পেরুঃ সূর্য মন্দিরে ঘেরা দক্ষিণ আমেরিকার দেশ রিপাবলিক অব পেরু

পেরুঃ সূর্য মন্দিরে ঘেরা দক্ষিণ আমেরিকার দেশ রিপাবলিক অব পেরু

 পেরু দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম-মধ্য অঞ্চলে, প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। রিপাবলিক অব পেরুর রাজধানীর নাম লিমা। স্বাধীনতা ঘোষণা ২৮ জুলাই, ১৮২১। প্রধান ভাষা: স্পেনিশ। মুদ্রা: সুল। পার্লামেন্ট: কংগ্রেস অব দ্যা রিপাবলিক। জনসংখ্যা: ৩ কোটি ২৯ লক্ষ ৩৩ হাজার ৮৩৫ জন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার: ১.১৭% জনসংখ্যার ঘনত্ব: প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩ জন। মাথাপিছু আয়: ৬,৫০০ মার্কিন ডলার। প্রত্যাশিত গড় আয়ু: ৭৪.৯৮ বছর। জাতিসংঘে যোগদান: ১৯৪৫ সালে।  পেরু ল্যাটিন আমেরিকার পঞ্চম বৃহত্তম জনবহুল দেশ এবং এটি তার প্রাচীন ইতিহাস, বিভিন্ন ভূসংস্থান এবং বহুজাতিক জনসংখ্যার জন্য পরিচিত।

পেরুর ভূগোলে চরম বৈপরিত্যের সহাবস্থান পরিলক্ষিত হয়। এখানে আছে জনবিরল মরুভূমি, সবুজ মরূদ্যান, বরফাবৃত পর্বতমালা, উচ্চ মালভূমি এবং গভীর উপত্যকা। দেশটির উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব বরাবর আন্দেস পর্বতমালা চলে গেছে। আন্দেস পেরিয়ে দেশের অভ্যন্তরে রয়েছে ঘন ক্রান্তীয় অরণ্য, যেখানে জনবসতি তেমন ঘন নয়।প্রশান্ত মাহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত লিমা দেশটির প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও রাজধানী।  পেরু অতীতে দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তৃত ইনকা সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ছিল। ১৬শ শতকে স্পেনীয় বিজেতাদের হাতে ইনকা সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। আন্দিজের স্বর্ণ ও রূপার খনির আকর্ষণে স্পেনীয়রা পেরুকে দক্ষিণ আমেরিকাতে তাদের সম্পদ ও শক্তির কেন্দ্রে পরিণত করে।

ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্য পেরুই প্রথম স্বাধীনতা লাভ করে। ১৮২১ সালে দেশটি স্পেনের কবল থেকে মুক্ত হয়। পেরুর বেশির ভাগ লোক ইনকা বা অন্য আদিবাসী আমেরিকান জাতির লোক। ইনকাদের ভাষা কেচুয়া ভাষা এবং এর সাথে সম্পর্কিত আরেকটি ভাষা আইমারা ভাষা স্পেনীয় ভাষার পাশাপাশি দেশটির সরকারি ভাষার মর্যাদা লাভ করেছে। তবে পেরুতে এখনও ঔপনিবেশিক শাসনামলে সৃষ্ট শ্রেণী ও জাতিগত বৈষম্য বিরাজমান। এই বিভক্ত সমাজে সংখ্যালঘু স্পেনীয় অভিজাত শ্রেণী দীর্ঘদিন যাবৎ সংখ্যাগুরু আদিবাসী আমেরিকানরা  শাসন করে আসছে।

ইঙ্কার সাম্রাজ্যের দ্রুত পতন সত্ত্বেও, ইনকা দেবতারা, তাদের এপিউ পর্বত প্রফুল্লতা এবং ইন্কা সমাজের ঐতিহ্যগত রীতিনীতি ও বিশ্বাস জাতীয় মানসিকতা থেকে বিবর্ণ হয়নি। আধুনিক পেরু এখনও প্রাক-কলম্বিয়ান ঐতিহ্যের ঘর, যদিও প্রধানত প্রভাবশালী ক্যাথলিক বিশ্বাসের সাথে মিলিত হয়। পেরুতে ক্যাথলিকতা স্প্যানিশ বিজয়ের আগে ফিরে আসছে এমন চিত্রাবলী এবং অনুষ্ঠান উপাদানের সাথে প্রত্যয়িত হয়, যা সারা বছর ধরে পেরুর জুড়ে বিভিন্ন ধর্মীয় উত্সবগুলির মধ্যে দেখা যায়।   

