উদয়শঙ্কর- ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যধারার কিংবদন্তী নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্কর

উদয়শঙ্কর- ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যধারার কিংবদন্তী নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্কর

ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যধারার কিংবদন্তী নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্কর (Uday Shankar)। তিনিই প্রথম ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের সঙ্গে আধুনিক পশ্চিমি ধারার নৃত্যের মিশ্রণ ঘটান। শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলীর উপর নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘কল্পনা’ উদয়শঙ্করের অন্যতম স্মরণীয় কাজ।

প্রথাগত নৃত্যশিক্ষা না থাকলেও এই অসম্ভব গুণসম্পন্ন মানুষটিই ভারতের আধুনিক নৃত্যধারার পথপ্রদর্শক ছিলেন। ১৯০০ সালের ৮ ডিসেম্বর রাজস্থানের উদয়পুরে এক বাঙালি পরিবারে উদয়শঙ্করের জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম উদয়শঙ্কর চৌধুরী। তাঁদের পরিবারের আদি নিবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের নড়াইলে।

তাঁর বাবার নাম শ্যাম শঙ্কর চৌধুরী। তিনি রাজস্থানের ঝালওয়ারের মহারাজার অধীনে সচিবের কাজ করতেন। তাঁর মায়ের নাম হেমাঙ্গিনী দেবী। উদয়শঙ্করের বাবা নবাবদের থেকে ‘হরচৌধুরী’ উপাধি পেয়েছিলেন, সেই থেকেই ‘হর’ অংশটুকু বাদ দিয়ে তিনি ‘চৌধুরী’ উপাধি ব্যবহার করতে থাকেন।

উদয়শঙ্করের আরো চার ভাই ছিল – রাজেন্দ্রশঙ্কর, দেবেন্দ্রশঙ্কর, ভূপেন্দ্রশঙ্কর এবং রবিশঙ্কর, এঁদের মধ্যে রবিশঙ্কর সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে পৃথিবী বিখ্যাত। ছোটবেলায় তাঁর বাবার কাজের ক্ষেত্রে বারবার বদলি হওয়ার কারণে, উদয়শঙ্কর বিভিন্ন জায়গায় প্রাথমিক পড়াশোনা করেছেন।

তবে শৈশবের বেশিরভাগ সময়টাই তিনি মামার বাড়ি নসরতপুরে তাঁর মা ও চার ভাইয়ের সঙ্গে কাটিয়েছেন। নসরতপুর ছাড়া বারাণসী, গাজীপুর এবং ঝালওয়ারেও তিনি পড়াশোনা করেছেন। তিনি গাজীপুরের স্কুলে অম্বিকাচরণ মুখোপাধ্যায়ের কাছে সঙ্গীত এবং ফোটোগ্রাফির শিক্ষালাভ করেন।

১৯১৮ সালে আঠারো বছর বয়সে মুম্বাইয়ের জে. জে. স্কুল অফ আর্ট এবং পরে গন্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ে তিনি পড়তে যান। ইতোমধ্যে তাঁর বাবা লণ্ডনে চলে যান। সেইজন্য লণ্ডনের ‘রয়্যাল কলেজ অফ আর্টস’-এ উইলিয়াম রথেনস্টাইনের কাছে উদয়শঙ্কর পেইন্টিং শিখতে শুরু করেন। তখনও পর্যন্ত তিনি নৃত্যশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হননি। তবু তাঁর বাবার আয়োজিত লণ্ডনে ছোটখাটো অনুষ্ঠানে তিনি নৃত্য প্রদর্শন করেছেন।

এছাড়া শোনা যায় নসরতপুরে থাকাকালীন তাঁর মামার বাড়ির কাছে পারিয়া আর চর্মকার সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। তাদের মধ্যে মাতাদীনের নাচ দেখে, তাঁকে অনুকরণ করার মাধ্যমেই নৃত্যের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায়। ঝালোয়ারে থাকাকালীন রাজপুত সেনাদের অসি-নৃত্য, রাজস্থানী নারীদের লোকনৃত্য এমনকি ভীল উপজাতিদের আদিবাসী নৃত্য দেখতে দেখতে উদয়শঙ্করের মনে নৃত্যের তাল-লয়-ছন্দ-শিল্পসুষমা গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে যায়।

তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় নৃত্যশিল্পের মাধ্যমেই, যদিও তাঁর তথাকথিত কোনো নৃত্যশিক্ষার তালিম ছিল না। ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যে তিনি কোনো গুরুর কাছে নাড়া বাঁধেননি। ইউরোপে থাকাকালীন অনেক ছোটো বয়স থেকেই ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্য, লোকনৃত্য এমনকি পশ্চিমি ব্যালে নাচের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তিনি সেসময় এই বিভিন্ন ঘরানার নৃত্যশৈলী থেকে কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যের মিশেলে এক নবতর নৃত্যের ধারা তৈরি করতে চান যার নাম দেন তিনি ‘হাই-ডান্স’ (Hi-Dance)।

