জুরানপুরের জয়দুর্গায় সতীপীঠ | Juranpur Satipith

জুরানপুরের  জয়দুর্গায়  সতীপীঠ | Juranpur Satipith

সতীর ৫১ পীঠের পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, দক্ষের যজ্ঞে মহাদেবের অপমান সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞকুন্ডে আত্মাহুতি দেন দেবী সতী। তারপর সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে তান্ডবলীলায় মাতেন স্বয়ং মহাদেব। মহাদেবকে শান্ত করতে না পেরে বিশ্ব সংসারকে রক্ষা করতে সুদর্শন চক্রের সাহায্যে সতীর দেহ খন্ড বিখন্ড করে দেন শ্রীবিষ্ণু। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে সতীর দেহ খন্ডগুলি। পৃথিবীর বুকে পড়া মাত্রই প্রস্তরখন্ডে পরিণত হয় সতীর দেহের খন্ডগুলি। সেই বিশেষ বিশেষ স্থানগুলি পরিণত হয় এক একটি সতীপীঠে। প্রত্যেক হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পরম পবিত্রের জায়গা সতীর এই ৫১ পীঠ।

ভারতের নানা প্রান্তের সতীপীঠের সঙ্গে এখানকার ছবিকে ঠিক মেলানো যায় না। গ্রামে হাতেগোনা কয়েকটি পরিবারের বাস। বিশাল বাঁধের ধারে এক বিস্তৃত প্রান্তরের মাঝে পঞ্চবটির নীড়ে শিলাবতী দেবীর অধিষ্ঠান। খোলা আকাশের নিচে নদীয়ার জুরানপুরের  জয়দুর্গায়  সতীপীঠ  যা সত্যিই দুর্লভ। নদীয়া জেলার কালীগঞ্জ থানার অন্তর্গত হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত জুরানপুর সতীপীঠ। প্রাচীনকালে এটি কালীপীঠ নামেও পরিচিত ছিল। বর্ধমানের কাটোয়া ঘাট থেকে নদী পেরিয়ে নদীয়ার বল্লভপুর ঘাটে নেমে পৌঁছে যাওয়া যায় এই জুরানপুর।

এক বিশাল বড় বাঁধের একপাশে বিস্তৃত প্রান্তর এর মধ্যে পঞ্চ বটির মধ্যে রূপে এখানে দেবী অধিষ্ঠাত্রী। শাস্ত্র অনুসারে, এখানে দেবীর মুণ্ড পড়েছিল। তবে শিব চরিত্র অনুযায়ী, এখানকার সতীপীঠের দেবী হলেন চন্ডেশরী। এখানে একজন পুরোহিত নিত্য পূজা করেন। মন্দিরের ভেতর একটি সুরঙ্গ আছে। জানা যায় এই সুরঙ্গ নাকি গঙ্গা পর্যন্ত চলে গিয়েছে। তবে বর্তমানে সুরঙ্গ বন্ধ আছে। কথিত আছে, তারাপীঠ যাওয়ার আগে বামদেব নাকি এখানে বসে তপস্যা করেছিলেন। এর ভিতর একটি অষ্টধাতুর মূর্তি আছে।

প্রতিদিন সকালে এই মূর্তিকে শীলাদেবীর পাশে বসিয়ে পুজো করা হয়। তারপরে আবার তার নিজস্ব স্থানে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।  একে কালীপীঠ বলাই যুক্তিযুক্ত। শিবচরিতের উপপীঠের তালিকায় কালীপীঠের কথা আছে। সেখানে বলা হয়েছে কালীপীঠে দেবীর শিরের অংশ পতিত হয়েছিল, দেবী এখানে চণ্ডেশ্বরী ও ভৈরব চণ্ডেশ্বর। দুটি মতের মধ্যে নামভেদ থাকলেও মূল বিষয়ের সাদৃশ্য লক্ষনীয়। সেটি হল দেবীর অঙ্গ; মুণ্ড বা শিরাংশ। আর কালিকট পীঠ যেহেতু কলকাতায় অবস্থিত সেইজন্য আরও একটি কালীকট পীঠ ভ্রমাত্বক, সেইহেতু কালীপীঠ নামকরণ অধিক বোধগম্য।

