বিশ্ব আলঝেইমার দিবস

বিশ্ব আলঝেইমার দিবস

বিংশ শতাব্দীতে ৪৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সীদের মধ্যেই এই রোগ হতে দেখা যায় সব থেকে বেশি। আর রোগ থেকেই ডিমেনশিয়া হতে থাকে। ১৯৮৪ সাল থেকে world alzheimer day অ্যালজাইমার্স ডিজিজ ইন্টারন্যাশনাল এই রোগে আক্রান্ত মানুষদের চিকিৎসা করাতে সাহায্য করতে থাকে এবং একই সঙ্গে সচেতনতাও ছড়াতে থাকে। ১৯৯৪ সালে এই সংস্থাই ২১ সেপ্টেম্বরকে বেছে নেয় বিশ্ব অ্যালজাইমার্স দিবস হিসেবে, যেদিন এই রোগের গুরুত্ব, ভয়াবহতা ইত্যাদি সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা হবে। ২১ তারিখ বেছে নেওয়া হয়েছিল কারণ ১৯৯৪ সালে এই সংগঠনের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছিল ওই দিনই তাই।

  কোথাও কোথাও এই রোগের গুরুত্ব অনুসারে সারা মাসব্যাপী আলঝাইমার্স মাস পালন করা হয়ে থাকে। ১৯৮৪ সালে ‘আন্তর্জাতিক আলঝাইমার ব্যাধি’ নামে একটি সংস্থা স্হাপিত হয় যারা সারা পৃথিবীতে আলঝাইমার রোগীদের সাহায্য করার জন্য তৈরী হয়েছে। এই সংস্থার দশম প্রতিষ্ঠা দিবসে ১৯৯৪ সালে ২১ সেপ্টেম্বর তারিখে প্রথম বিশ্ব আলঝাইমার্স দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

আলঝাইমার্স একটি স্নায়বিক অবক্ষয়মূলক রোগ যা সাধারণত বৃদ্ধ বয়সেই দেখা যায় বেশি। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে পঁয়ষট্টি বছরের বেশি ব্যক্তিরাই বেশি এই রোগের শিকার। প্রথমদিকে স্মৃতিভ্রংশ হওয়া এই রোগের প্রথম লক্ষণ। এরপর ধীরে ধীরে রোগের প্রকোপ বাড়লে রোগীর মধ্যে অস্হিরতা বাড়ে ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্রমশ কমতে থাকে। এর সাথে রোগীর শারীরিক দুর্বলতা দেখা যায় এবং শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকর্মগুলিও ক্রমশ দুর্বল হতে শুরু করে। খাওয়ার প্রতি অনিচ্ছা এবং রাগ বৃদ্ধি পায়।

প্রথমদিকে দৈনন্দিন কাজগুলি মনে থাকে না। পরবর্তীতে রোগের প্রকোপে নিজের নাম ও ঠিকানাও মনে রাখতে অক্ষম হয়ে পড়ে রোগী। এইভাবে একসময় রোগীর মৃত্যু হয়। মনোচিকিৎসক আলোইস আলঝাইমার ১৯০১ সালে সর্বপ্রথম এই রোগটিকে চিহ্নিত করেন বলে তাঁর নামানুসারেই এই রোগের নামকরণ করা হয়। এই রোগে আক্রান্ত তাঁর প্রথম রোগী ছিলেন অগাষ্টি ডেটর। গবেষণায় জানা গেছে এই রোগটির একশোটিরও বেশী ধরন হয়। ২০০৬ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে এই রোগে ২ কোটি ৬৬ লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন।

এবং ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি ৮৫ জনে একজন এই রোগের শিকার হবেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুসারে সারা পৃথিবীতে প্রতি ৬৮ সেকেন্ডে একজন এই রোগের শিকার হন। এই রোগের কোন স্হায়ী প্রতিকার নেই। আলঝাইমার্স রোগের কারণ এখনও সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তবুও গবেষণার তথ্যানুসারে এই রোগটিকে মস্তিষ্কের প্লাক ও টেঙ্গুল যা হাইড্রোফসফোরাইলেটেড টাউ প্রোটিনের সমষ্টিগত সংশ্লিষ্ট রোগ। এই রোগের সম্ভাব্য কারণগুলি হল —– ১) আমাদের মাথার কর্টেক্সে ও সামনের অংশে বড় পিরামিডের মত অ্যাসিটাইলকোলিন নিউরণ থাকে যা বুদ্ধি বিকাশে সাহায্য করে। এই অ্যাসিটাইলকোলিন নিউরনে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী অণুনালিকা থাকে।

