বেদ | হিন্দু ধর্মের গ্রন্থ Vedas

বেদ |  হিন্দু ধর্মের গ্রন্থ  Vedas

বৈদিক সংস্কৃত ভাষায় রচিত বেদই সংস্কৃত সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন এবং হিন্দু সনাতনধর্মের সর্বপ্রাচীন ধর্মগ্রন্থ। "বেদ" এর অপর নাম "শ্রুতি"। "বেদ" রচনা হওয়ার পূর্বে "বেদ" এর বাণী সমূহ, মুখে মুখে বলা ও শোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। শ্রুতির মাধ্যমেই "বেদ"কে স্মরণে রাখা হতো। এক দিকে বেদ শব্দটি "বিদ্" ধাতু থেকে নিষ্পন্ন। "বিদ্" ধাতুর অর্থ - জানা।

সেজন্য বেদ শব্দের ধাতুগত অর্থ - "জ্ঞান বা বিদ্যা"। এই জ্ঞান দুই প্রকার "পরা" এবং "অপরা"। অলৌকিক জ্ঞান - পরাবিদ্যা। জাগতিক বিষয় সম্বন্ধীয় যাবতীয় লৌকিক জ্ঞান - অপরা বিদ্যা। পরা ও অপরা এই দুই বিদ্যাই স্থান পেয়েছে সেই জন্য বেদকে সর্ব জ্ঞানের ভান্ডার বলা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বেদের বেদত্ব ওই পরাবিদ্যা বা ব্রহ্মবিদ্যা প্রকাশের জন্য।পরাবিদ্যাই শ্রেষ্ঠ বিদ্যা । বেদের ব্যাবহারিক বিভাজনগুলো যথাক্রমে ঋক, সাম, যজু্ঃ ও অথর্ব। বৈদিক ধর্মগ্রন্থ বা শ্রুতি সংহিতা নামে পরিচিত চারটি প্রধান সংকলনকে কেন্দ্র করে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম তিনটি ঐতিহাসিক বৈদিক ধর্মের যজ্ঞ অনুষ্ঠান-সংক্রান্ত:

ঋগ্বেদ অংশে হোতার বা প্রধান পুরোহিত কর্তৃক পঠিত মন্ত্র সংকলিত হয়েছে;

যজুর্বেদ অংশে অধ্বর‍্যু বা অনুষ্ঠাতা পুরোহিত কর্তৃক পঠিত মন্ত্র সংকলিত হয়েছে;

সামবেদ অংশে উদ্গাতার বা মন্ত্রপাঠক পুরোহিত কর্তৃক গীত স্তোত্রগুলি সংকলিত হয়েছে;

অথর্ববেদ অংশে মারণ, উচাটন, বশীকরণ সংক্রান্ত মন্ত্রগুলি সংকলিত হয়েছে।

প্রতিটি ভাগ কে আবার চার স্তরে বিভক্ত করা হয়েছে। স্তরগুলি হচ্ছে, (১) সংহিতা (২) ব্রাহ্মণ (৩) আরণ্যক (৪) উপনিষদ। গুরুশিষ্য পরম্পরায় শ্রুতি অর্থাৎ শ্রবণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেদ আয়ত্ত করা হতো। যেহেতু শোনা বা শ্রুতির মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি ঘটত তাই এ থেকে বেদের এক নাম হয় শ্রুতি। বেদকে ত্রয়ীও বলা হয়। এর কারণ, বেদের মন্ত্রগুলি আগে ছিল বিক্ষিপ্ত অবস্থায়। ব্যাসদেব যজ্ঞে ব্যবহারের সুবিধার্থে মন্ত্রগুলিকে ঋক্, যজুঃ, সাম এই তিন খণ্ডে বিন্যস্ত করেন। তাই বেদের অপর নাম হয় সংহিতা। বেদ চারখানা হলেও চতুর্থ অথর্ববেদ অনেক পরবর্তীকালের রচনা এবং এর কিছু কিছু মন্ত্র প্রথম তিনটি থেকেই নেওয়া হয়েছে।