চিত্রকলা শিক্ষার সময় ব্রিটিশ মিউজিয়ামে তিনি রাজপুত এবং মোগল চিত্রকলার সঙ্গে পরিচিত হন। এমনকি ফরাসি সরকারের ‘প্রিক্স ডি রোম’ (Prix De Rome) বৃত্তি নিয়ে তিনি চিত্রকলায় উচ্চশিক্ষার জন্য রোমে পাড়ি দেন। ইতিমধ্যে এই রাজপুত আর মোগল চিত্রকলাগুলি দেখে তিনি ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের একটা সমকালীন রূপ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।

লণ্ডনে তাঁর বাবার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁর নাচ দেখতে উপস্থিত ছিলেন রাশিয়ান ব্যালেরিনার বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী আন্না পাভলোভা। এই ঘটনাই মূলত উদয়শঙ্করকে নৃত্যের প্রতি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। আর এই সময়পর্বে আন্না পাভলোভার সঙ্গে উদয়শঙ্কর কাজ করা শুরু করেন। একে একে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে হিন্দু ধর্মীয় কাহিনির উপর বহু ব্যালে উপস্থাপিত হয় যার নাম দেন তাঁরা ‘ওরিয়েন্টাল ইম্প্রেশনস’।

এর মধ্যে আন্না আর উদয়শঙ্করের যুগল উপস্থাপন ‘রাধাকৃষ্ণ’, ‘হিন্দু ওয়েডিং’ এবং ‘ডান্সেস অফ জাপান’ নামের তিনটি ছোট ছোট ব্যালে ছিল। এই ব্যালেটি লণ্ডনের কনভেন্ট গার্ডেনে ‘রয়্যাল অপেরা হাউস’-এ উপস্থাপিত হয়। ‘হিন্দু ওয়েডিং’ এবং ‘রাধাকৃষ্ণ’ দর্শকমহলে খুবই সমাদৃত হয়। তারপরে উদয়শঙ্কর নিজের উদ্যোগে ব্যালে পরিচালনা শুরু করেন এবং ভারতের অজন্তা গুহাচিত্রের অনুসরণে একটি ব্যালে নৃত্য উপস্থাপন করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।

তাঁর এই বিশেষ নৃত্যশৈলী প্রথমে ‘হাই-ডান্স’ নামে পরিচিত হলেও পরে উদয়শঙ্কর নিজে একে ‘ক্রিয়েটিভ ডান্স’ বলে চিহ্নিত করেন। আন্নার সঙ্গে উদয়শঙ্কর প্রায় দেড় বছর কাজ করেছেন। পরে যদিও তিনি প্যারিসে চলে গেলে আন্নার সঙ্গে সম্পর্কে ছেদ পড়ে। ১৯২৭ সালে তিনি দেশে ফিরলে তাঁর সঙ্গী হন এক ফরাসি পিয়ানোবাদক সিমোন বার্বিয়ারে এবং একজন সুইশ ভাস্কর অ্যালিস বোনার।

সিমোন চেয়েছিলেন নৃত্যশিক্ষা করতে আর অ্যালিস ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা করতে চেয়েছিলেন। উদয়শঙ্কর পরে আবার প্যারিস যান ১৯৩১ সালে এবং তখন ইউরোপে সর্বপ্রথম ভারতীয় নৃত্যের গ্রুপ তৈরি করেন যার নাম দেন ‘উদয়শঙ্কর অ্যান্ড হিজ হিন্দু ব্যালে’। অ্যালিস বোনার এই কাজে তাঁকে সহায়তা করেন যিনি উদয়শঙ্করের প্রত্যক্ষ শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

নৃত্য উপস্থাপনের উপযোগী একটি নতুন ধারার ‘মিউজিক কোম্পানি’ গড়ে তোলেন তিনি যেখানে বিষ্ণুদাস শিরালি এবং তিমিরবরণ ছিলেন প্রধান শিল্পী। ১৯৩১-এর ৩ মার্চ প্যারিসের ‘চার্লস-এলিসেস থিয়েটার’-এ তাঁর প্রথম ধারাবাহিক নৃত্য উপস্থাপিত হয়। নিউ ইয়র্ক শহরে উদয়শঙ্কর প্রথম নৃত্য উপস্থাপন করেন ১৯৩৩ সালের জানুয়ারি মাসে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের আরো বহু শহরে দল নিয়ে ঘুরে ঘুরে তিনি নৃত্য পরিবেশন করেন।

টানা তিন বছর ধরে ইউরোপ আমেরিকার বহু দেশে ঘুরে বেরিয়েছেন উদয়শঙ্কর আর ইউরোপ-আমেরিকাবাসীর কাছে ভারতীয় নতুন ঘরানার নৃত্যশৈলীর পরিচিতি গড়ে উঠেছে। ভারতীয় নৃত্যের মধ্যে ইউরোপীয় থিয়েটারের বৈশিষ্ট্য সংযোজন করায় উদয়শঙ্করের এই নতুন ধরনের পরিবেশনা সারা বিশ্বে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করে।