আলঝাইমার্স রোগে টাউ প্রোটিনের গাঠনিক পরিবর্তনের কারণে এই অ্যাসিটাইকোলিন নিউরনের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। সেই কারণে মানুষের বুদ্ধি ও বিচারশক্তি হ্রাস পায়। ২) আমাদের স্নায়ু রক্ষা করে ‘অ্যামাইলয়েড প্রিকারস’ নামে একটি প্রোটিন। অতিরিক্ত স্নায়বিক চাপের কারণে এবং কোন কারণে স্নায়ুতে চোট বা আঘাত লাগলে ‘অ্যামাইলড প্রিকারস’ ভেঙ্গে গিয়ে অ্যামাইলড বিটা নামক এক ধরনের প্রোটিন উৎপাদিত করে যা মস্তিষ্কের রক্তকণিকার মধ্যে দলা পাকিয়ে অ্যামাইলড প্লাক গঠন করে।

এই অ্যামাইলড প্লাকই মস্তিকের স্নায়ুকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে রোগী ধীরে ধীরে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হতে শুরু করে। এখনও অবধি এই রোগের কোন প্রতিকার করা সম্ভব হয়নি। আক্রান্ত রোগীর উপযুক্ত যত্ন ও সাহচর্য বিশেষ প্রয়োজন। এই রোগ থেকে বাঁচার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম, যোগাসন, পুষ্টিকর খাদ্য যেমন বাদাম, আখরোট নিয়মিত গ্রহণ করা প্রয়োজন। ইংল্যান্ড, ওয়েলস এবং নর্দান আয়ারল্যান্ডে ‘ডিমেনশিয়া কানেক্ট’ নামে একটি সংস্হা কাজ করে যারা ঐ অঞ্চলের ডিমেনশিয়া রোগীদের অনলাইন পরিসেবা দিয়ে থাকে।

এতে স্হানীয় তথ্য, সহায়তা, পরিষেবা প্রদানকারী ৪,০০০ সংস্হার নাম নথিভুক্ত করা আছে। ঐ নিদির্ষ্ট অঞ্চলের রোগীরা নিজের পোষ্টকার্ড বা জায়গার নাম অর্ন্তভুক্ত করলে ঐ অঞ্চলের কোন দাতব্য বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে ডিমেনশিয়া কানেক্ট’ পরিষেবা প্রদান করে থাকে। আগে পৃথিবীর মধ্যে যে সমস্ত ঐতিহাসিক উঁচু সৌধ বা মিনার রয়েছে সেগুলিকে বেগুনী রঙের আলো দিয়ে আলোকিত করা হত বিশ্ব আলঝাইমার দিবসে। বর্তমানে বেগুনী রঙের ব্রেসলেট বাঁধা হয় হাতে।

বিভিন্ন সংস্থা বিশ্ব আলঝাইমার্স দিবস উদযাপনের জন্য সভা, সমিতির আয়োজন করে থাকে সারা পৃথিবী জুড়েই। এই রোগ সম্বন্ধে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে একসঙ্গে সংঘবদ্ধভাবে হাঁটা হয় বিভিন্ন জায়গায়। প্রবীণদের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নে আরও বেশী সচেতন হওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন করা হয়। প্রতি বছরই আলঝাইমার দিবস পালনে আন্তর্জাতিক আলঝাইমার ব্যাধি নামের সংস্থাটি কিছু বিশেষ থিম রাখে।

