মহাভারতে দুর্যোধনের বৈষ্ণবযজ্ঞ

মহাভারতে দুর্যোধনের বৈষ্ণবযজ্ঞ

দুর্যোধন বা দূর্যোধন হলেন মহাভারতের একটি চরিত্র। তিনি কৌরব পক্ষের যুবরাজ ছিলেন। তার পিতার নাম ধৃতরাষ্ট্র এবং মাতার নাম গান্ধারী। তিনি ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান। মহাভারতের বনপর্বের ২৫৩ তম অধ্যায় থেকে ২৫৬ তম অধ্যায় পর্যন্ত দুর্যোধনের বৈষ্ণবযজ্ঞের কথা বর্ণিত হয়েছে। দ্বৈত বনে ঘোষযাত্রায় গিয়ে দুর্যোধন ও সব কৌরব ভাইয়েরা গন্ধর্বদের কাছে হেরে যান ও বন্দি হন।

যুধিষ্ঠির এই কথা জানতে পেরে ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেবকে পাঠিয়ে কৌরবদের মুক্ত করেন এবং হস্তিনাপুরে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন। পান্ডবদের কৃপায় জীবন ফিরে পেয়ে দুর্যোধন খুব ভেঙে পড়েন এবং আত্মহত্যা করতে যান। পরে অবশ্য ভাইদের অনুরোধে ও শকুনির উপদেশ শুনে তাঁর মনে শান্তি ফিরে আসে এবং তিনি রাজধানীতে ফিরে আসেন।

হস্তিনাপুরে ফিরে এসে দুর্যোধন সবাইকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই সময়ে আমাদের কোন কাজ করলে ভালো হয়, কোন কাজ করা আমাদের বাকি আছে এবং তা কীভাবে করলে ঠিক ভাবে শেষ হবে, সেই কথা আপনারা আমাকে বলুন।” কর্ণ তখন তাঁকে যুধিষ্ঠিরের মতো রাজসূয় যজ্ঞ করার পরামর্শ দিলেন। এই কথা দুর্যোধনের খুব পছন্দ হল এবং তিনি পুরোহিতদের ডেকে এনে রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করতে আদেশ করলেন।

তখন পুরোহিতরা বললেন, “মহারাজ! যুধিষ্ঠির বেঁচে থাকতে আপনাদের বংশের অন্য কেউ এ যজ্ঞ করতে পারবেন না আর তাছাড়া, আপনার বাবা মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র এখনও বেঁচে আছেন এবং তাঁর আয়ু অনেক বেশি। সেজন্যও এই যজ্ঞ করা আপনার উচিত নয়। তবে রাজসূয় যজ্ঞের মতোই আরও একটি মহাযজ্ঞ আছে। আপনি আমার কথা শুনুন, সেই যজ্ঞ করুন। আপনার অধীনে যে সব রাজারা আছেন, তাঁদের কাছ থেকে কর হিসেবে সোনার জিনিস এবং আসল সোনা সংগ্রহ করুন।

সেই সোনা দিয়ে একটি লাঙ্গল তৈরি করতে হবে এবং সেই লাঙ্গল দিয়ে যজ্ঞের জমি চাষ করতে হবে। তারপর সেই জমিতে সব নিয়ম এবং আচার মেনে যজ্ঞ শুরু হবে। এই যজ্ঞের নাম বৈষ্ণবযজ্ঞ । এর আগে একমাত্র ভগবান বিষ্ণু ছাড়া এই বৈষ্ণবযজ্ঞ কেউ করেননি। রাজসূয় যজ্ঞ ও বৈষ্ণবযজ্ঞ একই ফল দেয়। এই যজ্ঞ করলে আপনার মনের সব ইচ্ছা পূর্ণ হবে।” ব্রাহ্মণদের এই সব কথা দুর্যোধন তাঁর ভাইদের এবং গুরুজনদের জানালেন।

সকলেই অনুমতি দিলে যজ্ঞের কাজ আরম্ভ হল। অনুগত রাজাদের থেকে কর হিসেবে অনেক সোনা নিয়ে আসা হল এবং তা দিয়ে লাঙ্গলও তৈরি করা হল। সব আয়োজন শেষ হলে ধৃতরাষ্ট্র অন্য অন্য রাজা ও ব্রাহ্মণদের নিমন্ত্রণ করার জন্য চারিদিকে দূত পাঠালেন। একজন দূতকে আড়ালে ডেকে দুঃশাসন বলে দিলেন, “তুমি দ্বৈতবনে গিয়ে পাপী পান্ডবদের এই যজ্ঞে নিমন্ত্রণ করে এস।” দূত আদেশমত তাই করল।

দুর্যোধনের যজ্ঞের কথা শুনে যুধিষ্ঠির দূতকে বললেন, “আমার ভাই দুর্যোধন এমন বিরাট যজ্ঞ করছে শুনে আমি খুব খুশি হয়েছি। আমরাও সেখানে নিশ্চয়ই যাব কিন্তু কোনোমতেই এখন যাব না। তেরো বছর শেষ হলে তবে যাব।” নির্দিষ্ট সময়ে বৈষ্ণবযজ্ঞ আরম্ভ হল। সোনার লাঙ্গল দিয়ে যজ্ঞের জমিতে চাষ করে সেই জমিতে শুরু হল যজ্ঞের নানা অনুষ্ঠান ও নিয়ম-নীতি।

আস্তে আস্তে বিনা বাধায় যজ্ঞ শেষ হল। মহারাজ দুর্যোধন যজ্ঞের পুরোহিতদের প্রচুর দক্ষিণা দিলেন। অন্যান্য ব্রাহ্মণদেরও অনেক অনেক মূল্যবান জিনিস দান করলেন। রাজাদের অনেক উপহার দিলেন। গরীব-দুঃখীদের খাবার, জামা-কাপড়, টাকাপয়সা দান করলেন। রাজ্যে জয়জয়কার পড়ে গেল। কিন্তু তবুও কিছু লোক বলতে লাগল, “মহারাজ! আপনার এ যজ্ঞ যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের সমান হয়নি।”আবার কেউ কেউ বলল, “এই বৈষ্ণবযজ্ঞ রাজসূয় যজ্ঞের ষোলো ভাগের এক ভাগের মতোও হয়নি।”

অবশ্য দুর্যোধনের বন্ধু ও আত্মীয়রা বললেন, “এ যজ্ঞ সব যজ্ঞকে ছাপিয়ে গেছে। কারণ পুরাকালে যযাতি, নহুষ, মান্ধাতা ও ভরতের মত বিখ্যাত রাজারা এই যজ্ঞ করেই স্বর্গে গেছেন।” তখন রাজা দুর্যোধন আনন্দিত হয়ে রাজপুরীতে ঢুকলেন। গুরুজনদের প্রণাম করলে সবাই তাঁকে আশীর্বাদ করলেন। এইভাবে দুর্যোধনের বৈষ্ণবযজ্ঞ শেষ হল।

[ আরও পড়ুন জামাই ষষ্ঠী ]