পেরুর বর্তমান রাজধানী লিমার কাছে অবস্থিত এই চাভিন দে উয়ান্তার শহরটি খ্রিস্টপূর্ব ৯০০ অব্দ নাগাদ নির্মিত হয়। তবে তার আগেও এখানে বসবাসের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই কেন্দ্রের মন্দিরটিকে চাভিন স্থাপত্যের একটি প্রধান নিদর্শন বলে মনে করা হয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে ধাপে ধাপে তৈরি করা হয়েছে। এই অঞ্চলে প্রচূর বৃষ্টিপাত হয়। তাই বৃষ্টির জলের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মন্দিরটিকে ঘিরে অত্যন্ত সুন্দর নিকাশী ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল। তাছাড়া মন্দির তৈরি করতে যে সাদা ও কালো পাথরের ব্যবহার করা হয়েছিল, তা বয়ে আনা হয়েছিল দূর থেকে।

এর থেকে এক ধরণের সাংগঠনিক ক্ষমতার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়, যার থেকে বোঝা যায় চাভিনদের কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠী ছিল যথেষ্ট শক্তিশালী। তবে তাদের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে তেমন কিছুই আবিস্কৃত হয়নি। চাভিন দে উয়ান্তার ছিল মূলত একটি ধর্মীয় কেন্দ্র। তবে এর অবস্থান ছিল পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চলের যোগাযোগের রাস্তা ও উত্তর দক্ষিণে যোগাযোগের রাস্তার একরকম সংযোগস্থলে। সেই কারণে আন্দাজ করা হয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও এর যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। চাভিন সভ্যতা ছিল মূলত কৃষিভিত্তিক। এরা ভুট্টা, কিনোয়া, মেইজ ও আলু চাষ করতো।

চাষের জন্য জল সেচের বন্দোবস্তও ছিল। স্থানীয় পশু ইয়ামাকে তারা পোষ মানিয়েছিল। তাদের মাংস খাওয়া হত, পোশাক তৈরির জন্য তাদের লোম ব্যবহৃত হত, আবার মালবহনের কাজেও তাদের ব্যবহার করা হত। পূর্ববর্তী কারাল সভ্যতার সাথে তাদের এক উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হল, মৃৎপাত্রের ব্যবহার তারা জানতো। উপকূলীয় অঞ্চলে তাদের ব্যবহৃত সুন্দর সুন্দর মৃৎপাত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, যার থেকে তাদের শিল্পবোধের পরিচয় মেলে। এছাড়া মন্দিরগাত্রে ও দেওয়ালেও তারা খোদাই করে অনেক শিল্পকর্ম রচনা করেছিল। এগুলির সাথে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের যোগ ছিল বলে মনে করা হয়। ধাতুবিদ্যাতেও তাদের যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় মেলে। ধাতু গলিয়ে তারা কাজ করতে জানতো।

সোনার কাজেও তাদের দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।  লিমা শহর ঘুরে দেখতে। শহরটার পতন হয় ১৫৩৫ সালে। তখন আদিবাসী ইনকাদের দেশে ইউরোপের স্পেন থেকে মানুষ আসতে শুরু করে। স্পেনের রাজা প্রথম চার্লসের জন্য ফ্রান্সেসকো পিজারো (১৪৭১-১৫৪১) এই লিমা শহর দখল করেন এবং উপনিবেশ স্থাপন করেন। সে সময় তাঁকে বাধা দিতে পুরো লিমা শহরের বাইরে প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল। সেই প্রাচীরের কিছু অংশের দেখা মেলে এখনো। স্প্যানিশদের শাসনামলের আগে পেরুর বাসিন্দারা ‘কিনুয়া’ খেতেন।

খেসারির ডালের মতো কালচে ধরনের শস্য এটি। এই শস্য ফলাতে গুয়ানো বা পাখির বিষ্ঠা থেকে সার তৈরি করে ব্যবহার করা হতো। দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়া, চিলি, পেরু যুদ্ধে জড়িয়ে পরেছিল বিশেষ এই সারের কারণেই! পৃথিবীতে পাখির বিষ্ঠা নিয়ে একমাত্র যুদ্ধ!  ইনকাদের সম্রাট পাচাকুটি এটি তৈরি করেছিলেন ১৪৫০-১৪৬৫–এর মধ্যে। এটাকে পবিত্র উপত্যকা বলার কারণ, ইনকারা বিশ্বাস করত তাদের উৎপাদিত শস্য রক্ষা করার জন্য দেবতা পাহারা দিচ্ছেন। পাহাড়ঘেরা এলাকাটিতে চাষের জন্য ছিল সামান্য জমি।

