ত্রিফলার উপকারিতা

ত্রিফলার উপকারিতা

আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাশাস্ত্র প্রচুর ভেষজ গাছড়ার ব্যবহার করে চলেছে এগুলির ভেষজগুণ ও স্বাস্থ্যবর্ধক বৈশিষ্ট্যের জন্য। আয়ুর্বেদিক ও ঘরোয়া চিকিৎসা ব্যবস্থা সর্বদাই সামগ্রিক চিকিৎসার ওপর বেশি নির্ভর করে থাকে। Triphala ত্রিফলা হল একটি অতি প্রসিদ্ধ আয়ুর্বেদিক প্রণালি যেটি আমলা(এম্বলিকা অফিসিনালিস), বিভিতকি বা বহেড়া(তারমিনালিয়া বেলিরিকা)এবং হরিতকি বা হরদ(তারমিনালিয়া চেবুলা) এই তিনটি ফল থেকে তৈরি করা হয়। বস্তুত ত্রিফলা শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “তিনটি ফল”(ত্রি=তিন ও ফলা=ফল)। আয়ুর্বেদে ত্রিফলা উল্লেখযোগ্য তার রাসায়নিক গুণাবলীর জন্য যার অর্থ এটি আমাদের শরীরস্বাস্থ্য ও জীবনীশক্তি বজায় রাখতে এবং রোগ থেকে আমাদের দূরে রাখতে সাহায্য করে।  

হরিতকী, বহেরা আর আমলকি এই তিন ফলের মিশ্রণে তৈরি হয় ত্রিফলা। এদের যেমন গুন আছে তেমনি একসঙ্গে এর গুনাগুন মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয় । নিয়মিত ত্রিফলার সেবন সিজনাল ঠান্ডা, সর্দি, কাশি জ্বরের হাত থেকে দূরে রাখে । ত্রিফলা দেহের ভারসাম্য বজায় রাখে, দেহ পরিস্কার রাখে ও প্রয়োজনীয় ভিটামিন আর মিনারেলস দেয় । মানবদেহের বর্জ্য নিষ্কাশন করা আর ডিটক্সিফাই করার ত্রিফলার মোকাবেলা আর কেউ করতে পারবে না । কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ত্রিফলা কার্যকারী ।

এছাড়াও এটি হজম প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে ও বদহজম জনিত সমস্যা, দূর করতে সাহায্য করে । শরীরে ফ্যাট সেল জমতে না দিয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। এর উচ্চমাত্রায় ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুনে বাড়িয়ে দেয় । দেহে টক্সিন জমার কারণে হওয়া চর্ম্ রোগ যেমন ব্রণ ,হোয়াইট হেডস দূরে রাখে ।

ত্রিফলা চুলের প্রয়োজনীয় ভিটামিন আর মিনারেলস সরবরাহ করে । ত্রিফলার মধ্য থাকা আমলকী আর হরিতকী চুল পড়া কমায় ও নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে । ত্রিফলা সেবনের উপায়ঃ নিয়মিত সেবনের জন্য ত্রিফলার গুড়া ব্যবহার করাই উত্তম। এক্ষেত্রে প্রতি রাতে এক গ্লাস জলেতে এক চা চামচ ত্রিফলা গুড়া ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে জলটা খেয়ে নেয়া যেতে পারে ।

কী কী ফল ব্যবহার করে ত্রিফলা বানানো হয়? সাধারণত আমলকি, হরিতকি এবং বিভিতকি সহযোগে বানানো হয় এই ঔষধিটি, যাতে উপস্থিত একাধিক ভিটামিন এবং মনারেল ছোট-বড় নানা রোগকে দূরে রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই সঙ্গে এতে উপস্থিত গ্যালিক অ্যাসিড, ইলেগিক অ্যাসিড এবং চেবুলিনিক অ্যাসিড ত্বক এবং চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও কাজে আসে। তবে এখানেই শেষ নয়, নিয়মিত ত্রিফলা চুর্ণ খাওয়ার অভ্যাস করলে মেলে আরও অনেক উপকার, 

