ত্রিপুরাঃ ভারতের অদ্ভুত সুন্দর তৃতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য ত্রিপুরা

ত্রিপুরাঃ  ভারতের অদ্ভুত সুন্দর  তৃতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য ত্রিপুরা

ভারতের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য ত্রিপুরা। সবুজে মোড়া তার রাজধানী শহর আগরতলা। 

নীরমহল: নামকরণ থেকেই বোঝা যায় জলের উপর দাঁড়িয়ে আছে যে মহল, উত্তর-পূর্ব ভারতের একমাত্র জলমহল হল এটি। আগরতলা থেকে ৫১ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত জনপদটির নাম মেলাঘর। মেলাঘরের দুই কিলোমিটার দূরেই অবস্থান নীরমহলের। বিশাল রুদ্রসাগর সরোবরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ব এই রাজপ্রাসাদ। মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ শুরু করান এই সুদৃশ্য প্রাসাদটির। প্রাসাদের স্থাপত্যে মুঘল শৈলীর প্রভাব যথেষ্টই বোঝা যায়।

নির্মাণকার্য শেষ হতে সময় লেগেছিল প্রায় আট বছর। ১২২ মিটার লম্বা কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে দুধ-সাদা রঙের প্রাসাদে রয়েছে সর্বমোট ২৪টি কক্ষ, যাকে ঘিরে রয়েছে সুন্দর বাগান। প্রাসাদের গম্বুজ আকৃতির মিনারগুলি, বিরাট ‘দরবার কক্ষ’, রাজা-রানির বিশ্রামকক্ষ, সুউচ্চ নজরমিনার সবই চমৎকৃত করবে। রুদ্রসাগরের পাড় থেকে জলের মধ্যে থাকা নীরমহলকে দেখে রাজস্থানের উদয়পুরের লেক-প্যালেস ‘জগনিবাস’-এর (পিছোলা লেকের উপর অবস্থিত) কথা মনে পড়বে।

রুদ্রসাগর লেকের জলেও পড়ে নীরমহলের প্রতিবিম্ব। ৫.৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রুদ্রসাগর সরোবর বিভিন্ন ধরনের পাখির (বিশেষত পরিযায়ী) জলকেলির এক নিরাপদ ঠাঁই। নীরমহলের প্রশস্ত ছাদ থেকেও রুদ্রসাগরের এক দারুণ দৃশ্য চোখে পড়ে।  রুদ্রসাগরের পাড় থেকে (সাগরমহল ট্যুরিস্ট লজের প্রান্তে) নিয়মিত মোটরবোট চলাচল করে নীরমহল পর্যন্ত, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা অবধি। ভাড়া মাথাপিছু ১০ টাকা। সপ্তাহের প্রতি দিনই খোলা থাকে নীরমহল। জুলাই মাসে প্রতি বছর এক নৌকা প্রতিযোগিতার আসরও বসে রুদ্রসাগরের জলে। নীরমহল প্রাসাদে ঢোকার প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ১০ টাকা। স্টিল ক্যামেরার চার্জ ২০ টাকা। ভিডিও ক্যামেরার চার্জ ৪০ টাকা। 

 উদয়পুর: দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার সদর শহর হল উদয়পুর। আগরতলা থেকে দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটার। মধ্যযুগে ত্রিপুরার রাজাদের রাজধানীও ছিল এই উদয়পুর। সে সময় রাঙামাটি নামেই পরিচিত ছিল এই জায়গাটি। রাজস্থানের উদয়পুরের মতোই ত্রিপুরার উদয়পুরকেও ‘লেক সিটি’ বলাই যায় নির্দ্বিধায়। সুখসাগর, অমরসাগর, জগন্নাথ দিঘি, মহাদেব দিঘি ইত্যাদি সুদৃশ্য জলাশয় সৌন্দর্য বাড়িয়েছে উদয়পুরের।

আবার মন্দির-নগরীও বলা যেতে পারে উদয়পুরকে। ত্রিপুরাসুন্দরী, ভুবনেশ্বরী, গুণবতী মন্দিররাজি, বিষ্ণু মন্দির, মহাদেব মন্দির, দুর্গামন্দির, জগন্নাথ মন্দিরের মতো প্রাচীন ও বিখ্যাত মন্দিরগুলির অবস্থান এখানেই। আগরতলা থেকে উদয়পুর যাওয়ার পথেই পড়বে তেপানিয়া ইকো-পার্ক (এখান থেকে উদয়পুরের দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার)। সুন্দর এই পার্কটিতে ঝুলন্ত সেতু, অর্কিড হাউস, গাছবাড়ি, ক্যাকটাস হাউস প্রভৃতি রয়েছে। ঘন জঙ্গলে ঘেরা সুদৃশ্য পার্কটি দেখেও চলে যেতে পারেন উদয়পুর। নীরমহল থেকে উদয়পুরের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার।

 ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির: ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা ধন্যমাণিক্য প্রতিষ্ঠিত ত্রিপুরাসুন্দরীর মন্দিরটি মাতাবাড়ি নামেই বেশি পরিচিত স্থানীয় মানুষজনের কাছে। কচ্ছপ আকৃতির এক অনুচ্চ টিলার উপরে অবস্থান এই মন্দিরের। ৫১ সতীপীঠের অন্যতম পীঠ এই ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরে সারা বছরই ভিড় লেগে থাকে পুণ্যার্থীর। কালীপুজোর সময় দু’দিনব্যাপী এক বড় মেলা বসে মন্দিরপ্রাঙ্গনে। আটচালা আকৃতির লালরঙা মন্দিরটির শীর্ষে রয়েছে স্তূপ, আর তারও উপরে রয়েছে কলস। কথিত আছে, সতীর ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পড়েছিল এখানে।

মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী (কালীমূর্তি) মূর্তিটি কষ্ঠিপাথরের। ধন্যমাণিক্যর পরবর্তীকালে রাজা কল্যাণমাণিক্য মন্দিরের পিছনে একটি দিঘি খনন করান, যা তাঁর নামেই কল্যাণসাগর বলে খ্যাত হয়। দিঘি খননের সময় মাটির ভিতর থেকে আর একটি মূর্তি পাওয়া যায়। যে মূর্তিটিকেও কল্যাণমাণিক্য এই মন্দিরেই প্রতিষ্ঠা করেন ত্রিপুরাসুন্দরীর মূর্তির পাশেই।

অপেক্ষাকৃত ছোট এই মূর্তিটিই (দেবী চণ্ডীর) ‘ছোট মা’ বা ‘ছোটি মা’ রূপে পূজিতা হন। মন্দিরের সামনে রয়েছে বড় এক নাটমন্দির। আর পিছনে রয়েছে সেই কল্যাণসাগর। অগণিত মাছ ও কচ্ছপের বাস এই দিঘিতে। বিভিন্ন পূজা-পার্বণে বলিপ্রথাও চালু আছে এখানে। ভোর সাড়ে ৪টে থেকে রাত ১০টা অবধি খোলা থাকে মন্দির ভক্তদের জন্য, দুপুরে এক ঘণ্টা (১.৪৫ থেকে ২.৪৫ অবধি) শুধু বন্ধ থাকে গর্ভগৃহে দেবীকে ভোগ নিবেদনের জন্য। এখানকার প্যাঁড়া খুব বিখ্যাত তার স্বাদের জন্য। পুজোর জন্য তো বটেই, এমনিও সংগ্রহ করতে পারেন বাড়ির জন্য। মন্দিরের কাছেই রয়েছে সুবিখ্যাত ‘রাজেশ্বরী প্যাঁড়া ভাণ্ডার’ (ফোন: ০৯৪৩৬৫-২১৮১৩)। এখানকার ক্ষীরের প্যাঁড়ার খ্যাতি আছে।

ভুবনেশ্বরী মন্দির: মহারাজা গোবিন্দমাণিক্য তাঁর আরাধ্যা দেবী ভুবনেশ্বরীর এই মন্দিরটি নির্মাণ করান ১৬৬০-১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। গোমতী নদীর তীরে অবস্থিত টেরাকোটার এই মন্দিরটি অবশ্য বিগ্রহহীন। অতীতে এই মন্দিরে নাকি নরবলি দেওয়া হত। এমনটাই জনশ্রুতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই মন্দিরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত নিয়েই রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত নাটক ‘বিসর্জন’ এবং উপন্যাস ‘রাজর্ষি’। মন্দিরের পাশেই রয়েছে প্রাচীন রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ।

 গুণবতী মন্দিরাজি: তিনটি পাশাপাশি টোরাকোটা মন্দির রয়েছে একই চত্বরে। এইগুলি মহারানি গুণবতী (মহারাজা গোবিন্দমাণিক্যের স্ত্রী) নির্মাণ করান ১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে। আর তাঁর নামেই পরিচিত হয় এই মন্দিররাজি। মন্দিরগুলি বিগ্রহহীন হলেও এদের নির্মাণশৈলী কিন্তু চোখ টানে।

