েবেল অগ্নি নিরোধ নামে বেশ কয়েকটি নামকরা বাণিজ্য-প্রতিষ্ঠানও আছে।

শিক্ষা , শিল্পতেই নয় স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও রাণীগঞ্জ বেশ উন্নত।এখানে রয়েছে বল্লভপুর গ্রামীণ হাসপাতাল রাণীগঞ্জ সিডি ব্লকের প্রধান সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র , রানীগঞ্জের ২৫ টি শয্যা বিশিষ্ট   রানীগঞ্জ ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র  , বাক্তরনগরে এবং তিরাত প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র । রানীগঞ্জের অন্যান্য হাসপাতালের মধ্যে রয়েছে আনন্দলোক হাসপাতাল,  মারোয়ারী রিলিফ সোসাইটি হাসপাতাল, বি.এন. আগরওয়াল মেমোরিয়াল হাসপাতাল, কুনুস্তুরিয়া এরিয়া হাসপাতাল।

রানিগঞ্জ কয়লাক্ষেত্র পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল এবং দুর্গাপুর মহকুমার অন্তর্ভুক্ত একটি কয়লাখনি অঞ্চল।রানিগঞ্জ কয়লাক্ষেত্র ৪৪৩.৫০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত এবং মোট ৪৯১৭ কোটি টন কয়লা সঞ্চিত আছে,যা  দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ কয়লাক্ষেত্র ।  উনিশ শতক এবং বিশ শতকের  অধিকাংশ সময়কাল জুড়ে রানিগঞ্জ কয়লাক্ষেত্রই দেশের প্রধান কয়লা উৎপাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন সুমনার এবং সুয়েটিনিয়াস গ্র্যান্ট হিটলি ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে ইথোরা অঞ্চলে, বর্তমান সালানপুর সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকে কয়লা দেখতে পান। শুরুর দিকে পরীক্ষানিরীক্ষা এবং খনন কাজকর্ম একটু একটু করে শুরু হয়েছিল। ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্ডার অ্যান্ড কোম্পানি নামে একটি এজেন্সি হাউজের নেতৃত্বে নিয়মিত খনন কাজ শুরু হয় ।

১৮৩৫ খ্রীষ্টাব্দে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর কোলিয়ারির জায়গা কেনেন এবং কার অ্যান্ড টেগোর কোম্পানি ঐ ক্ষেত্রটি অধিগ্রহণ করে। উইলিয়াম প্রিন্সেপের আদেশানুসারে কার অ্যান্ড টেগোর কোম্পানি গিলমোর হমব্রে অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে  মিলে ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গল কোল কোম্পানি গঠন করে।সাঁকতোড়িয়ায় এদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল। 

অন্যান্য খনন কোম্পানিগুলোর মধ্যে ছিল ইকুইটেবল কোল কোম্পানি, অ্যান্ড্রু ইউল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড  বীরভূম কোল কোম্পানি,  মধু রায় অ্যান্ড প্রসন্ন দত্ত কোম্পানি, সাউথ বরাকর কোল কোম্পানি, বার্ড অ্যান্ড কোম্পানি,  এবং বামার লরি। সমস্ত কাঁচা কয়লার খনি কোল মাইন্স অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার অধীনে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে জাতীয়করণ করা হয়েছে।

১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড-এর সহায়ক, ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড গঠিত হয়। এই সংস্থা রানিগঞ্জ কয়লাক্ষেত্রের প্রথম দিককার সমস্ত বেসরকারি কোলিয়ারিগুলো অধিগ্রহণ করে। রানিগঞ্জ কয়লাক্ষেত্রে কয়লা স্তরগুলোকে দুটো খণ্ডে ভাগ করা যায়—রানিগঞ্জ পরিমাপন এবং বরাকর পরিমাপন। পাণ্ডবেশ্বর, ঝাঁঝরা, বাঁকোলা, কেন্দা, কাজোরা, সাতগ্রাম, শ্রীপুর, সোদপুর সোনপুর, কুনুসতোড়িয়া, এবং আংশিকভাবে সালানপুর রানিগঞ্জ পরিমাপনে পড়ে ।  বরাকর পরিমাপনের অঞ্চলগুলো হল ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেডের সালানপুর এবং মুগমা।