আমলকি: প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভর্তি। পেটের সমস্যা দূর করা থেকে শরীরে জমা দূষিত পদার্থ সাফ করা— আমলকির অনেক গুণ। রোগ প্রতিরোধ শক্তিও বাড়ায় এটি।

হরিতকি: এতেও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। অন্ত্র পরিষ্কার করতে এর বিকল্প নেই।

বিভিতকি: এটি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি পেশির পুষ্টি জোগায় আর হাড় মজবুত করে।

গবেষণায় এই ৩ ফলের মিশ্রনের গুণ সম্পর্কে উঠে এসেছে বিস্ময়কর তথ্য। কী কী গুণ রয়েছে ত্রিফলার? দেখা গিয়েছে, ওজন কমাতে সাহায্য করে এটি। এ ছাড়াও ক্যানসার প্রতিহত করতেও সাহায্য করে ত্রিফলা। এখানেই শেষ নয়। দাঁতের সমস্যা আটকাতে, ত্বক উজ্জ্বল করতে, মানসিক চাপ বা উদ্বেগ কমাতে পারে এই মিশ্রন।

১.ক্যান্সার রোগকে দূরে রাখে:২০১৫ সালে ক্যান্সার সেলের গ্রোথ এবং তার উপর ত্রিফলার প্রভাব সম্বর্কে একটি গবেষণা করা হয়েছিল। তাতে দেখা গিয়েছিল নিয়মিত খালি পেটে এই আয়ুর্বেদিক চূর্ণটি খাওয়া শুরু করলে শরীরের অন্দরে এমন কিছু পরিবর্তন হতে শুরু করে যে ক্যান্সার সেল জন্মে নেওয়ার কোনও সুযোগই পায় না।

আর একবার যদি জন্ম নিয়েও ফেলে তাহলেও তার বৃদ্ধি আটকে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই মারণ রোগ ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না। প্রসঙ্গত, অরেকটি স্টাডিতে প্রমাণিত হয়েছে যে কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধেও ত্রফলা বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। আসলে এই প্রকৃতিক উপাদানটির অন্দরে উপস্থিত গ্যালিক অ্যাসডি এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

২. কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমায়:সকালটা যদি আপনার কাছে অভিশাপের সমান হয়, তাহলে আজ থেকেই ত্রিফলা চুর্ন খাওয়া শুরু করুন। দেখবেন উপকার মিলবে। কারণ বেশ কিছু কেস স্টাডিতে একথা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গেছে যে বাওয়েল মুভমেন্টের উন্নতি ঘটানোর মধ্যে দিয়ে কনস্টিপেশনের মতো রোগের চিকিৎসায় এই হার্বাল মিশ্রনটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। শুধু তাই নয়, কোলোনকে পরিশুদ্ধ করার মধ্যে দিয়ে আরও নানা ধরনের রোগের আশঙ্কা কমাতেও ত্রিফলার কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে।

৩. অ্যাংজাইটি দূর করে:নিয়মিত খালি পেটে ত্রিফলা খাওয়ার অভ্যাস করলে শরীরের অন্দরে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, যা ব্রেন পাওয়ার বাড়ানোর পাশাপাশি মানসিক ক্লান্তি এবং স্ট্রেস কমাতেও বিশেষ ভূমিকা নেয়। প্রসঙ্গত, বর্তমানে আমাদের দেশে যেভাবে অ্যাংজাইটি এবং মানসিক অবসাদে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে ত্রিফলার খাওয়ার প্রয়োজনও যে বেড়েছে, সে বিষযে কোনও সন্দেহ নেই।

