পদার্থবিদ্যায় ব্ল্যাকহোল নিয়েই গবেষণাকেই স্বীকৃতি দিল নোবেল কমিটি

পদার্থবিদ্যায় ব্ল্যাকহোল নিয়েই গবেষণাকেই স্বীকৃতি দিল নোবেল কমিটি

আজবাংলা      কৃষ্ণগহ্বর এক সুতোয় বেঁধে দিল ব্রিটেন, জার্মানি আর আমেরিকাকে! কৃষ্ণগহ্বর একত্রে বেঁধে দিল ৮৯, ৬৮ আর ৫৫ বছর বয়সকেও। কেননা এ বছর পদার্থবিদ্যায় ব্ল্যাকহোল নিয়েই গবেষণাকেই স্বীকৃতি দিল নোবেল কমিটি। এবং এই সূত্রে নব্বইয়ের দরজায় পৌঁছে যাওয়া রজার পেনরোজও অবশেষে নোবেল পুরস্কারের মুখ দেখলেন।

ব্রিটেনের পেনরোজ ছাড়াও প্রাপকদের তালিকায় রয়েছেন জার্মানির রেইনহার্ড গেঞ্জেল এবং আমেরিকার আন্দ্রে গেজ। প্রসঙ্গত, আন্দ্রে গেজ নোবেলের ইতিহাসে চতুর্থতম মহিলা যিনি পদার্থবিদ্যায় এই সম্মান পেলেন। তিনি বলেওছেন, তিনি আশা করেন তিনি নিশ্চয়ই অনেক মহিলাকে বিষয়টির প্রতি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হবেন।

প্রসঙ্গত গেঞ্জেল ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া এবং জার্মানির 'মাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অফ এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিক্স'-এর সঙ্গে যুক্ত।আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি যে ব্ল্যাকহোল নামে মহাশূন্যের রাক্ষসের হদিস দেয়, তা স্বয়ং আইনস্টাইনও বিশ্বাস করেননি। সে জন্য আইনস্টাইনকে বলা হয় ‘রিলাকট্যান্ট ফাদার অব ব্ল্যাকহোল’।

তাঁরই ফর্মুলা যে ব্ল্যাকহোলের হদিস দিতে পারে, সে কাহিনি দীর্ঘ। অনেক পদার্থবিজ্ঞানী এ কাজে যুক্ত। যাঁরা কেউ মানেননি যে, আইনস্টাইনই ঠিক বলছেন। আমাদের সুব্রহ্মণ্যম চন্দ্রশেখর ওই বিজ্ঞানীকূলে অন্যতম। স্যর রজার এমনই এক জন বিজ্ঞানী যে, তিনিও মানেননি আইনস্টাইনের অবিশ্বাস। প্রমাণ করে ছেড়েছিলেন আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি ব্ল্যাকহোলের হদিস দিচ্ছে। 

এই মহাবিশ্ব-রহস্যের সব চেয়ে আকর্ষণীয় একটি বিষয়ে আবিষ্কারের জন্যই এই পদার্থবিদেরা এই পুরস্কার পেলেন-- এমনটাই জানিয়েছে নোবেল কমিটি। রজার এই সম্মানে ভূষিত হলেন কারণ, তিনিই 'জেনারেল থিয়োরি অফ রিলেটিভিটি'ই যে ব্ল্যাকহোলের অভিমুখে নিয়ে যায়, এই প্রজ্ঞা প্রকাশ করেছিলেন। অন্য দিকে, গেঞ্জেল ও গেজ এই সম্মান পেলেন কারণ তাঁরাই আবিষ্কার করেছেন এই তথ্য, আমাদের গ্যালাক্সির একেবারে কেন্দ্রে তারাদের কক্ষপথকে নিয়ন্ত্রণ করে অদৃশ্য ও প্রচণ্ড ভারী এক বস্তু।

কিন্তু ব্ল্যাকহোল বস্তুটি কী?

ব্ল্যাকহোল এই মহাবিশ্বের প্রচণ্ড ঘন এক বস্তু। এর ভয়ানক শক্তিশালী মহাকর্ষ-ক্ষেত্রও তৈরি হয়। যার হাত থেকেও আলো রেহাই পায় না। আলোকেও শুষে নেয় এটা। পেনরোজ ১৯৬৫ সালেই অঙ্ক কষে প্রমাণ করেছিলেন, ব্ল্যাকহোলের হাত থেকে আলোও পালাতে পারে না। কিন্তু ভয়ানক ঘন এই বস্তুটি তৈরি হয় কী ভাবে? এর পিছনে আছে মৃত তারার ইতিহাস। মহাকর্ষের হাত এড়িয়ে যখন ভেঙে পড়ে কোনও তারা তখনই কৃষ্ণগহ্বর তৈরির সূচনা। 

গেঞ্জেল ও গেজ অবশ্য পেনরোজের অনেক পরে এ সংক্রান্ত গবেষণায় আসেন। তাঁরা গত সহস্রাব্দের নব্বইয়ের দশকে ছায়াপথের 'স্যাজিটেরিয়াস-এ' নিয়ে গবেষণা করতে শুরু করেন। বিশ্বের সব চেয়ে দীর্ঘতম টেলিস্কোপ ব্যবহার করে তাঁরা দারুণ ভারী কিন্তু অদৃশ্য এক বস্তু আবিষ্কার করেন। যে বস্তুটি আমাদের সূর্যের মোট বস্তুপুঞ্জের চেয়ে ৪০ লক্ষ গুণ বেশি।

এই বৃহৎ বস্তুটি তার চারপাশের তারাগুলিকে প্রবল ভাবে টানছে। এই টানাটানির প্রভাবেই আমাদের গ্যালাক্সিতে একটা বিশেষ কম্পন অনুভূত হয়। গেঞ্জেল ও গেজ এমন এক পদ্ধতি তৈরি করেন যাতে মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রের আন্তর্নক্ষত্র গ্যাস ও ধুলোর আস্তরণের মধ্যে দিয়ে দৃষ্টি মেলে ধরা যায়। ইতিমধ্যে ২০১৯ সালের এপ্রিলে মহাকাশচারীদের সৌজন্যে ব্ল্যাকহোলের ফোটোগ্রাফও হাতে পেয়ে গেলেন বিজ্ঞানীরা। সুতরাং গবেষণার ক্ষেত্র ক্রমশই পুষ্ট হতে থাকল। এবং সেই কঠিন কিন্তু মসৃণ পথ ধরেই ব্ল্যাকহোলের আবিষ্কার সম্ভব হল।