নদীয়ার শান্তিপুরের প্রাচীন ঈশ্বরী শ্রী শ্রী আগমেশ্বরী কালিমাতার পূজা কাহিনী

নদীয়ার শান্তিপুরের প্রাচীন ঈশ্বরী শ্রী শ্রী আগমেশ্বরী কালিমাতার পূজা কাহিনী

দক্ষিণাকালির রুপকারের তিন'শো সত্তর বছরের বেশি প্রাচীন পুজো। ঘোর অমাবস্যার রাত। এক তান্ত্রিক বসেছেন তন্ত্রসাধনায়। সামনে দেবীমূর্তিকে তিনি তৈরি করেছেন নিজের হাতে। পুজো শেষ হতেই ভোর হওয়ার আগেই দেবীমূর্তিকে বিসর্জন দেবেন তিনি। এমনই পুজো চলে প্রতি অমাবস্যায়। এই তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ।


"আগম"শব্দের অর্থ তন্ত্র। আর তন্ত্রের পণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ উপাধি পেলেন আগমবাগিশ। কৃষ্ণানন্দ জন্ম নিয়ে নানা মত থাকলেও এই কৃষ্ণানন্দের জন্ম ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে। চতুর্থ শতাব্দীতে থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যে তন্ত্র সাধনা বিপুল প্রচার পেলেও ক্রমশ তা সমাজের একটি শ্রেণীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়।সেই শ্রেণি রাজা, জমিদার আর ডাকাতেরা মেতে ওঠে তন্ত্র নিয়ে। তন্ত্রের এই অধোগতি দেখে কৃষ্ণানন্দ বহুতন্ত্রগ্রন্থের সারবস্তু নিয়ে লিখলেন "বৃহৎতন্ত্রসার" বৃহৎ তন্ত্রসারেই প্রথম লিখিত হল "শ্যামা পূজো" বা দক্ষিণা কালির পূজো পদ্ধতি।আমাদের দেশে যে ব্যাপক দক্ষিণা কালির পুজোর প্রচলন,

তার রূপ আর পুজো পদ্ধতির রূপকার কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ কিন্তু দেবীর বরাভয় কর ও ভ্রূ রং কি হবে তাই নিয়ে দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়লেন। চিন্তিত কৃষ্ণানন্দকে আদেশ দিলেন দেবী, "কাল সকালে উঠে তুমি যাকে প্রথম দেখবে সেই রূপেই আমার পুজো করবে।পরদিন সকালে কৃষ্ণানন্দ কুটির থেকে বেরোলেন।

সামনেই কৃষ্ণবর্ণ রমণী ডান পা, সামনে রেখে দেওয়ালে ঘুঁটে দিচ্ছেন। তার চুল খোলা, উর্ধাঙ্গে কোন বস্ত্র নেই।কপালের সিঁদুর ঘেমে নেমে এসে ভ্রূ রক্তবর্ণ। কৃষ্ণানন্দকে সামনে দেখে লজ্জায় জিভ কাটলেন রমণী। কৃষ্ণানন্দ ঐ মূর্তি দেখে রচনা করলেন দক্ষিণাকালীর ধ্যান।তারপর প্রতি অমাবস্যায় শুরু হল পুজো।


নবদ্বীপ আগমেশ্বরী পাড়ায় আজও কার্তিকী অমাবস্যার পুজো হয় কৃষ্ণানন্দ পূজিত কালীমূর্তির। এই কালীপুজো শুরু হয় কার্তিক মাসের পঞ্চমীতে। কৃষ্ণানন্দের বংশধরেরা নিয়ম মেনেই পঞ্চমীতে নিজের হাতে তৈরি করেন পাঁচ পোয়া খড়ের মূর্তি।তারপর পরের একাদশী পর্যন্ত ঐ মূর্তিরই পূজা হয়,ভোগ হয়। একাদশীতে যখন বড় প্রতিমার খড় বাঁধা হয় তখন এই ছোট পাঁচ পোয়ার প্রতিমাকে স্থাপন করা হয় বড় প্রতিমার বুকে।চতুর্দশীতে বসে প্রতিবার মাথা। আর আমাবস্যায় আঁকা হয় দেবীর চোখ।

এই কালীপুজোর বিশেষত্ব আছে অন্য জায়গায়। কৃষ্ণানন্দ নিজে শাক্তপন্থী হলেও তাঁর বাবা মহেশ্বর গৌড়াচার্য ও ভাই মাধবানন্দ ছিলেন বৈষ্ণব গোপালের উপাসক। তাই এ পুজোতে মাধবানন্দের বংশধরদের কাছ থেকে গোপালকে এনে তবে পুজো করার রীতি।আগমেশ্বরী পূজার ভোগে দিতে হয় অড়হর ডালের খিচুড়ি, এঁচোড়, মোচা আর চালতার টক। পরদিন বেলা ১২টার আগে বেহারাদের কাঁধে চেপে বিসর্জনে যান দেবী।

নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শান্তিরঞ্জন দেব বলেন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ছিলেন একজন মহা পন্ডিত এবং উঁচুদরের তন্ত্রসাধক। আজকে আমরা যে দক্ষিণা কালী মূর্তির পুজো করি সেই দক্ষিণা কালী মূর্তির তিনি প্রবর্তন করেন।মায়ের শান্তরূপ তারপর এই ভাবেই কালী পুজো শুরু হয়। দীপান্বিতার দিন নিজে হাতে কালী মূর্তি তৈরি করে পুজো দিয়ে ভোরবেলাতে বিসর্জন দিতেন তিনি। শান্তি রঞ্জন দেব বলেন কৃষ্ণানন্দ, অনুমান ১৬৪৪ থেকে ১৬৫০ ঘরে ঘরে গিরা যাতে শুদ্ধাচারে শক্তি আরাধনা করতে পারে তার জন্য তিনি দক্ষিণা কালী মূর্তির প্রবর্তন করেছিলেন।

তিনি বলেন ৩৭০ বছরের প্রাচীন এই আগমেশ্বরী কালী। ঐতিহ্য বজায় রাখা হয়েছে এখন যে বিরাট করে মূর্তি হচ্ছে। কিন্তু আগমবাগিসের সেই ঐতিহ্য বজায় রাখা হয়েছে ছোট বিচালি দিয়ে তৈরি মূর্তি পরে বৃহৎ মূর্তির হৃদয়ে প্রতি স্থাপন করা হয়। এখনও পুজো ঘিরে মানুষের মধ্যে উন্মাদনা রয়েছে।