 পিলাক: দক্ষিণ ত্রিপুরার পিলাক এক ঐতিহাসিক স্থান। বৌদ্ধ ও হিন্দু স্থাপত্যের অনেক বিস্ময়কর নির্দশন পাওয়া গিয়েছে পিলাক ও সংলগ্ন অঞ্চল থেকে। আগরতলা থেকে দূরত্ব ১১৪ কিলোমিটার। প্রাচীন মন্দিরগুলির ধ্বংসাবশেষগুলিও যথেষ্ট নজরকাড়া। এখান থেকেই পাওয়া গিয়েছিল নবম শতাব্দীর ‘অবলোকিতেশ্বর’ ও দ্বাদশ শতাব্দীর ‘নরসিংহ’-র বিশাল মূর্তিগুলি।

এই মূর্তিগুলি বর্তমানে আগরতলার সরকারি মিউজিয়ামে রাখা আছে। এখনও পিলাকে রাখা গণেশ, দুর্গা ও সূর্যমূর্তি (১০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট) পর্যটকের মনে বিস্ময় সৃষ্টি করে। পিলাকের কাছে ঋষ্যমুখ থেকেও পাওয়া যায় বুদ্ধের দু’টি ব্রোঞ্জের মূর্তি। ঐতিহাসিক ভাবে প্রথমে বৌদ্ধ রাজারা ও পরবর্তীকালে হিন্দু রাজাদের শাসনকালে নমুনা পাওয়া যায় এই জায়গায়। খুব কাছেই অবস্থিত বাংলাদেশের ময়নামতী ও পাহাড়পুরের সঙ্গেও এই জায়গার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বিশেষ ভাবেই চোখে পড়ে। উদয়পুর থেকে পিলাকের দূরত্ব ৬২ কিলোমিটার।

 মহামুনি প্যাগোডা: দক্ষিণ ত্রিপুরার আর একটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্র হল মহামুনি প্যাগোডা। আগরতলা থেকে দূরত্ব ১৩৪ কিলোমিটার। উদয়পুর থেকে দূরত্ব ৮২ কিলোমিটার আর পিলাক থেকে দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার। মহামুনি প্যাগোডার অবস্থান হল মনুবংকুল নামক স্থানে। স্বর্নাভ প্যাগোডাটি শুধু যে সুদৃশ্য তাই নয়, সারা বছরই দেশ ও বিদেশের (মায়ানমার, জাপান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ) প্রচুর বৌদ্ধ পুণ্যার্থীও আসেন এই বৌদ্ধতীর্থে। এখান থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরেই সাবরুম। এখানেই বাংলাদেশ সীমান্ত ফেনী নদীর ওপারে। দেখে নিতে পারেন সেটিও একযাত্রায়।

 তৃষ্ণা অভয়ারণ্য: ১৯৪.৭০৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট এই বনাঞ্চলটি অভয়ারণ্যের শিরোপা পায় ১৯৮৭ সালে। এই অভয়ারণ্যের মুখ্য আকর্ষণ হল গাউর বা ইন্ডিয়ান বাইসন। অভয়ারণ্যের একটি অংশে আছে বাইসন পার্ক। যেটি দেড় শতাধিক বাইসনের অবাধ চারণভূমি। তৃষ্ণা অভয়ারণ্যের আর এক আকর্ষণ হল বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাণী ‘হুলক গিবন’। এ ছাড়াও ক্যাপড্ লাঙ্গুর, গোল্ডেন লাঙ্গুর, বার্কিং ডিয়ার ও বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য পাখিরও দেখা মেলে এই বিস্তৃত অরণ্যাঞ্চলে। আগরতলা থেকে দূরত্ব ১১১ কিলোমিটার ও উদয়পুর থেকে ৬০ কিলোমিটার।

কালাপানিয়া নেচার পার্ক: ২০০৪ সালে রাজ্য বন দফতরের উদ্যোগে ২১ হেক্টর পতিত জমিকে বনসৃজন প্রকল্পের মাধ্যমে পরিণত করা হয়েছে এই নেচার পার্কে। চোখজুড়নো সবুজে মোড়া পার্কটির পরিবেশ ভারী সুন্দর। দু’টি টিলার মধ্যে রয়েছে একটি লেক, যেখানে বোটিং-এর ব্যবস্থাও আছে পর্যটকদের জন্য। আর রয়েছে একটি ‘নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার’ পার্কের কেন্দ্রস্থলে। অবশ্যই দেখে নিতে হবে সেটিও। আগরতলা থেকে কালাপানিয়া নেচার পার্কের দূরত্ব ১১৬ কিলোমিটার, উদয়পুর থেকে দূরত্ব ৬৪ কিলোমিটার।