তাছাড়া যজ্ঞে এর ব্যবহার নেই। অবশ্য বেদকে ত্রয়ী বলার অন্য একটি কারণও আছে এবং তা হলো: এর মন্ত্রগুলি মিতত্ব, অমিতত্ব ও স্বরত্ব এই তিনটি স্বরলক্ষণ দ্বারা বিশেষায়িত, যার ওপর ভিত্তি করে মন্ত্রগুলিকে উপর্যুক্ত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।বেদের রচনাকাল সম্পর্কে অনেক মতভেদ আছে। এ নিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্যও দেখা যায়। উল্লেখ্য যে, বেদ রচনার শুরু থেকে তা সম্পূর্ণ হতে বহুকাল সময় লেগেছে।

সেই কালসীমা মোটামুটিভাবে খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০-৯৫০ অব্দ পর্যন্ত ধরা হয়। ঋক্, সাম, যজু ও অথর্ব এই চারটি বেদের সঙ্গে পরস্পর ঘনিষ্ঠ সন্বন্ধ আছে। ঋকবেদের শাকল শাখাই সমধিক প্রচলিত। তাতে দশটি মন্ডল আছে এবং প্রতি মন্ডলে অনেকগুলি সূক্ত বা দেবতার উদ্দেশ্যে রচিত প্রশস্তি আছে। এই সূক্তগুলির উপাদান হল কয়েকটি মন্ত্র। এই মন্ত্রগুলিকে ঋক্ বলে। ঋক্ সমূহের সংগ্রহ গ্রন্থ বলেই ঋগবেদের এই নাম। কোনও সূক্তে ঋক্ সংখ্যা ৪।৫টি, কোনও সূক্তে ২৫।৩০টিও আছে। কোথাও আরও বেশী আছে।

বেদের বিষয়বস্ত্ত সাধারণভাবে দুই ভাগে বিভক্ত কর্মকান্ড ও জ্ঞানকান্ড। কর্মকান্ডে আছে বিভিন্ন দেবদেবী ও যাগযজ্ঞের বর্ণনা এবং জ্ঞানকান্ডে আছে ব্রহ্মের কথা। কোন দেবতার যজ্ঞ কখন কীভাবে করণীয়, কোন দেবতার কাছে কী কাম্য, কোন যজ্ঞের কী ফল ইত্যাদি কর্মকান্ডের আলোচ্য বিষয়। আর ব্রহ্মের স্বরূপ কী, জগতের সৃষ্টি কীভাবে, ব্রহ্মের সঙ্গে জীবের সম্পর্ক কী এসব আলোচিত হয়েছে জ্ঞানকান্ডে।

জ্ঞানকান্ডই বেদের সারাংশ। এখানে বলা হয়েছে যে, ব্রহ্ম বা ঈশ্বর এক, তিনি সর্বত্র বিরাজমান, তাঁরই বিভিন্ন শক্তির প্রকাশ বিভিন্ন দেবতা। জ্ঞানকান্ডের এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে ভারতীয় দর্শনচিন্তার চরম রূপ উপনিষদের বিকাশ ঘটেছে।ঋগবেদের দশটি মন্ডলে মোট ১০,৫৫২টি ঋক্ নিয়ে ১,০২৮টি সূক্ত আছে। এদের মধ্যে অষ্টম মন্ডলের অন্তর্ভূক্ত ৮০টি ঋক নিয়ে ১১টি সূক্তকে বালখিল্য সূক্ত বলা হয়।

সায়ণাচার্য এগুলিকে ঋগবেদের অন্তর্ভূক্ত বলে স্বীকার করেন না। সেই জন্য তাদের ওপর ভাষ্য রচনা করেন নি। তাদের বাদ দিয়ে ঋগবেদে সূক্ত সংখ্যা দাঁড়ায় ১,০১৭এই এবং ঋক্ সংখ্যা দাঁড়ায় ১০,৪৭২টি। ঋক্, সাম ও যজুর্বেদের মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠ সন্বন্ধ বিদ্যমান। আগেই বলা হয়েছে যাঁর জন্য যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিনি যজমান এবং যাঁরা যজ্ঞ কার্যটি অনুষ্ঠান করছেন তাঁরা ঋত্বিক। এই ঋত্বিকদের মধ্যে শ্রেণী বিভাগ ছিল। যিনি প্রশস্তি পাঠ করতেন তিনি হোতা। তাঁর পাঠন মন্ত্রের সংকলন ঋক্ সংহিতা।

