পুরুষোত্তম মাস বা ‘মলমাস’ কী? কেন শুভ কাজ করা যায় না?

পুরুষোত্তম মাস  বা  ‘মলমাস’ কী? কেন শুভ কাজ করা যায় না?

আজবাংলা    চলছে পুরুষোত্তম মাস বা মল মাস। পুরুষোত্তম বলা হয় কারণ বৈষ্ণব গ্রন্থাবলীতে বলা হয়েছে এটি শ্রী বিষ্ণুর সবচেয়ে প্রিয় মাস। অপর দিকে আবার মল মাস বলেও প্রচলিত রয়েছে। মল মাস হলো অশুদ্ধ মাস। এই মাসে হিন্দুরা সাধারণত শুভানুষ্ঠান করেন না। এখন প্রশ্ন হলো, এই মাস কেন শ্রী বিষ্ণুর প্রিয় ? কিংবা কেন এই মাসটিকে অশুদ্ধ মাস বলা হয় ? শ্রী বিষ্ণুর প্রিয় মাস কেন অশুদ্ধ হবে ? এই মাস প্রতি বছর আসে না।

এটি প্রায় ২/৩ বছর পর পর আসে। সনাতন শাস্ত্রে এটি অতিরিক্ত মাস। আসুন প্রথমে জেনে নেই এটি কিভাবে অতিরিক্ত হলো।চান্দ্র ও সৌরবর্ষের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য অতিরিক্ত একটি মাস হিসাব করা হয়।এটি অনেকটা ইংরেজি অধিবর্ষের মতো।আরেকটু ক্লিয়ার করি।

ইংরেজিতে যেমন প্রতি চার বছর পর পর ফেব্রুয়ারির ১ দিন বাড়ে ঠিক তেমন ভাবে চান্দ্রমাসে প্রায় ৩ বছরে ১ মাস বৃদ্ধি পায়। প্রতি চান্দ্রমাস ও সৌরমাসের পার্থক্যের কারণে প্রতি মাসে ১৯ থেকে ২৬ ঘণ্টার (গড়ে ২৩ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট ও ২৮সেকেণ্ড) একটি ব্যবধান থেকে যায়। অর্থাৎ চান্দ্রবর্ষের ৩৬০টি তিথিতে সর্বমোট ৩৫৪.৩৬ সৌরদিন লাগে।

ফলে প্রতিবছর চান্দ্র ও সৌরমাসের মধ্যে ১০দিন ২১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের পার্থক্য হয়। এই অতিরিক্ত ১০দিন ২১ ঘণ্টা (২৯.৫৩ * ১০.৬৩) গড়ে ২.৭১বছর বা ৩২.৫ মাসে সমন্বয় করা হয়। ৩২ টি সৌরমাসের জন্য ৩৩টি চান্দ্রমাস। মোট কথা, চান্দ্র ও সৌর বর্ষের মধ্যে একটি অতিরিক্ত মাস সমন্বয় করতে হয়। সাধারণত, প্রতি ১৯ বছরে ৭টি অধিমাস পড়ে।

এটি নির্ভর করে গ্রহসঞ্চারের সময়ের উপর ভিত্তি করে। কখনো সেটি ২৮ মাস, কখনো ৩১, ৩২, ৩৩ বা ৩৫ মাসহতে পারে। এজন্য মহাভারতে পাঁচ বছরে দুটি অতিরিক্ত মাসের কথা বলা হয়েছে। এই অধিক মাস যদি যুক্ত না করা হত তাহলে সনাতন বর্ষপঞ্জীতে বৈশাখের গ্রীষ্মকাল না হয়ে অনেক সময় মাঘ মাসে গ্রীষ্ম চলে যেত। এতে করে কালের সাথে মাসের অনেক পার্থক্য হয়ে যেত। মূলত অধিক মাস বলতে কিছু না। চান্দ্র ও সৌরবর্ষ ঠিক রাখতেই এই অধিক মাসের প্রচলন শাস্ত্র সম্মত।

এটি কেন মল মাস ?মাস অতিরিক্ত হওয়ায় এই অধিমাসে কোন পালনীয় তিথি বিদ্যমান থাকে না, তাই কোনো বৈদিক কর্মকাণ্ড এই মাসে পালিত হয় না। আবার অনেকেই কোন শুভ কাজ এই মাসে করতে চায় না। তবে এটি অশুভ মাস নয়। অন্য মাস গুলোর মতই শুদ্ধ। আর যেহেতু এই মাসে বৈদিক কর্মকাণ্ড করা হয় না তাই এটিকে মল মাস বলা হচ্ছে। 

এই মাস কেন পুরুষোত্তম ?

