শান্তিপুর রাসের গোড়ার কথা

শান্তিপুর রাসের গোড়ার কথা

মলয় দে    শান্তিপুর :- নদীয়ার অদ্বৈতভূমি  শান্তিপুর ও চৈতন্যভূমি নবদ্বীপের রাস উৎসব জগৎবিখ্যাত।রাস নিয়ে রয়েছে এক সুবিশাল কাহিনী।শ্রীমদ্ভগবৎ অনুযায়ী,রাসের যে পৌরাণিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তাতে বলা হয়, শ্রীধাম বৃন্দাবনে রসরাজ শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের সঙ্গে রাসলীলা করতেন। সে রাসে অংশ নিতেন সকল গোপিনীরা। তারা সকলে ষোড়োশীভাবে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে রসাস্বাদনে মিলিত হতেন।রাস অঙ্গনে শ্রীকৃষ্ণ ব্যাতিত অন্য পুরুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। কিন্তু দেবাদিদেব মহাদেবের একবার ইচ্ছা হল তিনি সেই রাস দর্শন করবেন।

তিনি শ্রীকৃষ্ণের মহিমা সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন তার স্ত্রী যোগমায়াকে।পুরাণে আছে, যোগমায়াও নাকি সেই রাসলীলায় যোগদান করতে ছুটে গিয়েছিলেন।মহাদেব ছদ্মবেশে গেলেন রাসমঞ্চের কাছে।কিন্তু অন্তর্যামী শ্রীকৃষ্ণ সে বিষয়টি অনুভব করলেন।রাসলীলায় দ্বিতীয় পুরুষের উপস্থিতি গোপিনীরাও বুঝতে পারলেন।ইতিমধ্যে যোগমায়াই তাঁর স্বামীকে চিনতে পারলেন রাস কুঞ্জে  এবং ভর্ৎসনা করে রাস অঙ্গন ছেড়ে চলে যেতে বললেন।

মহাদেব ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, “ঠিক আছে, রাস না দেখে আমি চলে যাচ্ছি ঠিকই। কিন্তু কলি যুগে আমি সমগ্র বিশ্ববাসীকে এই রাস দর্শন করাবো।" বৈষ্ণব ধর্মালবম্বীদের বিশ্বাস, দ্বাপর যুগের সেই মহাদেবই কলিতে অবতীর্ণ হলেন অদ্বৈতাচার্যের রূপে।অদ্বৈতাচার্যই শান্তিপুরে রাস উৎসব শুরু করেন। নেপালের গণ্ডকী নদী থেকে তিনি একটি নারায়ণ শিলা পেয়েছিলেন, প্রথমে সেই নারায়ণ শিলা দিয়েই রাস পুজো শুরু হয়।তারপর বৃন্দাবন থেকে রাধার সখী বিশাখা নির্মিত একটি শ্রীকৃষ্ণের চিত্রপট তিনি শান্তিপুর নিয়ে আসেন।

সেই পৌরাণিক আখ্যা অনুযায়ী, শান্তিপুরের বিখ্যাত মদনগোপাল বিগ্রহের রূপদান করা হয়। অদ্বৈতাচার্যের রাস উৎসবের বিশেষ প্রচার শুরু হয়। একে সব অদ্বৈত অনুগামী গোস্বামী বাড়িতে এই উৎসব পালিত হতে থাকে।রাস পূর্ণিমা তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহকে ঘিরে নাম সংকীর্তন, রাত্রিকালীন বিশেষ পুজো, সাজসজ্জা ইত্যাদি হত।কথিত আছে, বড় গোস্বামীর সেই রাধারমণ আগে একা পুজিত হতেন।কিন্তু প্রায় ৩৫০ বছর আগে রাধারমণের এই বিগ্রহ একবার অন্তর্হিত হয়।লোকেরা বিশ্বাস করেন যে, শ্রীকৃষ্ণ একা আছেন বলেই হয়ত অন্তর্হিত হয়েছেন।

ঠিক তখনই এক অষ্টধাতুর রাধিকা মূর্তি নির্মাণ করা হয় বড় গোস্বামী বাড়িতে।এবং রাস পূর্ণিমার পুণ্য তিথিতে শ্রীরাধারমনের সেই যুগল মূর্তি স্থাপনা করা হয়।রাধিকার নাম দেওয়া হয় শ্রীমতী।শ্রীমতীর এই অভিষেক তিথি একরকম লৌকিক বিবাহ বলা চলে।বিবাহের পর তাদের সামাজিক পরিচিতি দিতে হবে।সুতরাং নির্ধারিত হয় যে রাধারমণ শ্রীমতীর যুগল বিগ্রহ নিয়ে নগর পরিক্রমা করা হবে।তারপরই স্বর্ণালংকারে সজ্জিত করা হয় যুগল মূর্তিকে।মখমলের কাপড়ে মোড়া হাওদায় তোলা হয়, আতরদানি, পিকদানি ফুল দিয়ে সাজানো হয় হাওদা এবং ভক্তবৃন্দ কাঁধে করে সেই হাওদা নিয়ে নগর পরিক্রমায় বেড়োন।

রাস উৎসবের তৃতীয় দিনে এই শোভাযাত্রা শুরু হয়। যা আজকের ভাঙ্গারাস হিসেবে বিখ্যাত।প্রাণের ঠাকুর প্রেমের দেবতাকে কাছাকাছি পেয়ে শান্তিপুরের ধর্মপ্রাণ মানুষ আপ্লুত হন। শোভাযাত্রার পর যুগল বিগ্রহ মন্দিরেই এনে রাখা হয়।পরদিন ভক্তেরা দর্শন করার পর যার যার মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়।  রাসকুঞ্জ ভেঙে দিয়ে রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহের এই ঘরে ফেরার অনুষ্ঠানকেই “কুঞ্জভঙ্গের ঠাকুর নাচ” উৎসব বলা হয় ।

