থাইল্যান্ড

থাইল্যান্ড

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজ্যের মধ্যে থাইল্যান্ড একমাত্র দেশ যা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকীকরণের শিকার হয় নি। তিনি খুব কমই বেসামরিক যুদ্ধ এবং জাতিগত দ্বন্দ্বের অভিজ্ঞতা করার চেষ্টা করেছিলেন। এই দেশের ইতিহাসে যেমন একটি উল্লেখযোগ্য সত্য সংজ্ঞাটি প্রতিফলিত হয়েছিল, যা প্রায়শই থাইল্যান্ডের বাসিন্দাদের দ্বারা দেওয়া হয় - "স্বাধীন জনগণের দেশ।" থাইল্যান্ড বা তাইল্যান্ড (থাই: ประเทศไทย প্রথেশ্থাই অর্থাৎ "তাই প্রদেশ") দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি রাষ্ট্র। এর সরকারি নাম তাইরাজ্য (থাই: ราชอาณาจักรไทย রাচ্ ক্সাণাচক থাই অর্থাৎ "তাই রাজ্য")। এর বৃহত্তম শহর ও রাজধানীর নাম ব্যাংকক। থাইল্যান্ড একমাত্র দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্র যা যুদ্ধকালীন সময় ব্যতীত কখনও কোন ইউরোপীয় বা বিদেশী শক্তির নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ১৭৮২ সাল থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত দেশটিতে পরম রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। ১৯৩২ সালে বিদ্রোহীরা একটি অভ্যুত্থান ঘটায় এবং দেশে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত থাইল্যান্ড বহু সামরিক ও বেসামরিক সরকারের অধীনে শাসিত হয়েছে। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত দেশটি শ্যামদেশ (থাই: สยาม সায়াম্‌) নামে পরিচিত ছিল। ঐ বছর এর নাম বদলে থাইল্যান্ড রাখা হয়।

তবে ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে আবারও একে শ্যামদেশ নামে ডাকা হত। ১৯৪৯ সালে দ্বিতীয়বারের মত থাইল্যান্ড নামটি গ্রহণ করা হয়। থাইল্যান্ডের মধ্যভাগে রয়েছে একটি বিস্তীর্ণ উর্বর সমভূমি। এই সমভূমির মধ্য দিয়ে দেশের প্রধান নদী চাও ফ্রায়া এবং এর শাখানদী ও উপনদীগুলি প্রবাহিত হয়েছে। এই অঞ্চলে দেশের ধান ও অন্যান্য ফসলের অধিকাংশের আবাদ হয়। মধ্যভাগের সমভূমির পশ্চিম, উত্তর ও পূর্ব দিক ঘিরে রেখেছে পাহাড় ও মালভূমি। পশ্চিমের পর্বতশ্রেণী দক্ষিণ দিকে মালয় উপদ্বীপে প্রসারিত হয়েছে। থাইল্যান্ডের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর ব্যাংকক চাও ফ্রায়া নদীর মোহনায় থাইল্যান্ড উপসাগরের তীরে অবস্থিত। থাইল্যান্ডের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ থাই জাতির মানুষ। এরা প্রায় সবাই থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম পালন করে। থাইল্যান্ডে বসবাসকারী অন্যান্য জাতির মধ্যে আছে চীনা, মালয় ও আদিবাসী পাহাড়ি জাতি, যেমন মং ও কারেন। থাইল্যান্ডের পরিশীলিত ধ্রুপদী সঙ্গীত ও নৃত্য এবং লোকশিল্প বিখ্যাত। কৃষিপ্রধান দেশ হলেও ১৯৮০-র দশক থেকে থাইল্যান্ডের অর্থনীতির দ্রুত উন্নতি ঘটছে।