এই বিদেশ সফরকালে তাঁর দলের প্রধান নৃত্যশিল্পী ছিলেন সিম্‌কি যাঁর আসল নাম সিমোন বার্বিয়ের। পরবর্তীকালে যখন লিওনার্দ নাইট এলম্‌হার্স্ট উদয়শঙ্করকে তাঁর ব্যালে ট্রুপ সহ ডার্টিংটন হলে ছ’মাস থেকে নৃত্য পরিবেশনের জন্য নিমন্ত্রণ করেন, তখনও এই সিম্‌কি তাঁর ট্রুপের প্রধান নৃত্যশিল্পীর ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৩৮ সালে উত্তরাখণ্ডের আলমোড়ার কাছে সিমতোলায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘উদয়শঙ্কর ইণ্ডিয়া কালচারাল সেন্টার’।

এই সেন্টারে কথাকলি, ভরতনাট্যম, মণিপুরি ইত্যাদি নৃত্য প্রশিক্ষণের জন্য তিনি যথাক্রমে শঙ্করন নাম্বুদ্রি, কান্দাপ্পা পিল্লাই এবং অম্বি সিংকে নিয়ে আসেন। তাঁদের ট্রুপে সঙ্গীতের দায়িত্ব দেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানকে। বহু উৎসাহী-গুণী ছাত্র-ছাত্রী এই সেন্টারে এসে উপনীত হয় যাদের মধ্যে গুরু দত্ত, শান্তি বর্ধন, রুমা গুহ ঠাকুরতা, নরেন্দ্র শর্মা, জোহ্‌রা সায়গল, শান্তা গান্ধী প্রমুখ সব উজ্জ্বল নাম।

এই সেন্টারের ছাত্রী আরেক গুণী নৃত্যশিল্পী অমলা পরে উদয়শঙ্করের অর্ধাঙ্গিনী হন। উদয়শঙ্কর-অমলাশঙ্করের জুটি নৃত্যে দর্শকমহলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্যারিসে থাকাকালীন অমলাশঙ্করের সঙ্গে ‘কালীয়দমন’ নৃত্য উপস্থাপন করেছিলেন উদয়শঙ্কর। মাত্র চার বছর পর ১৯৪২ সালে এই সংস্থা অর্থকরী দৈন্যতায় বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পরে কলকাতার বালিগঞ্জে শেষ জীবনে ১৯৬৫ সালে উদয়শঙ্কর পুনরায় আরেকটি নৃত্য-সংগঠন স্থাপন করেন ‘উদয়শঙ্কর সেন্টার ফর ডান্স’ নামে।

এর মাঝে ১৯৪৮-এ শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলীর উপর একমাত্র চলচ্চিত্র ‘কল্পনা’ নির্মাণ করেন উদয়শঙ্কর। দর্শকমহলে তেমন সাড়া না পেলেও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এই ছবিটি। শোনা যায় নাকি সত্যজিৎ রায় মোট এগারোবার ‘কল্পনা’ ছবিটি দেখেছিলেন। উদয়শঙ্করের ছাত্র গুরু দত্ত এই চলচ্চিত্রের প্রাথমিক চিত্রনাট্যের খসড়া তৈরি করেছিলেন।

উদয়শঙ্করই প্রথম যিনি পূর্বতন মন্দির বা রাজদরবারকেন্দ্রিক নৃত্য উপস্থাপনের বদলে পেশাদারি নৃত্য উপস্থাপনের প্রচলন করেন। বিভিন্ন সময়ে তাঁর উপস্থাপিত নৃত্য-পরিবেশনাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ১৯৩০-এর দশকে ‘শিবনৃত্য’, ‘স্নেক চার্মার’, ‘যুদ্ধযাত্রা’, ‘রাসলীলা’, ‘হারভেস্ট’, ‘কুমায়ুন গ্রাস কাটারস্‌’, ‘রিদ্‌ম অফ লাইফ’; আবার ১৯৪০-এর দশকে ‘ফাইভ অ্যারো’স অফ প্রদ্যুম্ন’, ‘দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা’, ‘রামলীলা’, কিরা-অর্জুন’, ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’, ‘ইটারনাল মেলোডি’ ইত্যাদি।

১৯৭১ সালে মঞ্চে সিনেমার মতো ছবি দেখিয়ে বিশেষ ধরনের উপস্থাপনরীতি উদ্ভাবন করেন উদয়শঙ্কর যার নাম দেন ‘শঙ্করস্কোপ’। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতা অনুসরণে নৃত্য উপস্থাপন করেন উদয়শঙ্কর। বহু সম্মান ও খ্যাতি লাভ করেছেন তিনি সারা জীবন ধরে। নৃত্যের মাধ্যমে সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন এই ভারতীয় শিল্পী।

১৯৬০ সালে তাঁর প্রবর্তিত ‘ক্রিয়েটিভ ডান্স’-এর জন্য তিনি সঙ্গীত নাটক একাডেমি পুরস্কার পান, ১৯৭১ সালে পান পদ্মবিভূষণ পুরস্কার। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে ১৯৭৫ সালে। কলকাতার টালিগঞ্জ এলাকায় তাঁর নামেই গল্‌ফ ক্লাব রোডের নতুন নামকরণ হয় উদয়শঙ্কর সরণি।   ১৯৭৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর উদয়শঙ্করের মৃত্যু হয়।