যিনি গান গেয়ে স্তুতি করেন তিনি উদ্গাতা। তাঁর গেয় মন্ত্রের সংকলন হল সাম সংহিতা। যিনি আহুতি দেন তিনি অধ্বর্যু। সেই সময় যে মন্ত্র উচ্চারণ হত তার সংকলন হল যজুঃসংহিতা। মীমাংসার মত ঋক্ ও সাম ছাড়া সব যজুঃ (মীমাংসা সূত ২।১।৩৭)। সুতরাং ঋক্ মিত’ অর্থাৎ পদবদ্ধ, সাম সুরে বাঁধা সঙ্গীত রূপে গেয়, আর যজুঃ ‘অমিত’ অর্থাৎ তা ঋকের মত ছন্দোবদ্ধ নয়। যজুর্বেদ সংহিতার মন্ত্রগুলি গদ্যে রচিত। সুতরাং ঋক্, সাম ও যজুঃ সংহিতা পরস্পর ঘনিষ্ঠ সন্বন্ধে যুক্ত। সম্ভবতঃ একই যজ্ঞে তিন সংহিতার মন্ত্রই ব্যবহার হত।

এই তিন বেদের ঘনিষ্ঠতা সন্বন্ধে আরও কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। আমরা দেখি সামবেদের কৌথুন শাখার ১,৮১০টি ঋক্ আছে।  পুনরুক্তি বাদ দিলে মোট ঋক্ সংখ্যা ১,৬০৩। তাদের মধ্যে ১৯টি বাদে সবই ঋগবেদ হতে নেওয়া। তাদের সম্ভবত ঋগবেদের অন্য শাখা হতে সংগ্রহ করা হয়েছে। এ বিষয়ে নিশ্চিত হবার উপায় নেই। কারণ ঋগবেদের অনেক শাখা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনুরূপভাবে যজুর্বেদ যদিও গদ্যে রচিত, তার মধ্যেও অনেক ঋগবেদের ঋকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বাজসনেয় সংহিতার অর্ধেক মন্ত্র ঋগবেদ হতে নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে অথর্ববেদের সঙ্গেও ঋগবেদের কিছু সংযোগ আছে। অথর্বেদে ছন্দোবদ্ধ মন্ত্রও আছে, গদ্যে রচিত মন্ত্রও আছে। ছন্দোবদ্ধ মন্ত্রকেও ঋক্ বলা হয়। অথর্ববেদের মোট মন্ত্র সংখ্যার এক পঞ্চমাংশ ঋগবেদ সংহিতা হতে নেওয়া। এই সব দেখে মনে হয় ঋগবেদ চারটি বেদের মধ্যে প্রাচীনতম গ্রন্থ। এদের মধ্যে আবার ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে বেদগুলিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। ঋক্, সাম ও যজু নিয়ে পরস্পর ঘনিষ্ঠ সন্বন্ধে যুক্ত তিনটি বেদ এক দিকে এবং চতুর্থ বেদ অথর্ববেদ সংহিতা অন্য দিকে। অথর্ববেদের আবির্ভাব হয়েছিল মনে হয় এদের অনেক পরে। এই প্রতিপাদ্যের সপক্ষে কিছু প্রমাণ স্থাপন কর যায়।