ইতিহাস   বান চিয়াং সংস্কৃতির সময় থেকেই থাইল্যান্ডে বিভিন্ন স্থানীয় সংস্কৃতি বিরাজ করছিল। তবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এর সংস্কৃতিতে ভারত, চীন এবং অন্যান্য দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রতিবেশীর সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে। প্রথম সিয়ামিজ/থাই রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় বৌদ্ধ সুখোথাই (থাই: สุโขทัย সুখোঠাই, অর্থাৎ "সুখোদয়") সাম্রাজ্যকে, যার সূচনা হয় ১২৩৮ সালে। চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে বৃহত্তর সিয়ামিজ সাম্রাজ্য আয়ুত্থাইয়া (থাই: อยุธยา আয়ুট্‌ঠায়া, মূলতঃ অয়ুধ্যা) প্রাধান্য লাভ করে। ১৪৩১ সালে সিয়ামিজ সৈন্য কর্তৃক অ্যাংকর লুণ্ঠনের পর অ্যাংকরের অনেক হিন্দু প্রথা ও আচার-অনুষ্ঠান সিয়ামের সংস্কৃতির অংশ হয়ে পড়ে। ১৭৬৭ সালে বর্মীদের হাতে আয়ুত্থাইয়ার পতনের পর কিছুকাল রাজা তাকসিনের (থাই:টাক্‌সিন্‌) অধীনে থোনবুরি (থাই:ঠোন্‌বুরি, অর্থাৎ "ধনপুর") থাইল্যান্ডের রাজধানী ছিলো।

১৭৮২ সালে রাজা প্রথম রাম চাকরি সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ব্যাংকককে বেছে নেন। ষোড়শ শতাব্দী থেকে থাইল্যান্ডে ইউরোপীয় শক্তিগুলির আগমন ঘটতে থাকে। তবে তাদের প্রচুর চাপ সত্ত্বেও থাইল্যান্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র দেশ যা কোন ইউরোপীয় শক্তির উপনিবেশে পরিণত হয়নি। এর প্রধান দু'টি কারণ হলঃ সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে থাইল্যান্ডে ধারাবাহিকভাবে যোগ্য শাসকের শাসন এবং ব্রিটিশ ও ফরাসিদের মধ্যকার শত্রুতার সুযোগ নেয়া। অবশ্য ইউরোপীয় চাপের কারণে তারা ঊনবিংশ শতকে বিভিন্ন সংস্কার করতে বাধ্য হয় এবং ব্রিটিশদের ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য কিছু বড় ছাড় দিতে হয়।

উদাহরণস্বরূপ, ১৯০৯ সালে অ্যাংলো-সিয়ামিজ চুক্তির ফলে তারা দক্ষিণের তিনটি প্রদেশ হারায় যা পরবর্তীতে মালয়েশিয়ার তিনটি উত্তর প্রদেশে পরিণত হয়। ১৯৩২ সালে একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের ফলে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে থাইল্যান্ড জাপানের পক্ষ নেয়, তবে যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রে পরিণত হয়। থাইল্যান্ড উপর্যুপরি বেশ কিছু সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যায়। ১৯৮০-এর দশকে তাদের গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটে। ২০০৬ সালের ১৯শে সেপ্টেম্বর সামরিক বাহিনী থাকসিন সিনাওয়াত্রার (থাই: ทักษิณ ชินวัตร ঠাক্‌সিন্‌ ছিন্নাওয়াট্‌ [tʰáksǐn tɕʰinnawát]) নির্বাচিত সরকারকে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত করে।

 রাজনীতি   থাইল্যান্ড একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। ১৯৯২ সাল থেকে ২০০৬-এর কু পর্যন্ত দেশটি একটি কার্যকর গণতন্ত্র হিসেবেই বিবেচিত হয়েছিল। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে একটি বহুদলীয়, মুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশটিতে গণতন্ত্র পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়। থাইল্যান্ডের সংবিধানে রাজাকে খুব কম ক্ষমতাই দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি জাতীয় পরিচয় ও ঐক্যের প্রতীক। থাইল্যান্ডের বর্তমান রাজা হলেন রাজা ভূমিবল অতুল্যতেজ (থাই: ภูมิพลอดุลยเดช ফুমিফোন্‌ আটুন্‌য়াডেট্‌")। তিনি ১৯৪৬ সালে থেকে এখানে রাজপদে অধিষ্ঠিত আছেন এবং জনগণের উপর তাঁর বিরাট প্রভাব রয়েছে। তিনি কখনও কখনও রাজনৈতিক সংকট মীমাংসায় এগিয়ে এসেছেন। ২০০৭ সালের সংবিধান অনুযায়ী থাইল্যান্ডের জাতীয় আইনসভা দুইটি কক্ষে বিভক্ত - সিনেট বা উচ্চকক্ষ এবং প্রতিনিধিসভা বা নিম্নকক্ষ।