৪. ওজন কমাতে সাহায্য করে:অতিরিক্ত ওজনরে কারণে যদি চিন্তায় থাকেন, তাহলে ডায়েট কন্ট্রোলের পাশাপাশি আপনার প্রথম পছন্দ হওয়া উচিত ত্রফলা চুর্ন। কারণ নিয়মিত এই প্রাকৃতিক উপাদানটি গ্রহন করলে বাওয়েল মুভমেন্টের উন্নতি ঘটে। সেই সঙ্গে হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটার কারণে শরীরে মেদ জমার আশঙ্কা একেবারে কমে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ওজন কমতে শুরু করে।

৫. খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়:শরীরের কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়তে শুরু করলে হার্টে রক্ত সরবরাহকারি আর্টারিগুলি বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করে। ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত না পাওয়ার কারণে হার্ট দুর্বল হয়ে পরে । সেই সঙ্গে হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়। সেই কারণেই তো নিয়মিত ত্রিফলা খাওয়া পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।

আসলে এমনটা করলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ার কোনও আশঙ্কাই থাকে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই হার্টের কোনও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়। প্রসঙ্গত, জার্নাল অব ফার্মাসিউটিকাল সোসাইটি অব জাপানে প্রকাশিত একটি স্টাডি অনুসারে ত্রফলায় উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট একদিকে যেমন এল ডি এল বা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। তেমনি হার্টের অন্দরে যাতে কোনওভাবেই প্রদাহ সৃষ্টি না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কোনও ধরনের করনারি আর্টারি ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়।

৬. আর্থ্রাইটিসের প্রকোপ কমায়:ত্রিফলায় উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং পলিফেনল শরীরে প্রবেশ করার পর প্রদাহ কমাতে শুরু করে। আর একবার ইনফ্লেমেশন কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই জয়েন্ট পেন কমতে থাকে। সেই সঙ্গে শরীররে সচলতাও বৃদ্ধি পায়। তাই এমন ধরনের কোনও রোগে যদি ভুগতে থাকেন, তাহলে নিশ্চিন্তে একবার এই প্রকৃতিক উপাদানকে কাজে লাগিয়ে দেখতে পারেন। এমনটা করলে উপকার যে মিলবে, তা হলফ করে বলতে পারি।

কীভাবে ত্রিফলাকে ব্যবহার করতে হবে?এই আয়ুর্বেদিক ওষুধটি ডিনারের ৩০ মিনিট আগে খেতে হবে, হয় ট্যাবলেট হিসেবে খেতে পারেন, নয়তো ত্রিফলা পাউডারকে গরম জলে গুলে চায়ের মতো করেও পান করতে পারেন। তবে যেভাবেই গ্রহণ করুন না কেন, মধ্যা কথা প্রতিদিন যদি ত্রফলা চূর্ন খেতে পারেন, তাহলে শরীর নিয়ে আর কোনও চিন্তাই থাকবে না।

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ত্রিফলা ভেজানো জল খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে এমনিতেও বলা হয় যে ত্রিফলার মধ্যে রয়েছে হাজার গুণ। ত্রিফলা আসলে একটি সংস্কৃত শব্দ। তিন ফলের মিশ্রণ হওয়ায় একে বলে ত্রিফলা। আমলকি, বিভিতকা এবং হরিতকি রয়েছে এই ত্রিফলার মধ্যে। প্রতিটি ফলের মধ্যেই আলাদা করে রয়েছে অনেক পুষ্টি এবং স্বাস্থ্য গুণ। ফলে তিনটি ফলের মিশ্রণে ত্রিফলা তৈরি হওয়ায় তার গুণ যে আরও বেশি, সেটা স্পষ্ট।  

মূলত মানবশরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সুদৃঢ় করতে ত্রিফলা কাজে লাগে। এছাড়াও হজমশক্তি ভাল করতেও এই ফল কাজ করে। সেই সঙ্গে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবেও কাজ করে ত্রিফলা। গুঁড়ো হোক বা রস সেভাবে ইচ্ছে খেতে পারেন এই ফল। আজকাল বাজারে ক্যাপসুল বা ট্যাবলেট আকারেও ত্রিফলা বিক্রি হয়। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেও দারুণ ভাবে কাজ দেয় ত্রিফলা।