শান্তিপুর | নদীয়ায় জেলার ঐতিহাসিক জনপদ শান্তিপুর

শান্তিপুর | নদীয়ায় জেলার ঐতিহাসিক জনপদ শান্তিপুর

নদীয়ার শান্তিপুর একটি সুপ্রাচীন ও ঐতিহাসিক গঙ্গা (সুরধনী) তীরবর্তী জনপদ। প্রায় হাজার বছরের প্রাচীন এই জনপদ বাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতির পীঠস্থান ও বিখ্যাত তাঁত শিল্পের সূতিকাগার। মহাপুরুষ চৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষাগুরু অদ্বৈত আচার্যর সাধনপীঠ শান্তিপুর। শান্তিপুর কিন্তু শুধু চৈতন্যতীর্থই নয়। ইংরেজ আমল পর্যন্ত শহরটির রীতিমতো গুরুত্ব ছিল। এখনও সুরধনী গঙ্গার পাশে ভগ্নস্তূপটির দেওয়াল জুড়ে গোবরের ঘুঁটে দেখা যায়, তা আসলে রেশম কুঠির হাতিশালা। এক সময় শান্তিপুরে প্রচুর নীল ও রেশম চাষ হত। এই রেশম কুঠি সেই ইতিহাসের সাক্ষী। কিন্তু অবহেলা আর অনাদরে আজ তার পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। শুধু এই হাতিশালাটাই কোনও মতে টিকে আছে। বাঙালির ইতিহাসে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ের নিদর্শন চোখের সামনে হারিয়ে গেল।

শহরটির অবস্থানের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ হল ২৩.২৫° উত্তর ৮৮.৪৩° পূর্ব। সমুদ্র সমতল হতে এর গড় উচ্চতা হল ১৫ মিটার (৪৯ ফুট)। ভারতের ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে শান্তিপুর শহরের জনসংখ্যা হল ১৩৮,১৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫১% এবং নারী ৪৯%। এখানে সাক্ষরতার হার ৬৪%। পুরুষদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৬৯% এবং নারীদের মধ্যে এই হার ৫৮%। সারা ভারতের সাক্ষরতার হার ৫৯.৫%, তার চাইতে শান্তিপুর এর সাক্ষরতার হার বেশি। এই শহরের জনসংখ্যার ১২% হল ৬ বছর বা তার কম বয়সী। শান্তিপুরের প্রায় ৭৯.১৫ % মানুষ হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী। এখানে ইসলামে ২০.২৫ %, খ্রিস্ট ধর্মে ০.০৪ %, শিখধর্মে ০.০২ %, বৌদ্ধ ধর্মে ০.০১ %, জৈন ধর্মে ০.০১ % মানুষ বিশ্বাসী। এছাড়া অন্যান্য ধর্মে ০.৪২ % মানুষ বিশ্বাসী ও বিবৃতি নেই এমন মানুষ ০.১১ %।  

প্রাচীন কাল থেকে শান্তিপুর শহরে নানা সময়ে নানা ধর্মের মানুষ বসবাস করছেন। রেখে গিয়েছেন তাঁদের ধর্মচর্চার নিদর্শন। মন্দির, মসজিদ কিংবা ব্রাহ্মসমাজের এ ভাবে ‘গলা জড়াজড়ি’ করে থাকাটাকেই শান্তিপুর শহরকে অন্যদের তুলনায় আলাদা করেছে বলেই দাবি করেন শান্তিপুরের মানুষ। কিন্তু সেই সঙ্গে এই শহরের মানুষের প্রশ্ন-- এত যার বৈচিত্র্য, এত যার বৈভব সেই শান্তিপুর কেন আজও বাংলার পর্যটন মানচিত্রে সে ভাবে জায়গা করে নিতে পারল না? কেনই বা এই শহর তার এত সমৃদ্ধ ইতিহাস আর স্থাপত্য শিল্পকে বুকে নিয়েও নিঃসঙ্গ পড়ে থাকবে?কেন শুধু অনাদরে নষ্ট হয়ে যাবে বিভিন্ন মন্দিরের গায়ে সুদৃশ্য টেরাকোটার কাজ? কেন নীরবে হারিয়ে যাবে নীলচাষের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ঐতিহাসিক নিদর্শন?

দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম পর্যটন স্থল শান্তিপুর। শান্তিপুরের শহরতলি বাবলায়। এই বাবলাই বৈষ্ণবতীর্থ শান্তিপুরের আসল আকর্ষণ। শান্তিপুর বাইপাসের ধারে বাবলা। আমবাগানের মাঝ দিয়ে পথ। আম গাছের ডাল নেমে এসেছে অনেক নীচে। সেই সব ডাল এরিয়ে সাবধানে পৌঁছতে হয় নিমাইয়ের শিক্ষাগুরু অদ্বৈতাচার্যের সাধনপীঠে। অদ্বৈতাচার্যকে নিমাইয়ের শিক্ষাগুরু বললে অবশ্য কম বলা হয়। অদ্বৈত মহাপ্রভুর আদি বাড়ি শান্তিপুর শহরের দক্ষিণে গঙ্গা গর্ভে বিলীন বলে গবেষকদের অভিমত।তার প্রকৃত পৈতৃক বাসভূমি ছিল বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট জেলা তে। চৈতন্যদেব, নিত্যানন্দ মহাপ্রভু ও অদ্বৈতাচার্যের মিলন ঘটেছিল এই শান্তিপুরে।

সন্ন্যাস গ্রহণের পর এই শান্তিপুরেই চৈতন্যের সঙ্গে দেখা হয়েছিল শচীমায়ের। অদ্বৈতাচার্যের বংশেই জন্ম আরেক বৈষ্ণবসাধক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর। তারও স্মৃতিমন্দির রয়েছে শান্তিপুরে। শান্তিপুরের কাছে হরিপুর গ্রামে কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের পৈত্রিক বাসভূমি এবং শান্তিপুর মিউনিসিপাল স্কুলের পাশে কবি করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় ও ফুলিয়ায় আদি কবি রামায়ণ রচয়িতা কৃত্তিবাস ওঝার জন্মস্থান। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর কবিগানের একজন বাধনদার সাতু রায় ও পন্ডিত হরিমোহন প্রামাণিক এর বাড়িও শান্তিপুর।

এছাড়া শান্তিপুরের রাসযাত্রা জগৎ বিখ্যাত এবং দোলযাত্রা, সূত্রাগড় জগদ্ধাত্রী পূজা, হরিপুরের রামনবমী ও অদ্বৈত প্রভুর জন্মতিথি মাঘি সপ্তমী বা মাকড়ি সপ্তমী, বৈশাখ মাসের শেষে রবিবার মুসলিম সম্প্রদায়ের গাজী মিয়ার বিয়ে এখানকার উল্লেখযোগ্য উৎসব ও পরব[২]। বড়গোস্বামী বাড়ি সহ বিভিন্ন গোস্বামী বাড়ি ও গোকুলচাঁদের আটচালা মন্দির এবং অদ্বৈত পৌত্র মথুরেশ গোস্বামী প্রতিষ্ঠিত বড় গোস্বামী বাড়িতে হাজার বছরের প্রাচীন কষ্টি পাথরের রাধারমণ বিগ্রহ (শান্তিপুরের বিখ্যাত রাস উৎসব এই রাধারমন বিগ্রহকে কেন্দ্র করেই সূচনা হয়) এবং অদ্বৈত মহাপ্রভু আনীত নেপালের গণ্ডকী নদী থেকে প্রাপ্ত নারায়ণ শিলা এবং শান্তিপুরের একমাত্র চৈতন্যদেবের ষড়ভূজ মূর্তি বর্তমান।

শান্তিপুর বিধানসভা কেন্দ্র হল নদিয়া জেলার একটি বিধানসভা কেন্দ্র। ভারতের সীমানা পুনর্নির্ধারণ কমিশনের নির্দেশিকা অনুসারে ৮৬ নম্বর শান্তিপুর বিধানসভা কেন্দ্রটি শান্তিপুর পুরসভা, বাবলা, বাগানছরা, বেলগরিয়া-১, বেলগরিয়া-২, গয়েশপুর ও হরিপুর গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি শান্তিপুর সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকের অন্তর্গত। শান্তিপুর বিধানসভা কেন্দ্রটি ১৩ নম্বর রানাঘাট লোকসভা কেন্দ্রের (তফসিলি জাতি) অন্তর্গত। আগে এই কেন্দ্রটি নবদ্বীপ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ছিল।

২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রদেশ যুব কংগ্রেসের সভাপতি অরিন্দম ভট্টাচার্য ছ'বারের বিধায়ক অজয় দে'কে পরাজিত করেছিলেন। অরিন্দম ভট্টাচার্য একজন তরুণ নেতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন বিশেষজ্ঞ তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বিকে হারিয়ে জয়লাভ করেছিলেন। তিনি ১০৩,৫৬৬ টি ভোট পেয়ে ৫২.২৫ শতাংশ মার্জিনে ঐতিহাসিক জয়লাভ করেছিলেন। ২০১৪ সালের উপনির্বাচনে বিধায়ক অজয় দে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। তার আগে ২০১১ সালের নির্বাচনে তৎকালীন কংগ্রেসের অজয় দে করেছিলেন।

