ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট  বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট Indian Statistical Institute ১৯৩১ সালে স্থাপিত, ভারতের অন্যতম ঐতিয্যপূর্ণ এই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিসংখ্যান গবেষণাতে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আদলে উত্তর ক্যরোলিনার বিখ্যাত গবেষণা ত্রিভুজে উত্তর আমেরিকার প্রথম পরিসংখ্যানতত্ত্বের প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়। আই.এস.আই. এর সদর দপ্তর কলকাতার বরানগরে স্থাপিত।

এছারাও এই প্রতিষ্ঠানের বেঙ্গালুরু, দিল্লি, চেন্নাই ও তেজপুরে চারটি শাখা রয়েছে। তা ছারাও মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, পুনে, গিরিডি, বরোদা ও কোয়েমবাটুরে আই.এস.আই. এর কার্যালয় রয়েছে।১৯৩১ সালে প্রাথমিকভাবে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ প্রাঙ্গণে একটি প্রধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানরূপে দি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয় এবং ১৯৩২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি নিবন্ধিত হয়।

বিশ শতকের বিশের দশকে প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রফেসর প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে ঘিরে জড়ো হওয়া একদল তরুণ গবেষক এ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছিলেন।প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে অনার্সসহ ডিগ্রি পরীক্ষা শেষ করে ১৯১৫ সালে কেম্ব্রিজ থেকে ফিরে এসে মহলানবিশ কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিদ্যায় অধ্যাপনা শুরু করেন। কেম্ব্রিজ ত্যাগের সামান্য আগে তাঁর শিক্ষক ডব্লিউ.এইচ মেকলে তাঁর সঙ্গে কার্ল পিয়ার্সনের ‘বায়োমেট্রিক টেবলস’ এবং সাময়িকী বায়োমেট্রিকার পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বায়োমেট্রিকার সম্পূর্ণ সেট সঙ্গে করে কলকাতায় ফিরে আসেন।

এ সব সাময়িকী অধ্যায়ন করে তিনি পরিসংখ্যান বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে শুরু করেন। ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষাপদ্ধতি তদন্ত করার জন্য তদানীন্তন দর্শনের অধ্যাপক ব্রজেন্দ্রনাথ শীলকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করে। শীল বায়োমেট্রি (biometry) বা প্রাণের সম্ভাব্য আয়ু নির্ধারণের পরিসাংখ্যনিক জ্ঞানের সাম্প্রতিক বিকাশের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।

পরিসাংখ্যনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে গবেষণা কাজে সহায়তা করার জন্য তিনি মহলানবিশকে অনুরোধ করেন। এটিই মহলানবিশকে পরিসাংখ্যনিক সমস্যা সম্পর্কে ব্যবহারিক কাজ শুরু করতে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯২৬ সালে মহলানবিশ ইংল্যান্ডে প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ আর.এ. ফিশারের সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং সরেজমিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফিশারীয় পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হন।

১৯২৭ সালে মহলানবিশ প্রেসিডেন্সি কলেজে একটি পরিসাংখ্যনিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেন। কলেজে তিনি তাঁর নিজের অফিসকক্ষকে ভাগ করে গবেষণাগারের জায়গার ব্যবস্থা করেন। ১৯২৬ সাল থেকে একযুগ ধরে এ পরিসাংখ্যনিক গবেষণাগার কৃষিসংক্রান্ত তথ্যানুসন্ধানে পরিসাংখ্যনিক পদ্ধতি প্রয়োগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কেন্দ্রবিন্দুরূপে কাজ করতে থাকে। ১৯৩১ সাল থেকে ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ’-এর অনুদান এগুলির ব্যয়ভার বহন করে।

১৯৩১ সালে এ গবেষণাগারের গবেষকগণ ভারতে একটি পরিসংখ্যান সমিতি প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৩১ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (অর্থনীতির মিন্টো প্রফেসর), নিখিলরঞ্জন সেন (ফলিত গণিত শাস্ত্রের খয়রা প্রফেসর) এবং প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের স্বাক্ষরে একটি জনসভা আহবান করা হয়। প্রখ্যাত শিল্পপতি আর.এন মুখোপাধ্যায় এতে সভাপতিত্ব করেন। এ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

১৮৬০ সালের ‘সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট XXI’ এর অধীনে ১৯৩২ সালের ২৮ এপ্রিল অলাভজনক একটি বিদ্বান সমিতি রূপে এটি নিবন্ধিত হয়। লিঙ্গ, বর্ণ, ধর্ম, শ্রেণী বা জাতীয়তা নির্বিশেষে পরিসংখ্যানে উৎসাহী সকল ব্যক্তির জন্য এর সদস্যপদ উন্মুক্ত ছিল। ইনস্টিটিউটের প্রাথমিক বছরগুলিতে বছরে দশ থেকে বারটি সভার ব্যবস্থা করে পরিসংখ্যানের তাত্ত্বিক ও ফলিত সমস্যাবলি সম্পর্কে বক্তৃতা ও আলোচনা করা হতো।

ভারতের সব এলাকা থেকে আসা পরিসাংখ্যনিক বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নের জবাব দেওয়া ছিল তখন ইনস্টিটিউটের কাজের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৪২ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত পরিসরে পরিসাংখ্যনিক সমস্যা সম্পর্কিত প্রশ্নের মোট সংখ্যা ছিল ১৩০। ইনস্টিটিউটের গবেষণালব্ধ ফল প্রকাশ করার জন্য ১৯৩৩ সালে সংখ্যা নামে একটি সাময়িকীর প্রকাশ শুরু হয়।

একটি বৃহৎ এলাকায় এলোপাথাড়িভাবে নমুনা পরীক্ষা করে জমির পরিমাণ ও ফসল উৎপাদনের আনুমানিক হিসাব করার নতুন কৌশল উদ্ভাবন করা হয় এবং ১৯৩৭ সালে তা বাংলা প্রদেশের পাটের ফলনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। ১৯৩৮ সালের জানুয়ারিতে কলকাতায় প্রথম ভারতীয় পরিসংখ্যান সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আর.এ ফিশার এতে সভাপতিত্ব করেন।

ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের জুবিলি অধিবেশনের অব্যবহিত পরই এটা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরে ১৯৪৫ সাল থেকে সায়েন্স কংগ্রেস পরিসংখ্যানের জন্য একটি আলাদা বিভাগ শুরু করতে সম্মত হয়। ১৯৫৯ সালে পার্লামেন্ট ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটকে জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন ইনস্টিটিউটরূপে ঘোষণা করে এবং এটিকে পরিসংখ্যানে ডিগ্রি প্রদান করার ক্ষমতা দান করে। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে ইনস্টিটিউটটিকে প্রেসিডেন্সি কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে সরিয়ে ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোডের পাশে এর বর্তমান প্রাঙ্গণে স্থানান্তর করা হয়।

১৯৫০ সালে আই এস আই আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউট, জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ও কেন্দ্রীয় সরকারের সাহাজ্যে আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানগত শিক্ষা সেন্টার তৈরি করে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, ও আফ্রিকা কমনওয়েলথ দেশগুলির ছাত্রদের তাত্ত্বিক ও ফলিত পরিসংখ্যানে শিক্ষা প্রদান করবার জন্য। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানগত শিক্ষা সেন্টারে যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তা সাধারনত স্নাতকদের জন্য। ইংরেজি ও গণিত এ দক্ষ স্নাতকদের প্রশিক্ষণে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।