 প্রথমত লক্ষ্য করা যেতে পারে, অথর্ববেদের প্রকৃতি অন্য তিন বেদ হতে ভিন্ন। সেটা বুঝতে হলে অথর্ববেদের আলোচিত বিষয়ের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া প্রয়োজন। অথর্ববেদের সূক্তগুলি কুড়িটি কান্ডে বিভক্ত। সপ্তম কান্ড পর্যন্ত নানা আভ্যুদয়িক কর্মের মন্ত্রই বেশী। এরা হল আয়ূষ্য অর্থাৎ দীর্ঘ আয়ূলাভের জন্য, ভৈষজ্য অর্থাৎ আরোগ্য লাভের জন্য, শান্তিক অর্থাৎ ভৌতিক উপদ্রবাদি দূর করবার জন্য, পৌষ্টিক অর্থাৎ শ্রীলাভের জন্য, সাংমনস্য অর্থাৎ মৈত্রী লাভের জন্য, আভিচারিক অর্থাৎ শত্রুনাশের জন্য, প্রায়শ্চিত্ত, এবং রাজকর্ম অর্থাৎ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও উন্নতির জন্য।

এই বিষয়গুলি গার্হস্থ্য ও সামাজিক বিষয় সংক্রান্ত। এ ধরনের মন্ত্রের ব্যবহার জন্য তিন বেদে সাধারণত পাওয়া যায় না। এই হল অথর্ববেদের প্রথম ভাগ। অষ্টম হতে দ্বাদশ কান্ড অথর্ববেদের দ্বিতীয় ভাগ। এখানেও আভ্যুদয়িক কর্ম আছে। তবে অতিরিক্তভাবে দার্শনিক চিন্তা আছে। এই ধরনের সূক্তগুলি কোনও বৈদিক ক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা যায় না। ঋগবেদের দশম মন্ডলের নানা দার্শনিক তত্ত্ব সম্পর্কিত সূক্তের সহিত এদের তুলনা চলে।

ত্রয়োদশ হতে বিংশ কান্ড অথর্ববেদের তৃতীয় ভাগ। শেষের দুটি কান্ড হল পরিশিষ্ট। অন্য কান্ডগুলির প্রত্যেকটির বিষয়য়বস্তু নির্দিষ্ট। ত্রয়োদশ কান্ডে রোহিত নামে আদিত্যের প্রসঙ্গ আছে। চতুর্দশ কান্ডের বিষয় বিবাহ প্রকরণ। পঞ্চদশ কান্ডে ব্রাত্যের প্রশংসা আছে। ষোড়শ কান্ডে নানা শান্তি স্বস্ত্যয়নের মন্ত্র আছে। সপ্তদশ কান্ডে আছে আদিত্যের স্তুতি এবং অষ্টাদশ কান্ডের বিষয় হল পিতৃমেধ। সুতরাং অথর্ব সংহিতার শ্রৌত কর্ম হতে স্মার্ত কর্মেরই প্রাধান্য। অবশ্য শ্রৌত কর্মের আদৌ উল্লেখ যে নেই তা নয়।

তবে প্রধানত স্মার্তকর্ম প্রাধান্য পাওয়ায় তার প্রকৃতি অন্য তিন বেদ হতে পৃথক। এককালে বেদ যে তিনটি ছিল এবং চতুর্থ বেদ অথর্বের আবির্ভাব হয়নি তার প্রমাণ নানাভাবে পাওয়া যায়। নেই প্রমাণগুলি এবার একে একে স্থাপন করা হবে। ঋগবেদের দশম মন্ডল সম্ভবত সবার শেষে রচিত হয়েছিল। তার একটি প্রমাণ তার সূক্তগুলি একেবারে এই বেদের প্রান্তে স্থাপিত। আরও ভাল প্রমাণ হল এই মন্ডলে এমন অনেকগুলি সূক্ত আছে যাদের সঙ্গে শ্রৌত কর্মের কোনও সংযোগ নেই। এগুলিকে মনুষ্য জাতির প্রথম দার্শনিক চিন্তা বলা যায়। চিন্তা পরিণতি লাভ করলেই ব্যবহারিক যাগযজ্ঞাদি ক্রিয়া হতে বিশুদ্ধ চিন্তায় সরে আসে।