২০০৬, ২০০১, ১৯৯৬ ও ১৯৯১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের অজয় ​​দে শান্তিপুর কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন। সিপিআইএমের শান্তনু চক্রবর্তী, নির্দলের বাদল বসাক, আরসিপিআইয়ের বিমলানন্দ মুখোপাধ্যায় ও আরসিপিআইয়ের অসীম ঘোষকে পরাজিত করেছিলেন। পাশাপাশি জনতা পার্টির জ্ঞানেন্দ্রনাথ প্রামাণিককে ওই বছরগুলিতে পরাজিত করেছিলেন। ১৯৭২ সালে কংগ্রেসের আষ্মাজা দে এই আসনে জয়ী হয়েছিলেন। তার আগে ১৯৭১ সালে বিমলানন্দ মুখোপাধ্যায় জিতেছিলেন। ১৯৬৯ সালে আরসিপিআইয়ের এম. মোকশাদ আলি জয়ী হয়েছিলেন।১৯৬৭ সালে সিপিআইএমের কে পাল জয়ী হয়েছিলেন।১৯৬২ সালে নির্দলের কানাই পাল এই আসনে জয়ী হয়েছিেন।১৯৫৭ সালে কংগ্রেসের হরিদাস দে জয়ী হয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে দেশের প্রথম নির্বাচনে কংগ্রেসের শশিভূষণ খান শান্তিপুর কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন। 

শ্রী অদ্বৈত চারিয়া (১৪৬০-১৫৫৮ সাল)র অদ্বৈতমঙ্গলে শান্তিপুরের তাঁত হস্ত শিল্পের কথা লিখিত আছে। নথি অনুযায়ী ১৪০৯ সালে গৌড়ের রাজা গণেশ দানু সাধনদেবের সময়ে শান্তিপুরে প্রথম শাড়ি বোনার সূচনা হয়। পূর্বে বিভিন্ন জাতের তাঁতিদের একটি বড় অংশ বৈষ্ণব ধর্মে দিক্ষিত হয়ে, ধামরাই (অধুনা বাংলাদেশ) থেকে নবদ্বীপে স্থানান্তরিত হয়েছিল। তারা ভগবান মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের পায়ে থিতু হতে চেয়েছিল। মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যদেব তাদের উপদেশ দিয়েছিলেন, শান্তিপুরের শ্রী অদ্বৈত চারিয়ার কাছে যেতে। তারা তখন শান্তিপুরে বসবাস করতে শুরু করেন এবং তাদের চিরাচরিত তাঁত শিল্প চালিয়ে যেতে থাকে। রাজা রুদ্র দেব রায়ের (১৬৮৩- ১৬৯৪) সময় থেকে বাণিজ্যিক ভাবে শাড়ি বোনার ঝোঁক বাড়তে থাকে। পরবর্তী কালে তাদের তৈরী শাড়ি শান্তিপুরী শাড়ি নামে পরিচিত হয়।স্বাধীনতার পরে, যখন বাংলাদেশের তাঁতিরা বা তাঁদের পূর্বপুরুষেরা পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ থেকে শান্তিপুরে চলে আসে তখন শান্তিপুরের তাঁত শিল্পের বাড়বাড়ন্ত হয়। 

শান্তিপুরের তাঁত বয়ন শিল্পে তিন ধরনের ব্যবস্থা লক্ষ করা গিয়েছে। প্রথমত, স্বাধীন তাঁতি, যাঁরা মহাজন বা তৃতীয় কোন ব্যক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাধীন ভাবে কাজ করেন। কাঁচামাল আনা থেকে শুরু করে কাপড় বোনা এবং উৎপাদিত দ্রব্য বাজারে বিক্রি করা—সবই নিজেরাই করে থাকেন। শান্তিপুরে এ ধরনের তাঁতির সংখ্যা এক সময়ে প্রচুর হলেও এখন বেশ কম। দ্বিতীয়ত, পরাধীন তাঁতি, যারা খুব গরিব এবং এর জন্য তাঁরা সম্পূর্ণ ভাবে মহাজনের উপর নির্ভর করে থাকেন। শান্তিপুর তাঁত বয়ন কেন্দ্রে এঁদের সংখ্যা সব থেকে বেশি, এঁরাই এই শিল্পের প্রাথমিক কারিগর। প্রাথমিক বিনিয়োগ থেকে শুরু করে কাঁচামাল আনা, উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রি— পুরোটাই মহাজন নির্ভর। আর সেই সুযোগে মহাজনেরা তাঁদের ইচ্ছেমতো গরিব তাঁতিদের ব্যবহার ও শোষণ করে থাকেন। তৃতীয় গোত্রের তাঁতিরা সংখ্যায় বেশ কম হলেও তাঁদের অবস্থাই তুলনামূলক ভাবে ভাল। এঁরা কোনও একটি নির্দিষ্ট সমবায়ের অধীন কাজ করেন এবং ওই সমবায় তাঁদের যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে থাকে।