তারাপীঠ | দ্বারকা নদীর তীরে অবস্থিত বীরভূম জেলার মন্দিরনগরী তারাপীঠ

তারাপীঠ |  দ্বারকা নদীর তীরে অবস্থিত  বীরভূম  জেলার মন্দিরনগরী তারাপীঠ

তারাপীঠ বীরভূম জেলার Tarapith তারাপীঠ থানার অধীনস্থ দ্বারকা নদীর তীরে অবস্থিত একটি ছোট্ট গ্রাম।এটি দ্বারকা নদীর তীরে অবস্থিত। দেবী তারার মন্দির ও মন্দির-সংলগ্ন শ্মশানক্ষেত্রের জন্য বিখ্যাত তারাপীঠ। এই মন্দির ও শ্মশান হিন্দুদের একটি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র।  তারাপীঠ এখানকার সাধক বামাক্ষ্যাপার জন্যও প্রসিদ্ধ। বামাক্ষেপা এই মন্দিরে পূজা করতেন এবং মন্দির-সংলগ্ন শ্মশানক্ষেত্রে কৈলাসপতি বাবা নামে এক তান্ত্রিকের কাছে তন্ত্রসাধনা করতেন। 

মন্দিরের অদূরেই আটলা গ্রামে তাঁর আশ্রম অবস্থিত। প্লাবন সমভূমির সবুজ ধানক্ষেতের মধ্যে এই তীর্থস্থান অবস্থিত। তীর্থমাহাত্ম্যের কারণে প্রচুর জনসমাগম হওয়ায় গ্রামটি ছোটোখাটো শহরের আকার নিয়েছে।কথিত আছে সতীর তৃতীয় নয়ন তারাপীঠ গ্রামে পড়ে এবং প্রস্তরীভূত হয়ে যায়।ঋষি বশিষ্ঠ প্রথম এই রূপটি দেখতে পান এবং সতীকে তারা রূপে পূজা করেন। অপর একটি কিংবদন্তি অনুসারে সমুদ্র মন্থনের সময় উত্থিত হলাহল বিষ পান করার পর বিষের জ্বালায় শিবের কণ্ঠ জ্বলতে শুরু করে।

এই সময় তারাদেবী শিবকে  স্তন্য পান করিয়ে তার জ্বালা নিবারণ করেন। স্থানীয় কিংবদন্তী অনুসারে, বশিষ্ঠ তারাপীঠ নামে প্রসিদ্ধ এই তীর্থে দেবী সতীর পূজা শুরু করেন।অপর একটি কিংবদন্তী অনুসারে, বশিষ্ঠ এখানে তারাদেবীর তপস্যা করেছিলেন। কিন্তু তিনি অসফল হন। তখন তিনি তিব্বতে গিয়ে বিষ্ণুর অবতার বুদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বুদ্ধ তাকে বামমার্গে মদ্যমাংসাদি পঞ্চমকার সহ তারাদেবীর পূজা করতে বলেন। এই সময় বুদ্ধ ধ্যানযোগে জানতে পারেন মন্দিরে তারামূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজার করার আদর্শ স্থান হল তারাপীঠ।

বুদ্ধের উপদেশক্রমে বশিষ্ঠ তারাপীঠে এসে ৩ লক্ষ বার তারা মন্ত্র জপ করেন। তারপর তারাদেবী বশিষ্ঠের সম্মুখে উপস্থিত হন। বশিষ্ঠ দেবীকে অনুরোধ করেন বুদ্ধ যে শিশু শিবকে স্তন্যপানরতা তারাদেবীকে ধ্যানে দেখেছিলেন, দেবী যেন সেই রূপেই তাকে দর্শন দেন। দেবী সেই রূপেই বশিষ্ঠকে দর্শন দেন এবং এই রূপটি প্রস্তরীভূত হয়। সেই থেকে তারাপীঠ মন্দিরে শিশু শিবকে স্তন্যপানরতা মূর্তিতে দেবী তারা পূজিত হয়ে আসছেন।

 তারাপীঠ মন্দিরটি উত্তরমুখী আটচালা লাল ইঁটে নির্মিত। উপরিভাগে শিখর পর্যন্ত একাধিক ধনুকাকৃতি খিলান উঠেছে। চারচালার ওপরে চার কোণে চারটি ছোট ছোট চূড়া অবস্থিত। মন্দিরের প্রবেশপথের মধ্য খিলানের ওপর দুর্গার প্রতিকৃতি রয়েছে। উত্তরদিকে বামপাশের খিলানের ওপর কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ঘটনা, ভীষ্মের শরশয্যা প্রভৃতি মহাভারতের কাহিনী উৎকীর্ণ রয়েছে।

