সতীপীঠ গুহ্যেশ্বরী

সতীপীঠ গুহ্যেশ্বরী

গুহ্যেশ্বরী মন্দিরটি নেপালের কাঠমাণ্ডুতে অবস্থিত। এটি একান্ন সতীপীঠের একটি অন্যতম পীঠ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এখানে সতীর দুই হাঁটু পড়েছিল। Sati peeth Guhyeshwari  সতীপীঠ গুহ্যেশ্বরীর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বাগমতী নদী। আদি পশুপতিনাথ মন্দিরের থেকে এর দূরত্ব মাত্র এক কিলোমিটার। এখানে অধিষ্ঠিত দেবী মহাশিরা এবং ভৈরব হলেন কপালী। এই সতীপীঠকে আদি শক্তির এক অংশ বলেই ধরা হয়।

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মাতা সতী বাবার কাছে স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে নিজের বাপের বাড়িতেই দেহত্যাগ করেছিলেন। মাতা সতীর দেহত্যাগের খবর মহাদেবের কাছে পৌঁছাতেই মহাদেব সেখানে উপস্থিত হন। সতীর মৃতদেহ দেখে ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেব এই দেহ কাঁধে নিয়ে তান্ডব নৃত্য শুরু করেন। মহাদেবের তান্ডব নৃত্যে পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কায় শ্রীবিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দ্বারা মাতা সতীর দেহ একান্নটি খণ্ডে খণ্ডিত করেন। সেই দেহখণ্ডগুলিই যে যে স্থানে পড়েছিল সেখানে একটি করে সতীপীঠ প্রতিষ্ঠা হয়।

সেই রকম একটি পীঠ গুহ্যেশ্বরী সতীপীঠ। বলা হয় সতীর দুই হাঁটু মাটিতে পড়ে জন্ম হয়েছে এই গুহ্যেশ্বরী সতীপীঠের। গুহ্যেশ্বরী মন্দিরের নামের উৎপত্তির কারণ সম্পর্কে অনেকে মনে করেন যে ‘গুহ্য’ শব্দের অর্থ হল গুহা আর ‘ঈশ্বরী’ হলেন স্বয়ং দেবী। যদিও অনেকেই ‘গুহ্য’কে যোনির সঙ্গে এক করে দেখতে চান। কিন্তু সেই ধারণা ভ্রান্ত। দেবীর যোনি পতিত হয়েছিল কামরূপ-কামাখ্যা সতীপীঠে। ব্রহ্মাণ্ডপুরাণের ‘ললিতাসহস্রনাম’ অধ্যায়ে দেবী ললিতার সহস্র রূপের মধ্যে সাতশো সাততম রূপটি হল গুহ্যরূপিণী।

অনেকে আবার মনে করেন ষোড়শী দেবীর মন্ত্রের যে ষোলোটি অক্ষর তা থেকেই এই গুহ্যরূপিণী নামের উৎপত্তি হয়েছে। নেওয়ারি বজ্রযান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে এই মন্দিরের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের সময় এখানেই নেওয়ারি ভোজের ব্যবস্থা করা হয়। নেওয়ার বজ্রযানী বৌদ্ধরা এই গুহ্যেশ্বরী দেবীকে বজ্রযোগিনী রূপে পূজা করে থাকেন। বজ্রযোগিনী আসলে বজ্রবারাহীর এক বিশেষ অবস্থা যা কিনা কিংবদন্তী উপকথার সেই পবিত্র পদ্মকে সূচিত করে। এই পদ্মের উপরেই স্বয়ম্ভুনাথ বিশ্রাম নেন। বৌদ্ধদের কাছে এই মন্দির কাঠমাণ্ডুর নাভিকুণ্ড এবং ‘বজ্রবারাহী’ কথার অর্থ হল বারাহীর গর্ভতরল।

এই মন্দিরে দেবীর বেদীর নীচে যে জলধারা বয় তাকেই বৌদ্ধরা বারাহীর যোনি নিঃসৃত তরল বা গর্ভতরল বলে মনে করে থাকেন। তাই এই সতীপীঠ হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয়ের কাছেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মনে করা হয়, সপ্তদশ শতকে রাজা প্রতাপ মল্ল এই মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। একটি উন্মুক্ত প্রাঙ্গণের একেবারে মাঝখানে অবস্থিত এই গুহ্যেশ্বরী মন্দির। মন্দিরের চূড়ায় লক্ষ করা যায় চারটি সোনালি বর্ণের পিতলের সর্পের উপস্থিতি যাতে নানাবিধ কারুকার্য খচিত রয়েছে।

কালীতন্ত্র, চণ্ডীতন্ত্র কিংবা শিবতন্ত্ররহস্য গ্রন্থে এই গুহ্যেশ্বরী মন্দিরকে তন্ত্রসাধনার অন্যতম উপযুক্ত পীঠ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই মন্দিরের গঠন অনেকটা ত্রিকোণ যন্ত্রের মত যার চতুষ্কোণ চাতালের মধ্যে দেবীর পীঠস্থান রয়েছে। নেপালের বিখ্যাত পশুপতিনাথ মন্দিরের খুব কাছেই এই গুহ্যেশ্বরী মন্দিরের অবস্থান। এই মন্দিরকে বলা হয় পশুপতিনাথের শক্তিস্থান। গুহ্যেশ্বরী মন্দিরের গঠন অনেকটা প্যাগোডার মতো। এই সতীপীঠে বা শক্তিপীঠে কোনো দেবীমূর্তি নেই।

বরং একটি জলপূর্ণ কলসকে দেবী মহাশিরা রূপে পূজা করা হয় এখানে। এই কলসের উপর সোনা ও রূপোর পুরু স্তর থাকে। একটি পাথরের বেদীর উপরে এই অধিষ্ঠিত থাকে এই কলসটি। পাথরের বেদীটি আসলে একটি প্রাকৃতিক জলধারার গতি রুদ্ধ করে রাখে, কিন্তু তার পরেও পাথরের ধার বেয়ে জলধারা গড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও এখানে রয়েছে ভৈরব কুণ্ড যেখানে ভক্তরা জলে হাত ডুবিয়ে যা কুড়িয়ে পায় দেবীর আশীর্বাদী হিসেবে ভক্তিভরে নিজের কাছে রেখে দেয়।

প্রত্যেকটি সতীপীঠ বা শক্তিপীঠে দেবী এবং ভৈরব অধিষ্ঠিত থাকেন। দেবী হলেন সতীর রূপ। ভৈরব হলেন দেবীর স্বামী। গুহ্যেশ্বরী শক্তিপীঠে দেবী হলেন মহাশিরা এবং ভৈরব হলেন কপালী। প্রাচীনকালে এই গুহ্যেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু করে পশুপতিনাথ হয়ে বসন্তপুরে হনুমান ধোকায় পৌঁছানোর এক শোভাযাত্রাকে বলা হত গুহ্যেশ্বরী যাত্রা। বর্তমানে দশাসিন তথা নবরাত্রির সময় এই মন্দিরে বিশাল আড়ম্বরপূর্ণভাবে উৎসব হয়। এসময় দেবী দুর্গার নানা রূপের ভিন্ন ভিন্ন মূর্তি সজ্জিত হয় মন্দির প্রাঙ্গণ জুড়ে।