২০১২ সালের প্রথম থিম ছিল ‘ডিমেনশিয়া : একসাথে বাঁচা’ (Dementia : Living Together) ২০১৫ সালের থিম ছিল ‘আমাকে মনে রেখো’ (Remember me). ২০১৬ সালের থিমও ছিল ঐ একই ‘আমাকে মনে রেখো’ (Remember me)। ২০১৭ সালেও ছিল এই একই থিম। ২০১৮ সালের থিম ছিল ‘প্রতি তিন সেকেন্ডে’ (Every 3 seconds)। ২০১৯ সালের থিম ছিল ‘ডিমনেশিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হোক’ (Let’s talk about dementia)। ২০২০ সালের থিম ছিল ২০১৯ সালের মত একই ‘ডিমেনশিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হোক’ (Let’s talk about dementia)। ২০২১ সালের থিমও ‘ডিমেনশিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হোক’ (Let’s talk about dementia) ।  

অ্যালঝাইমার্স রোগের লক্ষণগুলি কী কী? বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের স্মৃতিশক্তির সমস্যাকে অ্যালঝাইমার্স রোগের প্রধান উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রোগীদের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি মনে রাখতে সমস্যা হতে পারে, জিনিসগুলি নামিয়ে রাখার পরে ভুলে যেতে, সম্প্রতি যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাদের নাম মনে রাখতে। রোগের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর লক্ষণগুলি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে, যা আরও বিপজ্জনক বলে মনে করা হয়। নিরাপত্তা এবং ঝুঁকি বোঝার অভাব।যে কোনও সমস্যায় সিদ্ধান্ত নিতে কষ্ট হচ্ছে। হতাশা, উদাসীনতা এবং সমাজ থেকে দূরত্ব।

বিরক্তি এবং ঘুমের অভ্যাসের পরিবর্তন। কথা বলার সময় আগের চেয়ে অনেক বেশি বিরক্তি বা রেগে যাওয়া।যেগুলি সাধারণত আনন্দ দেয়, তেমন ক্রিয়াকলাপে আগ্রহের অভাব।বিশেষজ্ঞরা জানান, যদিও অ্যালঝাইমার্স রোগের সঠিক কারণগুলি এখনও পুরোপুরি বোঝা যায়নি, তবুও এটি বিশ্বাস করা হয় যে মস্তিষ্কে নির্দিষ্ট ধরণের প্রোটিনের অভাবে মানুষের এই সমস্যা হতে পারে। শরীরের স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়। জিনগত, জীবনযাত্রা এবং পরিবেশগত কারণেও অ্যালঝাইমার্স রোগ হতে পারে। আপনার পরিবারের মধ্যে বা আশেপাশের কারো যদি কোনো অস্বাভাবিক স্মৃতি বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে, অনুগ্রহ করে আপনার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

মৃত্যুর কারণ হতে পারে অ্যালঝাইমার্স ডিজিজ: ইউএস-ভিত্তিক ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং অনুসারে, অ্যালঝেইমার্স রোগ সে দেশের মৃত্যুর ষষ্ঠ প্রধান কারণগুলির মধ্যে একটি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্তিষ্কে প্লাক এবং জট থাকার কারণে মানুষ এই সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে যে মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় নষ্ট হওয়ার কারণেও এই সমস্যা হতে পারে। অ্যালঝেইমার্স রোগের সমস্যা ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। তবে এই ব্যাধি কম বয়সীদের মধ্যেও দেখা দিতে পারে। তাই সকলেরই এর ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত।

আরো পড়ুন      জীবনী  মন্দির দর্শন  ইতিহাস  ধর্ম  জেলা শহর   শেয়ার বাজার  কালীপূজা  যোগ ব্যায়াম  আজকের রাশিফল  পুজা পাঠ  দুর্গাপুজো ব্রত কথা   মিউচুয়াল ফান্ড  বিনিয়োগ  জ্যোতিষশাস্ত্র  টোটকা  লক্ষ্মী পূজা  ভ্রমণ  বার্ষিক রাশিফল  মাসিক রাশিফল  সাপ্তাহিক রাশিফল  আজ বিশেষ  রান্নাঘর  প্রাপ্তবয়স্ক  বাংলা পঞ্জিকা