রোমানিয়া| বঞ্চিত ভারতীয় দের দেশ রোমানিয়া

রোমানিয়া| বঞ্চিত ভারতীয় দের দেশ রোমানিয়া

ইউরোপ ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশ রোমানিয়ার Romania  অনেক পুরোনো ইতিহাস রয়েছে।  এটি ২০০৭ সালে ইউরোপ ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।  রোমানিয়ার টাকার নাম হচ্ছে লিউ।  ভৌগোলিকভাবে রোমানিয়ার অবস্থান হচ্ছে পূর্ব ইউরোপের শেষ প্রান্তে। রোমানিয়ার পাশ্ববর্তী দেশগুলি হচ্ছে- রোমানিয়ার পশ্চিমে সেঞ্জেনের দেশ হাঙ্গেরী দক্ষিণ পশ্চিমে রয়েছে সার্বিয়া, দক্ষিণে বুলগেরিয়া, উত্তরে ইউক্রেন, উত্তর পূর্বে মলদোভা। রোমানিয়া একটি বড় দেশ হলেও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ নয়।  রোমানিয়া দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বৃহত্তম দেশ এবং ইউরোপের দ্বাদশতম বৃহত্তম দেশ। এর আয়তন ২৩৮,৩৯৭ বর্গকিলোমিটার (৯২,০৪৬ বর্গ মাইল)। এটি ৪৩° উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৪৯° উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত এবং২০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৩০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। অঞ্চলটি প্রায় সমানভাবে পর্বত, পাহাড় এবং সমভূমির মাঝে বিতরণ করা। 

ভৌগোলিকভাবে রোমানিয়ার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সে হিসেবে তারা ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলির কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারছেনা। দেশটির অর্থনীতিক সমস্যা সবসময় লেগেই থাকে৷ দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার, সাধারণ মানুষের অযোগ্যতা দেশটিকে অনেক পিছিয়ে রেখেছে। দেশটিতে শিক্ষার হার অনেক কম। ইউরোপ ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষার হার কম রোমানিয়া এবং বুলগেরিয়ায়। রোমানিয়ায় এখনো উচ্চশিক্ষার হার মাত্র ৪০% এর নিচে। রোমানিয়ার সংবিধান ফ্রান্সের পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের সংবিধানের উপর ভিত্তি করে তৈরি এবং তা ১৯৯১ সালের ৮ ই ডিসেম্বর একটি জাতীয় গণভোটে অনুমোদিত হয়েছিল।

এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টের সাথে সামঞ্জস্য আনার জন্য ২০০৩ সালের অক্টোবরে সংশোধন আনা হয়েছিল। দেশটিতে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান এবং আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভগের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এটি একটি অর্ধ-রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রতিনিধিত্বমূলক বহুদলীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়, যেখানে রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। সরকারপ্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের উপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং দ্বিকাক্ষিক আইনসভা উভয়ের উপর ন্যস্ত। বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা হতে স্বাধীন। রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে পাঁচ বছরের জন্য সর্বোচ্চ দু'বার নির্বাচিত হন এবং তিনি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ দেন, যিনি পরবর্তীতে মন্ত্রিপরিষদ নিয়োগ করেন। রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নের দশম বৃহত্তম শহর যাতে প্রায় ২ মিলিয়ন বা ২০ লাখ লোকের বসবাস ।

২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী রোমানিয়ার জনসংখ্যা ছিল ২০,১২১,৬৪১ জন। অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মতো, উপ-প্রতিস্থাপনের উর্বরতা হার এবং নেতিবাচক নিট স্থানান্তর হারের ফলে আসন্ন বছরগুলিতে এর জনসংখ্যা ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০১১ সালের অক্টোবরের হিসেব অনুযায়ী রোমানিয়ার জনসংখ্যার ৮৮.৯% রোমিানিয়ান, বৃহত্তম জাতিগত সংখ্যালঘু হলেন হাঙ্গেরিয়ান, তারা জনসংখ্যার ৬.১% এবং রোমা জনসংখ্যার ৩.০%। হাঙ্গেরিয়ানরা হারগিতা এবং কোভাসনা অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মধ্যে ইউক্রেনীয়, জার্মান, তুর্কি, লাইপোভানস, অ্যারোমানীয়, টাটার এবং সার্বস অন্তর্ভুক্ত। ১৯৩০ সালে, রোমানিয়ায় ৭৪৫,৪২১ জন জার্মান ছিল, তবে আজ প্রায় ৩৬,০০০ জনে নেমেছে। ২০০৯ পর্যন্ত রোমানিয়ায় প্রায় ১৩৩,০০০ অভিবাসী বাস করতেন, যারা মূলত মোলদোভা এবং চীন থেকে এসেছে।

রোমানিয়া একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং এর কোন রাষ্ট্রীয় ধর্ম নেই। জনসংখ্যার সিংহভাগ খ্রিস্টান হিসাবে তাদের পরিচয় দেয়। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে, রোমানিয়ান অর্থোডক্স চার্চের অন্তর্ভুক্ত অর্থোডক্স খ্রিস্টান হিসাবে পরিচয় দাতাদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৮১.০%। অন্যান্য সংখ্যার মধ্যে রয়েছে প্রোটেস্ট্যান্টাইন (৬.২%), রোমান ক্যাথলিক (৪.৩%) এবং গ্রীক ক্যাথলিক (০.৮%)। বাকী জনসংখ্যার মধ্যে ১৯৫,৫৬৯ জন অন্যান্য খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়ভুক্ত বা অন্য একটি ধর্মের অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে ৬৪,৩৭৭ জন মুসলমান (বেশিরভাগ তুর্কি ও তাতারি নৃগোষ্ঠীর) এবং ৩,৫৯৯ ইহুদি (ইহুদিরা একবার রোমানিয়ান জনসংখ্যার ৪% গঠন করেছিল, ১৯৩০ সালের আদমশুমারিতে ৭২৮,১১৫ জন ছিল)। তদুপরি, ৩৯,৬৬০ জনের কোন ধর্ম নেই বা নাস্তিক, যদিও বাকিদের ধর্ম অজানা। 