এই মাস শ্রী বিষ্ণুর প্রিয়। ইহা বৃহন্নারদীয় পুরাণ এবং পদ্মপুরাণে বর্ণনা করা হয়েছে। বৃহন্নারদীয় পুরাণের একত্রিংশৎ অধ্যায়ে এই মাসের মাহাত্ম্য বর্ণনা হয়েছে।‘‘.... অধিমাস বহুকষ্টে বৈকুণ্ঠে গমন পূর্বক নিজ দুঃখ নারায়ণ কে জানাইয়াছিলেন। বৈকুণ্ঠ পতি অর্থাৎ নারায়ণ কৃপা করিয়া অধিমাসকে সংগে লইয়া গোলকে শ্রী কৃষ্ণের নিকট উপস্থিত হইলেন। শ্রী কৃষ্ণ অধিমাসের দুঃখ শুনিয়া বললেন হে অধিমাস রমাপতি, আমি যেই রূপ এই জগতে পুরুষোত্তম বলিয়া পরিচিত ঠিক তেমনি তুমিও পুরুষোত্তম মাস বলিয়া অভিহিত হইবে। এবং অন্য সকল মাসের অধিপতি হইবে’’

তিথি এবং নক্ষত্রের হিসাব সাধারণত চন্দ্রের গতির উপর নির্ভর করে হয়। সূর্য এবং চন্দ্রের দূরত্বের ব্যবধান যখন ০ ডিগ্রি তখন অমাবস্যা। প্রত্যেক ১২ ডিগ্রির ব্যবধানে তিথির পরিবর্তন হয়। মেষ রাশির প্রথম ডিগ্রি থেকে প্রত্যেক ১৩ ডিগ্রি ২০ মিনিটের ব্যবধানে (চন্দ্রের ) নক্ষত্রের পরিবর্তন হয়। প্রত্যেক চন্দ্রমাস ২৯.৫৪ দিনে। চন্দ্রবর্ষ ৩৫৪.৩৬ দিনে।

সূর্য প্রত্যেক রাশিতে কমবেশি ৩০ দিন ১০ ঘণ্টা অবস্থান করে। মেষ রাশি থেকে শুরু করে ১২ রাশি ভ্রমণ করে পুনরায় মেষ রাশিতে ফিরতে সময় লাগে ৩৬৫.৫৪ দিন। অর্থাৎ সৌরবর্ষ ৩৬৫.৫৪ দিনে। পৃথিবীর নিজ কক্ষপথে ভ্রমণ করতে সময় লাগে ৩৬৫.৬৯ দিন।অর্থাৎ প্রত্যেক বৎসরের (চন্দ্রবর্ষ এবং সৌরবর্ষ) হিসাবে কম বেশি ১১.১৮ দিনের পার্থক্য হয়। এই পার্থক্য হিসাবে সাধারণত প্রত্যেক ৩২ মাস অন্তর ৩০ দিন বা ১ মাস বৃদ্ধি হয়। এই বৃদ্ধি মাসই অধিক মাস। অধিক মাস মল মাস এবং পুরুষোত্তম মাস নামেও পরিচিত।

মলমাসে সাধারণত বিবাহ, অন্নপ্রাশন, গৃহ ক্রয়, গৃহপ্রবেশ, শুভ বস্তু ক্রয়ের মত শুভ কার্য করা হয় না। তবে পুরুষোত্তম মাস ভগবান শ্রী বিষ্ণুর পূজা এবং ধর্মশাস্ত্র  পাঠের পক্ষে প্রশস্ত মাস এবং ওই কাজে শুভ ফল পাওয়া যায়।১৪২৭ সনের আশ্বিন মাস (১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৬ অক্টোবর) অধিক মাস বা মলমাস বা পুরুষোত্তম মাস।

এই মাসে ১ আশ্বিন এবং ৩০ আশ্বিন অমাবস্যা।

১১ আশ্বিন এবং ২৭ আশ্বিন একাদশী।

১৫ আশ্বিন পূর্ণিমা।