পরনে শাড়ি, মাথায় ঘোমটা, ভদ্রেশ্বর জগদ্ধাত্রী বরণ করেন পুরুষেরাই

পরনে শাড়ি, মাথায় ঘোমটা, ভদ্রেশ্বর জগদ্ধাত্রী বরণ করেন পুরুষেরাই

কারও হাতে জলের পাত্র। কারও ডালা। কারও মুঠোয় গুচ্ছ ফুল।কারও পরনে বাসন্তী-রঙা শাড়ি। কেউ লালপেড়ে। কেউ আটপৌরে। প্রতিমা বরণের ফ্রেমে এ সবই থাকে। থাকে বধূদের ভিড়ে সিঁদুরের হোলি। এই ছবিটাই একটু পাল্টে নিন। নারীর আসন দিন পুরুষকে। উৎসবের একটি পর্বে লিঙ্গপরিচয় মুলতুবি থাক।না, কল্পকথা নয়। দশকের পর দশক ধরে Jagaddhatri Puja জগদ্ধাত্রীর বিজয়ার লগ্নে এমন অসম্ভব মুহূর্ত তৈরি হয়।

তেঁতুলতলা ও গঞ্জ বাজার--- Bhadreswar ভদ্রেশ্বরের দু’টি প্রাচীন পুজোয় পুরুষরা নারীর বেশে বরণ করেন প্রতিমাকে। রীতি মেনে সাতবার প্রতিমাকে প্রদক্ষিণ করা হয়। বিজোড় সংখ্যায় থাকেন পুরুষরা। তাঁদের আচার-আচরণ হয় নারীসুলভ। কোমর দুলতে থাকে, চপল চরণে ললিত ছন্দ। ভিড় যখন ভেঙে পড়ে, তখন সিঁড়ি বেয়ে উঠে দেবীর আরও কাছে পৌঁছে যান তাঁরা। মুখে সন্দেশ গুঁজে দেন।

একে একে সকলে বরণ করেন জগদ্ধাত্রীকে। চন্দননগর-ভদ্রেশ্বর অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন জগদ্ধাত্রীর ঠিকানা এই তেঁতুলতলায়। কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দেওয়ান দাতারাম সুর ১৭৬৩ সালে এই পুজোর সূচনা করেন। কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোর এক বছর পরেই। ভদ্রেশ্বরগঞ্জের পুজোর বয়স ২১০ বছর। এই পুজো কমিটির কর্তা প্রদীপ মণ্ডল বলেন, ‘আমরাই মাকে বরণ করি, মহিলারা নন।

একেবারে আলাদা অনুভূতি।’ কিছুক্ষণের জন্য রূপান্তর কামনা কি জাগে মনে? তেঁতুলতলার গোরাচাঁদ দাসের ভাষায়, ‘মায়ের কাছে নিবেদনটাই বড়। সেটাই মনে থাকে। এই দিনটা আমাদের কাছে অন্যরকম।’এই বিস্ময়কর প্রথার উৎস নিশ্চিত ভাবে বলা মুশকিল। কালীতে কৃষ্ণ দর্শন করা কোনও ভাবতন্ময় সাধক কি এই প্রথার নেপথ্যে? চন্দননগর বিএড কলেজের অধ্যাপক বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরে দাতারামের প্রসঙ্গ টানেন।

বলেন, ‘দাতারামের দুই কন্যা ছিলেন জমিদারনি। তাঁরাই পুজোর আয়োজন করতেন। তাঁদের প্রয়াণের পর ভদ্রেশ্বরের মানুষরা পুজোর ভার নেন। সেই দুই কন্যার স্মরণে সম্ভবত মহিলার বেশে পুরুষের বরণের প্রথা চালু হয়।’ প্রবীণদের কারও কারও মতে, দু’শো বছর আগে হয়তো পুজোয় মহিলাদের অংশগ্রহণ তেমন ছিল না। তাই নারীর ভূমিকা নিতেন পুরুষরা। প্রাচীন দু’টি পুজোর অনুকরণে এখন নিমতলা স্পোর্টিং ক্লাব, নেতাজি পল্লি কদমতলার মতো নবীন বারোয়ারিতেও বরণের একই প্রথা জায়গা করে নিয়েছে।