 এই দশম মন্ডলে পুরুষ সূক্তে (১০।৯০) সৃষ্টির একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সেই প্রসঙ্গে বেদগুলির উৎপত্তির কথাও আছে। তার নবম মন্ত্রে পাইঃ ‘সেই সর্বহোম সম্বলিত যজ্ঞ ঋক্ ও সাম সমূহ উৎপাদিত হল, ছন্দ সকল আবির্ভূত হল, যজুঃ তা হতে জন্মগ্রহণ করল।’ অর্থাৎ সৃষ্টির এই ব্যাখ্যায় তিন বেদের উল্লেখ আছে, চতুর্থ অথর্ববেদের উল্লেখ নেই। তার তাৎপর্য হল এই যে, এই সূক্ত যখন রচিত হয় তখন অথর্ববেদের আবির্ভাব হয়নি। তারপর প্রমাণ পাই ব্রাহ্মণের যুগেও অথর্ববেদের সন্ধান পাওয়া যায় না।

তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে বেদকে ‘ত্রয়ী বলা হয়েছে এবং এই ত্রয়ীর অন্তর্ভূক্ত বেদ হিসাবে কেবলমাত্র ঋক্, সাম ও যজুর্বেদের উল্লেখ করে হয়েছে। প্রাসঙ্গিক উক্তিটি এইঃ ‘যমৃষয়স্ত্রয়ীবিদ্যে বিদুঃ ঋচঃ সামানি যজুংষি ৷৷ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১। ২।১।২৬)। সুতরাং এটা অনুমান করা অসঙ্গত হবে না এই ব্রাহ্মণ যখন রচিত হয় তখন অথর্ববেদের নাম জানা ছিল না। তারপর আসে উপনিষদের যুগ। ছান্দোগ্য এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদ প্রাচীনতম উপনিষদগুলির অন্যতম। এই দুটি উপনিষদই ব্রাহ্মণের অংশ। এদের আলোচনা হতে দেখা যায় যে এরা ‘ত্রয়ী’ কথাটির সঙ্গে পরিচিত এবং সেই সূত্রে যখন বেদের উল্লেখ করছে তখন অন্য তিনটি বেদের উল্লেখ আছে, কিন্তু অথর্ববেদের উল্লেখ নেই। আবার অন্য সূত্রে আলোচনায় চারটি বেদেরই উল্লেখ করা হয়েছে।

 ছান্দোগ্য উপনিষদের প্রথম অধ্যায়ের চতুর্থ খন্ডে আছে মৃত্যু হতে ভয় পেয়ে দেবতারা ত্রয়ী বিদ্যায় প্রবেশ করল। (দেবা বৈ মৃত্যোর্বিভ্যতস্ত্রয়ীং বিদ্যাং প্রাবিশন্ ৷৷ ১ ৷৷ ৪ ৷৷ ২)। তারপর আছে তাঁরা ঋক্ সাম এবং যজুর স্বরের মধ্যে প্রবেশ করলেন। (তে তু বিত্ত্বোর্ধ্বা ঋচঃ সাম্নো যজুষঃ স্বরমের প্রাবিশন্ ৷৷১৷৷৪৷৷৩)। সুতরাং এখানে দেখি ঋক্ সাম ও যজুর্বেদকে ‘ত্রয়ী বিদ্যা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

অপর পক্ষে একই উপনিষদের সপ্তম অধ্যায়ে দেখি নারদ যখন সনৎকুমারের কাছে ব্রহ্মবিদ্যা শিক্ষা লাভের জন্য গেছেন তখন তিনি জিজ্ঞাসা করছেন, নারদ কি বিদ্যা আয়ত্ত করেছেন। তখন নারদ যে বিষয়গুলি পাঠ করেছেন তাদের যে তালিকা দিলেন তার মধ্যে ঋক্ সাম যজু এবং অথর্ব এই চারটি বেদের উল্লেখ আছে (৭।১।২)। সুতরাং ছান্দোগ্য উপনিষদ যখন রচিত হয় তখন যে অথর্বব্দের আবির্ভাব হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

