বিশাল বিশাল মণ্ডপ ও প্রতিমা কাটোয়ার ঐতিহ্যবাহী কার্তিক পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব

বিশাল বিশাল মণ্ডপ ও প্রতিমা কাটোয়ার ঐতিহ্যবাহী কার্তিক পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব

 এবার করোনা পরিস্থিতিতে কাটোয়ায় কার্তিক পুজো উপলক্ষে আড়ম্বর অনেকটাই কম। এবছর ঐতিহ্যবাহী কার্তিক লড়াই অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। দুর্গাপুজোর মতোই মণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।মণ্ডপের বাইরে যাতে একসঙ্গে অনেক দর্শনার্থী ভিড় করতে না পারেন তা নিশ্চিত করার জন্য পুজো কমিটিগুলির কাছে আবেদন রেখেছে জেলা পুলিশ প্রশাসন।

দর্শনার্থীদের মাস্ক পরে রাস্তায় বের হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।সন্ধ্যা ঘনালেই নিষিদ্ধপল্লির ঘরগুলিতে জ্বলে ওঠে বাহারি আলো৷ ঝলমলে পেশাকে নিজেকে সাজিয়ে বাবুদের কাছে আরও মোহময়ী করে তোলার আপ্রাণ প্রয়াস চালিয়ে যান বারবনিতারা। বাবুকে খুশি করে মেলে অর্থ৷  

কিন্তু, যৌনতা ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের পরেও কোথাও যেন খামতি থেকে যেত৷ কখনও কখনও মাতৃত্বের আকাঙ্কায় আকুল হয়ে পড়তেন কাটোয়ার চুনারিপাড়া, হরিসভাপাড়া ও লবনগোলাপাড়ার লাস্যময়ী বারবনিতারা। আর সেই আকুল বেদনা থেকে জন্ম দেওয়া সন্তানলাভের আশঙ্কায় শুরু কার্তিক পুজোর আয়োজন৷ আয়োজনের নিরিখে কাটোয়া শহরের কার্তিক পুজোর রাজ্যজোড়া খ্যাতি রয়েছে।

স্থানীয় ইতিহাস বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কাটোয়া শহরের ঐতিহ্যবাহী এই কার্তিক পুজোর সূচনা হয়েছিল কাটোয়ার নিষিদ্ধপল্লি থেকেই। স্থানীয় ইতিহাসের উপর লেখা একাধিক বই থেকে জানা যায়, কাটোয়া শহরের প্রাচীন নাম ছিল কন্টকনগর। যা ছিল অতীতের ইন্দ্রাণী পরগনার অন্তর্গত। কাটোয়া শহরের উপর দিয়ে বয়ে চলা ভাগীরথী নদী তখন ছিল বাণিজ্যের এক যোগাযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ীরা কাটোয়া বন্দরে বাণিজ্যের জন্য আসতেন। বিশাল বিশাল নৌকায় থাকত পণ্যসামগ্রী৷ দেশ-বিদেশের হরেক মালপত্র কাটোয়ায় আসত৷ কাটোয়ার কাঁসা-পিতলের সামগ্রী যেত দূরান্তে। আর বনিকবাবুদের অনেকেই রাত কাটাতেন কাটোয়ার ভাগীরথীর পাড়ে নিষিদ্ধপল্লিতে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কাটোয়ার কার্তিক পুজো প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন। প্রথম বারবনিতারাই সন্তান লাভের আশায় এই পুজো শুরু করেন৷ পুজো ঘিরে থাকত প্রচুর আয়োজন। আর এই পুজো উপলক্ষে অঢেল টাকা খরচ করে যেতেন তাঁদের বাবুরা। শোভাযাত্রায় আলো বাজনার আয়োজন নিয়ে এক বাবুর সঙ্গে অন্যবাবুর প্রতিযোগীতা হত৷ সেই থেকেই কাটোয়ায় সূচনা হয়েছিল কার্তিক লড়াইয়ের।

কাটোয়া শহরের সেই বারবনিতাদের পল্লি আর নেই৷ কালের স্রোতে ভাগীরথী দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। কিন্তু হারিয়ে যায়নি কার্তিক পুজোর সেই ঐতিহ্য৷ বর্তমানে কার্তিক পুজোর উৎসব হয়ে উঠেছে কাটোয়ার গর্বের৷ এবার কাটোয়া শহরে কার্তিক পুজো উপলক্ষে শুরু হয়ে গিয়েছে লড়াই৷চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর মতই কাটোয়ায় বিখ্যাত কার্তিক পুজো। এই পুজোর জন্য কাটোয়ার বাসিন্দারা সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন। আত্মীয় স্বজনে ভরে ওঠে বাড়িগুলি। উৎসবমুখর হয়ে ওঠে শহর। বিশাল বিশাল মণ্ডপ ও প্রতিমা কাটোয়ার কার্তিক পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব।

অন্যান্যবার কাটোয়ার কার্তিক পুজো বিশেষত ভাসানের শোভাযাত্রা দেখতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অগণিত ভক্ত-দর্শক এই শহরে ভিড় করেন। হোটেলে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় এবার সেই কার্তিক লড়াই বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। তাদের সঙ্গে সহমত পোষন করেছে পুজোর উদ্যোক্তারাও।

করোনা পরিস্থিতিতে এবার পুজোর জৌলুস কমলেও কম বাজেটের মধ্যেই বিভিন্ন থিমের মন্ডপ গড়েছে বেশ কয়েকটি পুজো কমিটি। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লকডাউন, পরিযায়ী শ্রমিক সমস্যা, লকডাউনে কাজ হারানো বাসিন্দাদের কথা, করোনা সচেতনতার ছবি উঠে এসেছে থিমের মন্ডপে।

পুজোর উদ্যোক্তারা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাতে পুজো অনুষ্ঠিত হয় তা নিশ্চিত করতে সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মণ্ডপের ভেতর দর্শকদের ঢুকতে দেওয়া হবে না। বাইরে থেকে মণ্ডপ প্রতিমা দর্শন করতে হবে। সেই সঙ্গে মাস্ক বা ফেস কভারে সবাই যাতে মুখ ঢাকেন তা নিশ্চিত করতে বাড়তি স্বেচ্ছা সেবক নিয়োগ করা হয়েছে।

অনেক জায়গাতেই পুজো মণ্ডপের পাশে মেলা বসে। এবার সেই মেলা বা স্টল বসানো স্থগিত রেখেছে অনেক পূজা কমিটি। কার্তিক পুজো দর্শনে যাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকে, সকলে যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন তা নিশ্চিত করার জন্য বাড়তি নজরদারি চালাবে পুলিশ প্রশাসন।