নদীয়ায় আদিবাসীদের করম পরবের জাওয়া অর্থাৎ সাত শস্য বীজ বপন করা হলো আজ

নদীয়ায় আদিবাসীদের করম পরবের  জাওয়া অর্থাৎ সাত শস্য বীজ বপন করা হলো আজ

মলয় দে   নদীয়া :-করম হল পূর্বভারতের আদিবাসী ও হিতমিতান গোশঠীর অন্যতম বৃহৎ পরব। মানুষ যখন প্রথম চাষবাস করতে শিখেছিল সেই আনন্দের মহুর্তের ই সাক্ষী হল করম পরব। করম পরবের নেগ নীতি থেকে এটা পরিস্কার যে চাষের শুরু মেয়েদের দ্বারাই হয়েছিল। 
করম হল সেই পরব যেখানে একাধারে বোন ভাই এর মঙ্গল কামনা করে বলে "হামার করম ভাই এর ধরম" আবার সাথে সাথে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলা এবং তাকে রক্ষার বার্তাও দেয়া হয়। 


একই সাথে কৃষি ও ওষধি গুনাগুন সম্পন্ন গাছপালার ঞ্জান এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে অত্যন্ত সুচারু ভাবে বাহিত হয় করমের মাধ্যমে। তাই একে যদি "ডরমেটরি সিস্টেমের " ক্ষুদ্র সংস্করণ বলা হয় তাহলেও অত্যুক্তি হয় না। 
ডরমিটরি সিস্টেম এ যেভাবে কোনো আদিবাসী সম্প্রদায় তার কীশোর কীশোরী দের সমাজের রীতিনীতি, সংস্কৃতি, ও পূর্বপুরুষ অর্জিত ভেষজ ও সামাজিক ঞ্জান প্রদান করে এখানেও তেমনি ভাবে ই প্রতিটি নেগাচার সমাজের অভিঞ্জতা সম্পন্ন ব্যাক্তি/মহিলা দের দ্বারা দেখিয়ে দেওয়া হয়। 


করম পরবেত জাওয়া গীত গুলি সমাজের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল এবং একই সাথে এই জাওয়া গীতের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে মেয়েদের দুঃখ কস্ট এবং সামাজিক কোন সম্পর্ক কিভাবে পালন হবে তার ঞ্জান। 
"খইড়কা খুচি পাটের শাঢ়ি রহইল সিঁকায় তুলা গো 
ভাইলে ভাইলে গেল ভাদর মাস গো 
মা যদি থাইকত অবিশ করে আইসত 
ভাই ভাজ ত জনমেত দুশমন।। "


এখানে একটা মেয়ে যে করম পরবে বাপের বাড়ি আসতে চাইছে কিন্তু তাকে তার ভাই আনতে আসেনি তাই সে গানের মাধ্যমে তার দুঃখ টা প্রকাশ করছে। করমের ৫/৭দিন আগে কোনো জলাশয় থেকে বালি তুলে জাওয়া ডালা করা হয় তাতে নানা রকমের বীজ দেওয়া হয় অঙ্কুর হওয়ার জন্য। মেয়েরা প্রতিদিন সেউ জাওয়া ডালার চারপাশে ঘুরে ঘুরে নাচ গান করে এবং জাওয়া র যত্ন নেয়। একটা গানের মাধ্যমে ব্যাপার টা বোঝানো যায় --
"মুগ দিব জনহাইর দিব আরঅ দিব কুত্থি 
জনহাইর সইরসা হলুদ পানি সঙে গঁধা মেথি
হালা হালা ঝিঙা ফুলে সাজাব জাওয়া ডালা
তর নামে জাগরনে হব মাতোয়ারা"
এভাবেই আসে করমের দিন যেদিন চারদিক থেকে ভেসে আসে 
"আইজ রে করম ঠাকুর ঘরে দুয়ারে
কাইল রে করম ঠাকুর শাঁক নদীর পাড়ে"
ছেলে মেয়েরা ওই দিন বনে যায় এবং নানান রকমের বনজ কিছু গাছের অংশ নেয় যা করমে ফুল হিসাবে কাজে লাগে। সেই সাথে অবশ্যই নাচ গান ও হয় দিনভর। 

 রাত্রে বেলা করম ডাল পোতা হয় আর তার চারপাশে গোল করে বাচ্চা রা বসে "করমের কহনী" শুনে। তার পর রাত্রি ভর জাগরন চলে। সকালে জাওয়া ডালার চার পাশে মেয়েরা জাওয়া গান নাচ করে তার পর করম ডাল কে কোনো জলাশয়ে বিসর্জন করা হয় এবং ছেলে মেয়েরা একটি ধান গাছি এনে তার সামনে বাসি ভাত খেয়ে "পারনা" করে। 
মোটামুটি ভাবে এই ছিল করম। কিন্তু এর থেকে পাওয়া ঞ্জান বিশাল। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে করমে ব্যবহৃত প্রতিটি গাছপালা মারাত্মক রক ভাবে ভেষজ গুন সম্পন্ন। যেমন করম গাছ যাকে করম পরবে পুজা করা হয়। তার বিঞ্জানসম্মত নাম MITRAGYNA PARVIFOLIA। এই গাছের মূল ও ছাল কোলিক ফিভার,পেশির ব্যাথা,জ্বালা জ্বালা ভাব, গাইনোলজিক্যাল প্রবলেম, কফ, প্রভৃতি র সমস্যায় এবং ন্যাচারাল ভায়াগ্রা হিসাবে ব্যাবহৃত হয়। 


এই গাছের পাতা জন্ডিস ও আলসার উপসমে সাহায্য করে। 
এই গাছের ফলের জুস মায়েদের দুগ্ধ নিঃসরন বাড়াতে সাহায্য করে। 
আরেক টি যে গাছের কথা বলব তাকে আমাদের স্থানীয় ভাষায় অসারিয়া পাতা গাছ বলে। যার বিঞ্জানসম্মত নাম হল COSTUS LGNEUS. এই গাছের পাতাতে কোরোসলিক এসিড থাকে যা ইনসুলিন তৈরি তে সাহায্য করে। ইনসুলিন যা ডায়াবেটিস রোধ করে। 

করম পরব প্রকৃতি রক্ষার জন্য ই হোক বা লোকওষুধির সাহায্য জটিল রোগের চিকিৎসা র জন্যেই হোক বা কুড়মি তথা আদিবাসী সমাজের রীতিনীতি সংস্কৃতি রক্ষা র ক্ষেত্রে এক অনবদ্য ভূমিকা পালন করে। করমের সময় ভাই দের কাছে বোনেদের আবেদন থাকে 
" সোব পরবে রাখবি দাদা 
ইঁদ করমে আনবি রে 
ইঁদ করম জাওয়া ডালি 
সঙী মনে পড়ে রে "
করম মানে এখানে শুধু মাত্র পূজা নয় করম এক শিক্ষনীয় পরব আনন্দের পরব 
তাই ত করমের শেষে প্রার্থনার সুরে ছোট নাগপুর জুড়ে একটা ই কথা ভাসতে থাকে 
"যাহ যাহ করম ঠাকুর যাও ছ অ মাস 
পড়তঅ ভাদর অ মাস আনব ঘুরাই।। "

আজ গঙ্গায় স্নান করে গঙ্গার  বালি নিয়ে এসে সাত রকমের দানাশস্যর বীজ পাতা হল আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে যা আগামী বিশ্বকর্মা পুজোর দিন "করম" গাছের সাথে লাগানো হবে।