মন্দিরের উত্তর ভিতের পূর্বদিকে সীতাহরণ, অকালবোধন, রাম ও রাবণের যুদ্ধের দৃশ্য এবং পশ্চিমদিকে কৃষ্ণলীলার চিত্র খোদিত আছে। শিশু শিবকে স্তন্যপানরতা তারার মূল প্রস্তরমূর্তিটি একটি তিন ফুট উঁচু ধাতব মূর্তির মধ্যে রাখা থাকে। দর্শনার্থীরা সাধারণত ধাতব মূর্তিটিই দর্শন করে থাকেন। এই মূর্তিটি তারা দেবীর ভীষণা চতুর্ভূজা, মুণ্ডমালাধারিণী এবং লোলজিহ্বা মূর্তি। মূর্তির মাথার উপরে থাকে একটি রূপোর ছাতা। তারাপীঠে শিব চন্দ্রচূড় হিসেবে পূজিত হন। এই মন্দির নির্মাণ করেন জয়দত্ত বণিক নামক ত্রয়োদশ শতাব্দীর এক বণিক পরিবারের সন্তান। মন্দিরটি মাঝারি আকারের গম্বুজাকৃতি ও তারা মন্দিরের পূর্বদিকে অবস্থিত। 

ভক্তরা এই মন্দিরে প্রবেশের পূর্বে মন্দির-সংলগ্ন জীবিতকুন্ড নামক পবিত্র জলাশয়ে স্নান করেন। তারপর মন্দিরে প্রবেশ করে পূজা দেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই জলাশয়ের জলে আরোগ্যক্ষমতা বিদ্যমান।[মন্দিরে রোজই পশুবলি হয়ে থাকে। ভক্তেরা এই মন্দিরে ছাগ বলি দিয়ে থাকেন। বলির পূর্বে ছাগটিকে পবিত্র জলাশয়ে স্নান করানো হয়। বলিদাতা নিজেও স্নান করে পবিত্র হন।  প্রতি বছর আশ্বিন মাসের কোজাগরি শুক্লা চতুর্দশী তিথিতে মন্দির থেকে শিলামূর্তি এনে পশ্চিমমুখো করে বিরাম মঞ্চে রাখা হয় এবং সেইদিন প্রকাশ্যে তারামূর্তিকে স্নান করানো হয়ে থাকে।

তারাপীঠ  মহাশ্মশানটি এই শক্তিপীঠের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তারা দেবীকে শ্মশানের অন্ধকারে বলিপ্রদত্ত ছাগের রক্ত পান করতে দেখা যায়।তন্ত্রসাধকরা বিশ্বাস করেন নরকঙ্কাল ও শ্মশানক্ষেত্র তারা দেবীর বিশেষ প্রিয়। দেবীর যে সকল চিত্র আঁকা হয়ে থাকে, তাতে তাকে শ্মশানক্ষেত্রনিবাসিনী রূপেই দেখানো হয়। এই কারণে তন্ত্রসাধকেরা শ্মশানক্ষেত্রকেই তাদের সাধনস্থল হিসেবে বেছে নেন।   তারাপীঠে প্রতি বছর কৌশিকী অমাবস্যা উপলক্ষে বিশেষ নিশি পূজার আয়োজন করা হয়। মহাভোগ ও মহা রাজবেশে মায়ের এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই অমাবস্যাকে ‘তারা রাত্রি’ও বলা হয়।

তারাপীঠ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ও মা তারার একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন সাধক বামাক্ষ্যাপা। ১২ ফাল্গুন ১২৪৪ বঙ্গাব্দে বীরভূমে বামাক্ষ্যাপার জন্ম। তার পিতা ছিলেন সর্বানন্দ চট্টোপাধ্যায়। বামক্ষ্যাপার প্রকৃত নাম বামচরণ চট্টোপাধ্যায়।  তিনি দেবী তারার ভক্ত ছিলেন এবং মন্দিরের কাছে শ্মশানঘাটে সাধনা করতেন। অল্প বয়সেই তিনি গৃহত্যাগ করেন এবং কৈলাসপতি বাবার সান্নিধ্যে তন্ত্রসাধনা শুরু করেন।

কথিত আছে,মা তারা শ্মশানক্ষেত্রে ভীষণা বেশে বামাক্ষ্যাপাকে দর্শন দিয়ে তাকে স্তন্যপান করিয়েছিলেন। বামাক্ষ্যাপা ছিলেন তারাদেবীর একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনি মন্দিরে পূজা করতেন এবং শ্মশানে সাধনা করতেন। তিনি তারাপীঠ নিকটবর্তী মল্লরাজাদের মন্দিরময় গ্রাম মালুটি তে সাধনা করেন। তিনি মন্দিরের নিয়ম মানতেন না। একবার নৈবেদ্য নিবেদনের পূর্বে খেয়ে ফেলে তিনি পুরোহিতদের রোষের মুখে  পড়েছিলেন। শোনা যায়, এরপর তারাদেবী নাটোরের মহারানিকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বামাক্ষ্যাপাকে প্রথমে ভোজন করাতে আদেশ দেন। এরপর থেকে মন্দিরে দেবীকে নৈবেদ্য নিবেদনের পূর্বে বামাক্ষ্যাপাকে ভোজন করানো হত এবং কেউ তাকে বাধা দিতেন না।