মাটি ছাড়াই নির্ঝঞ্ঝাট বিকল্প অর্কিড চাষে উৎসাহ বাড়ছে চাষিদের

মাটি ছাড়াই নির্ঝঞ্ঝাট বিকল্প অর্কিড চাষে উৎসাহ বাড়ছে চাষিদের

  আজবাংলা    :-  সূক্ষ জালের আচ্ছাদনে ঢাকা কাঠা দুয়েকের খেত। যেন লখিন্দরের বাসর ঘর। ‘শেড নেটে’ ঢাকা ওই ঘরেই বড় হচ্ছে ঈশ্বরের নিজস্ব ফুল, অর্কিড। ঠান্ডা, স্যাঁতস্যাঁতে পাহাড়ি এলাকার গাছ হলেও অর্কিডের বিশেষ কিছু প্রজাতি উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে জন্মায়। সেই বিশেষ প্রজাতির অর্কিডের বাণিজ্যিক ভাবে চাষ শুরু হয়েছে বর্ধমান ও নদিয়ায়। পরীক্ষামূলক ভাবে চাষ শুরু করেছেন মুর্শিদাবাদের জনাকয়েক চাষিও।

  থাইল্যান্ড বা তাইওয়ানে পুষ্প শিল্প গড়ে উঠেছে শুধুমাত্র বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড ফুলের চাষের মাধ্যমে। অপরূপ সৌন্দর্য, ফুলের দীর্ঘস্থায়িত্ব, ভেষজ গুণ এমনকি বাস্তুতন্ত্রে বিশ্বাসীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদায় এবং মাটির সঙ্গে দূরত্ব বৃদ্ধির বহুতল আবাসনে নির্ঝঞ্ঝাট এই ফুলের চাষ এখন প্রায় ঘরে ঘরে।হিমালয়ের পূর্বাংশে ঘাসিয়া পাহাড়, থাইল্যান্ড ,বার্মা ,শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ফিলিপিনস, মেক্সিকো, দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার উষ্ণ আদ্র অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবেই এই ফুল দেখা যায়।

বাণিজ্যিকভাবে বাংলাদেশে বেশ খানিকটা সফল পেলেও ভারতে খুব একটা চোখে পড়ে না।তবে ঘরোয়াভাবে বহুবর্ষজীবী পরাশ্রয়ী এই ফুল দেখা যায় অনেকের বাড়িতেই।সপ্তাহে মাটি ছাড়াই দুদিন জল স্প্রে করে স্বল্পপরিচর্যায় পাওয়া যায় দীর্ঘস্থায়ী ফুল। সাতশ'র বেশি অর্কিড জাতীয় ফুল থাকলেও আমাদের দেশে ভেন্ডা ,এরিডিস, ডেনড্রোবিয়াম প্রভৃতি নানান উল্লেখযোগ্য।

তবে বেড়ে ওঠার ভিত্তিতে অর্কিড দু প্রকার সিমপোডিয়াম  অর্থাৎ কান্ডের গোড়া থেকে শাখা বের হয় এবং শাখার অগ্রভাগ থেকে ফুল উৎপাদিত হয় যেমন ক্যাটেলিয়া, ফেলেন পসিস, সিম্পোডিয়াম, অনসিডিয়াম প্রভৃতি ।এবং অন্য একটি প্রজাতি হলো মনোপডিয়াল অর্থাৎ একটি লম্বা কান্ড থাকে যা প্রতিবছর প্রতি ঋতুতে বর্ধনশীল অংশ থেকে পাতা এবং প্রত্যক্ষ থেকে ফুল উৎপাদিত হয় যেমন ভ্যান্ডা, এরিডিস, রিনকোস্টাইলিস গ্রপ্রভিতি।

10 থেকে 30 ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উষ্ণতায় আর্দ্র ফেব্রুয়ারি মাসে যৌন ও অযৌন পদ্ধতিতে টিস্যুকালচারের মাধ্যমে বর্ধনশীল অঞ্চল থেকে চারা গাছ তৈরিকরা যায়।পার্থিব অর্কিড চাষ করতে গেলে, টব গামলা ঝুলন্ত বাস্কেটের তলদেশে কয়লা,  ঝামার টুকরো নারকেলের ছোবড়া প্রভিতির মধ্যে দিয়ে আর্দ্রতা বজায় থাকে। এবং বাতাস থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে।

রাজ্যে প্রধানত ডেনড্রোবিয়াম এবং ক্যাটালিয়া প্রজাতির অর্কিডের চাষ হচ্ছে। বাণিজ্যিক ভাবে অর্কিড চাষে পথ দেখাচ্ছেন বর্ধমানের পূর্বস্থলীর চাষিরা। পিছিয়ে নেই নদিয়ার রানাঘাট ও নাকাশিপাড়াও। ‘‘নাকাশিপাড়ায় দেড় হাজার বর্গমিটার এলাকায় অর্কিডের জমি তৈরি করা হয়েছে।” পরীক্ষামূলক ভাবে চাষ শুরু হয়েছে মুর্শিদাবাদেও। 

বর্ধমানের সহ কৃষি অধিকর্তা জানান, লোহার পাইপ দিয়ে তৈরি দু-আড়াই ফুট উঁচু বিশেষ টেবিলে টবে করে চাষ করা হয় অর্কিড। টবে মাটির বদলে থাকে নারকেলের ছোবড়া। শেডনেট দিয়ে ঘেরা ঘরের মতো দেখতে অর্কিড খেতে সরাসরি রোদের প্রবেশ নিষেধ। সারাদিনে বার বার জল দিয়ে ভিতরের স্যাঁতস্যাঁতে ভাবটা বজায় রাখতে হয়। কেউ আবার কাঠকয়লা বা ইটের টুকরো দিয়েও অর্কিডের জমি তৈরি করেন।

অর্কিড চাষি শঙ্কর দত্ত জানান, তিনি একটি সংস্থার মাধ্যমে তাইল্যান্ড থেকে অর্কিডের চারা সংগ্রহ করছেন। ছ’-সাত ইঞ্চির এক একটি চারার দাম পড়ছে আশি থেকে একশো টাকার মধ্যে। দেড় বছর পরিচর্যার পরে সেই গাছ থেকে নতুন গাছ এবং ফুল দুই-ই পাওয়া যাচ্ছে। একটি অর্কিড পরিণত হতে পনেরো মাস থেকে দেড় বছর সময় নেয়। তারপর তা থেকে দীর্ঘ দিন ধরে ফুল এবং নতুন চারা পাওয়া যায়।

চাষিরা জানাচ্ছেন, একটি অর্কিড ফুলের দাম চল্লিশ বা পঞ্চাশ টাকা। ফুলের পাশাপাশি টব-সহ একটি অর্কিডের দাম আড়াইশো টাকা থেকে শুরু। কিন্তু এত দামী ফুল কিনবে কে? অর্কিড চাষি গৌতম ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘অর্কিডের ফুল দীর্ঘ দিন অবিকৃত থাকে। ফলে গৃহস্থবাড়ি থেকে দামী হোটেল কিংবা রেস্তোরাঁর অন্দরসজ্জার জন্য অর্কিডের বিপুল চাহিদা রয়েছে।’’ ফ্ল্যাটবাড়ির রোদ্দুরহীন বারান্দায় অর্কিডের ঝুলন্ত টবে সময় করে একটু জল। তাহলে পুষ্পপ্রেমীদের আদরের ‘গড’স ওন ফ্লাওয়ার’ ফুটে ওঠা কেবল সময়ের অপেক্ষা।