উৎপাদিত ফসল ইনকারা সারা বছরের জন্য জমিয়ে রাখত পাহাড়ের উঁচু ঢালে, বিশেষভাবে তৈরি ফসল রাখার গুদাম বানিয়ে। সেই বিশেষায়িত গুদামে হাওয়া-বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা ছিল। পোকামাকড় যেন ফসলের ক্ষতি না করে সে জন্য গুদামের নিচ দিয়ে এক ধরনের তেল জ্বালিয়ে পোকা মারার ব্যবস্থা ছিল। কৃষিকাজে এরা কতটা উন্নত ছিল, ভাবা যায়? পাহাড়ের মাথায় মাথায় আবার হিসাব করে সূর্যঘড়ি তৈরি করা হয়েছে। চাষাবাদের সুবিধার জন্য এসব সূর্যঘড়ি ব্যবহার করা হতো। ইনকাদের ঘোড়া ছিল না, গরু ছিল না, চাকাও ছিল না। তারপরও কীভাবে উঁচু পাহাড়ে এত বড় বড় পাথর তুলে এগুলো নির্মাণ করেছে, ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।  

পেরুর একেক অঞ্চলের মানুষ একেকজন দেবতাকে মানে। পাচামামা উত্তরাঞ্চলের ইনকাদের দেবতা। শোনা যায়, এই দেবতার কথা বলে সম্রাট পাচাকুটি চাষিদের দিয়ে দুই মাস কাজ করিয়ে নিয়েছিলেন। চাষিরা জানত, দেবতা পাচামামাই তাদের দেখাশোনা করছে, পারিশ্রমিকও দিচ্ছে। মোটকথা, তারা পাশের পাহাড় থেকে পাথর কেটে এনে অত ওপরে তুলছিল দেবতার কাজ করছে ভেবেই। সূর্য মন্দিরটা প্রায় ২০ স্তর ওপরে। একেকটা স্তর চার ফুট করে উঁচু। পাথরের উঁচু আঁকাবাঁকা সিঁড়ি ভেঙে ঘুরে ঘুরে উঠতে হয়।

 দর্শনীয় স্থানটি আমাজন এলাকার মধ্যে পড়ে। পাহাড়ের গায়ে গায়ে গহিন অরণ্য। ঘন সবুজ জঙ্গল, অর্কিড আর নানা ধরনের বুনোফুল, পাখি। ১৪৫০ সালের দিকে স্থাপিত ইনকাদের একটা বসতি বা শহর বলা যেতে পারে এটাকে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ট্রেস প্লানটেশন করার ব্যবস্থা। থাকার বাড়িঘর, সূর্য মন্দির। রাজার বক্তৃতা শোনার জন্য খোলা জায়গা। কিন্তু বহু বছর ধরে এই এলাকা ছিল মানুষের অজানা। ১৯১১ সালে একজন আমেরিকান এর অস্তিত্ব খঁুজে পান।

গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন সত্ত্বেও, অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে পেরুতে 1980 সালে গুরুতর অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। 198২ থেকে 1983 সাল পর্যন্ত এল নিনো বন্যা, খরা এবং দেশের মাছ ধরার শিল্পকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। উপরন্তু, দুই সন্ত্রাসী গ্রুপ, Sendero Luminoso এবং Tupac Amaru বিপ্লবী আন্দোলন, আবির্ভূত এবং দেশের বেশিরভাগে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। 1985 সালে অ্যালান গার্সিয়া পেরেজ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং অর্থনৈতিক অপব্যবহারের পর 1988 ও 1990 সাল পর্যন্ত পেরুর অর্থনীতিতে আরও বিধ্বংসী হয়ে পড়ে।

1990 সালে আলবার্তো ফুজিমোরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং 1990-এর দশকে তিনি সরকারে বেশ কিছু পরিবর্তন করেন। অস্থিরতা অব্যাহত এবং 2000 অনেক রাজনৈতিক স্ক্যান্ডাল পরে Fujimori অফিস থেকে পদত্যাগ। 2001 সালে আলেজান্দ্রো টলোডো দখল করে নেয় এবং পেরুকে গণতন্ত্রের দিকে ফিরিয়ে আনার জন্য ট্র্যাক দেয়। 2006 সালে এলান গার্সিয়া পেরেজ আবার পেরু রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠে এবং যেহেতু তাদের দেশের অর্থনীতি এবং স্থিতিশীলতা হ্রাস পেয়েছে।