সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনী

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ রাষ্ট্রগুরু  সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনী

রাষ্ট্রগুরু, সামুদ্রিক ঝড়ের পাখি, Surrender not যার নামের প্রথম বসে তিনি সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। (১৮৪৮-১৯২৫)  জাতীয়তাবাদী নেতা। ১৮৪৮ সালের ১০ নভেম্বর কলকাতায় এক কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে সুরেন্দ্রনাথের জন্ম। পিতা ডাক্তার দুর্গাচরণ ব্যানার্জী, স্কুলজীবনে প্যারেন্টাল একাডেমিক ইনস্টিটিউশন ও হিন্দু কলেজ থেকে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী তাঁর আধুনিক উদারতাবাদী ধারণা আত্মস্থ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে তিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে অংশগ্রহণের জন্য ইংল্যান্ডে যান।

তিনি ১৮৬৯ সালে ঐ পরীক্ষা পাস করেও তাঁর সঠিক বয়স নিয়ে বির্তক সৃষ্টি হওয়ায় আদালতে বিষয়টির নিষ্পত্তির পরই তিনি ১৮৭১ সালে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফলকাম হন। এরপর তিনি সিলেটে সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ পান। তবে শীঘ্রই তিনি বর্ণ বৈষম্যের কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত হন এবং তাঁর বরখাস্তের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করতে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। তাঁর সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

১৮৭৪-৭৫ সালে লন্ডনে তাঁর অবস্থানকালে তিনি বার্ক, মাৎসিনি ও পাশ্চাত্যের অন্যান্য উদারতাবাদী চিন্তাবিদদের লেখা গভীর মনোনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করেন। ভারতে ফিরে এসে সুরেন্দ্রনাথ শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি প্রথমে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন, পরে ফ্রি চার্চ কলেজ এবং অবশেষে তাঁর পরিকল্পিত রিপন কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হন। শিক্ষক হিসেবে তিনি তাঁর ছাত্রদের সদ্যোজাত ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নব চেতনায় উদ্দীপ্ত করেন। এ সময় তিনি কলকাতায় ও কলকাতার বাইরে ‘ভারতীয় ঐক্য’, ‘মাৎসিনির জীবন ও চিন্তাধারা’ এবং ‘শিবাজি ও শিখদের ইতিহাস’ ইত্যাদি বিষয়ে জনসমক্ষে বক্তৃতা দেওয়া শুরু করেন।

তাঁর বাকপটুতা ভারতীয়দের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। এখানে উল্লেখ্য যে, ঊনিশ শতকের সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনসমূহ ভারতীয়দের মনকে ইতোমধ্যেই নাড়া দিয়েছিল। সুরেন্দ্রনাথ তাদের মনকে সামাজিক সংস্কারসাধন থেকে রাজনৈতিক নবজাগরণের দিকে চালিত করেন। ভারতের জাতীয় উদ্দেশ্য সাধনে এটাই সুরেন্দ্রনাথের অদ্বিতীয় অবদান।  সুরেন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগরিত করেছিলেন এবং ১৮৭৬ সালের ২৬ জুলাই ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন গঠনের মাধ্যমে তা বাস্তবরূপ দানের প্রচেষ্টা চালান।

তিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার্থীদের বয়স-সীমা কমানোর বিরোধিতা করেন। বিষয়টি ছিল ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে ইংরেজি শিক্ষিত ভারতীয়দের সর্বজনীন অভিযোগ। এজন্য তিনি সমগ্র ভারতব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা অভিযান চালান। বিষয়টি তাঁকে অধিক জনপ্রিয় করে তোলে।  সুরেন্দ্রনাথ তাঁর সংবাদপত্র Bengali-তে মন্তব্য করার জন্য আদালত অবমাননার দায়ে কারাদন্ডাদেশ পেলে তার প্রতিবাদে সমগ্র বাংলাব্যাপী ‘হরতাল’ পালিত হয়। সে সঙ্গে আপামর জনতার মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা প্রজ্বলিত হয়, এমনকি আগ্রা, ফয়েজাবাদ, অমৃতসর, লাহোর, পুনা ও আরও অনেক স্থানে জনগণের প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