গোস্বামী বাড়ি থেকে এই রাস উৎসবের প্রথা ছড়িয়ে পড়ে সারা শান্তিপুরময়।  প্রত্যেকটি গোস্বামী বাড়ির নহবতের আহির ভৈরবের সুর সকল শান্তিপুরবাসীর মনকে ভরিয়ে তোলে এক অনাবিল আনন্দে। প্রতিটি বিগ্রহ সোনার গয়নায়, মখমলের সাজে জ্বলজ্বল করে ওঠে।ফুলের সাজে হাওদা, প্রাচীন কালের বেলোয়ারি ফানুসে মোমবাতির স্নিগ্ধ আলোয়, পরম্পরা এবং প্রাচীন ধারায় বিভিন্ন সাবেকি উপকরণ দিয়ে রাসমঞ্চ সেজে ওঠে আজও।

ধর্মীয় ধারা পালন, প্রথা, নিষ্ঠা পরম্পরাই রাস উৎসবের প্রধান অলঙ্কার। রাস মঞ্চে শ্রীকৃষ্ণের মনোমুগ্ধকর রূপ দেখে মনে অপরিসীম ভক্তির সঞ্চার হয়. বৈষ্ণবভাবসম্পন্ন এই প্রাচীন ধারা আজও অব্যাহত একইভাবে শান্তিপুরে। বাংলার তথা হিন্দু ধর্মের এ এক মনোমুগ্ধকর উৎসব।অদ্বৈতাচার্য দেহ রাখার ৩০০ বছর পর তার বংশে আনন্দ কিশোর গোস্বামী বলে একজন একবার এক  ভীষণ পন করলেন। দন্ডি কেটে জগন্নাথধাম যাত্রা করলেন এবং জগন্নাথের মূর্তির সামনে আছড়ে পড়ে প্রার্থনা করলেন,জগন্নাথদেবকে উনি পুত্র রূপে পেতে চান।

সেই মুহূর্তে জগন্নাথের মূর্তি থেকে এক জ্যোতি বেরিয়ে এসে ওনার শরীরে প্রবেশ করলো, উনি অচৈতন্য অবস্থায় পরে রইলেন মাটিতে।কিছুদিন পর স্বর্ণময়ী এবং আনন্দ কিশোরের ঘরে জন্ম নিল এক পুত্রসন্তান। আনন্দ কিশোর তার নাম রাখলেন, বিজয়কৃষ্ণ।  ছোটবেলা থেকেই বিজয়কৃষ্ণ খেলা করতেন তাদের আরাধ্য পারিবারিক দেবতা শ্যাম সুন্দরের সঙ্গে। তার করুণা অপার, তার মহিমা অসীম।বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী তার জীবনের শুরুতে নিরাকার আধাত্ম সাধনায় নিযুক্ত ছিলেন।ব্রাহ্সমাজের একজন প্রধান হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন এবং ব্রাহ্ম সমাজেই থাকতেন।বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর জীবনী পড়লে জানা যায় যে,তার দীক্ষা হয়েছিল স্বপ্নে।

তারপরেই তাঁকে ব্রহ্ম জ্ঞান ছেড়ে কৃষ্ণ নাম নিতে আদেশ দেন অদ্বৈতাচার্য।বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী বৈষ্ণবকূলের গুরু হিসেবে পুজিত  হন সেই থেকেই।শ্যামসুন্দর তারই গৃহ দেবতা এবং শান্তিপুরের অনেক বিগ্রহের মধ্যে একটি।এই প্রাচীন ধারায় শ্যাম সুন্দরও ফুলের হাওদায় উঠে ভাঙা রাসের দিন নগর পরিক্রমা করতে বেরোন।সঙ্গে যান গোঁসাই। বিশ্বাস, ভক্তি, ঈশ্বর মহিমা এই শব্দগুলো আজ বড়ো অচেনা শোনায়। যান্ত্রিক জীবনে ঈশ্বরের জায়গা সঠিক নির্ধারণ করা খুব কঠিন।

দৈনন্দিনের মাঝে ঈশ্বর জ্ঞান, ঈশ্বর চিন্তা এগুলোর জন্য আলাদা করে সময় বের করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। তবুও যখন কোথাও কোথাও উৎসবের ছলে, পুজোর ছলে মূর্তি পুজোর ছলে ঈশ্বর নামক সেই অপার্থিবের আরাধনা দেখে  ভাবতে ইচ্ছে করে কোথাও হয়তো সত্য এখনও অবিনশ্বর।

সোনার গয়নায়, ফুলের সাজে, ঢাকের শব্দে, লাল মখমলে মোড়া হাওদায়, আতরের গন্ধে, ফানুসের মধ্যে মোমবাতির আলোয় কোথায় যেন মনে হয় সেই রাস কুঞ্জই  রচনা করার চেষ্টা করে চলেছে মানুষ। কিছু ধর্মপ্রাণ মানুষ, যাদের মধ্যে এখনো ঈশ্বর বোধ, জীবনের মূল্যবোধ কিছুটা হলেও অবশিষ্ট আছে. এই কলিযুগে ঈশ্বরের অবস্থান কোথায় জানা নেই।তবে এই পুরাতন আচার পরম্পরা মেনে যে রাস  উৎসব পালন করা হয়ে আসছে। এখনও শান্তিপুরে তা দেখে বিশ্বাস করতে হয়। তবে কথায় আছে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।