 বৃহদারণ্যক উপনিষদেরও একই অবস্থা পাই। তার প্রথম অধ্যায়ের পঞ্চম ব্রাহ্মণে মাত্র প্রথম তিনটি বেদের উল্লেখ আছে। প্রাসঙ্গিক উক্তিটি এইঃ ত্রয়ো বেদা এত এব বাগের ঋগ্বেদো মনো যজুর্বেদঃ প্রাণঃ সামবেদঃ (১।৫।৫) অর্থাৎ তিনটি বেদের মধ্যে ঋগ্বেদ বাক্যের সঙ্গে তুলনীয়, সামবেদ প্রাণের সঙ্গে তুলনীয় এবং যজুর্বেদ মনের সঙ্গে তুলনীয়।

এখানে কেবল তিনটি বেদেরই উল্লেখ পাই। অথচ দেখি চতুর্থ অধ্যায়ে চারটি বেদেরই উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে ‘মহতো ভূতস্য নিঃশ্বসিতমেতদ্ যদৃগবেদো যজুর্বেদঃ সামবেদোহথর্বাঙ্গিরসঃ’ ৪।৫।১১)। তাৎপর্য হল ব্রহ্ম হতেই চারটি বেদের উৎপত্তি হয়েছে। এখানে স্পষ্টই প্রমাণ পাওয়া যায় বৃহদারণ্যক উপনিষদ যখন রচিত হয় তখন চারটি বেদের সহিত মানুষ পরিচিত ছিল।

 সুতরাং এটা অনুমান করা যায় যে, এই দুই প্রাচীন উপনিষদ যখন রচিত হয় তখন তিন বেদের ধারণা একেবারে লুপ্ত হয়ে যায় নি। ‘ত্রয়ী’ বা ‘ত্রয়ো বেদাঃ’র ধারণা তখনও প্রচলিত ছিল। অবশ্য চতুর্থ বেদ অথর্বের তখন আবির্ভাব হয়েছে এবং তার সঙ্গেও মানুষের পরিচয় ছিল। তারপর দেখি মুন্ডক উপনিষদে আর ‘ত্রয়ী’র উল্লেখ নেই; সোজাসুজি চারটি বেদকে বেদাঙ্গগুলিসহ অপরা বিদ্যার অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে (১।৫)।

সুতরাং অনুমান করা যায় তখন ‘ত্রয়ী’র ধারণা লুপ্ত হয়েছে এবং চারটি বেদই সম্মানের আসন অধিষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে লক্ষ্য করা যেতে পারে যে, এই উপনিষদখানি কোনও বেদের সংহিতা বা ব্রাহ্মণ বা আরণ্যকের সঙ্গে সংযুক্ত আকারে পাওয়া যায় না। তা ঐতিহ্য অনুসারে অথর্ববেদের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং বুঝা যায় এটি ছান্দোগ্য এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদ হতে অপ্রাচীন এবং এটি যখন রচিত হয় তখন অথর্ববেদ রচিত হয়ে গেছে।

 সুতরাং দেখা যায় অথর্ববেদের যে অনেক পথে আবির্ভাব হয়েছিল তার একাধিক প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রথমত ঋক্, সাম ও যজুর্বেদ যেমন অঙ্গাঙ্গীভাবে পরস্পরের সহিত সংসুক্ত, অথর্ববেদের সহিত এদের তেমন সংযোগ নেই। দ্বিতীয়ত অথর্ববেদের প্রকৃতি এই তিনটি বেদ হতে বিভিন্ন। প্রথম তিনটি বেদে শ্রৌত কর্ম প্রাধান্য পেয়েছে। চতুর্থ বেদের আভ্যুদয়িক কর্ম প্রাধান্য পেয়েছে। তৃতীয়ত দেখি ব্রাহ্মণের যুগে বেদকে ‘ত্রয়ী’ বলা হত অর্থাৎ তখনও চারটি বেদের কথা মানুষ জানত না। ‘ত্রয়ী’ কথাটি উপনিষদের যুগেও প্রচলিত ছিল। তারপর অথর্ববেদ রচিত হয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করবার পর চারটি বেদের স্বীকৃতি উপনিষদ গুলিতে পাওয়া যায়। সুতরাং এমন অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে অথর্ববেদ তুলনায় অপ্রাচীন বেদ।