১৯৮৯ সালে রোমানীয় বিপ্লবের পর থেকে রোমানিয়ান শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের ধারাবাহিক প্রক্রিয়াধীন ছিল যা মিশ্র সমালোচনা পেয়েছে। ২০০৪ সালে প্রায় ৪,৪০০,০০০ জন মানুষ স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। এর মধ্যে কিন্ডারগার্টেনে ৬৫০,০০০ (৩ থেকে ৬ বছর), প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ৩১১,০০০ জন এবং তৃতীয় স্তরে (বিশ্ববিদ্যালয়) ৬৫০,০০০ জন।২০১৮ সালে রোমানিয়ার স্বাক্ষরতার হার ছিল ৯৮.৮%। ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলিতে যেভাবে সাধারণ জনগণের জন্য সুযোগ সুবিধা রয়েছে রোমানিয়ায় সেভাবে কোনো সুযোগ সুবিধা নেই।

রোমানিয়ার ৬০ ভাগ মানুষ দিনে এনে দিনে খায়। রোমানিয়া ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলি থেকে পিছিয়ে থাকার অনেক কারণও আছে, রোমানিয়ার যে স্থানীয় মানুষ আছে তাদের ৬০ ভাগ অরিজিনাল রোমানিয়ার লোক নয়। রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, সার্বিয়া এ দেশগুলি জিপ্সিয়ানে ভরা। জিপ্সিয়ানরা হচ্ছে একটা জাতি যাদের উৎপত্তি হচ্ছে ভারতবর্ষ থেকে। আট এবং দশ শতাব্দীর দিকে ভারত থেকে বিতাড়িত এক শ্রেণীর লোক বিশেষ করে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে অসংখ্য ভারতীয়রা মধ্যপ্রাচ্যে এসে পাড়ি জমায়, পরে সেখান থেকে তারা তুরষ্ক, কুর্দি, সিরিয়া, মিশরে এসে বাসস্থান করে।

এর পরে তাদের কয়েক প্রজন্ম পরির্বতন হওয়ার পর রাশিয়ায় এসে ভীড় জমায়। পরে রাশিয়া থেকে আরো কয়েক প্রজন্ম শেষে পরের প্রজন্ম রোমানিয়া, বুলগেরিয়া সার্বিয়া, মেসিডোনিয়া, এসব দেশে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করে। ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি এসব দেশে ভিড় জমালেও সেখানে তারা টিকতে পারেনি। ইউরোপীয়ানরা মনে করে যে তাদের উৎপত্তি হচ্ছে ইজিপ্ট থেকে যেটাকে আমরা মিসর বলি। তাদেরকে ইজিপ্ট থেকে জিপ্সি নাম দেয় ইউরোপিয়ানরা। আসলে তাদের উৎপত্তি স্থল হচ্ছে ভারত থেকে।

তাই শত শত বছর পরে এসেও কয়েক প্রজন্ম পরিবর্তন হওয়ার পরেও তারা ভারতের দেশপ্রেম চর্চা করে, ভারতীয় গান, হিন্দী ভাষা তাদের প্রথম পছন্দ। জিপ্সিয়ানরা যেহেতু অন্যদেশ থেকে আগত তাই তারা সবসময় অবহেলিত ছিল। রাষ্ট্রীয়ভাবে রোমানিয়া বুলগেরিয়ার নাগরিকত্ব পেলেও এখনো তারা স্থানীয়দের দ্বারা বৈষম্যের শিকার হন। ওরা শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মান অনেক পিছিয়ে আছে। রোমানিয়ায় প্রায় দুই কোটি জনসংখ্যা থাকলেও এক কোটির উর্দ্বে জিপ্সিয়ান। যার কারণে দেশটি ইউরোপের একটি অনুন্নত দেশ হিসেবেই পরিচিত। ওদের কোন অফিশিয়াল জব দেয়না, ভাল কোন কাজে তাদের রাখেনা। আর এরাও খুব বাজে স্বভাবের। চুরি করে এরা, খুন খারাপি ছাড়া যত খারাপ কাজ আছে সবকিছুই করে এরা। কাজ করতে পছন্দ করেনা তারা।

এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে বেশিরভাগেরই গন্তব্য রোমানিয়া হয়ে পশ্চিম ইউরোপ। ইউরোপে প্রবেশের বলকান পথে গত দুবছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে রোমানিয়া। ২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটের সময়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ভিড় সার্বিয়া থেকে সরাসরি হাঙ্গেরিতে ঢুকে যায়, রোমানিয়াকে এড়িয়ে। কিন্তু গত কয়েক বছরে ইউরোপে প্রবেশের জন্য এই পথ আরো সহজ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর কারণ, ক্রোয়েশিয়া সীমান্তে পুলিশি কড়াকড়ি বাড়ানো ও হাঙ্গেরি সীমান্তে বৈদ্যুতিক কাঁটাতার, যা ২০১৫ থেকেই কার্যকর। যদিও রোমানিয়ার নিয়ম হচ্ছে কেউ ৫ বছর বৈধভাবে রেসিডেন্সি নিয়ে থাকলে সে পাঁচ বছর পরে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আবেদন করতে পারে। তবে এটা কেবল নামেমাত্র, বাস্তবে তারা কাউকে পারমেনেন্ট রেসিডেন্সি দেয়না।