তৃণমূল নেত্রীর অভিযোগে মালদা বন্যার ত্রাণ কেলেঙ্কারিতে নয়া মোড়

তৃণমূল নেত্রীর অভিযোগে মালদা বন্যার ত্রাণ কেলেঙ্কারিতে নয়া মোড়

তনুজ জৈন  হরিশ্চন্দ্রপুর   : ২০১৭ সালে ঘটে যাওয়া মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরের বিধ্বংসী বন্যায় ত্রাণ কেলেঙ্কারিতে এবার নতুন মোড়। এলাকার বন্যায় ক্ষতি-গ্রস্তদের রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে যে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছিল ইতিমধ্যে তা নিয়ে ব্যাপক পরিমাণ কেলেঙ্কারি ধরা পড়েছে। এবারে সেই কেলেঙ্কারিতে খোদ শাসক দলের নেত্রী তথা পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যা সুজাতা সাহা এবারে এই কেলেঙ্কারির পিছনে এলাকার বিডিও সহ অন্যান্য প্রশাসনিক আধিকারিক এমনকি এলাকারই তাবড় তাবড় নেতাদের দিকে আঙুল তুললেন সরাসরি।

তিনি আরো জানালেন ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক অনুদানের ত্রাণ বন্টনের মাস্টার রোলে তার সই জাল করে ব্যাপক পরিমাণে আর্থিক দুর্নীতি করা হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে আরো জানান এ ব্যাপারে সে সময় তিনি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন এলাকার বিডিও, এসডিও সহ অন্যান্য প্রশাসনিক আধিকারিকদের কাছে। কিন্তু তার অভিযোগকে কোন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। উল্টে তার নামে বন্যার ত্রাণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ নিয়ে এসে কোর্টে মামলা করা হয়। এবং ওয়ারেন্ট জারি করা হয়।

তিনি এ ব্যাপারে সমস্ত কাগজ পত্র কোর্টে দেখিয়ে বেল পেয়েছেন সম্প্রতি। আর বেল পেয়ে সাংবাদিকদের সামনে এসে তিনি সরাসরি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান হরিশ্চন্দ্রপুর ১ নম্বর ব্লকের বন্যার ত্রাণ কেলেঙ্কারিতে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে তিনি তা মেনে নিচ্ছেন। এবং এই দুর্নীতির মূল পান্ডারা এখনো পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়নি। এদিন সুজাতা সাংবাদিকদের মুখোমুখি সরাসরি নাম না করেই বলেন শাসকদলের তাবড় তাবড় নেতা এই দুর্নীতিতে জড়িয়ে আছেন। প্রশাসনিক কর্তারা তাদেরকে আড়াল করছেন। ২০১৭ সালে বন্যায় কম ক্ষতি-গ্রস্তদের জন্য ৩৩০০ টাকা এবং বেশি ক্ষতি-গ্রস্তদের জন্য ৭০ হাজার টাকা এই দুই ভাগে টাকা এসেছিল।

৩৩০০ টাকা বন্টন হয়েছিল ঠিক ভাবে কিন্তু ৭০ হাজার টাকার মাস্টার রোলে আমার সই জাল করা হয়েছিল। হরিশ্চন্দ্রপুর ১ নম্বর ব্লক এলাকার সব চাইতে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল বরই, কুশিদা এবং রশিদাবাদ অঞ্চলে বন্যায় সব চাইতে ক্ষতি বেশি হয়েছিল। হরিশ্চন্দ্রপুর ১ নম্বর ব্লক এলাকাতেই মোট ১০ কোটি টাকা এসেছিল বন্টনের জন্য। কিন্তু তার বেশির ভাগই এলাকার বেশ কয়েকজন তাবড় তাবড় তৃণমূল নেতার পকেটে ঢুকে গিয়েছে। আর এদেরকে আড়াল করছেন স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তারা। আমি এ ব্যাপারে সে সময় হরিশ্চন্দ্রপুর ১ নম্বর ব্লকের সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক কে অভিযোগ দায়ের করেছিলাম যে আমার সই মাস্টার রোলে জাল করা হয়েছে বলে।

কিন্তু আমার অভিযোগকে গুরুত্ব না দিয়ে উল্টে আমার এই নামে কোর্টে অভিযোগ দায়ের করে প্রশাসন। আমি সে সময়ে যে অভিযোগ পত্র গুলী প্রশাসনের কাছে পেশ করেছিলাম সঙ্গে দেখা করেছিলাম সেগুলি কোর্টে দেখিয় বেল পেয়েছি সম্প্রতি। এই ত্রাণ কেলেঙ্কারির মূল পান্ডা আড়াল করতেই বিডিও আমার বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা দায়ের করেছিলেন। আমার তো মনে হয় এ ব্যাপারে উনিও জড়িত আছেন। আমি চাই এ বিষয়ে ক্যাগ সহ অন্যান্য এজেন্সি তদন্ত করুন এবং প্রকৃত সত্য সামনে আসুক।

প্রসঙ্গত ২০১৭ সালের হরিশ্চন্দ্রপুরের বন্যার ত্রাণ কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত হরিশ্চন্দ্রপুর ১ নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কোয়েল দাস, বরুই গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সোনা মনি সাহা সহ বেশ কয়েকজনের নামে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। এদের মধ্যে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কোয়েল দাস পলাতক। বরুই অঞ্চলের প্রধান সোনা মনি সাহা দীর্ঘদিন থেকে পলাতক। ইতিমধ্যেই কোর্ট প্রধান সোনামনি সাহার নামে হুলিয়া জারি করেছে। পুলিশ সূত্রের খবর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির নামেও হুলিয়া জারি হতে পারে খুব তাড়াতাড়ি। যদিও এ ব্যাপারে মুখ খুলতে চাননি হরিশ্চন্দ্রপুর ১ নম্বর ব্লকের বিডিও অনির্বাণ বসু। তিনি জানান বিষয়টি বিচারাধীন। আমি এ বিষয়ে বিশেষ কিছু বলবো না।

এদিকে হরিশ্চন্দ্রপুরের বন্যার ত্রাণ কেলেনকারি নিয়ে শাসক দলের নেত্রী তথা হরিশ্চন্দ্রপুর ১ নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যা এভাবে শাসক দলের নেতাদের এবং প্রশাসনের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ আনতে সুর চড়িয়েছে বিজেপি সহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলি। বিজেপির মন্ডল সভাপতি রুপেশ আগারওয়াল জানান ব্যাপারটা আমরা আগেই জানতাম। এই কেলেঙ্কারি রাঘব বোয়ালরা এলাকায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদেরকে আড়াল করছেন এলাকারই প্রশাসনিক কর্তারা।

আমরা এর আগে এই ব্যাপারে অনেক অভিযোগ করেছি। কিন্তু এই কেলেঙ্কারিতে খোদ প্রশাসনই জড়িয়ে রয়েছে। এখন শাসক দলের নেত্রী এ ব্যাপারে মুখ খুলেছে দেখা যাক প্রশাসন কি ব্যবস্থা নেয়। এ প্রসঙ্গে শাসক দলের জেলা মুখপাত্র শুভময় বসু জানান এটা হাইকোর্টে বিচারাধীন বিষয়। দল এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবে না। কেউ যদি এর সম্বন্ধে কোন অভিযোগ করে দল সেই অভিযোগ নিয়ে কোনো অন্তরায় সৃষ্টি করবে না।