উচ্চকক্ষের সদস্যসংখ্যা ১৫০; এদের মধ্যে ৭৬ জন জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতি প্রদেশ থেকে ১ জন করে নির্বাচিত হয়ে আসেন। বাকী ৭৪ জন সিনেট সদস্য নির্বাচন কমিশনের তৈরি করা একটি তালিকা থেকে বিচারক ও ঊর্ধ্বতন অফিসারদের দ্বারা বাছাই হন। নিম্নকক্ষে ৪৮০ জন সদস্য, এবং এদের মধ্যে ৪০০ জন থাইল্যান্ডের বিভিন্ন জেলা ও নির্বাচনী এলাকা থেকে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। বাকীদেরকে বিভিন্ন দলের তৈরি করা তালিকা থেকে আনুপাতিক হারে বাছাই করা হয়। থাইল্যান্ডের আইন ব্যবস্থাতে ঐতিহ্যবাহী থাই এবং পশ্চিমা আইনের সম্মিলন ঘটেছে।

সংবিধান অনুসারে সাংবিধানিক আদালত হল আপিল বিভাগের সর্বোচ্চ আদালত। বিচারক, সংসদীয় নেতা এবং ঊর্ধ্বতন নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের একটি কমিটি সাংবিধানিক আদালতের সদস্যদের মনোনয়ন দেন। সিনেট তাদের মনোনয়ন নিশ্চিত করে এবং রাজা তাদেরকে কাজে নিয়োগ দেন। বিচার বিভাগের আদালতগুলো ফৌজদারী ও দেওয়ানী মামলাগুলি পরিচালনা করে। এগুলি কোর্ট অভ ফার্স্ট ইনস্ট্যান্স, কোর্ট অভ আপিল্‌স এবং সুপ্রিম কোর্ট --- এই তিন স্তরে বিভক্ত। থাইল্যান্ডের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, যেখানে মুসলমানেরা সংখ্যাগুরু, সেখানে প্রাদেশিক ইসলামী কমিটিসমূহ সীমত পরিসরে পারিবারিক, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত শালিশ পরিচালনা করতে পারে। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের গভর্নর জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। কিন্তু থাইল্যান্ডের বাকী ৭৫টি প্রদেশের গভর্নর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নিযুক্ত হন।

 থাই ভাষার আদর্শ রূপ থাইল্যান্ডের সরকারি ভাষা। এই আদর্শ থাই ভাষাতে এখানকার প্রায় ৪০% লোক কথা বলেন। এছাড়া থাই ভাষার অন্যান্য উপভাষায় আরও প্রায় ৫০% লোক কথা বলেন। থা ইল্যান্ডে আরও প্রায় ৭০টি ভাষা প্রচলিত। এদের মধ্যে দক্ষিণ মিন ভাষা (চীনা ভাষার একটি উপভাষা, যার বক্তাসংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ), মালয় ভাষা (বক্তাসংখ্যা প্রায় ২৪ লক্ষ), এবং খমের ভাষা (বক্তাসংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ) উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়। থাইল্যান্ড - সবচেয়ে উন্নত পর্যটন দেশ এশিয়া। বৈষম্যমূলক দর্শনীয় স্থানগুলি দেখতে এবং সবচেয়ে সুন্দর গ্রীষ্মমন্ডলীয় সৈকতগুলিতে শিথিল করা এবং কেনাকাটা করার জন্য সবচেয়ে সুন্দর একটিতেই সবচেয়ে সুন্দর দর্শনীয় সৈকতগুলি দেখতে বার্ষিক লক্ষ লক্ষ বিদেশিরা তার কাছে উপস্থিত হন। যৌন পর্যটন শেষ না। অনেকেই এই উদ্দেশ্যে থাইল্যান্ডে আসেন, কারণ এখানে এই পরিষেবাগুলিতে দাম সর্বনিম্ন বিশ্বের অন্যতম।