১৮৮৩ সাল থেকে সুরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বার্ষিক অধিবেশন পরিচালনা করে, যেখানে ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু ১৮৮৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যখন কলকাতায় দ্বিতীয় সেশনে মিলিত হয় তখন সুরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ঐ সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলটির সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। তখন থেকে তিনি কংগ্রেসে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন এবং ১৮৯৫ ও ১৯০৭ এ দুবছর তিনি এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সুরেন্দ্রনাথের অদ্বিতীয় নেতৃত্বের দক্ষতা স্পষ্টভাবে প্রদর্শিত হয়েছে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সৃষ্টি ও স্বদেশী আন্দোলনে, যা তাঁকে বাংলার ‘মুকুটহীন রাজা’-য় পরিণত করে।

ঐ সময় তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অগ্রগতির শীর্ষে অবস্থান করছিলেন, কিন্তু শীঘ্রই তাঁর পড়ন্ত অবস্থা শুরু হয়। কংগ্রেসের অভ্যন্তরে মধ্যপন্থী ও চরমপন্থীদের মাঝে তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হলে তা ক্রমাগত মধ্যপন্থীদের পতনের সূচনা করে। সুরেন্দ্রনাথ ছিলেন মধ্যপন্থীদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। হোম রুল লীগের গঠন ও গান্ধীর উত্থান ভারতীয় জনগণকে একটি নতুন রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নিয়ে আসলে মধ্যপন্থীগণ একেবারে ম্লান হয়ে যান।

তিনি ১৯১৯ সালের আইনে প্রস্তাবিত সংস্কারসমূহ সমর্থন করেন ও মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন। ফলে তাঁর জনপ্রিয়তা অনেকটা হ্রাস পায়। এটা জোর দিয়ে বলা যায় যে, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনে জনগণ যেটুকু কর্তৃত্ব পেয়েছে তা তাঁর প্রচেষ্টার ফল। সরকার তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর সকল কার্যক্রম জনগণের অনুমোদন লাভ করেনি এবং তিনি ১৯২৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গীয় আইন পরিষদে (Bengal Legislative Council) নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হন। এর কিছুকাল পর তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন।

শিক্ষক হিসেবে স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছাত্রদেরকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত, অনুপ্রাণিত তথা উদ্বুদ্ধ করতে অত্যন্ত মূল্যবান ভূমিকা পালন করেন। একই সাথে তিনি ভারতীয়দের একতাবদ্ধতা-সহ বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা দিতে শুরু করেন। উনবিংশ শতকে রাজা রামমোহন রায়ের নির্দেশিত সমাজ-ধর্ম বিষয়ক পুনর্জাগরণের আন্দোলনকে আরো বেগবান করতে বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন।

কিন্তু সুরেন্দ্রনাথ কর্তৃক অনুসৃত সামাজিক সংস্কারে সমাজ সচেতন ব্যক্তিদের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ডামাডোলের কারণে সে সকল উদ্যোগ তেমন একটা সফলতা পায়নি! এছাড়াও সমাজ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে অংশগ্রহণ হিসেবে, বিশেষত বিধবা বিবাহ, মেয়েদের অধিক বয়সে বিবাহ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন। ইংরেজির প্রফেসর হিসেবে প্রথমে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন এবং পরে ফ্রী চার্চ কলেজে নিয়োজিত ছিলেন। সর্বশেষে রিপন কলেজে যোগ দেন। পরবর্তীকালে এই রিপন কলেজই তার নামে নামকরণ করা হয় সুরেন্দ্রনাথ কলেজ হিসেবে।

 ১৯০৫ সালে সুরেন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন এবং স্বদেশী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এর ফলে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে। পরবর্তীতে তিনি মতানৈক্যজনিত কারণে ১৯১৮ সালে কংগ্রেস থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। এবং মধ্যপন্থী হিসেবে হিন্দু-মুসলিম উভয় পক্ষকে একীকরণের জন্য তিনি উদ্যোগী হন। ১৯২১ সালে তিনি নাইট উপাধি লাভ করেন এবং বাংলায় তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী হিসেবে ১৯২১ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত দেশের সেবায় মনোনিবেশ ঘটান।  ৬ই আগস্ট, ১৯২৫; স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ৭৭ বৎসর বয়সে প্রয়াত হন।  তিনি আজ শুধু মাত্র একটি কলেজের নাম ও একটি রাস্তার নাম হিসেবেই থেকে গিয়েছেন। কিন্তু বাঙালিকে শিড়দাঁড়াটা সঠিক শিড়দাঁড়ার অবস্থানে রাখতে শিখিয়েছিলেন তিনিই।