ডিভাইসের ফাঁদে বিশ্বজুড়ে ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করলো এফবিআই

ডিভাইসের ফাঁদে বিশ্বজুড়ে ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করলো এফবিআই

বিশ্বজুড়ে ৮০০ জনের বেশি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ধরা পড়েছেন তারা। এ অপারেশনে এফবিআইয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপোলসহ বিভিন্ন দেশের পুলিশ যুক্ত ছিল। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশাল ছদ্মবেশী কৌশল বা স্টিং অপারেশন চালাতে অপরাধীদের ব্যবহৃত ডিভাইসে বিশেষ নজরদারির কৌশল নেওয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার এ তথ্য জানানো হয়।  স্টিং অপারেশনে পুলিশের কর্মকর্তারা বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়াদের বার্তা পড়তে পারতেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এফবিআই চালিত অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করায় অপরাধী চক্রের অজান্তেই রিয়েল টাইমে নজরদারির সুযোগ পেয়ে যান পুলিশ কর্মকর্তারা। এফবিআইয়ের সঙ্গে এ অপারেশনে যুক্ত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দারা। তাঁরা তিন বছর ধরে অপারেশনটি চালু রেখেছিলেন। গোপনে ‘এএনওএম’ নামের একটি ডিভাইস অপরাধীদের মধ্যে বিতরণ করেছে। ডিভাইসে থাকা অ্যাপের মাধ্যমে গোপনে মাদক বিক্রি, অস্ত্র চোরাচালানের মতো কর্মকাণ্ডের তথ্য তাঁদের কাছে পৌঁছেছে। এএফপি জানায়, এফবিআই এ অপারেশনের নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন ট্রোজান শিল্ড’। এফবিআই, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পুলিশ সংস্থা ইউরোপোল ও অন্যান্য দেশের পুলিশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অপারেশন থেকে প্রাপ্ত প্রমাণের ফলে অন্তত ১০০টি হত্যাকাণ্ড রোধ করা গেছে।

এ ছাড়া বেশ কয়েকটি বড় আকারের মাদক চোরাচালান ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে ইউরোপোলের প্রধান কার্যালয়ে এফবিআইয়ের সহকারী পরিচালক কেলভিন শ্রিভার্স বলেন, ‘ফলাফল বিস্ময়কর।’ শ্রিভার্স আরও বলেন, এফবিআই ১০০টির বেশি দেশে গত দেড় বছর ধরে অপরাধী চক্রের হাতে ডিভাইস পৌঁছে দিয়েছে, যাতে তাদের যোগাযোগ কার্যক্রমে নজরদারি করা যায়। ইউরোপোল জানায়, ১৬টি দেশের পুলিশ ফোন থেকে পাওয়া তথ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়েছে। বিশ্বে ১২ হাজার ডিভাইস বিতরণ করা হয়েছে।

 ইউরোপোলের অপারেশন বিভাগের উপপরিচালক জন-ফিলিপ লেকুফি বলেন, অপারেশনে প্রাপ্ত তথ্য থেকে শত শত অপারেশন চালানো হয়। নিউজিল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্র—সবখানেই এ অভিযান চালিয়ে দারুণ ফল পাওয়া গেছে। এ অভিযানে ৮০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, ৭০০–এর বেশি জায়গায় অনুসন্ধান এবং ৮ টনের বেশি কোকেন উদ্ধার করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ বলেছে, এফবিআইয়ের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মাফিয়া, এশিয়ার অপরাধী চক্র, মাদক মাফিয়া ও মোটরসাইকেল গ্যাংয়ের মধ্যে এনক্রিপটেড ডিভাইস পৌঁছানো হয়। শুধু অস্ট্রেলিয়াতেই এই অপারেশনের অংশ হিসেবে ২০০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রেসিডেন্ট স্কট মরিসন বলেছেন, ‘এ অভিযান সংগঠিত অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে শুধু দেশেই প্রচণ্ড আঘাত হানবে না, বরং বিশ্বজুড়ে এর প্রতিফলন ঘটবে।’ 

 দীর্ঘমেয়াদি এই অভিযানের অংশ হিসেবে দুই বছর ধরে অপরাধী চক্রের ব্যবহার করা দুটি এনক্রিপটেড ফোন নেটওয়ার্ক এনক্রোচ্যাট ও স্কাইগ্লোবালে বিঘ্ন ঘটানো হয়। নিউজিল্যান্ডের পুলিশ জানায়, এ দুটি এনক্রিপটেড যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেওয়ার ফলে এনক্রিপটেড যোগাযোগের বাজারে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়। এ শূন্যতা দূর করতে এফবিআই নিজস্ব এনক্রিপটেড ডিভাইস কোম্পানি এএনওএম চালু করে। এফবিআইয়ের সহকারী পরিচালক শ্রিভার্স বলেন, ‘এএনওএম চালু করার পরই অপরাধী চক্রের ওপর নজরদারি করার সুযোগ তৈরি হয়।

আমরা ফল শিপমেন্টের আড়ালে বা মুখবন্ধ ক্যান পাঠানোর আড়ালে শত শত টন কোকেন পাঠানোর ছবি দেখতে পাই।’ এফবিআই যে ডিভাইস সরবরাহ করত, তাতে কোনো ই–মেইল, ফোনকল বা জিপিএস সেবা ছিল না। এতে কেবল অন্য এএনওএম ডিভাইসে বার্তা পাঠানোর সুবিধা রয়েছে। এগুলো কালোবাজারে দুই হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়। এই ডিভাইস ব্যবহার করতে বর্তমানে কোনো ব্যবহারকারীর কোড প্রয়োজন হয়। শ্রিভার্স বলেন, এ ধরনের ডিভাইসের খোঁজে অনেকেই তাদের কাছে এসেছিল। এই ডিভাইস ছড়িয়ে দিতে ও আস্থা অর্জনে অস্ট্রেলিয়ার এজেন্সি সহায়তা করে। এর মধ্যে গত মার্চ মাসে একজন ব্লগার এএনওএমের নিরাপত্তা ত্রুটির কথা জানিয়ে দেন।

এ ছাড়া ডিভাইসটি অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ ফাইভআইস ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেন। পরে তিনি পোস্টটি মুছে ফেলেন। অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশ বলেছে, অপারেশনের ফলে দেশটিতে ২২৪ জনের বিরুদ্ধে ৫০০টির বেশি অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া ছয়টি আন্ডারগ্রাউন্ড ওষুধের কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের পুলিশ বলছে, দেশটিতে ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।