যাই হোক, এই শক্তিপীঠ পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কালীগঞ্জ থানার অন্তর্গত জুরানপুরে। উত্তরে ভাগীরথী প্রবাহিত। তার বালুকাময় তীরে বট, অশ্বত্থ, বেল তমাল গাছের বন। নদীর অপর তীরে উদ্ধরণপুর মহাশ্মশান। জুড়ানপুর তীর্থে বটবৃক্ষ মূলে রয়েছে গোলাকার প্রস্তরখণ্ড যা সতীর মুণ্ড বলে বিশ্বাস। পাশেই ক্রোধশি ভৈরবের মন্দির। অষ্টধাতুর জয়দুর্গা বিগ্ৰহ পাশে ভক্তনিবাসের মধ্যে রক্ষিত। পূজার সময় দেবীকে বটবৃক্ষমূলের বেদিতে স্থাপন করে অর্চনা করা হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণেই দেবীকে ভক্তনিবাসে রাখা হয়।

এখনও পর্যন্ত দেবীর স্বতন্ত্র মন্দির নির্মিত হয়নি। ভিন্ন মতে এই পীঠ কর্ণাটে বলা হয় । সেখানেও একটি দেবীর মন্দির আছে । তবে ঐতিহাসিকেরা এই স্থানের দিগ নির্দেশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গেই । দেবী এখানে বোধ হয় রুদ্রানী রূপে বিরাজিতা । সেজন্য শুম্ভ নিশুম্ভ বিনাশিনী দেবী জয়দুর্গাকে পীঠদেবী রূপে পূজা করা হয় । এই পীঠের নাম সব শাস্ত্রে পাওয়া যায় না । পীঠনির্ণয় তন্ত্র , শিবচরিত , তন্ত্রচূড়ামণি শাস্ত্রে এই পীঠের নাম দেখা যায় । জ্ঞানেন্দ্র মোহোন দাস তাঁর অভিধানে এই পীঠকে অবশ্য বর্ধমানের কাটোয়ার কাছে কালীপীঠ বলে উল্লেখ করেছেন ।

তবে যেহেতু উক্ত শাস্ত্র গুলিতে “জুড়ানপুর” নাম পাওয়া যায় । তাই এই পীঠের নাম উল্লেখ হয় “জুড়ানপুর” রূপে । ঐতিহাসিক গণ তাই নদীয়া জেলার জুরানপুরকেই পীঠ রূপে চিহ্নিত করেছেন । কিছু তন্ত্র সাধক এখানে সাধনা করে সিদ্ধ হয়েছেন । এঁনাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ , ব্রহ্মানন্দ, পূজানন্দ গিরি , সর্বানন্দ । নাটোরের রাণী ভবানীর পোষ্যপুত্র সাধক রামকৃষ্ণ এখানে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। এই পীঠে হিন্দুদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের লোকেরাও পূজা দেন ।

এই পীঠ স্থাপনের সাথে দেবী কালীর ভক্ত সাধক রাজারামের নাম জড়িয়ে আছে । এখানে দেবীর তেমন মন্দির নেই । ত্রিভুবন মায়ের রূপ  । বট গাছের তলায় শিলাখণ্ডে দেবীর পূজা হয় । ভক্তেরা বৃক্ষের তলায় দেবীকে পূজা দেন । প্রত্যহ পূজা ছাড়া অমাবস্যা, পূর্ণিমায় পূজা হয় বিশেষ ভাবে কালিকা দেবীর । বলা হয় এই দেবীর শরণ নিলে  সর্ব প্রকার বিপদ- আপদ- সঙ্কট- অমঙ্গল দূর হয় । বিশেষ পূজার সময় দেবীর উদ্দশ্যে ছাগাদি বলি হয় । রটন্তী কালী পূজায় ও মাঘী পূর্ণিমা তে এখানে এলাহী ভাবে পূজার আয়োজন করা হয় । মাঘী পূর্ণিমার সময় মেলা বসে । দেবীর বাঁধানো বেদীর পাশেই ভৈরবের মন্দির ।

মণীন্দ্র চক্রবর্তী নামক এক ভক্ত স্বপ্নে দেবীর আদেশ পেয়েছিলেন । সেই মতো পাশের এক দীঘি থেকে তিনি অষ্টধাতুর জয়দুর্গা মূর্তি প্রাপ্ত করেন । দিনের বেলায় এই বিগ্রহ বটের তলায় রাখা হলেও রাতে নিরাপত্তার জন্য মন্দিরে রাখা হয় । এখানে পাতালঘরে অনেক সাধক সাধনা করেছেন । পরাধীন ভারতে এখানে অনেক বিপ্লবীরা আশ্রয় নিতো । নিস্কাম কর্মযোগে দীক্ষিত হতেন বিপ্লবীরা । ব্রিটিশ পুলীশ এখানে প্রায় প্রায় হানাও দিতো বলে শোনা যায় ।